রাত ১২:৩৯ ; রবিবার ;  ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮  

ফুটবলের শূন্য আনন্দ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মূল : মারিও বার্গাস ইয়োসা অনুবাদ: দুলাল আল মনসুর ||

বছর দুই আগে ব্রাজিলের নৃবিজ্ঞানী রবার্তো দে মাত্তার এক চমৎকার বক্তৃতা শুনেছিলাম। তাঁর সেই বক্তব্যে তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, ফুটবলের জনপ্রিয়তা আসলে বৈধতা, সমতা এবং স্বাধীনতার প্রতি মানুষের সহজাত আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে থাকে।  তাঁর যুক্তির মধ্যে বেশ চাতুরি ছিল, শুনতে ভালোই লেগেছে। তাঁর মতে জনগণ ফুটবলকে দেখে থাকে একটা আদর্শ সমাজের আদলে, সে সমাজ পরিচালিত হয়ে থাকে পরিষ্কারভাবে বোধগম্য সরল আইন দ্বারা এবং সে আইনগুলো প্রত্যেকে বুঝতে পারে, মেনেও চলে। আবার অমান্য করলে সঙ্গে সঙ্গে দোষীর শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে সে সব আইনে। ফুটবলের মাঠ হলো একটা সমতাবাদের জায়গা যেখানে কোনো রকমের পক্ষপাতিত্ব এবং বিশেষ সুবিধার স্থান নেই। এখানে সাদা দাগঅলা ঘাসের মাঠে ব্যক্তিকে মুল্যায়ন করা হয় তার কর্মের ভিত্তিতে, মানে তার দক্ষতা, উৎসর্জন, উদ্ভাবনী শক্তি এবং অন্যদের মনের ওপরে দাগ কাটতে পারার ক্ষমতার ভিত্তিতে। গোল করার ক্ষেত্রে, দর্শকদের হাততালি কিংবা দর্শকদের মাঝ থেকে বিভিন্ন রকম বাঁশির শব্দ শোনার ক্ষেত্রে নামযশ, কিংবা প্রভাবশালী ক্ষমতা গণ্য করার মতো তেমন কোনো বিষয়ই নয়। ফুটবল খেলোয়ার স্বাধীনতার একটিমাত্র বিষয়কে চর্চা করে থাকে। সমাজের পক্ষ থেকে নাগরিকদেরও স্বাধীনতার এই বিষয়টি চর্চা করার অনুমোদন দেয়া হয়ে থাকে। তার মানে সমাজের সদস্যরা যা কিছু তা-ই ইচ্ছে মতো করতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে তাদের ইচ্ছে যেন সকলের সমর্থনপ্রাপ্ত আইনের পরিপন্থী না হয়। এই বৈশিষ্ট্যই শেষ পর্যন্ত সমবেত দর্শকদের আবেগকে নাড়া দিতে পারে, দর্শকরা তাদের আবেগ ঢেলে দিতে পারে খেলার মাঠে, টেলিভিশনের সামনে বসে তারা মগ্ন মনোযোগে খেলার গতি অনুসরণ করতে পারে এবং নিজ নিজ ফুটবল আদর্শকে নিয়ে তর্কযুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। তাদের মধ্যে চলতে থাকে গোপন ঈর্ষা, ফুটবলের জগতের জন্য অবচেতন স্মৃতিবিধুরতা; তারা মনে করে থাকে, এরকম জগতই পারে ঐক্য, আইন আর সাম্যের সন্ধান দিতে। তারা আরো মনে করে থাকে, তাদের বসবাসের জগত তো অন্যায়, দুর্নীতি, অরাজকতা আর সংঘর্ষের ভাগার। এই সুন্দর মতবাদ কি সত্য হতে পারে? যদি সত্য হয়েই থাকে, তবে মানবতার ভবিষ্যতের জন্য সমবেত দর্শকদের সহজাত গভীরতার ভেতর নিবিড় অবস্থানে থাকা এই সভ্য অনুভূতিগুলোর চেয়ে অন্য কোনো কিছুই বেশি ইতিবাচক হতে পারে না। কিন্তু সাধারণত যেমন দেখা যায়, তত্ত্বকথার অসম্পূর্ণতা তুলে ধরার মাধ্যমে বাস্তবতা সব সময় তত্ত্বকথাকে ছাড়িয়ে যায়। তত্ত্বকথা সব সময়ই যুক্তিনির্ভর, বিচারক্ষম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক। এমনকি যে সব তত্ত্বকথা যুক্তিহীনতা এবং পাগলামির কথা উপস্থাপন করে থাকে সেগুলোও এরকমই। তবে মানব সমাজে এবং মানব আচরণে অবচেতন, যুক্তিহীন এবং খাঁটি স্বতঃস্ফূর্ততা সব সময়ই একটা ভূমিকা পালন করে যাবে। সে কথা অবশ্যম্ভাবী এবং অপরিমেয়।

