ভোর ০৬:১৫ ; রবিবার ;  ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬  

কী ভাষায় লিখবে তুমি, কী চেতনায়? || জাহেদ সরওয়ার

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

 

[আমরা ২০১৫ সালে প্রকাশিত বই থেকে দশটি বই বেছে নিতে অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছি তাদের প্রিয় বই নিয়ে লিখতে। এই প্রস্তাবে যারা সাড়া দিয়েছেন তাদের প্রিয় বই নিয়েই আমাদের এই আয়োজন। কুমার চক্রবর্তীর ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ নিয়ে লিখেছেন জাহেদ সরওয়ার। বইটি প্রকাশ করেছে সংবেদ। প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর। মূল্য তিনশত টাকা।–বি. স.]

 

কুমার চক্রবর্তীর ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ পাঠ করতে করতে কেমন যেন সমুদ্রে সাঁতার কাটার অভিজ্ঞতা অনুভূত হয়। তিনি বিষয়ের এত গভীর অবধি দেখতে পান ও নিয়ে যান পাঠকদের— স্নায়ুশক্ত পাঠক বা অভিজ্ঞতাজাত কবি না হলে তার প্রবন্ধগুলোর সঙ্গে সময় কাটানো অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। কবি পুর্ণেন্দু পত্রী আক্ষেপ করে বলেছিলেন একবার—বাঙালি কবিদের চিন্তার ডাইমেনশন কম হওয়ার কারণ হচ্ছে তারা খুব সীমিত বিষয়ে আগ্রহী। যে কবিতা লেখে; দেখা গেল সে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, আর্ট বা চলচ্চিত্র সম্পর্কে আগ্রহী নয়। অর্থাৎ তিনি এক সৃজনি সত্তাকে তার গ্রহণবর্জনের দরজা-জানলা খুলে রাখতে বলেছিলেন। কবি হিসাবে আজ আমরা যাদের নাম নেই বা শিল্পী হিসাবে তাদের প্রত্যেকেরই একাধিক বিষয়ে আগ্রহ ছিল। আর সেই বহু অভিজ্ঞতার অনুরণন তাকে জাগিয়ে রেখেছে। তাকে দিয়ে সৃষ্টি করিয়ে নিয়েছে অবিরাম।

জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধ সমগ্রও যদি আমরা পড়ি বা টি. এস. এলিয়টের বা বিনয় মজুমদারের বা চেশোয়াভ মিউশের তাহলেও আমরা মাল্টিডাইমেনশনাল বিষয়াষয় যে একজন কবির চিন্তাস্রোতকে কতটা গভীর করে তুলতে পারে তা অনুধাবন করতে পারি। কারণ একজন প্রকৃত কবিসত্তাতো শুধু কবিতা লেখে না, কবিতা লিখতে লিখতে সে একটা জার্নিও করে তার নিজস্ব ভাষারাজ্যে, ভাবনারাজ্য। হয়তো বলা যায় আবার নিজস্ব বলেও কিছু আছে নাকি আদৌ? কারণ এই সব টুলসতো বিভিন্ন কবির অভিজ্ঞতা থেকে একজন সন্ধানি কবিসত্তার দিকে ধেয়ে আসছে ক্রমাগত। কুমার চক্রবর্তী নির্বাচিত প্রবন্ধ পাঠে এসব চিন্তার অবতারণা হচ্ছে কারণ তার অভিজ্ঞতা, পাঠ ও প্রকাশ বহুগামী, বহুপ্লাবী।

অনেক কবিই কবিতা লিখিত হবার সময়ের যেই জার্নি সেটা জ্ঞাপন করতে চান না অথবা তিনি সেই মুহূর্তে সচেতন থাকেন না। বিষয়টা নির্ভর করে কবির সহ্যক্ষমতার উপর। এটা চোরকে চুরি করতে দেওয়া ও তা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করার মতো। সমূহ ক্ষতিকে মেনেই চেতন অবচেতনের অলিগলিতে ঘোরাফেরা।

অনেকগুলো বিষয়ে অবতারণা করেছেন তিনি এই গ্রন্থে। কবিতার ভাষা কবির অভিজ্ঞতা কবিতার অন্তর্নিহিত দার্শনিক চেতনা। সে সবের প্রচুর রেফারেন্সও ব্যবহার করেছেন। কিন্তু অযাচিত কোনো রেফারেন্স নয়। নিজের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে রেফারেন্স নেয়ার কারণে নির্ভার হয়ে উঠেছে সে সব। উনিশটা প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে এই গ্রন্থে তিন বিভাগে। প্রথমটায় কবিতার একান্ত ভ্রমণপথ, দ্বিতীয় বিভাগে জয়েস, সার্ত্র, টমাস মান, ভার্জিনিয়া উলফ, মিউশ ও ট্রান্সটোমারের লেখার উপর ভিত্তি করে আলোচনা। তৃতীয় পর্বে দুটো প্রবন্ধকে দার্শনিক প্রবন্ধ বলা যায়।

