ভোর ০৬:১৩ ; রবিবার ;  ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬  

বিশ্বের প্রাচীনতম কোরআনের রহস্য (ভিডিও)

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মিছবাহ পাটওয়ারী।।

বিশ্বের প্রাচীনতম কোরআনের পাণ্ডুলিপি পাওয়ার ঘোষণা দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছিল যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়। অনুসন্ধানের নিরিখে এটা একটা বড় ঘটনা। তবে তার চেয়েও বড় ব্যাপার এর মূল উৎস সন্ধানের প্রশ্নটি।

মধ্যপ্রাচ্যের সূত্রগুলো বলছে, এই পাণ্ডুলিপিকে যতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছিল এটা তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব বহন করে। দাবি অনুযায়ী, এটা প্রথম দিককার কোরআনের পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপিগুলোর একটি। ধারণা করা হচ্ছে, এক হাজার ৩৭০ বছরের পুরনো কোরআনের কপিটি মহানবী (সা.)-এর সাহাবি হজরত আবু বকর (রা.)-এর হতে পারে। এখন পর্যন্ত এটি মুসলিম জাহানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান।

সন্ধান পাওয়া পাণ্ডুলিপিটি লেখা হয়েছে ‘হিজাজি লিপিতে’; যা আরবি লেখার প্রথম দিকের রূপ। যা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, পাণ্ডুলিপিটি কতো পুরনো।

পবিত্র কোরআনের এই খণ্ডটি এক সময় মিসরের প্রাচীনতম মসজিদ আমর ইবনে আল আস-এ সংরক্ষিত ছিল। ফ্রান্সের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে থাকা কোরআনের পুরনো কপিটির সঙ্গে এটি  যথার্থভাবে মিলে যায়। ফলে এ পাণ্ডুলিপিটির ব্যাপারে একাডেমিশিয়ানরাও যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। প্যারিসের গ্রন্থাগারের বিশেষজ্ঞরা এটি নিশ্চিত করেছেন যে, সেখানে থাকা কোরআনের কপিটির সঙ্গে বার্মিংহামের কপিটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বার্মিংহামের এ কপিটি প্রথম শনাক্ত করেন আলবা ফেদেলি নামের একজন গবেষক। তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, প্যারিস আর বার্মিংহামের কপি একই রকম। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব হচ্ছে, দুটি কপিই এক সময় আমর ইবনে আল আস মসজিদে সংরক্ষিত ছিল।

১৯ শতকে এই পাণ্ডুলিপিটি আমর ইবনে আল আস মসজিদ থেকে ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব কায়রোতে স্থানান্তরিত হয়। নানা হাত হয়ে এক পর্যায়ে এটি প্রত্নতত্ত্বের বাজারে চলে আসে।

ফ্রান্সে কোরআনের পাণ্ডুলিপিটি এসেছিল আসেলিন দে চেরভিল নামের এক ব্যক্তির হাত ধরে। তিনি ১৯ শতকে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর অধীনে মিসরের পক্ষের একজন প্রতিনিধি ছিলেন।

অধ্যাপক ডেরোসি বলেন, ‘আসেলিন দে চেরভিলের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী কোরআনের এই কপিটি বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। ১৯২০ সাল পর্যন্ত এটি দফায় দফায় বিক্রি হতে থাকে। এক পর্যায়ে কোরআনের এ কপিটি কিনে নেয় বার্মিংহামের কর্তৃপক্ষ।’

অধ্যাপক ডেরোসির ধারণা, পশ্চিমা সংগ্রাহকদের কাছে একই ধরনের আরও সংগ্রহ বিক্রি হয়ে থাকতে পারে, যেগুলো এখনও অজানাই রয়ে গেছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিওকার্বন অ্যাক্সেলেরেটর ইউনিট ওই পাণ্ডুলিপি পরীক্ষার পর জানায়, পাণ্ডুলিপিটি ছাগল বা ভেড়ার চামড়ার ওপর লেখা হয়েছে। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে পাওয়া কোরআনের এই কপিটি ৫৬৮ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যকার সময়ের।

সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম ফাউন্ডেশন ফর ইসলামিক স্টাডিজ’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল বিন হুয়ারিব। তিনি বলেন, ‘বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাওয়া কোরআনে ব্যবহৃত চামড়ার কাগজ এবং হাতের লেখাগুলো দেখে মনে হয়, ২০০ পাতার মূল কপিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তির জন্য তৈরি করা।’ তার মতে, এ ধরনের একটা নথি খুব কমসংখ্যক মানুষের কাছেই সংরক্ষিত থাকতে পারে। সে হিসেবে কপিটি হজরত আবু বকরের কাছেই সংরক্ষিত ছিল- এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সংগ্রহবিষয়ক পরিচালক সুসান ওরাল। তিনি বলেন, ‘এটা যে এত বেশি প্রাচীন, তা গবেষকেরাও ভাবতে পারেননি। আমরা কোরআনের সবচেয়ে প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে একটি পাণ্ডুলিপির অংশবিশেষ পেয়েছি, পুরো দুনিয়া ভীষণ খুশি।’

বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিশ্চিয়ানিটি অ্যান্ড ইসলামের অধ্যাপক ডেভিড টমাস। তিনি বলেন, ‘ওই পাণ্ডুলিপি আমাদের ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রকৃত সময়ের কাছাকাছি বছরগুলোতে নিয়ে যায়। খোঁজ পাওয়া পাণ্ডুলিপির অংশবিশেষ যিনি লিখেছেন, তিনি সম্ভবত মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর সময় বেঁচে ছিলেন। হয়তো তিনি মহানবী (সা.)-কে চিনতেন। হয়তো মহানবী (সা.)-এর বাণী তিনি সরাসরি শুনেছেন।’ অধ্যাপক টমাস জানান, শুরুর দিকে পবিত্র কোরআন শরিফের আয়াতগুলো পশুর চামড়া, পাথর, খেঁজুরগাছের পাতা ইত্যাদিতে লেখা হতো। ৬৫০ সালের দিকে পবিত্র কোরআনের চূড়ান্ত সংস্করণ সংকলিত হয়। পাণ্ডুলিপির যে অংশটি পাওয়া গেছে, তা মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পরের দুই দশকের কম সময়কালের হতে পারে।

দাতব্য সংস্থা মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাখতুম ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল বিন হুয়াইরিবের মতে, কোনও মুসলিম দেশের পরিবর্তে যুক্তরাজ্যে কোরআনের এই দুর্লভ পাণ্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া ধর্মীয় সহনশীলতার একটি বার্তা। জামাল বিন হুয়াইরিব বলেন, ‘আমাদের উচিত একে অন্যকে সম্মান করা, একযোগে কাজ করা। আমাদের সংঘাত তৈরির প্রয়োজন নেই।’

উল্লেখ্য, মহানবী (সা.)-এর পরিবারের বাইরে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তি হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। মহানবীর (সা.) এই ঘনিষ্ঠ সাহাবি ৬৩২ হিজরিতে ইসলামের প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন। ৬৩৪ হিজরিতে ইন্তেকালের আগে তিনি ২৭ মাস ক্ষমতায় ছিলেন। সূত্র: বিবিসি।

/এমপি/বিএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।