[caption id="attachment_17569" align="aligncenter" width="512"]মারিও বার্গাস ইয়োসা মারিও বার্গাস ইয়োসা[/caption]

আর্জেন্টিনা এবং বেলজিয়ামের মাঝে অনুষ্ঠিতব্য এবারের বিশ্বকাপের (স্পেন ১৯৮২) প্রথম ম্যাচ শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট আগে আমি এই কথাগুলো কোনো রকমে লিখে যাচ্ছি নাও ক্যাম্পের একটা আসনে বসে। লক্ষণ অনুকূল মনে হচ্ছে: দীপ্তিমান সূর্য, বহুবর্ণিল ভীড়ের মাঝে দর্শকরা স্প্যানিস, কাটালান, আর্জেন্টিনা এবং কিছুসংখ্যক বেলজিয়ান পতাকা নাড়াচ্ছে, হৈহুল্লোড়ে ভরা আতশবাজি; চারদিকে উৎসবের আমেজ আর খেলাকে চাঙ্গা করার জন্য উপস্থাপিত নাচ এবং শারীরিক কলাকৌশল প্রদর্শনের প্রতি হাততালি পড়ছে। নাও ক্যাম্পের পেছনে ফেলে আসা বাইরের জগতের চেয়ে এখানকার জগত অনেক বেশি আকর্ষণীয়, কয়েক ডজন উঠতি বয়সীর শারীরিক কসরত এবং নাচের প্রতি দর্শকদের হাততালি অনেক বেশি মোহনীয়। দক্ষিণ আটলান্টিক কিংবা লেবাননে চলমান যুদ্ধের মতো কোনো যুদ্ধ এখানে নেই। ফুটবল বিশ্বকাপ সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ ভক্ত দর্শকের মনে যুদ্ধকে দ্বিতীয় স্থানে ফেলে দিয়েছে। এখানে উপস্থিত দর্শকদের মতোই সারা বিশ্বের দর্শকরা আপাতত পরবর্তী দুঘণ্টা অন্য কিছু ভাববেই না। তাদের মনে স্থান পাবে শুধু  টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচের আর্জেন্টিনা এবং বেলজিয়াম দলের বাইশজন খেলোয়ারের মাঝে বল আদান প্রদান আর বল মারার কৌশল।

ফুটবল এক সঙ্গে অনেক মানুষকে বিনোদন দিয়ে থাকে। সেদিক থেকে ফুটবলের রয়েছে বিশাল জনপ্রিয়তা। তবে আমরা, মানে ফুটবলের আনন্দপায়ীরা ফুটবলের এই বিশাল জনপ্রিয়তায় কিছুতেই বিস্মিত হই না। কিন্তু এমন অনেক মানুষ আছেন যারা ফুটবলের এই জনপ্রিয়তাকে বুঝতে পারেন না। তারা ফুটবলের সমালোচনাও করে থাকেন। তারা ফুটবলকে শোচনীয় মনে করে থাকেন। কারণ হিসেবে তারা বলে থাকেন, ফুটবল সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করে দেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে তাদেরকে দূরে রাখে। যারা এরকম কথা বলে থাকেন তারা ভুলে যান, আনন্দ পাওয়াটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারা আরো একটি কথা ভুলে যান, বিনোদনের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো- বিনোদান জিনিসটা স্বল্পস্থায়ী, সাধারণ বুদ্ধিতে ধরার মতো এবং অনপকারী

