রাত ০১:২৫ ; রবিবার ;  ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮  

‘ঝুলবারান্দায় মেঘ’ : সম্পর্কের নস্টালজিয়া

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মেহেদী উল্লাহ || আধুনিক মানুষের বদলে যাওয়া সম্পর্কের নানাবিধ প্রবণতাকে কবিতা করে তুলেছেন মোহীত উল আলম। তাঁর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘ঝুলবারান্দায় মেঘ’ মূলত জৈবিক সংহতিমূলক সম্পর্কের নস্টালজিক ডিসকোর্স। নর-নারী, প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী-স্ত্রী, মা-ছেলে, ভাই-বোন অথবা অাত্মীয়-অনাত্মীয় মিলে যে বন্ধনসূত্র তার বিনির্মাণের রূপটিও অন্যতম অন্বিষ্ট এই কাব্যগ্রন্থের। সম্পর্কের নানামাত্রিক রূপ যেমন- সম্পর্কের সূচনা, সম্পর্কের পরিণতি, সম্পর্কের ভাঙন কিংবা সম্পর্কের ফেলে যাওয়া দাগ- সব মিলিয়ে তুমুল সম্পর্কমুখর ব্যাখ্যান হাজির হয়েছে কবিতার পরতে পরতে। আবার কখনো কখনো সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে সম্পর্কে চিড় ধরায় যে শ্যামসমান মৃত্যু তার করুণ-কঠিন বক্ররূপটিও উপভোগযোগ্য। এবার দেখা যাক, কাব্যগ্রন্থটিতে সম্পর্কের স্বরূপ- যে মানুষটি পৃথিবীতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অবস্থান করে এবং অন্যান্য মরণশীল মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয় কবি সেই ব্যক্তি মানুষটিকে পরিচিত করে তোলেন এইভাবে- এত সাবলীল থাকে মানুষ কীভাবে- ‘আরম্ভ, শেষ, মাঝখান-তার নিটোল/এক সুরে বাঁধা, যেন এখানে কাটবে সুর, ওখানে যে/ ভয়াবহ একটি পতন অপেক্ষারত, তারের জটাজাল-’ (ভুলতে পারি না) কবি জানান, এই মানুষটির এই যে জীবন তা অর্থহীন যতক্ষণ না পর্যন্ত সে অন্যের ভিতরে প্রবেশ করে। অন্যের ভিতরে চলে গেলেই কী শান্তি! কবি পাঠকের কাছে জানতে চেয়ে মূলত বোধে আঘাত করে বোঝান, একে অন্যের ভেতরে ঢোকার নামই সম্পর্ক। কবির কাছে প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কের রূপ কখনো কখনো অভিসার। প্রেমিক বা প্রেমিকা প্রিয় মানুষের চিঠির জন্য অপেক্ষারত। ঝুল-বারান্দায় একলা দাঁড়িয়ে, ওদিকে আকাশে চাঁদ, দু'দিকে দু’জন একা। এই একাকিত্বই যান্ত্রিক সংহতি। কবি সম্পর্কের এই নবতর মাত্রাকে কবিতায় উপস্থিত করে একে আরো প্রকট করে তুলেছেন ঝুল বারান্দার প্রতীকে। বারান্দা নাগরিক জীবনে নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বের প্রতীক। এই সম্পর্কের ভেতর দিয়েই কবি প্রবল রাজনীতি সচেতন। ‘এ ভাবে ভালো থাকা, কী করব বল’ কবিতায় প্রাণপ্রিয় সন্তানের মৃত্যুর আশঙ্কার কথা বলতে বলতে কবি প্রবেশ করেন রাজনীতির ময়দানে। তিনি উচ্চারণ করেন- যদি হতশ্রী দেশকে ফেলে রাষ্ট্রনেতা যায় সুখের ভ্রমণে, যদি বন্দুকের গুলিতে রাজপথে মারা পড়ে সুশীল নাগরিক, যদি দরপত্রের দপ্তরে চলে লুটেরাদের হামলা। এভাবেই বর্তমান বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটকে সামনে এনে এর রাজনৈতিক অবস্থান চিহ্নিত করেন কবি। আর তা পাঠকমাত্রই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবগত আছেন। এছাড়া নেতারা গোপন মন্ত্র দিচ্ছে কার জান নিতে হবে, কাকে করতে হবে নির্বংশ- এই দেশবিনাশী রাজনীতি চারিত্র্য সম্পর্কেও সচেতন কবি। এছাড়া এর পরিণামে অস্তিত্বহীন ব্যক্তি মানুষকেও কবিতায় তুলে ধরতে পিছপা হননি কবি। তিনি জানান, আর তুমি যে ভয় পাচ্ছ ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে, যেন ব্যাঙের সর্দি সেটা। এ প্রসঙ্গে জ্যাঁ পল সার্ত্রের সেই মন্তব্য মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যক্তি স্বাধীন হয়েও পরাধীন, কারণ তার সামনে বিকল্পের ফলাফলসহ হাজির থাকে না।’ এখানেও ঝুলবারান্দায় দাঁড়ানো ব্যক্তিটি হতবিহ্বল, সে কী সিদ্ধান্ত নেবে ভেবে পাচ্ছে না। মূলত, এই কারণেই ব্যক্তি মানুষটি অস্তিত্বহীনভাবে একা। তার সামনে ফলাফলসহ কোনো সম্ভাবনা হাজির নেই। সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে না। মূলত, ব্যক্তির এই অস্তিত্বহীন দশাই বর্তমানে পৃথিবীর সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক নির্দেশ করছে। পৃথিবী ব্যক্তিকে পরিশেষে কোনঠাসা করতে করতে শোষক আর শোষিতের ছকে ফেলেছে। ‘মা জেগে থাকেন ঠিকই’ কবিতায় আছে মা ও ছেলের চিরাচরিত বাঙালিয়ানা সম্পর্ক। কবিতার শুরুতে মায়ের বর্তমান শারীরিক অবস্থার বর্ণনা দেন কবি। পাখির উপমা ব্যবহার করে তিনি জানাচ্ছেন, ‘পাখি হয়ে যাচ্ছেন আমার মা। দুবলা পাতলা, শীর্ণকায়া/ হাতের কুঁচকান চামড়া/পাখির ডানার মতো খসখসে কিংবা মসৃণ।’ মা ও তাঁর সংসারের বিগত দিনের ভাবনা সামনে আনেন কবি। তারপর মা ছেলের বাড়ি ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকেন। ছেলের কোনোদিন তাড়াতাড়ি ফেরা হয় না, তবুও মা জেগে থাকেন। মা ও ছেলের এই সম্পর্কের রূপটিও মূলত জৈবিক সংহতিমূলক। ইউরোপীয় সমাজ বাস্তবতার নিরিখে যান্ত্রিক সংহতির সঙ্গে এই রেওয়াজ ও আবেগের নিঃস্বার্থ সম্পর্ক কতটা খাপ খায়? ‘নির্বিবাদ’ কবিতায় গদ্য ঢংয়ে কবি সম্পর্কের এমন একটি দুঃসহ সংবাদ দেন যাতে গা শিউরে ওঠে। যেমন, ছোট দেবরটা স্কুলে বলল, ‘জানিস, আমার ভাবী গান জানেন।’ আরেকদিন/ বলল,‘ভাবী রান্নাঘর থেকে বের হতে পারেন/ না। ভাইয়া ভাবীকে তলপেটে লাথি মেরেছে। তাঁর/ তিনবার গর্ভপাত হলো এ নিয়ে।’ ‘সম্পর্ক কোত্থেকে হয়!’ কবিতায় কবি নিজেই প্রশ্ন রেখেছেন সম্পর্কের জন্ম বিষয়ে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন,‘কে বোঝাবে কাকে, কোত্থেকে সম্পর্ক হয়, কিংবা ভাঙে!’ এভাবেই সম্পর্কের ভাঙা-গড়ার রহস্য উন্মোচিত হয় না কবির কাছে। সবার কাছেই তা অধরা। তবুও সম্পর্ক তৈরির মূলসূত্র আছে। কর্তব্য করলেই অধিকার আপনাতেই আসে। অধিকারের ধরনই ঠিক করে সম্পর্কের রূপ। এখনো পর্যন্ত সম্পর্ক বিষয়ে মোদ্দাকথা, সম্পর্ক একটা ক্ল্যাসিক দাসত্ব জেনেও মানুষ একে সচল করে রাখে। এমনকি সম্পর্ক ভেঙে গেলে কেউ কেউ একে যাপন করে। নাগরিক একাকীত্বের ঘোরে ফেসবুকে বসে মানুষ ভাবে-‘আহা! পৃথিবীটা গ্লোবাল ভিলেজ।’ আর, আর তার একটা ঝুলবারান্দা আছে! পুরো কাব্যগ্রন্থে বারবার উচ্চারিত হয়েছে এই ‘ঝুলবারান্দা’ শব্দটি। কাব্যে এটি প্রতীক। কীসের? এটি নাগরিক একাকীত্বের প্রতীক। আসলে, মানুষে-মানুষে সম্পর্কগুলির একটা আদর্শ রূপরেখা হয়তো আছে, কিন্তু মানুষের মনের অন্তর্নিহিত লোভ, সীমাহীন আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রভুত্ব করার বাসনা সেই সম্পর্কগুলির বিবর্তন ঘটিয়েছে- ক্রমশ অস্বচ্ছ করেছে। অবশেষে দ্বিচারিতার মাধ্যমে অবিশ্বাস ও সন্দেহের কুয়াশায় আবৃত হয়ে তাদের মূল তাৎপর্য আর নেই। তারা দলে দলে ভাগ হয়ে যায় অথবা যাচ্ছে। তবুও মানুষ সম্পর্ক গড়তে চায়। এটা তার আদিম বাসনা। তা প্রাগৈতিহাসিক। প্রথম প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর, ২০১২/ প্রচ্ছদ : গোলাম কবির/ প্রকাশক : একাডেমিক প্রেস এন্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরি/ মূল্য: ১৫০ টাকা।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।