ভোর ০৬:১২ ; রবিবার ;  ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬  

বড়দিনে রাজধানীতে আনন্দ-আলোর ঝলকানি

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সালমান তারেক শাকিল ও চৌধুরী আকবর হোসেন ।।

পরিসর সীমিত হলেও অবাধে ও আন্তরিকতার সঙ্গে বড়দিনের আনন্দ উদযাপন করতে প্রস্তুত রাজধানী ঢাকা। এ আনন্দের উপলক্ষ যিশুখ্রিস্টের জন্মদিন। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস ও আবেগ প্রকাশের দিন।

খ্রিস্টান সম্প্রদায় এ দিনটিতে ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি আড়ম্বর উৎসব পালন করে থাকে। ঈশ্বরের কাছে পাপের ক্ষমা চেয়ে অনুতাপের পাশাপাশি নানা সাজে সজ্জিত হয়ে বহুরঙে নিজেদের রাঙিয়ে নেয়। রাজধানী ঢাকায় বসবাসরত খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের এই আনন্দ বহুগুণে বাড়াতে প্রস্তুতি নিয়েছে মহানগরীর তিন থেকে পাঁচতারা হোটেলগুলোও।

বড়দিন উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের কেক ও খাদ্য সামগ্রী তৈরি করেছে হোটেল লা মেরিডিয়ান। ছবি: নাসিরুল ইসলাম

পাঁচ তারকা হোটেলগুলোর বাইরের দেয়ালগুলো বৃহস্পতিবার রাত থেকেই বর্ণিল আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয়েছে। আর প্রতিটি হোটেলের ভেতরের সাজসজ্জায় রয়েছে চমক দেওয়া রকমারি আনন্দ-উপকরণ। যিশু খ্রিস্টের জন্মদিনে শিশুদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় বিষয় হচ্ছে সান্তাক্লজের কাছ থেকে উপহার পাওয়া আর রঙ-বেরঙের উপকরণ দিয়ে সাজানো ঘরে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানো। শিশুদের এই প্রত্যাশার বিষয়টাও অজানা নয় তিন থেকে পাঁচ তারা হোটেলগুলোর। তাই বড়দিনকে ঘিরে প্রায় সব হোটেলেই করা হয়েছে শিশুদের জন্য বিশেষ বিশেষ আয়োজন। সবাই যাতে স্বল্প খরচে সব আয়োজন উপভোগ করতে পারে সেদিকটাতেও নজর রেখেছে তারকা হোটেলগুলো। বৃহস্পতিবার রাতে সরেজমিনে ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।

নানা ধরনের খাবাবের আয়োজন রয়েছে হোটেল ওয়েস্টিনেও। ছবি: নাসিরুল ইসলাম

কাওরান বাজারের হোটেল সোনারগাঁওয়ের চত্বর থেকে শুরু করে ভেতরের লবিতে ছড়িয়ে পড়ছে নানা রঙের আলোর বিচ্ছুরণ। হ্যাপি ক্রিসমাস ডে লেখা হয়েছে আলোকসজ্জায়। বড়দিনের আগের রাতে সান্তা ক্লজ আগত শিশুদের ডেকে ক্রিসমাস ক্যাপ, ক্যান্ডি দিচ্ছে। লাল-সাদা পোশাকে সব শিশুদের আগলে ধরে ফটোসেশনও চলছে আগ্রহভরে।

হোটেলটির সুপারভাইজার মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সোনারগাঁও হোটেলে ক্রিসমাস ডে’র নানা আয়োজন রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হোটেলের পুলে কিডস পার্টি। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এ পার্টি চলবে। এতে থাকবে পাপেট শো, ম্যাজিক শো, কিডস ডিজে ডান্স। এই পার্টিতে প্রতিজন ফি লাগবে ১২শ’ টাকা।

ওয়েস্টিন হোটেলে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের উপহার ও সাজসজ্জার ব্যবস্থা। ছবি: নাসিরুল ইসলাম

বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় দেখা গেল অনেকেই টিকেট ক্রয় করছেন শুক্রবারের কিডস পার্টিতে যোগ দিতে। মঈনউদ্দীন জানান, তাদের আয়োজন দুই হাজার জনের জন্য করা হয়েছে। এছাড়া ক্রিসমাসে বিশেষ লাঞ্চের আয়োজন থাকবে। এতে খরচ পড়বে জন প্রতি ৪ হাজার টাকা। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সবগুলো আয়োজন সবার জন্য খোলা থাকবে।