সম্ভবত এই অসাধারণ সাম্প্রতিক চিত্রের পক্ষের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ কোনো সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানী প্রদত্ত ব্যাখ্যার চেয়ে অনেক কম জটিল। কেননা আমজনতার ধর্মের পর্যায়ে উন্নীত ফুটবলের জন্য মানুষের প্রবল আবেগ এবং সকলের মনোযোগ অবশ্যই চোখে পড়ার মতো। ফুটবল মানুষকে এমন কিছু দিয়ে থাকে যা তারা অন্যখান থেকে কদাচিত পেয়ে থাকে: মজা করার সুযোগ, নিজেদেরকে আনন্দ দেয়ার, উত্তেজনা অনুভব করার কিংবা প্রাত্যহিক জীবনে পাওয়া যায় না এমন কিছু প্রবল আবেগ অনুভব করার সুযোগ।

মজা করতে চাওয়া, নিজেদেরকে আনন্দ দিতে চাওয়া, আনন্দে সময় কাটাতে চাওয়া নিশ্চয়ই একটা বৈধ আকাঙ্ক্ষা, কিংবা বলা যায় খাওয়া এবং কাজ করতে চাওয়ার মতোই একটা আইনসম্মত অধিকার। কারণ অনেক জটিল হয়ে থাকলেও আজকের বিশ্বে অনেকের জন্যই ফুটবল অন্য যে কোনো খেলার চেয়ে এই ভূমিকাটা অনেক বেশি সফলতার সঙ্গেই গ্রহণ করে ফেলেছে। ফুটবল এক সঙ্গে অনেক মানুষকে বিনোদন দিয়ে থাকে। সেদিক থেকে ফুটবলের রয়েছে বিশাল জনপ্রিয়তা। তবে আমরা, মানে ফুটবলের আনন্দপায়ীরা ফুটবলের এই বিশাল জনপ্রিয়তায় কিছুতেই বিস্মিত হই না। কিন্তু এমন অনেক মানুষ আছেন যারা ফুটবলের এই জনপ্রিয়তাকে বুঝতে পারেন না। তারা ফুটবলের সমালোচনাও করে থাকেন। তারা ফুটবলকে শোচনীয় মনে করে থাকেন। কারণ হিসেবে তারা বলে থাকেন, ফুটবল সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করে দেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে তাদেরকে দূরে রাখে। যারা এরকম কথা বলে থাকেন তারা ভুলে যান, আনন্দ পাওয়াটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারা আরো একটি কথা ভুলে যান, বিনোদনের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো- বিনোদান জিনিসটা স্বল্পস্থায়ী, সাধারণ বুদ্ধিতে ধরার মতো এবং অনপকারী। বিনোদন খুব তীব্র হতে পারে আবার নিমগ্নও হতে পারে। আর বিনোদন হিসেবে ফুটবল তো অবশ্যই প্রবলভাবে তীব্র  এবং নিমগ্ন। ফুটবল খেলা দেখা এমন একটা অভিজ্ঞতা যেখানে কারণ এবং ফলাফল একই সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়। যারা ফুটবলের ভক্ত তাদের কাছে খেলাধূলা মানে বাহ্য বস্তুর র প্রতি ভালোবাসা। সেটাকে বলা যেতে পারে চমৎকার একটা দৃশ্য এবং এই দৃশ্য শারীরিক এবং ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতা কিংবা তাৎক্ষণিক আবেগের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না। এ রকমের কোনো দৃশ্য বই কিংবা নাটকের মতো স্মৃতির ওপরে কোনো স্থায়ী রেখা ফেলে যায় না, আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে না, নিঃস্বও করে না। ফুটবলের আবেদন এখানেই; সেটা উত্তেজনাকর এবং ফাঁকা। সে কারণে বুদ্ধিমান এবং বুদ্ধিহীন, সংস্কৃতিবান এবং সংস্কৃতিরহিত মানুষ একইরকমভাবে উপভোগ করে থাকে ফুটবল। তবে সে যা-ই হোক, এখানে ক্ষান্ত দেয়া দরকার। রাজা এসে গেছেন। দুদলই বের হয়ে এসেছে। বিশ্বকাপ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়ে গেছে। খেলা শুরু হতে যাচ্ছে। লেখা আপাতত এই। চলুন নিজেদের একটু বিনোদন দেয়া যাক।

