রাত ০৮:১৮ ; বৃহস্পতিবার ;  ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৬  

মিরপুরের জঙ্গি আস্তানায় শ্বাসরুদ্ধকর ১৪ ঘণ্টার অভিযান

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

আমানুর রহমান রনি।।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার রাত ২টা থেকে রাজধানীর শাহআলীর এ-ব্লকের একটি ছয়তলা ভবনের দুইটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ভবনটির ছয়তলার দুটি ফ্ল্যাটেই গত চারমাস ধরে আস্তানা গেড়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন অব বাংলাদেশ (জেএমবি)।

এর আগে বুধবার জেএমবির এক শীর্ষ নেতাকে আটক করে ডিবি। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই বাড়িটিতে যৌথভাবে অভিযান চালায় র‌্যাব,পুলিশ,গোয়েন্দা পুলিশ, বোম ডিস্পোজাল টিম,সোয়াত ইউনিট, সিআইডি ও ফায়ার সার্ভিস। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক,গ্রেনেড তৈরি করার লেদ মেশিন, উপকরণ ও ম্যানুয়াল, বস্তা ও ট্রাঙ্কভর্তি তাঁজা গ্রেনেড এবং সুইসাইড ভেস্ট। আটক করা হয়েছে সাত জঙ্গিকে। যারা শিবিরের সাবেক ক্যাডার বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় অভিযান শেষ করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্মকমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুরো পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে। আমাদের বোম ডিস্পোজাল টিম, সোয়াট টিম, ডিবি এবং ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশের ব্যাকআপ রয়েছে। আমারা ১৬টি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উদ্ধার করেছি। বেশকিছু বোমা ও গ্রেনেড গুলো আমরা নিষ্ক্রিয় করেছি। বাসাটি থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেনেড তৈরির ম্যানুয়াল ও ‍উপকরণ উদ্ধার করা হয়েছে। ফ্ল্যাটের সবকটি কক্ষে তল্লাশি করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বিগত দিনে ঢাকায় নাশকতার জন্য যেসব গ্রেনেড ব্যবহৃত হয়েছে বা উদ্ধার হয়েছে। এখান থেকে ঠিক একই রকম গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়েছে। হুবাহু একই রকম।এগুলো একই মেকার দ্বারা তৈরি। বোমা তৈরির যেসব উপকরণ এখান থেকে উদ্ধার হয়েছে তাতে ধারণা করা হচ্ছে, ইতিপূর্বে ব্যবহৃত গ্রেনেডগুলো এখানেই তৈরি।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আইন অনুযায়ী সিজার লিস্ট করা হচ্ছে। আমাদের অভিযান শেষ হয়েছে। আটকৃতদের এখনও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। তাদের কারও কারও কাছে  একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। সেগুলো আমাদের কাছে ফেক মনে হয়েছে।’

যুগ্ম কমিশনার বলেন, ‘আমাদের মনে হচ্ছে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্যই তারা এই গ্রেনেডগুলো তৈরি করেছি। সরবরাহ করেছি। এখান থেকে যে পরিমান বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে, সেগুলো দিয়ে আরও দুইশ গ্রেনেড তৈরি করা সম্ভব ছিল।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, শাহআলীর এ-ব্লকের ৯ নম্বর সড়কের ৩ নম্বর বাড়িটির ছয়তলার দুইটি ফ্ল্যাট। বাড়িটির মালিক আবুল হোসেন ভুইয়া। যিনি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। তার ছেলে অপু বাড়িটির দেখা শোনা করেন। গত চার মাস আগে শিক্ষার্থী ও চাকুরিজীবী পরিচয়ে ফ্ল্যাটদুটি ভাড়া নেয়। তবে ভাড়াটিয়াদের বিষয়ে বিস্তারিত কোনও তথ্য ভাড়িওয়ালা সংরক্ষণ করেননি।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার জেএমবির এক শীর্ষ নেতাকে আটক করা হয়। তার দেওয়ার তথ্যের ভিত্তিতে এই বাড়িটিতে অভিযান চালানো হয়। জেএমবির ওই শীর্ষ নেতা বাসাটির ষষ্ঠ তলার পেছনের ফ্ল্যাটে আরও দুই জেএমবির সদস্যকে নিয়ে থাকতেন। বুধবার রাত ২ টার দিকে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই বাসার আশেপাশে অবস্থান নেয় ডিবি। এরপর ভেতরে প্রবেশ করে ডিবি সদস্য এবং থানা পুলিশ। কিন্তু জেএমবি সদস্যরা বারবার বোমা হামলার হুমকি দিচ্ছিল। ভেতরে প্রবেশ করা যাচ্ছিল না।’

তিনি বলেন, ‘এরপর ডিবির বোম ডিস্পোজাল টিম, সোয়াত টিম এবং পুলিশের সংখ্যা আরও বাড়ানো হয়। দরজা দিয়ে ওই ফ্ল্যাটের ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করে ডিবি। এসময় ভেতরে কয়েকটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা।’

এদিকে অভিযানের বর্ণনা দিয়ে যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বাসার অন্যান্য বাসিন্দাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের কাছে বেশি প্রাধান্য ছিল। তাই অভিযানের আগেই বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর অভিযান চালানো হয়।’

