রাত ০৮:২০ ; বৃহস্পতিবার ;  ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৬  

দলিল দিয়েই ১৯৫ জনের বিচার সম্ভব

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

উদিসা ইসলাম।।

মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের যেসব দলিল আমাদের সামনে উপস্থিত তার মাধ্যমেই ১৯৫ পাকিস্তান সেনার বিচার সম্ভব বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। তারা বলছেন, অনুপস্থিতিতে বিচার করার তো একটা পদ্ধতি আমাদের বর্তমান আইনেই আছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ১৯৭৩ এবং তার সব সংশোধনীতে এ বিচার করা সম্ভব। আমাদের কাছে যেসব দলিলপত্র আছে পাকিস্তানের সেনাদের দোষী সাব্যস্ত করতে তা যথেষ্ট, তবে পদ্ধতিটা নিয়ে ভেবে-চিন্তে নামা যৌক্তিক হবে বলেও মনে করেন তারা।

সম্প্রতি জামায়াত নেতা মানবতাবিরোধী অপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির আদেশ কার্যকরের পর পাকিস্তানের পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধ অস্বীকার করে দেওয়া বক্তব্যের পরই জোরেশোরে শুরু হয়েছে ১৯৫ জনের বিচারের কথা। ইতোমধ্যে মন্ত্রীদের কেউ কেউ বলেছেন, তারা উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি ভেবে দেখছেন। এদিকে অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, স্বাধীনতার দলিলপত্রে টিক্কা খানের জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া আছে সেটাই পাকিস্তানকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য যথেষ্ট এবং যুদ্ধাপরাধ প্রমাণে আর কিছু লাগে না। যদিও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাট্রিবিউনকে বলছেন, যেহেতু দেশ ভিন্ন হয়ে গেছে। বিচার করতে ও তা কার্যকর করতে জাতিসংঘের মাধ্যমে একটি আদালত গঠন করতে হবে। তবে অবশ্যই সেই আদালত বাংলাদেশেই স্থাপিত হতে হবে।

২৫ মার্চ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর রাতব্যাপী উন্মত্ততা চলছিল বলে লিখেছেন বি জোনের সামরিক আইন প্রশাসকের সদর দফতরে উপস্থিত থাকা লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের জনসংযোগ অফিসার মেজর সিদ্দিক সালিক। পাকিস্তানি বাহিনীর এই তরুণ মেজর মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত হয়ে দেশে ফিরে ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ নামে লেখা বইতে ২৫ ভয়াবহতার কথা উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলছেন, দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্যে আমি তাড়াতাড়ি ক্যান্টনম্যান্টে ফিরে এলাম। এখানকার পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্নতর দেখলাম। শহরের হৃদয় বিদারক ঘটনা সামরিক বাহিনীর লোকজন এবং তাদের ওপর নির্ভরশীলদের স্নায়ুবিক অবস্থাকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। তাদের অনুভূতি এই রকম- ‘দীর্ঘদিন পর ঝড় থেমেছে এবং দিগন্তকে নির্মল করে অবশেষে বয়ে গেছে। স্বস্তির সাথে গা এলিয়ে দিয়ে অফিসার মেসে অফিসাররা বসে গল্প করছে।’

গবেষকরা বলছেন, তারা কি ধরনের অপরাধ করেছেন তার সব প্রমাণই বাংলাদেশের হাতে আছে। হত্যা, গণহত্যা, দেশত্যাগে বাধ্য, জেনোসাইডসহ সব ধরনের অপরাধ পাকিস্তান সেনাবাহিনী করেছে। এলাকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের খুঁজে খুঁজে নির্যাতন, অপহরণ ও হত্যা করা হয়েছে।

এদিকে জেনারেল নিয়াজী পতনের কয়দিন আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে নিজের বুকের দিকে ইশারা করে বলেছিলেন, ‘এজন্য তাদের আগে এর ওপর দিয়ে ট্যাংক চালিয়ে যেতে হবে। উনি আরও প্রতিজ্ঞা করলেন যে শেষপর্যন্ত উনি লড়ে যাবেন।’

এখন বর্তমান আইনেই এই বিচার সম্ভব কিনা প্রশ্নে প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ বলেন, ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধে যেসব পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন তাদের বিচার আমাদের প্রচলিত আইনে সম্ভব এবং যে চুক্তির কথা বলা হয়ে থাকে সেটাও এটার ক্ষেত্রে কোনও বাধা সৃষ্টি করবে না। তিনি আরও বলেন, তাদের অপরাধগুলো প্রয়োজনীয় তদন্ত শেষ করে বিচার শুরু করা যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান যেহেতু বলেছিল তাদেরকে নিজ দেশে নিয়ে বিচার করবে এবং করতে ব্যর্থ হয়েছে সেহেতু এখন আমরা বিচারের উদ্যোগ নিতে পারি। কেউ কেউ চুক্তির বিষয়টি বলতে পারেন কিন্তু চুক্তি রেটিফাই না হলে তা আমাদের জন্য আইন নয়। ফলে এই কারণে বিচারে কোনও বাধা নেই।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে যেসব পাকিস্তান সেনা কর্মকর্তা জড়িত ছিল তাদের বিচার আমাদের আইনে করা সম্ভব। ওই সময়ে অপরাধ করে এখনও যারা জীবিত আছে এই জন্যই  তাদের বিচার করতে হবে। আর তাদের এখানে বিচারের জন্য উপস্থিত থাকতে হবে বিষয়টি তা নয়, অনপুস্থিতিতেই বিচার করা সম্ভব, সরকার বিচার করতে পারে। আমার মনে হয়, ওই সব কর্মকর্তার বিচার করা উচিত।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, এখনই এটা নিয়ে মন্তব্য করব না। বিষয়টি কোন পর্যায়ে আছে দেখি, তারপর মন্তব্য করব। তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ নিয়ে কথা বলেছেন। বিষয়টি বুঝে ওঠার আগে কোনও বিভ্রান্তিমূলক মন্তব্য করতে চাই না।

ছবি: সংগৃহীত ও Center for Bangladesh Genocide Research - CBGR

/এএইচ/আপ-এফএস/

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।