'ফুটবলেও যুদ্ধ আছে, শুধু গুলিবর্ষণ নেই'

দেখতে দেখতে চার বছর পার হয়ে গেল। চলে এল এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের মৌসুম। বিশ্ব জুড়ে সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের স্পন্দন দ্রুততর গতিতে চলবে আপাতত কিছুদিন। সকল শ্রেণির মানুষের সঙ্গে অনেক কবি সাহিত্যিকও সুর মেলাবেন তাঁদের আনন্দ বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে। এবারের বিশ্বকপের মতো অতীতেও তাঁরা সরব ছিলেন ফুটবল নিয়ে। তাঁদের অনেকের মধ্য থেকে মাত্র কয়েকজনের ফুটবল-অনুভূতির কথা দ্যা টেলিগ্রাফ অবলম্বনে তুলে ধরেছেন দুলাল আল মনসুর

[caption id="attachment_17535" align="aligncenter" width="418"]আলবেয়ার কামু আলবেয়ার কামু[/caption]

সাহিত্যে নোবেলজয়ী লেখক আলবেয়ার কামু ছিলেন একজন দক্ষ ফুটবলার। রেসিং ইউরভার্সিটেয়ার আলজেরিওস-এর খেলোয়ার ছিলেন তিনি। তাঁদের দল নর্থ আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নস কাপ জয় করেছিল। ফুটবল সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য সারাবিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল। তিনি বলেছিলেন, নৈতিকতা এবং আইনগত বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে আমি যা কিছু শিখেছি সে সবের জন্য আমি ফুটবলের কাছেই ঋনী। তাঁর এই মন্তব্য এক সময় অগণিত ফুটবল ভক্তের টি-শার্ট এবং পোস্টারে শোভা পেয়েছে।

[caption id="attachment_17537" align="alignleft" width="179"]স্যার আর্থার কোনান স্যার আর্থার কোনান[/caption]

কালজয়ী গোয়েন্দা কাহিনী শার্লক হোমস-এর রচয়িতা স্যার আর্থার কোনান ডয়েল ছিলেন ফুটবল খেলোয়ার। পোর্টসমাউথ অ্যাসোসিয়েসন ফুটবল ক্লাবের গোল রক্ষক ছিলেন তিনি। কোনান ডায়েলের খোলোয়ারী ছদ্মনাম ছিল এসি স্মিথ। সে সময় তাঁর আবাস বিছল সাউথসিতে। অবশ্য ১৮৯৬ সালে তাঁদের সেই ক্লাব ভেঙে যায় এবং বর্তমানের পোর্টসমাউথ এফ সি ক্লাবের সঙ্গে তাঁদের সেই ক্লাবের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। উল্লেখ্য, কোনান ডয়েল ভালো ক্রিকেটও খেলতেন। এম সিসি ক্লাবের জন্য তিনি দশটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচও খেলেছেন।

[caption id="attachment_17541" align="alignright" width="209"]জে কে রাউলিং জে কে রাউলিং[/caption]

