সন্ধ্যা ০৬:১৩ ; রবিবার ;  ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬  

আচরণবিধি লঙ্ঘন: এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে ইসি

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

এমরান হোসাইন শেখ।।

পৌরসভা নির্বাচনে অন্তত দুই ডজন মন্ত্রী-এমপির আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত কয়েকদিনে সংঘটিত আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে ইসি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। জানা গেছে, সরকারি সুবিধাভোগী এসব ব্যক্তিকে কোনও ধরনের শোকজ না করে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইসি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বুধবার সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া তার প্রতিক্রিয়ায় এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে এখন থেকে কোনও চিঠি দেওয়া হবে না। সরাসরি অ্যাকশন নেওয়া হবে। আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী যত বড়ই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হন না কোনও ছাড় পাবেন না। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তিবর্গ কোনও প্রার্থীর পক্ষে আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে প্রয়োজনে ওই প্রার্থীরও প্রার্থিতা বাতিল করা হবে। রিটার্নিং অফিসারদের এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কমিশন সূত্র জানিয়েছেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের তালিকায় এখন পর্যন্ত ৫জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং ২১ জন এমপি রয়েছেন। সংসদ সদস্যদের মধ্যে সবাই  আওয়ামী লীগ দলীয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারদের মাধ্যমে তদন্ত করে ইসি। এরপর রিটার্নিং অফিসারদের দেওয়া পৃথক প্রতিবেদনের মাধ্যমে ইসি এসব মন্ত্রী-এমপির তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে, এই তালিকা কম বা বেশি হতে পারে বলেও কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কমিশনের তদন্তে আচরণবিধি লঙ্ঘনে যেসব মন্ত্রী-এমপির নাম উঠে এসেছে, তারা হলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু,  ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, তথ্য ও যোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, খাদ্য প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও চাঁদপুর­-১ আসনের এমপি ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক, ফরিদপুর-১ আসনের এমপি আবদুর রহমান, কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সোহরাব উদ্দিন, নাটোর­-৪ আসনের আবদুল কুদ্দুস, ঢাকা-২০ আসনের এম এ মালেক, শরীয়তপুর-৩ নাহিম রাজ্জাক, হবিগঞ্জ-৩ আসনের আবু জাহির, সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের হাসিবুর রহমান স্বপন , নোয়াখালী-৬ আসনের আয়শা ফেরদাউস, কুষ্টিয়া-৬ আসনের আবদুর রউফ, মানিকগঞ্জ-২ আসনের মমতাজ বেগম,  চট্টগ্রাম-৪ দিদারুল আলম, কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের নাজমুল হাসান, ময়মনসিংহ-৯ আসনের আনোয়ারুল আবেদীন খান, নড়াইল-১ আসনের কবিরুল হক মুক্তি, বরগুনা-২ আসনের শওকত হাচানুর রহমান রিমন, নাটোর-২ আসনের শফিকুল ইসলাম শিমুল, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের আফজাল হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের র আ ম ওবায়দুল মুকতাদির চৌধুরী ও রাজশাহী­-৪ আসনের এনামুল হক।

তবে তাদের মধ্যে শফিকুল ইসলাম শিমুল, এমএ ‍মান্নান ও শওকত হাচানুর রহমান রিমনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি কমিশন থেকে ইতোপূর্বে নিষ্পত্তি হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনও ব্যবস্থা নাও নিতে পারে বলে কমিশনের উপসচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন।

কমিশন ও সরকারি দলের সূত্র জানিয়েছেন, সরকারি দলের এমপি-মন্ত্রীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। তাতে ইতিবাচক সাড়াও মিলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতা কামনা করে গত রবিবার কমিশনার শাহনেওয়াজ বলেন, সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা আইনশৃঙ্খলা ও আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। আশা থাকবে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচিতরা আরও বেশি দায়িত্বশীল হবেন।  আমাদের সহযোগিতা করবেন। কারণ, এতে সরকারের ভাবমূর্তির বিষয়টি জড়িত রয়েছে। এজন্য যিনি সরকার প্রধান আছেন, বিষয়টি দেখার জন্য তাকেও বলব।

জানা গেছে, কমিশনের এ আহ্বানের পর সরকারের হাইকমান্ড থেকে ইতিবাচক সাড়া এসেছে। কমিশনকে গ্রিন সিগনাল দিয়ে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে যেকোনও ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলে সরকারের তাতে সম্মতি থাকবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিব সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী যিনি হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও সেই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 ‘কোন এমপি বা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কী না’—জানতে চাইলে সচিব বলেন, যিনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করবেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি তিনি এমপি হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব। আর তিনি যদি মন্ত্রী হন, তাহলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।

পৌরসভা নির্বাচনের আচরণ-বিধিমালায় বলা হয়েছে, ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও কোনও সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী নির্বাচন-পূর্ব সময়ে নির্বাচনি প্রচারণয় বা নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না।’ বিধিমালায় ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তি বলতে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সরকারের মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধী দলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা তাহাদের সমমর্যাদার কোনও ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের মেয়রকে বোঝানো হয়েছে।

এদিকে, বিধিমালায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তি হিসেবে বলা হয়েছে, ‘কোনও প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনও ব্যক্তি নির্বাচন-পূর্ব সময়ে এই বিধিমালার কোনও বিধান লঙ্ঘন করিলে অনধিক ৬ মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’ পাশাপাশি আচরণবিধি লঙ্ঘিত হলে কমিশন চাইলে কোনও প্রার্থীর প্রার্থিতাও বাতিল করতে পারে বলে বিধিমালায় উল্লেখ রয়েছে।

/এমএনএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।