তবে কবিতা বিষয়ক কবির গদ্যের ভেতরও বিপদ থাকে। যেমন কবিদের কাছে আমরা চাই মৌলিক গদ্য। বেশিরভাগ কবিই যেহেতু গদ্য চর্চা করেন কম সেহেতু তারা লেখেন সেকেন্ডারি গদ্য। কিন্তু কুমারের এই গদ্য সিংহভাগই মৌলিক

যে কোনো লেখাই আসলে এক ধরনের জাজমেন্ট। মানুষ অনেক কিছুকেই জাজ করতে চায়। আবার সে জাজের জায়গা থেকে নিজেকে খুব দ্রুত সরিয়েও নিতে চায় এটা তার ইন্টার্নাল পলিটিক্স। সে নিজেই আবার নিজেকে প্রশ্ন করে মানুষ কী আসলে জাজ করতে পারে? বিশেষ করে কবিদের ভেতর এই কন্ট্রাডিকশনটা দেখা দেয় প্রচুর। এই বইয়ের আভাসের ছদ্মবেশে ভূমিকায় কুমার চক্রবর্তী যখন বলেন, ‘‘এক্ষণে এই লেখাগুলো পড়ে মন আমার খারাপই হয়ে গেল। কিন্ত কী আর করা যায়! সবচেয়ে ভালো হতো যদি এগুলো না লেখা হতো, কিন্তু তা তো হবার নয়। মিদাস একবার সিলেনুসকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, মানুষের জন্য কোন নিয়তি শ্রেয়তর, তখন সিলেনুস উত্তর দিয়েছিলেন যে, সর্বোত্তম হচ্ছে জন্ম না-নেওয়া, কিছুই না-হওয়া, কিন্তু যেহেতু তা অসম্ভব তাই দ্বিতীয় উত্তম হচ্ছে আগেভাগে মরে যাওয়া। আমারও মনে হয় তা-ই। না-লিখতেই ভালো হতো, তবু যেহেতু লেখা হয়ে গেছে অতএব এগুলো তাদের জীবনসীমার আগেই মরে যাক। মরেই তারা প্রমাণ করুক তাদের নিস্প্রয়োজনীয়তাকে বা প্রয়োজনীয়তাকে, যে মৃত্যুর জন্যই একদিন তারা জন্মেছিল।’’

তখন আমরা সেটা আরো ভালো করে বুঝতে পারি। তবে কবিতা বিষয়ক কবির গদ্যের ভেতরও বিপদ থাকে। যেমন কবিদের কাছে আমরা চাই মৌলিক গদ্য। বেশিরভাগ কবিই যেহেতু গদ্য চর্চা করেন কম সেহেতু তারা লেখেন সেকেন্ডারি গদ্য। কিন্তু কুমারের এই গদ্য সিংহভাগই মৌলিক। কবিতা এক অর্ন্তগত ভাষাবোধ আসলে একে একেকজন একেক দিক দিয়ে বুঝে নেয় অনেকের বোঝাপড়া একরকম নাও হতে পারে। তিনি বলেন, একটি কবিতা বা শিল্পবস্তু তার সমগ্রকে নিয়েই শিল্প হয়ে উঠে। আর এই সমগ্রতার ভেতরই থাকে তার কাম্য হওয়ার গূঢ় আকাঙ্ক্ষা। শিল্প মানুষকে স্পশ করে থাকে—আর এর মধ্যেই আছে তার নান্দনিক অনুভূতির চাবিকাঠি। কবিতা যে অভিব্যক্তি, এ বিষয়ে বলার কিছু নেই কিন্তু এই অভিব্যক্তির মধ্যে যে-আরও বহুবিধ অনুপ্রকাশ থাকে, তাকে বুঝতে পারার মধ্যেই তার সামগ্রিক অন্বেষণের বিষয়টি জড়িত।

কবিতার সমস্ত দিকেই আলোকপাত করেছেন তিনি। বিভিন্ন দিক দিয়ে কবিতাকে কবিকে দেখার চেষ্টা আছে অবিরত। সে সব নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে যদিও পৃথিবীতে। তবুও এক হিসাবে বলতে গেলে তো সব লেখা রি-কন্সট্রাকশন। তবুও আলাদাভাবে নিজের মতো করে অনেক অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে বেজে উঠছে নিজের স্বর। কবিতার আগে আসলে মনে হয় কবির নিজের কিছু নিজস্ব পথ আছে যেগুলো তাকে ধীরে ধীরে তৈরি করে নিতে হয়। না হলে এই চরিত্রদোষ তার কবিতার কাঁধে সওয়ার হবে শেষ পর্যন্ত এর উদাহরণ ভুরি ভুরি জগতে। অধিকাংশ কবিই নিজের চরিত্রদোষে তার কবিতাকে বন্ধ্যা করে রাখলো সেই ব্যর্থতা তাকে কুরে কুরে খেল। সেটা যেমন আমরা খুঁজে পাই রিলকের চিঠিতে তেমনি নেরুদা বা রাসুল গামজাতভের আত্মজীবনীতে। কুমার যখন বলেন, ‘‘কবি মাত্রেই সমগ্রের কবি নন, সব কবিতাও শ্বাশতের কবিতা নয়। কবিতার দিকে দীর্ঘকাল হেঁটে যাওয়া, চারপাশের তুমুল হাতছানির বিষয়ে অন্ধ থেকে কবিতার পার্থেননের দিকে আসক্তিহীনভাবে ভাববিড়ম্বিত উপস্থিতির ভেতর নিজেকে ছেড়ে দেওয়া, যাবতীয় ভোজবাজির পথ ত্যাগ করে নিজেকে কবি করে তোলার সাধনায় শুধুই বেদনা অপার। কিন্তু এতে ব্যর্থতা বলে কিছু নেই। কবি হওয়ার জয় কবি হওয়ার মধ্যেই।’’