হ্যারি পটার-খ্যাত জে কে রাউলিং ফুটবলের ভক্ত। ছদ্মবেশে তিনি ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডের খেলা দেখেছেন। হ্যারি পটার সিরিজের প্রথম বই হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার্স স্টোন এবং চতুর্থ বই হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য গবলেট অভ ফায়ার-এ সংক্ষেপে হলেও হ্যামার্সদের কথা আছে।  একবার আমেরিকার একদল ছাত্র তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল উপন্যাসে তিনি ফুটবল দলের কথা উল্লেখ করেছেন কি না। তাদের কথার জবাবে তিনি বরং প্রশ্ন করেছিলেন ওয়েস্ট হ্যাম নামে আমেরিকায় কোনো ফুটবল দল আছে কি না।

[caption id="attachment_17544" align="alignleft" width="192"]মার্টিন এমিস মার্টিন এমিস[/caption]

মানি এবং লন্ডন ফিল্ডস উপন্যাসের লেখক মার্টিন এমিসও একজন ফুটবল ভক্ত। তাঁর মতে বুদ্ধিজীবি ফুটবল ভক্তরা বুদ্ধিজীবি এবং ফুটবল ভক্ত উভয়ের কাছেই অপছন্দনীয়। যেহেতু ফুটবল তাঁর পছন্দের বিষয়, অন্য বিষয়ে কথা বলার সময়ও তিনি ফুটবলের ভাষায় কথা বলতে পছন্দ করেন। ২০১২ সালে টেলিগ্রাফের সঙ্গে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময়ও তিনি ফুটবলের ভাষায় কথা বলেন। ইংল্যান্ড সম্পর্কে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, সেখানকার যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি মিস করেন সেটি হলো ফুটবল। তিনি বলেন, আমি মনে করি ফুটবলের আকর্ষণ কোথায় আমার জানা আছে। ফুটবলই একমাত্র খেলা যাতে একটিমাত্র গোলের মাধ্যমে জয়পরাজয় নির্ধারিত হয়ে যায়। কাজেই খেলার মুহূর্তের উত্তেজনা খুব প্রবল হয়ে থাকে। অন্য কোনো খেলায় এতটা উত্তেজনা অনুভব করা যায় না।

[caption id="attachment_17546" align="alignright" width="199"]জুলিয়ান বার্নস জুলিয়ান বার্নস[/caption]

২০১১ সালের ম্যান বুকারজয়ী লেখক জুলিয়ান বার্নস লেইসেস্টার সিটি ক্লাবের আজীবন ভক্ত। ২০০১ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তাঁর ছেলেবেলার লেইসেস্টারশায়ারের প্রতি তাঁর অটুট ভক্তির কারণ হলো সেখানকার ফুটবল। সিটি ক্লাবের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন ১৯৯৬ সালে ওয়েম্বলিতে ক্রিসটাল প্যালেস ফুটবল ক্লাবের বিপক্ষে স্টিভ ক্লারিজের শেষ মুহূর্তের বিজয়ের কথা।

[caption id="attachment_17548" align="alignleft" width="183"] জে বি প্রিস্টলি জে বি প্রিস্টলি[/caption]

ইংরেজ ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সাহিত্য সমালোচক জে বি প্রিস্টলি ছিলেন ফুটবল ভক্ত। তাঁর প্রিয় ফুটবল দল ছিল নটিংহাম ফরেস্ট ক্লাব। ফুটবল দর্শকদের অপরিমেয় আনন্দের কথা বলতে গিয়ে তিনি তুলনা টেনেছিলেন, যদি মনে করা হয় এই দর্শকেরা পয়সা খরচ করে শুধু বাইশজন ভাড়াটে লোকের পায়ে ফুটবলে লাথি মারা দেখতে এসেছে তাহলে বলা যায় একটা বেহালা মানে শুধু কাঠ আর তার এবং হ্যামলেট মানে গাদা গাদা কাগজ আর কালি।

