সন্ধ্যা ০৬:১১ ; রবিবার ;  ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬  

শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অমান্য করেছেন খালেদা জিয়া

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

উদিসা ইসলাম।।

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে উল্লেখ করে আদালতের নির্দেশ অমান্য করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাইব্যুনালের আইনজীবীরা। তারা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির একটি আবেগের জায়গা। ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোনও সমালোচনা না করার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বার্গম্যানকে সতর্ক করলেও সেটা নির্দেশনা হিসেবে আমাদের সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। আর গবেষকরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কেউ যদি সামান্য সহানুভূতিশীল হয়ে থাকেন তার পক্ষে এধরনের কথা বলা সম্ভব নয়।

সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের যে সংখ্যা বলা হয় তা নিয়ে বিতর্ক আছে বলে বক্তৃতা দেন। স্বাধীনতার ৪৫ বছরের মাথায় এসে ঢাকায় আয়োজিত মুক্তিযোদ্ধাদের এক অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়া এই মন্তব্য করেন যেখানে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় কতো মানুষ নিহত হয়েছিল তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

এর আগে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান তার ব্লগে ‘সাঈদী ইনডাইক্টমেন্ট: ১৯৭১ ডেথস’ লেখায় মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তাকে ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি হতে হয়। দীর্ঘ শুনানির পর ট্রাইব্যুনাল তার আদেশে বলেন, এই লেখা কোনওভাবেই জনস্বার্থে সামনে আনা হয়নি। বরং শহীদদের সংখ্যা নিয়ে এই বিতর্ক এমন সময় তোলা হয়েছে, যখন ট্রাইব্যুনালের সামনে আরও অনেক বিচারাধীন মামলা ছিল। মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির একটি আবেগের জায়গা। ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোনও সমালোচনা না করার জন্য বার্গম্যানকে সতর্ক করেন ট্রাইব্যুনাল।

প্রখ্যাত সাংবাদিক সানিকোলাস টেমালিনের শরণার্থী শিবিরের শিশুদের নিয়ে লিখেছিলেন, ‘যদি এই শিশুদের অতিরিক্ত প্রোটিন দেওয়া না হয়, তাহলে এরা অবশ্যই মারা যাবে। আর শিশুদের চার ভাগের তিন ভাগ নয় মাসের মধ্যে অবশ্যই মারা যাবে। তার মানে মারা যাবে- দশ লাখ শিশু।’ এত প্রতিবেদন, দলিল এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষী থাকার পরও এধরনের বক্তব্য দেয়াটাকে ধৃষ্টতা উল্লেখ করছেন জেনোসাইড গবেষকরা। এমনকি পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী লেখিকা সামান্তা পাওয়ারের গণহত্যা সম্পর্কিত লেখা সর্বাধিক বিক্রি হওয়া একটি বই আ প্রবলেম ফ্রম হেল: আমেরিকা অ্যান্ড দ্য এজ অব জেনোসাইড বইয়ে ১৯৭১ সালে শহীদের সংখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে ৩০ লক্ষ বলা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের গবেষণায় এসময়ের অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ রহমান বলেন, এজন্য বারবারই আমরা জেনসাইড ডিনায়াল ল-এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলি। সেটা সত্য, যেটা ইতিহাস সেটাকে কেউ বিকৃত করলে বা করতে চাইলে সেটা প্রতিহত করা জরুরি। এই মাটিতে গণহত্যা অস্বীকারের দায়ে খালেদা জিয়ার একদিন বিচার হবে।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের একজন গবেষক ড. এম এ হাসান তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময়। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটিরও আহ্বায়ক হাসান বলেন, এতবড় একটা যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয় সেটা যেমন ঠিক, তেমন সার্বিক দিক বিবেচনায় এনে যে সংখ্যাটি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে সেটি নিয়ে বিতর্ক করাও উচিত নয়।

প্রসিকিউটর শাহীদুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য জাতি গ্রহণ করবে না, এটা তাকে বুঝতে হবে। বিতর্ক তৈরির জন্য তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে তিনি যখন শহীদদের সংখ্যা নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করেন তখন তিনি রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণই করেন। একজন দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে রাস্তায় নামতে হলে এটুকু শিষ্ঠাচার থাকতে হবে।

/এফএ/আপ-এসএম

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।