মঈনউদ্দীন বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় সান্তা ক্লজ শুরু হয়েছে। আগামীকালও থাকবে। এছাড়া ক্রিসমাস ডে উপলক্ষে সোনারগাঁও হোটেল পৃথক একটি কাউন্টার খুলেছে। ওই কাউন্টারে পাওয়া যাচ্ছে ক্রিসমাস ডে উপলক্ষে বিশেষ চকোলেট, সান্তা ক্লজ কেকসহ নানা স্বাদের ও ভিন্ন আঙ্গিকের তৈরি বিভিন্ন চকলেট, কেক ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য।

গুলশান-২ এ অবস্থিত হোটেল দ্য ওয়েস্টিন ঢাকা। হোটেলটি নিজস্ব উদ্যোগে এবার ক্রিসমাস ডে’র আয়োজন করেনি, তবে আয়োজনের কমতি নেই সেখানে। এই হোটেলে জায়গা বরাদ্দ নিয়ে পুরো আনন্দ উদযাপন ব্যবস্থা করেছে ইভেন্ট কোম্পানি ইভনেক্স সলুশন।

হোটেলটিতে প্রবেশ করা মাত্রই চোখে পড়বে হ্যাপি ক্রিসমাস ডে’র আয়োজন। নানা রঙের লাইটিং করা ছোট্ট ঘরে মিলবে ক্রিসমাসের নানা আয়োজন।

উৎসব আয়োজনের কাউন্টারে কথা হয় ইভনেক্স সল্যুশনের কর্মকর্তা মাহফুজ রায়হান বাহারের সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে তাদের উৎসব শুরু হবে। চলবে বিকাল ৩টা অবধি। 

এমন আলোকসজ্জার রোশনাই রয়েছে হোটেল ওয়েস্টিনসহ প্রতিটি হোটেলে। ছবি: নাসিরুল ইসলাম

প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ ইফতেখার বলেন, বড়দিনে আমাদের আয়োজন শিশুদের জন্য। এতে গেমস থাকবে, মুভি থাকবে, বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য থাকবে। এ আয়োজনে শিশুদের ফি ১ হাজার টাকা এবং বড়দের জন্য ৫শ’ টাকা। এছাড়া শিশু ও বড়দের একসঙ্গে প্রবেশে বান্ডেল অফার রয়েছে ২৫শ’ টাকার।

রাজধানীর নতুন পাঁচ তারকা হোটেল লা মেরিডিয়ানও নানা আয়োজন নিয়ে বড়দিন পালনের জন্য তৈরি। হোটেলটির লেটেস্ট রেসিপি রেস্তোরাঁটির চকলেট বেকারিতে নিজস্ব শেফ দ্বারা তৈরি করা চকলেট। একেকটি চকলেট বক্সে ৬, ১২ ও ২৪ টি করে চকলেট পাওয়া যাবে।

বড়দিন উপলক্ষে হোটেলের প্রধান তিনটি রেস্তোরাঁতে থাকছে বিশেষ আয়োজন।

 

লা মেরিডিয়ানের মার্কেটিং কমিউনিকেশনস্ ম্যানেজার জায়রীন সুলতানা লোপা বাংলা ট্রিবিউনকে বড় দিনের নানা আয়োজনের তথ্য জানান। তিনি বলেন, হোটেলটির সবচেয়ে জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ লেটেস্ট রেসিপিতে থাকছে বড়দিনের নৈশভোজের বিশেষ আয়োজন। যা পাওয়া যাবে জনপ্রতি ৩,৬০০ টাকায়। এই অফারটিতে থাকছে ১০০টিরও বেশি খাবারের আইটেম উপভোগ করার দারুণ সুযোগ।