তিনি বলেন, ‘অভিযানের সময় ১০ রাউন্ড রাবার বুলেট এবং দুটি সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এরপর ফ্ল্যাটের প্রতিটি কক্ষে তল্লাশি করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ছয়জনকে আটক করা হয়েছে।’

এদিকে অভিযানের কোনও প্রত্যক্ষদর্শী না থাকলেও আশেপাশের বাসিন্দারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘তারা ভোররাত থেকে ওই বাসা থেকে বেশ কয়েকটি বিকট শব্দ পেয়েছেন। এরপর কিছুক্ষণ পরপরই এই শব্দ সকাল সাড়ে ১১ টা পর্যন্ত হয়েছে। তবে ভয়ে কেউ কোনও কথা বলেনি। এ সময় ৯ নম্বর সড়কটি বন্ধ করে দেয় পুলিশ।ওই সড়কের প্রতিটি বাসার বাসিন্দাদের বাসা থেকে বের হতে নিষেধ করা হয়।’

অভিযানের পুরো সময় ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে। গ্রেনেডের বিকট শব্দে কেউ কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। বাসার পাশেই এমন জঙ্গি আস্তানার খবর শুনে অবাক হয়েছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা।

৯ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর বাসার গৃহিনী ফারহানা হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাত ২ টার দিকে আমরা প্রথম শব্দ পেয়েছি। বাসার জানালা দিয়ে সড়কের উপর পুলিশের গাড়ি দেখেছি। কিন্তু বাইরে বের হওয়ার কোনও সাহস পাইনি।’

তিনি বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৮ টার দিকে আবার বিকট শব্দ শুনতে পাই। প্রথম দিকে দুইটি শব্দ পাই। পরে আরও অনেকগুলো শব্দ শুনেছি। তখনও জানতাম না এটা জঙ্গি আস্তানা।’

একই সড়কের ২০ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা ব্যবসায়ী আসাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ঘুমে ছিলাম। সকাল ১০টার দিকে বিকট দুটি শব্দ পাই। এরপর বাসা থেকে বের হই। এ সময় দেখি ডিবির মনিরুল ইসলাম ওই বাসার সামনে দাড়িয়ে আছেন। তিনি আসার পর আরও অনেকগুলো শব্দ হয়েছে। আমরা মনে করেছি ওই বাসায় কোনও সন্ত্রাসী আছে। কিন্তু জঙ্গি আস্তানা থাকতে পারে তা আমাদের ধারণা ছিল না।’

পাশের বাসার বাসিন্দা শাহিন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাতে হঠাৎ করেই পুলিশ বাড়ির মালিকদের নির্দেশ দেয় কেউ বাইরে বের হবেন না। এরপর আমরা রাতে কেউ বাইরে বের হইনি। পুরো ৯ নম্বর রোড ব্লক করে দেওয়া হয়।

পাশের বাড়ির মালিক হাসিনা বেগম বলেন, ‘মধ্যরাতে হঠাৎ করে হইচই চিৎকার শুনি। বিকট বিকট শব্দে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। শব্দ শুনে অনেকেই বাইরে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু কাউকে বাইরে বের হতে দেওয়া হয়নি। আমরা সারারাত অনেক টেনশনে ছিলাম। পরে জানলাম সেখানে জঙ্গি আস্তানা।’

এদিকে আটকৃতদের মধ্যে চারজনের নাম জানা গেছে, তারা হলেন, বিইউবিএটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহিদ ও মামুন, একটি অনলাইনভিত্তিক মার্কেটের মানবসম্পদ বিভাগে কর্মরত কামাল এবং নাহিদের ভাগ্নে রাজ।

চরম উৎকণ্টা আর উদ্বিগ্নের মধ্যে বৃহস্পতিবার বিকাল ৪ টায় অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেন মনিরুল ইসলাম।তিনি বলেন, ‘আটকৃতদের মধ্যে তিনজন জেএমবির শীর্ষ নেতা। তারা জেএমবি নেতা মাওলানা সাইদুর রহমানের এন্ট্রিগ্রুপ। এরা শিবিরের ক্যাডার ছিল একসময়।’

ঘটনাস্থল থেকে সিআইডির ক্রাইম সিন আলামত সংগ্রহ করেছে। ১৭ টি গ্রেনেড বাসাটির বামপাশের একটি পরিত্যক্ত জায়গায় নিস্ক্রিয় করা হয়েছে।

আতঙ্কের মধ্যেও পুলিশের এই অভিনযানকে বাহবা দিয়েছে কেউ কেউ। অসংখ্য স্থানীয় বাসিন্দা এবং সংসদ সদস্য আসলামুল হক পুলিশের এই অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। এমপি আসলাম বলেন, ‘জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই অভিযান প্রশংসার দাবিদার। এলাকাবাসী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করেছে। জঙ্গিদের কোনও আস্তানা এই এলাকায় হবে না।’

অভিযান শেষে ফ্ল্যাটটি সিলগালা করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ডিবির বোম ডিস্পোজাল টিমের প্রধান ও অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার সানোয়ার হোসেন।

/এমআর/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।