রাত ১০:০০ ; শুক্রবার ;  ১৮ অক্টোবর, ২০১৯  

মুখোমুখি মার্কেস ও ইয়োসা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

হামীম কামরুল হক || কলাম্বিয়ার গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ও পেরুর মারিয়ো বার্গাস ইয়োসা- দুজনের পরিচয় আলাদা করে দেওয়ার মনে হয় তেমন কোনো দরকার নেই। দুজনেই সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। লাতিন আমেরিকার সাহিত্যকে বিশ্বমানে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই দুজনের ভূমিকা কারো অজানা নয়। সে ভূমিকাটি আরো স্পষ্ট করে বোঝার ক্ষেত্রে একটি ছোট্ট বই বোধ করি দারুণ কাজে আসতে পারে। বইটি এখনো অব্দি ইংরেজিতে প্রকাশতি হয়নি। এক অর্থে প্রায় দুস্প্রাপ্যও। ফলে এটা আমাদের শ্লাঘার ব্যাপার যে রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী সরাসরি স্প্যানিশ তথা এস্পানিওল থেকে অনুবাদ করেছেন এমন একটি বই যা তৈরি হয়েছে এই দুজন ভুবনবিখ্যাত সাহিত্যিকের আলাপচারিতার ভিত্তি এবং যাতে উঠে এসেছে লাতিন আমেরিকার উপন্যাস নিয়ে এই দুজনের অভিযানের সূচনালগ্নের কথা। বইটির নাম ‘সংলাপ: লাতিন আমেরিকার উপন্যাস নিয়ে’। বইটি যেহেতু ইংরেজিতে অনুবাদ হয়নি, কিন্তু স্প্যানিশ নামটা বইয়ের মুদ্রণ-পরিচিতির জায়গায় দেওয়া নেই, যেখানে কি-না কোথা থেকে কবে,  কার আঁকা প্রচ্ছদে এবং কত মূল্যে বইটি বিক্রি হবে- এইসব উল্লেখ থাকে। তাতে পাঠকের তেমন কিছু আসে যায় না। কারণ বইয়ের বিষয় সব কিছুকে উতরে গেছে। ১৯৬৭ সালের ১ আগস্ট বেনেসুলেয়ার রাজধানী কারাকাসে এই দুজনের প্রথমবার দেখা হয়। দুজনেই তখন তরুণ লেখক। সবে মাত্র দুটি-তিনটি বই লিখেছেন। সে বছরের জুন মাসে প্রকাশিত হয়েছে মার্কেসের ‘শত বছরের নিঃসঙ্গতা’ উপন্যাসটি।  তাঁদের প্রথম সেই সাক্ষাতের একমাস পরে ৫ ও ৭ সেপ্টেম্বর পেরুর লিমায় তাদের এই সংলাপের আয়োজন করা হয়। উদ্যোগটি নিয়েছিল সেখানকার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয় তাদের স্থাপত্যকলা অনুষদের  মিলনায়তনে। সেই আলাপচারিতা নিয়ে কার্লোস মিইয়া বাত্রেস প্রকাশন একটি বই প্রকাশ করে, আজকের হিসাবে তার সময় প্রায় ছেচল্লিশ বছর পার হয়ে গেছে। এর একটি-দুটো সংস্করণ প্রকাশিত হলেও ১৯৭৬ সালে দুই লেখকের ব্যক্তিগত কলহের কারণে সেই বই আর ছাপা হয়নি। হয়নি কোনো ইংরেজি অনুবাদও। আর বইটি এখন প্রায় দুর্লভ হয়ে গেছে। তেমনি একটি বইয়ের অনুবাদ করে রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী আমাদের কৃতজ্ঞতার পাত্র হলেন- বইটি পড়ে উঠেই এটা মনে না করে উপায় নেই। প্রথমে ছোট্ট একটি ভূমিকাতে বইয়ের উৎস ও প্রবণতা