রাত ০৮:০৪ ; শনিবার ;  ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯  

অংশীদারিত্বের সম্পর্কে সকল দলের ভূমিকা চায় চীন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে অংশীদারিত্বে উন্নীত করতে সরকারি বেসরকারি নির্বিশেষে সকল দলের সহযোগিতা চায় চীন। শতকরা ৯৫ ভাগ বাংলাদেশি পণ্যের উপর শুল্ক ছাড় দিয়ে সমতার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন করতে চায় দেশটি। বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে চীনা রাষ্ট্রদূত লি জুন একথা বলেন। চলতি মাসের ৫ তারিখ লি জুনের সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেন বাংলা ট্রিবিউনের প্ল্যানিং এডিটর ও ঢাকা ট্রিবিউনের স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স  এডিটর সাহিদুল ইসলাম চৌধুরী। লি জুনের জন্ম ১৯৫৯ সালে। তিনি এক কন্যাসন্তানের পিতা। প্রশ্ন: চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক এখন যে পর্যায়ে আছে তাতে কি আপনি সন্তুষ্ট? লি জুন: চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক অন্য যে কোনও সময়ের তুলনায় ভালো যাচ্ছে, বিশেষত ক্ষমতাসীন ও বিরোধী- সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে এই সম্পর্ক পরিপুষ্ট হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার। অপরদিকে বাংলাদেশ চীনের তৃতীয় বৃহত্তর ব্যবসায়িক অংশীদার। পারস্পরিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে গড় বার্ষিক বৃদ্ধি ১০% যা ২০১৩ সালে ১০ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। আমার বিশ্বাস আরও ঘনিষ্ঠ ও ব্যাপক সমঝোতার সম্পর্কে যাবার জন্য দু’দেশের কাজ করা উচিত যাতে করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বিনিময়ের দিক থেকে উভয়েই উপকৃত হয়। প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে যাচ্ছেন (৬ জুন)। তিনি এর আগেও চীন সফরে গিয়েছেন। এবারের সফরের বিশেষত্ব কী? লি জুন: সাম্প্রতিক সময়ে চীন ব্যাপক কাঠামোগত উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সে কারণে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে যেন তারা বিদেশে বিনিয়োগ করে। বন্ধুত্ব, সততা ও সাফল্যের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে নতুন নেতৃত্বকেও স্বাগত জানানো হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ জনতাত্ত্বিক কারণেই চীনের জন্য ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই দুই রাষ্ট্র বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোরের অধীনে আঞ্চলিক সমঝোতায় অঙ্গীকারবদ্ধ। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের সফর বিদ্যমান সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে। বিশেষত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, টেলিযোগাযোগ, শক্তি প্রকল্প, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে দুই দেশের পুরনো বন্ধুত্ব নতুন মাত্রা পাবে। প্রশ্ন: বাংলাদেশ কী করে চীনের বাড়তি বৈদেশিক বিনিয়োগ পেতে পারে? লি জুন: আগামী পাঁচ বছরে চীন বাড়তি ৫০০ বিলিয়ন ডলার বিদেশে বিনিয়োগ করবে ও ১০ ট্রিলিয়ন আমদানি করবে। যেহেতু বাংলাদেশের দক্ষ শ্রমশক্তি ও বিনিয়োগযোগ্য নীতি আছে, ফলে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে চীনের জন্য অন্যতম প্রধান গন্তব্য হবে। চীনের জন্য বিশেষ রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা স্থাপনকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে। প্রশ্ন: চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে নিষ্কর ও কোটামুক্ত ব্যবস্থার সুবিধা বাংলাদেশ কতটা কাজে লাগাতে পেরেছে? লি জুন: চীন ২০১০ সালে বাংলাদেশের ৪৭২১ প্রকার পণ্যকে করমুক্ত ঘোষণা করেছে। গত তিন বছরে বাংলাদেশ ৬৯০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের করমুক্ত পণ্য চীনে পাঠিয়েছে। এটা ছিল মোট রপ্তানির শতকরা ৪৫ ভাগ এবং বেঁচে যাওয়া করের পরিমাণ ছিল ৩৬১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। প্রশ্ন: বাংলাদেশি টাকা ও চীনা মুদ্রা আরএমবি বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক লেনদেন নিষ্পত্তির সম্ভাব্যতাকে আপনই কিভাবে দেখেন? লি জুন: আরএমবির আন্তর্জাতিকীকরণের অংশ হিসেবে চীন ছয় বছরে বিশটিরও বেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় চুক্তি সাক্ষর করেছে। এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আছে