[caption id="attachment_17549" align="alignright" width="188"]জর্জ ওরঅয়েল জর্জ ওরঅয়েল[/caption]

ফুটবল নিয়ে কথা বলেছেন এনিম্যাল ফার্ম-খ্যাত লেখক এবং বিখ্যাত প্রবন্ধকার জর্জ ওরঅয়েলও। তবে ফুটবল সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য অতিশয় তীক্ষ্ম ও মর্মভেদী। দ্য স্পোটিং স্পিরিট পত্রিকায় ফুটবল সম্পর্কে অম্ল মিশ্রিত মন্তব্যে তিনি লেখেন, জগতের অশুভ মানসিকতায় আরো কিছু যোগ করতে চাইলে ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। সে প্রতিযোগিতাগুলো হতে পারে ইহুদি আর আরবদের মাঝে, জার্মান এবং চেকদের মাঝে, ভারতীয় এবং ব্রিটিশদের মধ্যে, রাশিয়ান এবং পোলিশদের মাঝে কিংবা হতে পারে ইতালীয় এবং যুগোশ্লাভদের মাঝে। সে সব প্রতিযোগিতার প্রতিটিতে দর্শক থাকতে হবে এক লাখের মতো। ফুটবলে ন্যায়নীতি বলে কিছু নেই। ঘৃণা, ঈর্ষা, অহংকার এবং সকল আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা ফুটবলকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে রেখেছে। অন্যকথায় বলা যায়, ফুটবলেও যুদ্ধ আছে, শুধু গুলিবর্ষণ নেই।

[caption id="attachment_17550" align="alignleft" width="155"]সালমান রুশদী সালমান রুশদী[/caption]

কথাসাহিত্যিক সালমান রুশদীও ফুটবলের ভক্ত। তিনি বেশ জোরেশোরেই ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, তিনি টোটেনহাম হটস্পার ফুটবল ক্লাবের ভক্ত। ফুটবল সম্পর্কে ১৯৯৯ সালে তিনি নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনে প্রবন্ধও লিখেছেন।

[caption id="attachment_17551" align="alignright" width="178"]অস্কার ওয়াইল্ডের অস্কার ওয়াইল্ডের[/caption]

ফুটবলের প্রতি আইরিশ নাট্যকার কবি অস্কার ওয়াইল্ডের দৃষ্টিভঙ্গি অন্যদের থেকে একটু আলাদা। ফুটবলবোদ্ধা হিসেবে তিনি ফুটবল সম্পর্কে বেশ রসালো মন্তব্যই করেছেন। তিনি বলেছেন, রূঢ় মেজাজের মেয়েদের খেলা হিসেবে ফুটবল অবশ্যই যুৎসই খেলা একটা, তবে কোমল স্বাভাবের ছেলেদের জন্য উপযুক্ত নয়। রাগবির সঙ্গে তুলনা করে ফুটবল সম্পর্কে তিনি বলেন, রাগবি হলো অসভ্যদের খেলা, কিন্তু খেলে থাকেন ভদ্রলোকেরা; অন্যদিকে ফুটবল হলো ভদ্রলোকদের খেলা, কিন্তু খেলে থাকেন অসভ্য লোকেরা।

তাঁদের মতোই ফুটবলের প্রতি অনুরক্তি দেখা গেছে স্যার ওয়াল্টার স্কট, জ্যাঁ পল সার্ত্রে, ঔপন্যাসিক ইয়ান ম্যাকইউয়ান, বৃটিশ ঔপন্যাসিক সাহিত্য সমালোচক ও সুরকার অ্যান্টনি বার্জেস, আইরিশ নাট্যকার ও ঔপন্যিাসিক রডি ডয়েল, ইংরেজ কমেডি লেখক ডেভিড নোবস, ইংরেজ লেখক ও অভিনেতা স্টিফেন ফ্রাইসহ আরো অনেক লেখকের।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।