জানা হয়ে যাবে। মূল বিষয় যেটা জানা হবে সেটি হল এতে ইয়োসার একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছেন মার্কেস। প্রশ্নগুলো কখনো দীর্ঘ, কখনো সংক্ষিপ্ত, সে অনুযায়ী উত্তরগুলোও কখনো দীর্ঘ, কখনো অল্প কথায় হয়েছে, কখনো এসেছে দুজনেরই মন্তব্য। আলাপের বিষয় লাতিন আমেরিকার উপন্যাস নিয়ে কথাবার্তা হলেও সে আলাপ এসে গড়িয়ে গেছে মূলত লেখকের ভূমিকা ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে, যা একেবারেই বৈশ্বিক স্তরে উন্নীত। তেমনি করে উপন্যাসের কথা কেবল লাতিন আমেরিকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা বিশ্ব-উপন্যাসের হালচালের বিচারবিবেচনার সূত্র হয়ে উঠেছে। [caption id="attachment_14757" align="aligncenter" width="531"]তাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হবার পর এই বই আর প্রকাশ করা হয়নি তাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হবার পর এই বই আর প্রকাশ করা হয়নি[/caption] সংলাপটি দুই পর্বে। প্রথম পর্বের শুরুতেই লেখককের ভূমিকা স্থপতির ভূমিকার চেয়ে আলাদা কতটা এই দিয়ে। মার্কেস এর উত্তরে যা বলেন, তা প্রথম কথা ছিল, এক অর্থে লেখালেখির কোনো মানে নেই।  কিন্তু একটু একটু করে তিনি চলে যান লেখকের ভূমিকায়। লেখক মানেই প্রচলিত ধ্যানধারণা, গেঁড়ে বসা বিষয়গুলোকে গুড়িয়ে  দেওয়ার সামর্থ্যওয়ালা ব্যক্তি। তিনি লেখার মাধ্যমে একদিকে মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করেন অন্যদিকে নিজের মাথাব্যথা, বাজে হজমশক্তিও দূর করেন। বোঝাই যাচ্ছে সিরিয়াস বিষয়গুলো কৌতুকপ্রদভাবে এতে নানান জায়গায় উঠে এসেছে। বই মানেই একটা বিধ্বংসী বিষয়। বই মানেই বোমা। একইসঙ্গে বই মানে পরিপার্শে¦র সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধের অবসান খোঁজার উপায়। বইয়ে শব্দ-বারুদ গুদামজাত হয়ে থাকে। বই পাঠকের আমোদ পাওয়ার জায়গা নয়- এই প্রসঙ্গগুলো ধারাবাহিকভাবে হাজির হয়েছে এখানে। চমকপ্রদ যে বিষয়টি এতে পাওয়া গেছে তা হল ‘টোটাল নভেল’-এর ধারণা। আমরা তো জানি উপন্যাস মানেই জীবনের একটা সামগ্রিকতায় পৌঁছানো। কিন্তু বর্তমানে উপন্যাসও খণ্ডিত হয়ে গেছে। যা খুশি একটা লেখার জায়গা হয়ে গেছে উপন্যাস। উপন্যাস মানে যেন দেখতে মোটা কোনো গল্পের বই। কিন্তু উপন্যাসের মূল ভূমিকা কী? কেন উপন্যাস এখনো জরুরি? সেসব আমাদের অনেকেরই স্পষ্ট করে জানা নেই। আর সেজন্যই উপন্যাসের মূল বিষয় যে সামগ্রিকতা সেটি বিশেষ জোরের সঙ্গে তাদের আলাপচরিতায় উঠে এসেছে। মার্কেস বলেছেন, 'সত্যিকারে লাতিন আমেরিকান উপন্যাস, লাতিন আমেরিকার সমগ্রতাস্পর্শী উপন্যাস লেখা হবে সেদিন, যে-উপন্যাস লাতিন আমেরিকার যে কোনো দেশে গ্রাহ্য হবে তাদের মধ্যকার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ঐতিহাসিক তফাত সত্ত্বেও।'  