রাত ০২:২৩ ; সোমবার ;  ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৬  

গল্পহীন গল্পের এই দিনে || নাসিমা আনিস

প্রকাশিত:

[আমরা ২০১৫ সালে প্রকাশিত বই থেকে দশটি বই বেছে নিতে অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছি তাদের প্রিয় বই নিয়ে লিখতে। এই প্রস্তাবে যারা সাড়া দিয়েছেন তাদের প্রিয় বই নিয়েই আমাদের এই আয়োজন। রাশেদ রহমানের ‘গণিকাপ্রণাম’ নিয়ে লিখেছেন নাসিমা আনিস। বইটি প্রকাশ করেছে শুদ্ধস্বর। –বি. স.]
             

 

হিসেব মতো রাশেদ রহমানের ‘গণিকাপ্রণাম’ দশম গল্পগ্রন্থ। ১৯৯৭-এ শুরু। আঠার বছরে দশটি গল্পগ্রন্থ, মাঝখানে তিনটে কাব্যগ্রন্থ আর একটি উপন্যাস। বোঝাই যায়, গল্পই তাঁর আরাধ্য, গল্পেই তাঁর বসবাস। গল্পহীন গল্পের এই দিনে গল্পে ঠাসা রাশেদ রহমানের গল্প, এ এক সুখবর তো বটেই; উপরন্তু তিনি প্রবলভাবে সমসাময়িক ও সুখপাঠ্য।  
রাশেদ রহমানের ঝোঁক, পক্ষপাতিত্ব বললেও ভুল হবে না—প্রান্তজনের প্রতি। আমরা জানি, রাশেদ রহমানের জন্ম গ্রামে, বড়ো হয়েছেন গ্রামে, থাকেনও গ্রামে, তাই প্রান্তিক মানুষের প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব থাকবে, তাদের নিয়েই তিনি গল্প লিখবেন—এটাই স্বাভাবিক। তাঁর গল্পের চরিত্ররা উঠে আসে নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওর, ক্ষেত-খোলা, পালবাড়ি-বেহারাবাড়ি, পোড়োবাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠিত পতিতাপল্লি, কী উচ্ছেদ হওয়া পতিতাদের জীবন থেকে। গ্রামের দরিদ্র কৃষক, দিনমজুর, ভিক্ষুক, প্রতারিত নারী, শোষিত-নির্যাতিত মানুষ থেকে শুরু করে নিষিদ্ধপল্লির বেশ্যা, বেশ্যাসন্তান; যাদের কোনো পিতৃপরিচয় থাকার প্রশ্নই ওঠে না (পবিত্রমাটির খুনপ্লাবিত গল্প), তারাই জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠে আসে রাশেদ রহমানের ছোটগল্পে।
তাঁর গল্প পড়ে মনে হয়—গল্পের সব ঘটনা চরিত্রই বাস্তব। কোন গল্পই কষ্টকল্পিত সৃজন বলে মনে হয় না; গল্পটি যদি ইতিহাসের কোন উপাদান নিয়ে লেখা হয়, তাও না। গল্প পড়তে গিয়ে মনেই হবে না আমরা বই পড়ছি, মনে হবে কেউ একজন পাশে বসে, সে সুমিত কি অর্ঘ্য কমল, গভীর আন্তরিকতায় জীবনের কথকথা বলে চলেছেন। গল্প বলার অপূর্ব-উজ্জ্বল ভঙ্গী, উপস্থাপনার চাতুরিতে মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না। বস্তুত ছোটগল্প তো লেখা হয় না, উপস্থাপনা হয়!
রাশেদ রহমান পাঠককে সাথে নিয়েই গল্প বলে চলেন। তিনি আখ্যান তৈরি করেন, চরিত্র তৈরি করেন—পাঠক তাঁর সাথে থেকে দেখতে পান, কীভাবে তা তৈরি হচ্ছে অর্থাৎ গল্প তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটির ভিতর দিয়েই পাঠক চলেন। পড়তে পড়তে আলাদা করে কিছু চিন্তা করার প্রয়োজন পড়ে না। ভঙ্গিটি তখন বেশ স্বস্তিকর ও কিছুটা নিরীহও বটে। কিন্তু আপাত নিরীহ ও স্বস্তিকর পড়ার সময়টুকু মাত্র; সে বলার ভঙ্গিটির কারণে, লেখক আলগোছে ভালোমানুষি করে করে যা বলার বলে গেছেন, পাঠ শেষে পাঠকের পালা। তখন বোধ করি লেখক ‘ছাপন’ ধরে  
বসে থাকেন।
রাশেদ রহমানের গল্প পড়ে কখনোই মনে হয় না যে, চরিত্রগুলো জোর করে সৃষ্টি করা হয়েছে। আমরা ধারনা করি, তিনি কলম হাতে বসলেই তার আখ্যান, আখ্যানের চরিত্ররা সৃজিত হতে থাকে। গল্পের বিষয়বস্তু, বর্ণনা, ভাষা সবই একই সঙ্গে এত প্রাত্যহিক ও উজ্জ্বল যে কবিতার মতো ছুঁয়ে যায়! বোধ করি রাশেদ রহমান কবি হওয়ায় গল্পভাষা কখনো কাব্যাক্রান্ত। গল্পে কবিতার ব্যবহারে দারুণ ঝোঁক, মন্দ লাগে না নেহাত। সব মিলিয়ে তাঁর গল্প বলার শিল্পিত দক্ষতা অনায়াশেই পাঠক হৃদয় দখল করে নেয়। 