যুক্তরাজ্য, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ব্রাজিল ইত্যাদি। দ্রুত উন্নতির সূচকে এর পরিমাণ ২ ট্রিলিয়ন আরএমবি। আমরা জানি এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর ও বাস্তবায়নে শুধু সময় নয়, তার আগে সম্ভাব্যতা নিরূপণ ও সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর সরকারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। আরএমবির আন্তর্জাতিকীকরণ প্রক্রিয়া ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে আরএমবি ও টাকার বিনিময়ের চুক্তির বিষয়ে আমরা আশাবাদী মনোভাব রয়েছে। প্রশ্ন: মায়ানমারের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে এ পর্যন্ত যে অগ্রগতি, তা আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন? লি জুন: চীন ও বাংলাদেশ ২০১০ সালে সড়ক ও রেল যোগাযোগের বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন থেকেই দুই পক্ষই এ বিষয়ে ঘনিষ্ট সহযোগিতা বজায় রেখেছে। বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মায়ানমার আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে এবং বাণিজ্য, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের লক্ষ্যে একটি অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠার জন্যে কাজ করে যাচ্ছে। বিসিআইএম-ইসি এর অধীনে চীন-বাংলাদেশ সড়ক যোগাযোগ প্রকল্পটি অগ্রগণ্য হবে বলেই আমার বিশ্বাস। প্রশ্ন: দায়িত্বপ্রাপ্ত চীনা কোম্পানির ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণে দেরির বিষয়ে আপনার কি কোন বক্তব্য আছে ? লি জুন: প্রথমত, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি এই দেরির পেছনের কারণ জটিল ও বহুমাত্রিক। তা সত্ত্বেও নির্মাণ ত্বরান্বিত করতে এই কোম্পানিটি পুরো রসদ এই নির্মাণ কাজের পেছনে ব্যয় করছে। মার্চে এই কাজের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে চীনা দূতাবাস ও বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। যে কোন প্রকল্পের বাস্তবায়নের সাফল্যের পেছনে সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও উপদেষ্টারা কোম্পানিটির যৌক্তিক দাবীগুলো বিবেচনায় আনবে ও একযোগে কাজটি শেষ করবে। প্রশ্ন: বাংলাদেশের সঙ্গে চীনা সামরিক সমঝোতার কৌশলগত কোনও বিশেষত্ব আছে কি? থাকলে সেগুলো কী কী ? লি জুন: চীন- বাংলাদেশ সামরিক সমঝোতা কৌশল প্রসঙ্গে আমি তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করবো। প্রথমত, সামরিক সহযোগিতা দুই দেশের সমন্বিত অংশীদারিত্বেও অপরিহার্য অংশ, যা সম্পর্কের প্রসারের ক্ষেত্রেই শুধু নয়, আমাদের সরকার ও জনগণের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে আধুনিক ও শক্তিশালী করতে চীন বিনাশর্তে সহযোগিতা করছে। তৃতীয়ত, এই সমঝোতা আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ম মেনেই করা হচ্ছে। এই সহযোগিতা তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়। প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক নদী ব্রহ্মপুত্র চীন, ভারত ও বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে, যা চীনে ইয়ালুজাঙবু নামে পরিচিত। চীন কি এই নদী ব্যবস্থাপনায় কোন যৌথ উদ্যোগে যেতে চাইবে? লি জুন: চীনা সরকার পানিসম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি রাখে। চীন এই নদীর পানিসম্পদ ব্যবহারে পরিবেশবান্ধব আচরণ করতে ও স্রোতের নিচের দিকে অবস্থিত দেশগুলোর কথা বিবেচনায় রাখতে দায়বদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে এই পানিসম্পদের বিষয়ে ২০০৮ সাল থেকেই বাংলাদেশ ও চীনের সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে দুই দেশের সরকার হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য ভাগাভাগির জন্য সমঝোতা সনদে সাক্ষর করেছে। সনদ অনুযায়ী বন্যার সময়ে চীন বাংলাদেশকে পানির উচ্চতা ও বৃষ্টিপাত সম্পর্কিত তথ্য দিয়ে সাহায্য করে আসছে। প্রতি বছর ১ জুন থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে বন্যাপ্রবণ বলে বিবেচনা করা হয়। চীনের পানিসম্পদ বিষয়ক উপমন্ত্রী জুনে বাংলাদেশ সফর করবেন। সেসময় দুই পক্ষ ২০১৩ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া সনদ নবায়ন করবেন। আমরা এ বিষয়ে আরও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে পারব বলেই আমার বিশ্বাস।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।