অর্থাৎ একটি দেশের উপন্যাস সবরকম পার্থক্যের পথ পার হয়ে সব দেশের উপন্যাস হয়ে উঠবে। আদতে তো তা হয়ে উঠবে বিশ্বের যেকোনো দেশের, যেকোনো জায়গারই উপন্যাস। জীবনের এমন সব দিক সেখানে হাজির হবে, যা হয়ে উঠবে সবার। বিষটি আমাদের মনে ‘এশীয় উপন্যাস’ বলে কিছু তৈরি করা যায় কি-না সেদিকে এক ঝলক চিন্তার জোগান দেয়। আমরা দেখি উপন্যাসের ইউরোপীয়, মাকির্নী, লাতিন আমেরিকান এবং আফ্রিকান মেজাজ তৈরি হয়ে গেছে, সেদিক থেকে উপন্যাসের এশীয় মেজাজে সেই সমাগ্রিকতা বিশ্বের দরবারে হাজির হতে পারেনি, যেখান থেকে আমরা বলতে পারি- এই হল এশীয় উপন্যাস। লেখা নিয়ে মার্কেসের জীবনযাপন কোনখানে এসে দাঁড়িয়েছে তার শুরুটাইবা কেমন ছিল, তাঁর শতবছরের নিঃসঙ্গতার পটভূমি ও কলাকৌশল, মাকেন্দো কী করে তৈরি হল- ইত্যাদি প্রসঙ্গে ইয়োসা একের পর এক চমকপ্রদ প্রশ্ন করেছেন। মার্কেসও দিয়েছেন তাক লাগানো সব জবাব। নিজের ব্যক্তিগত অভ্যাস ও লেখা নিয়ে চর্চার দিকগুলো যেকোনো তরুণ লেখকের দিগদর্শন হিসেবে যে কাজ করবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। যেমন মার্কেস বলছেন তিনি প্রতিরাতে বোর্হেস পড়েন, বোর্হেস থেকে তিনি লেখার কলাকৌশল শেখেন, কিন্তু বোর্হেসের লেখা পড়তে তাঁর ভালো লাগে না। এই যে বিষয়টি এমন চর্চা আমাদের লেখকরা তার অগ্রজসাহিত্যিকদের লেখা নিয়ে কতটা করেন তা মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, ভালো লেখক ও ভালো লেখা কী করে তৈরি হয়, এই দুজনের কথাবার্তায় সেই বিষয়টিই যেন হাজির হয়েছে বারবার। আর লেখককে সব রকম ডগমা, সংস্কার ও  পূর্বধারণাকে অতিক্রম করে কী করে নিত্য নিজেকে ক্রিয়াশীল রাখতে হয়, প্রতিদিনের জীবনযাপন করতে হয়- তা নিয়ে অনুপ্রেরণামূলক বহু উক্তি ছড়িয়ে আছে এই বইটিতে। অন্যদিকে এই বইটি হয়ে উঠেছে তুলনামূলক সাহিত্যেরও একটি বিশেষ পাঠ। আর সেই সঙ্গে উপন্যাসের বিস্ফোরক ও  পারমানবিক ক্ষমতার কথা বারবার মনে করাবে এই বই। তাই ছোট্ট এই বইটি ওজনে বোধ করি এক শেলফ বইয়ের চেয়েও বেশি। সংলাপ : লাতিন আমেরিকান উপন্যাস নিয়ে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ও  মারিয়ো বার্গাস ইয়োসা ॥ এস্পানিওল থেকে তর্জমা : রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী॥ ফেব্রুয়ারি : ২০১৪ ॥ প্রকাশক : শুদ্ধশ্বর, ঢাকা ॥ প্রচ্ছদ : হাসান মোর্শেদ ॥ ৬৪ পৃষ্ঠা ॥ ১২০ টাকা।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।