অন্ধপুরুষ তিন ভিক্ষুককে তো প্রবল প্রতারক রাজনীতিক বলেই প্রতীয়মান হয়। মিথ্যার জালে ফেলে যে চন্দ্রকে পালা করে ভোগ করে। শেষ পর্যন্ত চন্দ্রর প্রতিশোধটা যদি বাদ দেই! দেশ তো প্রতিশোধ নেয় না, জীবন বিছিয়ে বসে থাকে অন্যের কূটচাল আর ভোগের জন্য কেবল

উপন্যাসে যা সচরাচর, সেই ইতিহাসের ব্যবহার ছোটগল্পে কমই দেখি। তাঁর গল্পে কখনো ইতিহাস কখনো মিথের ব্যবহারও দেখি, দেখি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ইনছু কানার চাঁচাছোলা(!) কথকথা(জয়বাংলা)। রাশেদ রহমানের সমাজ-সংসার, বিশেষ করে মানুষ দেখার চোখ দারুণ। সব মানুষের ভেতরেই অন্য আরেকটি মানুষ বাস করে। ভেতরের সেই মানুষের দুঃখ-কষ্ট, ক্ষোভ-হতাশা, ক্লেদ-ঘৃণা, লোভ-রিরাংসা আখ্যান হয়ে উঠে তাঁর হাতে। 
গল্পকারকে বোধ হয় রাজনীতিক হতেই হয়। নিদেনপক্ষে তুখোড় রাজনীতি সচেতন। রাজনীতির নামে শঠতা-ভণ্ডামী, শ্রেণীসংগ্রামের নামে গলাকাটা রাজনীতি—তাঁর গল্প পড়লে মনে হয় এর সব কিছুই খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। ‘ইঁদুর-বিড়ালের দিন’ গল্পের কাহিনী আমরা সবাই জানি, সেই রক্ষীবাহিনী আর শ্রেণীশত্রু খতম করার কাজে নিয়োজিত গণবাহিনীর কথা। এক কিশোর সুমিত বস্তুত লেখকই এই গল্পের কথক, স্মৃতি আর মননের এক দারুণ মেলবন্ধন এই গল্প, পাঠ শেষে শিউড়ে উঠতে হয়।
একটু উদ্ধৃতি দিতেই পারি, “হাতকড়াপরিহিত মেহেদীভাইকে দেখেও আমি ঘটনা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তার মতো ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র গণবাহিনীতে যোগ দেবে কেন? আমার মাথার মগজ যেন গলতে শুরু করেছে। এ আমি কী দেখছি! মেহেদীভাই...? আমি দৌড় শুরু করলাম বাজারের দিকে। দেখি নতুন পাগলটা কী বলে? পাগলরা নাকি মানুষের মনের কথা জানে...।
বটতলা শূন্য। কোথাও কেউ নেই। একটা বিড়াল শুধু ছাপন ধরে বসে আছে...।”
কিংবা ‘এক অন্ধ যুবতী ও তিনটি কুকুর’ গল্পে মিন্নত, বাবলু ওয়াহেদ আর লেখকের আরোপিত কী বলে কয়ে দেয়া নাম চন্দ্র, যারা চারজনই ভিক্ষুক এবং অন্ধ। জানি না লেখক এই গল্প দিয়ে, গল্পের ছলে দেশমাতৃকার কোন গল্প বলতে চেয়েছেন কি না। অন্ধপুরুষ তিন ভিক্ষুককে তো প্রবল প্রতারক রাজনীতিক বলেই প্রতীয়মান হয়। মিথ্যার জালে ফেলে যে চন্দ্রকে পালা করে ভোগ করে। শেষ পর্যন্ত চন্দ্রর প্রতিশোধটা যদি বাদ দেই! দেশ তো প্রতিশোধ নেয় না, জীবন বিছিয়ে বসে থাকে অন্যের কূটচাল আর ভোগের জন্য কেবল।
একটা কথা না বলে পারা যায় না, নারী চরিত্রে প্রতি সীমাহীন দরদ, সে পতিতা কী ভিক্ষুক কী এনজিও কর্মী, যাই হোক না কেন।  
লেখক তো সারা জীবন একটা গল্পই করেন, নিজের জীবন; গ্রন্থের সব গল্পের পরতে পরতে লেখককে পাই সরবে, মিহিদানার মতো। রীতিমত শৈশব-কৈশোর হাঁটাহাঁটি করে, ছোটাছুটি করে। 
উত্তমপুরুষে গল্প লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন রাশেদ রহমান। সে কারণে সুমিত জহির কিংবা অর্ঘ্য কমল প্রকারন্তরে লেখক, বরাবর চরিত্র হয়ে সব গল্পই বহাল তবিয়তে থাকেন, অংশগ্রহণ করেন। 
মোট আটটি গল্প নিয়ে ‘গণিকাপ্রণাম’ তাঁর পূর্বতন গ্রন্থ ‘তৌরাতের সাপ’ থেকেও অনেক পরিণতও সুখপাঠ্যই শুধু নয়, চেতনায় এমন মোলায়েম অথচ গভীর দাগ কাটে যে আমার পছন্দের তালিকায় এ গ্রন্থটি উজ্জ্বল হয়ে থাকবে অনেক দিন।
 

পাঠকপ্রিয় ৩ পড়তে ক্লিক করুন—

কী ভাষায় লিখবে তুমি, কী চেতনায়? || জাহেদ সরওয়ার

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।