সকাল ০৮:২০ ; রবিবার ;  ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯  

প্রতিশোধের হাতিয়ার গণধর্ষণ!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

উদিসা ইসলাম॥ কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে  গত মাসে গণধর্ষণের শিকার হয় ১৭ বছর বয়সী এক গার্মেন্ট কর্মী। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই তরুণী অভিযোগ করে, তাকে যে ধর্ষণ করেছে সে গত কয়েক মাস ধরেই তাকে উত্যক্ত করছিল। সে পুলিশের কাছে যাওয়ার হুমকি দেওয়ার পরেই প্রতিশোধ হিসেবে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। পরে ওই তরুণী ধর্ষণকারীর নামে মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে। শুধু ওই গার্মেন্ট কর্মী নন। তার মতো নারীই  প্রায় প্রতিদিনই গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আর এদের বেশিরভাগই প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ কিংবা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার রোষের শিকার। এরকম একটি ঘটনা ঘটেছে জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর। ওই সময় যশোরের মণিরামপুর উপজেলার জামায়াত-ই-ইসলামী প্রভাবাধীন হাজরাইল গ্রামে দুই হিন্দু নারী গণধর্ষণের শিকার হন। ওই দুই নারী জানান, দুর্বৃত্তরা মুখোশ পরে রাতের আধাঁরে তাদের ওপর হামলা চালায়। বাড়ির লোকজনকে মারধরের পর তাদের ওপর নির্যাতন চালায়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক বিয়ে করতে চাওয়ায় সীমা (ছদ্মনাম) এক ব্যক্তিকে চড় মারে। এ ঘটনার প্রতিশোধ নিয়ে ওই ব্যক্তি তার তিন সহযোগীকে নিয়ে সীমাকে ধর্ষণ করে। তবে হামলাকারীদের শনাক্ত করতে না পারায় সীমার মামলাটি আদালত অবদি গড়ায়নি। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং হরহামেশাই গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তবে খুব কম ক্ষেত্রেই অপরাধীরা সাজা পাচ্ছে। প্রমাণের অবাবে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর এপ্রিল পর্যন্ত আটটি সরকারি হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে যৌন নির্যাতনের শিকার চার হাজার ৭০০ নারীকে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এক হাজার ৬৫৩ জনকে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বেশিরভাগ ধর্ষণের ঘটনাই প্রতিশোধমূলক ছিল এবং ধর্ষণকারী নির্যাতিতার পরিচিত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অনেক সময় ভয়ে ভুক্তভোগী বা তার পরিবার মামলা করে না। আবার সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের কারণে অনেক সময় ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর অক্টোবর থেকে চলতি বছর এপ্রিল পর্যন্ত নারীর বিরুদ্ধে সহিংস ঘটনা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সারা দেশে ৮৬৮ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২০৭ টি গণধর্ষণের ঘটনা। তবে মামলা হয়েছে মাত্র ৪৮২টি। নারী অধিকার কর্মী খুশি কবীর বলেন, যৌন নির্যাতনের ঘটনার সংখ্যা যা প্রকাশ পেয়েছে তার থেকেও অনেক বেশি। কারণ সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের ওপর ভিত্তি করেই মানবাধিকার সংস্থাগুলো নারী নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে। তিনি আরো বলেন, “বর্তমানে গণধর্ষণ প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।” আদালত সূত্রে জানা গেছে নারী নির্যাতনের যেসব মামলা আদালত অবদি আসে তার ৯৬ শতাংশই উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের  অভাবে দোষীরা খালাস পেয়ে যায়। এমনকি এখন পর্যন্ত কোনো ধর্ষণকারীকে সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মানবাধিকার কর্মী বলেন, “ধর্ষণের শিকার নারীরা বিচার না পেলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলবে তারা এবং পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না।” অন্যদিকে, কিছু মানবাধিকার কর্মী মনে করেন, মানবাধিকার সংগঠনগুলো নারীর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা রুখতে ঠিকমত কাজ করছে না। নারী অধিকার কর্মসূচির সমালোচনা করে খুশি কবীর বলেন, “বর্তমানে আমার এ ধরনের কার্যক্রম রুখতে মাঠ পর্যায়ে ঠিকমতো কাজ করছি না। এ কারণেই নারী নির্যাতনের অহরহই ঘটছে।”

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।