রাত ০৩:২৬ ; রবিবার ;  ১৬ জুন, ২০১৯  

সংকটে ব্যান্ডউইথ বাজার

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

হিটলার এ. হালিম॥

লাইসেন্স পাওয়ার দুই বছরেও চালু হয়নি ১০টি আইআইজি প্রতিষ্ঠান।

চাহিদার তুলনায় অধিক সংখ্যক লাইসেন্স দেওয়ায় ব্যান্ডউইথ বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজে পাচ্ছে না দেশের আইআইজি (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) অপারেটরগুলো। অনেক অপারেটর ব্যান্ডউইথ সেবা ব্যবসা চালু করেই আবার বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে সংকটের মুখে পড়েছে দেশের ব্যান্ডউইথের বাজার।

লাইসেন্স পাওয়া ৩৭টি আইআইজি অপারেটরের মধ্যে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে ১১টি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মার্কেট শেয়ারও সন্তোষজক বলে জানা গেছে। কারণ তাদের নিজস্ব ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বা আইএসপি রয়েছে। অন্যদিকে ১০টি অপারেটর কার্যক্রম শুরু করতে ব্যর্থ হয়েছে আর ১৫টি প্রতিষ্ঠান ঘাম ঝরাচ্ছে স্রেফ টিকে থাকার জন্য। আইআইজি অপারেটরগুলোর এই ন্যাক্কারজনক বাজার অবস্থার জন্য টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভুল নীতিমালাকেই দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রসঙ্গত, আইআইজি অপারেটররা আইএসপি, মোবাইল ফোন অপারেটর এবং ওয়াইম্যাক্স অপারেটরগুলোর কাছে ব্যান্ডউইথ বিক্রি করে। এসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেয়।

ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান তথা আইএসপিগুলোর মধ্যে অনেকেই আইআইজি লাইসেন্সধারী হওয়ায় ব্যান্ডউইথের বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ছে। দেশে মোট ব্যবহৃত ব্যান্ডউইথের পরিমাণ ৫০ গিগাবাইট হওয়ায় একেকটি আইআইজি অপারেটরের ভাগে পড়ছে দেড় গিগাবাইটেরও কম। অথচ টিকে থাকার জন্য অপারেটরদের ভাগে ন্যূনতম ৫-৬ গিগাবাইট থাকা দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১২ সালের আগ পর্যন্ত (২০০৮ সাল থেকে) মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) ও ম্যাঙ্গো টেলিসার্ভিসেস দেশে প্রয়োজনীয় ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করত। ২০১২ সালের ১২ এপ্রিল একসঙ্গে আরও ৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে ব্যান্ডউইথ অপারেটর বা আইআইজি লাইসেন্স দেয় সরকার। টেলিযোগাযোগ বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার শুরু তখন থেকেই। বর্তমানে ৩৭টি আইআইজি অপারেটরের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠানই আছে দুটি; বিটিসিএল এবং বিএসসিসিএল (বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড)

এ বিষয়ে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবি’র সভাপতি আক্তারুজ্জামান মঞ্জু বলেন, বেসরকারি অপারেটরগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে। ফলে শুরু হয়েছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

ব্যবসায় ভারসাম্য আনা না গেলে অচিরেই অনেক অপারেটর তাদের সেবা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের ব্যবহৃত মোট ৫০ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ এই ৩৭টি অপারেটর ভাগ করে নিচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, দেড় গিগারও কম ব্যান্ডউইথ নিয়ে অপারেটরগুলো কিভাবে টিকে থাকবে? একসঙ্গে এতগুলো আইআইজি লাইসেন্স দেওয়াকে তিনি সরকারের 'অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত' বলে মন্তব্য করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চালু থাকা ৬টি আইটিসির (ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাবল) মাধ্যমে দেশে নিম্নমানের ব্যান্ডউইথও ঢোকার অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের ব্যান্ডউইথ কম দামে বিক্রি হওয়ায় ভালো ব্যান্ডইউথ বাজার হারাচ্ছে। সবমিলিয়ে ব্যান্ডউইথ বাজারে অস্থিরতা চলছে।

আইআইজির রাষ্ট্রায়ত্ত্ব এক অপারেটরের শীর্ষ কর্মকতা বলেন, ব্যান্ডউইথ নিয়ে বাঘের সঙ্গে শেয়ালের লড়াই শুরু হয়েছে। এ লড়াইয়ে পরাজয় নিশ্চিত। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ছোট ছোট প্যাকেজ কিনে তারা কীভাবে টিকে থাকবে? এ বিষয়ে সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে আইআইজি অপারেটর ফাইবার অ্যাট হোমের প্রধান কৌশলগত কর্মকর্তা সুমন আহমেদ সাবির বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান আইটিসি এবং অন্যান্য উপায়ে মাত্র ২ দশমিক ৫ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ আনতে পারছে। অনেকের অবস্থা ফাইবার অ্যাট হোমের চেয়ে অনেক খারাপ। তাদের হাতে ব্যান্ডউইথ আছে কিন্তু বিক্রি করার জন্য প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে না। এ কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা শোচনীয় বলে জানান তিনি।

সাবির আরও জানান, শর্ত ছিল আইআইজি অপারেটরগুলো ব্যান্ডইউথ আনবে আর আইএসপিগুলো তাদের কাছ থেকে কিনবে। কিন্তু, এ রকম না হওয়াতেই সমস্যাগুলো দেখা দিচ্ছে। এক সঙ্গে অসংখ্য লাইসেন্স দেওয়াকেই এর কারণ হিসেবে দুষছেন অনেকে। এত সংখ্যক লাইসেন্স দেওয়ার পেছনে বাজার চাহিদার চেয়ে রাজনৈতিক চাপ প্রাধান্য পাওয়ায় বর্তমানে এই অস্থিরতা শুরু হয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যান্ডউইথের ব্যবসায়িক দৌড়ে টিকে থাকতে পারছে না।

যেসব প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে অপারেশনে আসতে পারেনি বিটিআরসি সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেবে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে। ওই সূত্রের দাবি, বেশিসংখ্যক লাইসেন্স দেওয়া বাজারের জন্য কোনও সমস্যা নয়। বরং যারা ভালো করবে তারাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে।

এর আগে ২০১২ সালের এপ্রিলে যখন এক সঙ্গে ৩৫টি আইআইজি লাইসেন্স দেওয়া হয় তখন দেশে মাত্র ২৫ গিগা ব্যান্ডউইথ ব্যবহৃত হতো। আর এখন প্রায় ৬০ গিগা ব্যবহার হচ্ছে ডাটা এবং ভয়েস যোগাযোগে। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনোয়ার হোসেন জানান, আইআইজি অপারেটরগুলো বিএসসিসিএল ও ৬ আইটিসি থেকে আইপি (ইন্টারনেট প্রটোকল) ট্রানজিট নিচ্ছে। তিনি আরও জানান, বিএসসিসিএল সরাসরি (নিজস্ব আইআইজি লাইসেন্স থাকা সত্বেও) আইএসপিগুলোর কাছে ব্যান্ডউইথ বিক্রি করে না।

এইচএএইচ/এফএ

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।