মূল আকর্ষণে থাকবে আস্ত টার্কি রোস্ট, হাঁসের রোস্ট, চকলেট ইউলগ, বিভিন্ন রকমের পাস্তা। হোটেলটির ইতালীয় রেস্তোরাঁ ফেভোলাতে থাকছে পাঁচ-কোর্সের নৈশভোজের আয়োজন। এর মূল্য পড়বে জনপ্রতি ৩,৮০০ টাকা । এই খাদ্য তালিকায় থাকছে ৩ প্রকার মূল খাবার যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্র্যানবেরি সস্ দিয়ে তৈরি ক্যাশুনাট স্টাফ্ টার্কি ব্রেস্ট এবং দুই প্রকার মিষ্টি জাতীয় খাবার। ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাবারের স্বাদে রেস্তোরাঁ ওলেয়াতে থাকছে তিন-কোর্সের বড়দিনের বিশেষ নৈশভোজের আয়োজন।সঙ্গে থাকছে কাবাব ও গ্রিল এর এসোর টেড মেযাহ প্ল্যাটার এবং পছন্দ মতো মিসর, তিউনিশিয়া, সৌদি, তুর্কিসহ বিভিন্ন দেশের খাবার।

শিশুদের জন্য এমন আলোকসজ্জা ও উপহার পাওয়ার সুযোগ থাকছে প্রতিটি হোটেলেই। ছবিটি হোটেল ওয়েস্টিন থেকে তোলা। ছবি: নাসিরুল ইসলাম

হোটেলটির স্কাইলাইন ইনফিনিটি পুল প্রথমবারের মতো আয়োজন করতে যাচ্ছে শিশুদের জন্য বড়দিনের অনুষ্ঠান। বড়দিনের আনন্দকে বহুগুণ বাড়াতে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়ে চলবে দুপুর সাড়ে ৩টা পর্যন্ত। অনুষ্ঠানে শিশুদের জন্য থাকছে জাদু প্রদর্শনী, বায়োস্কোপ, বেলুন প্রদর্শনী, টেবিল ট্রিক্স, ভাগ্য গণনা, ফেইস পেইন্টিং, বলহাউস, পপকর্ণ, ঝালমুড়ি, মাফিনস্ ও কাপকেক, হাওয়াই মিঠাই, হট চকলেটের সঙ্গে মার্শমেলো ও মিল্ক শেক । এ আয়োজনে সান্তা ক্লজ নিজেও উপস্থিত থাকবেন তার উপহার ভরা ব্যাগ নিয়ে। বাচ্চাদের মুখরোচক বুফের সঙ্গে থাকছে হটডগ, চকলেট ফাউন্টেন, চিজবল, পিজ্জা, বার্গার, নাগেট্স, পটেটো ওয়েজেস, ক্রকোটাস আরও অনেক কিছু। সব মিলিয়ে টিকিটের মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র ১,৫০০ টাকা। এছাড়াও বাচ্চাদের বড়দিনের অনুষ্ঠানে আগত অতিথিরা ২৫শে ডিসেম্বর ২০১৫ থেকে ০৪ জানুয়ারি ২০১৬ পর্যন্ত বুফে খাবারের ওপর ২৫% ছাড় পাবেন।

প্রতিবারের মতো এবারও বড়দিনে বিশেষ আয়োজন থাকবে র‌্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে। দুপুর ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত শিশুদের জন্য বিশেষ আয়োজন থাকবে বলে জানিয়েছেন হোটেলটির সুপারভাইজর মো. নাসিম। শিশুদের জন্য থাকবে জাদু প্রদর্শনী ও বিভিন্ন রকম খেলাধুলার ব্যবস্থা। এ আয়োজনের প্রবেশ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। তাছাড়া সান্তাক্লজের উপহারও থাকবে এই আয়োজনে। বড়দিনের জন্য হোটেল লবিতে ‘স্পেশাল ক্রিসমাস কুকি সেল’-এর আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে থাকছে বড়দিনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি কেক, কুকি ও অন্যান্য মিষ্টান্ন সামগ্রী।

এছাড়া বড়দিন উপলক্ষে বেসরকারি চ্যানেলগুলো প্রচার করবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। বড়দিনের সকালে গির্জায় বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠান (খ্রিস্টযোগ) হয়। সকালে প্রার্থনার পর গির্জাগুলোতে হবে চা চক্রের আয়োজন এবং শিশু কিশোরদের অংশগ্রহণে হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিশু-কিশোরদের জন্য আকর্ষণীয় উপহার দেওয়া হবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পর দুপুরে প্রীতিভোজের মাধ্যমে শেষ হবে বড়দিন উদযাপন।

এদিন প্রতিটি খ্রিস্টান পরিবারের থাকে কেক, পিঠা, কমলালেবু, পোলাও-বিরিয়ানিসহ বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু ও উন্নতমানের খাবার-দাবারের আয়োজন।

/এমআর/টিএন/

/ছবি: নাসির উদ্দিন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।