ইংরেজিতে বিদেশি সাহিত্য অতিরিক্ত পড়ার একটা সাইড অ্যাফেক্ট আছে প্রবন্ধগুলোতে। বিষয়সমূহ বুঝতে অসুবিধা না হলেও, বিষয়ে গভীরে প্রবেশপথে কোনো বাধা না আসলেও পড়ার পর কোথায় যেন মনে হয় এই সব ইউনিভার্সাল বিষয়গুলো বিদেশি ভাষার অ্যাকসেন্টের চেয়ে দেশীয় অ্যাকসেন্টে কী লেখা যেত না?

কী অসাধারণ বলেন তিনি। এরকম বহু রকম বিষয়াষয়ে ঋদ্ধ বইটির প্রথম ভাগ। দ্বিতীয় ভাগে তিনি এন্তার এন্তার লেখকদের দিকে আলোকপাত করেছেন। এতে তার পাঠের গভীরতা সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল হই। আমার মনে পড়ে জীবনানন্দেরও খুব প্রিয় লেখক ছিলেন টমাস মান। টমাস মানের ম্যাজিক মাউন্টেন নিয়ে তারও একটা প্রবন্ধ ছিল। বিশ্বসাহিত্যের প্রখ্যাত লেখকদের এই লেখাগুলোও সহজাত গুণে শুধুই বুক রিভিউ হয়ে থাকেনি সেগুলোও হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র প্রবন্ধ।তবুও কথা থেকে যায় এই প্রবন্ধগুলোতে গতানুগতিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রবন্ধের মতো কবি বা লেখকদের জন্ম বেড়ে উঠা বই প্রকাশ ইত্যাদি বিষয় তিনি এড়িয়ে যেতে পারতেন। এগুলো কোনো সৃজনশীল প্রবন্ধের বিষয় না, জীবনীকারদের বিষয়। নিজের সৃজনশীল বিষয়ে যেভাবে স্বতন্ত্র জায়গা থেকে তিনি পতাকা উড়িয়েছেন। বিভিন্ন লেখকের উপর লেখা প্রবন্ধগুলোতে এই কারণে কিছু ম্লান উপস্থিতি। আর গদ্যের ভাষাটা সাবলিল হলেও আরো বেশি দেশিয় অভিজ্ঞতার আলোকে উপস্থাপিত হতে পারতো। ইংরেজিতে বিদেশি সাহিত্য অতিরিক্ত পড়ার একটা সাইড অ্যাফেক্ট আছে প্রবন্ধগুলোতে। বিষয়সমূহ বুঝতে অসুবিধা না হলেও, বিষয়ে গভীরে প্রবেশপথে কোনো বাধা না আসলেও পড়ার পর কোথায় যেন মনে হয় এই সব ইউনিভার্সাল বিষয়গুলো বিদেশি ভাষার অ্যাকসেন্টের চেয়ে দেশীয় অ্যাকসেন্টে কী লেখা যেত না? অবশ্যই বলে লাভও নাই কারণ কবিতার এই অন্তর্নিহিত বিষয় দেশি কবিরা তেমন চর্চাও করে নাই কখনো। সেটা কেবল শুরু হয়েছে এই আধুনিক কবিদের হাত ধরেই। আধুনিক কবিরা বর্জনীয় কিনা সে প্রশ্ন মূলতবি রেখেও তাদের কবিতানিহিত গদ্যগুলো আমলে নেয়া যায়। যেমন জীবনানন্দ, সুধীন, অমিয়, বিষ্ণু দে’র মননশীল প্রবন্ধগুলো। বাংলা সাহিত্যে এ এক নতুন জিনিস। এরপর সব গভীর কবিদেরই আমরা একাধিক গদ্যের বই পেয়েছি। যেমন পেয়েছি কবি কুমার চক্রবর্তীর গদ্যও। নিঃসন্দেহে এসব ঋদ্ধ করবে পাঠকদের আরো বহু বহু দিন। গত বই মেলায় প্রকাশিত বইজঞ্জালের ভেতর হয়তো এই প্রবন্ধ-পুস্তক আমাদের উলবনে মুক্তো।

 

পাঠকপ্রিয় ২ পড়তে ক্লিক করুন—

উৎসের কাছে ফেরা || রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।