রাত ০২:১৮ ; সোমবার ;  ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৬  

নজরদারিতে রাজধানীতে বসছে ৪ হাজার সিসিটিভি

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

জামাল উদ্দিন॥

জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নজরদারিতে ক্লোজড সার্কিট টিভি ক্যামেরা (সিসিটিভি) ব্যবহারের বিষয়টি দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠছে। সম্প্রতি কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনায় দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করতে এই সিসিটিভি ফুটেজই সহায়তা করেছে। বিভিন্ন সময় বাসা-বাড়ি, অফিস ও মার্কেটে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবহার বাড়াতে নগরবাসীর প্রতি অনুরোধও জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। এবার সরকারি উদ্যোগেই পুরো মহানগরীকে সিসিটিভির আওতায় নিয়ে আসতে কয়েক হাজার ক্যামেরা বসানোর প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশ সদর দফতর। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পুরো রাজধানীতে প্রায় চার হাজার ক্যামেরা বসানো হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর ৫৯টি পয়েন্টকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রায় পাঁচ বছর আগে বসানো দেড় শতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এসব ক্যামেরা সচল করার বিষয়ে পুলিশ উদাসীন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে খুব শিগগিরই এই ক্যামেরাগুলোও চালু করা যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ক্যামেরাগুলো চালু না হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষেরই কিছুটা গাফিলতি ছিল বলেও মনে করেন তারা।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কন্ট্রোলরুম আধুনিকীকরণ প্রকল্পের অধীনে ২০০৭ সালে রাজধানীর ৫৯টি পয়েন্টকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সিসিটিভি বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে ডিএমপি কন্ট্রোল রুমের আধুনিকায়নের জন্য ১৯৯৮ সালে এই প্রকল্পটি হাতে নেয় তৎকালীণ সরকার। নতুন এ প্রকল্পের অধীনে কন্ট্রোল রুমের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ, ট্রাফিক পুলিশের জন্য মেসেজ ডিসপ্লে বোর্ড ও সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শুরু হয় ওই বছরই। পরে রাজধানীর সড়কগুলোতে যানজট কমানোর জন্য ৩১টি ইলেক্ট্রনিক্স ট্রাফিক মেসেজ ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সিসি ক্যামেরাগুলো বসানোসহ আনুষাঙ্গিক কাজগুলো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনেক আগেই পুলিশের টেলিকম বিভাগ বুঝে নেওয়ার কথা। পরে সেটি ডিএমপির কাছে হস্তান্তর করবেন তারা। ৬১ কোটি টাকারও বেশি টাকা ব্যয়ে রাজধানীর ৫৯ পয়েন্টে ১৫৫টি সিসি ক্যামেরা বসানো হয়। প্রকল্পটির কাজ শেষ হয় ২০১০ সালে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফলেক কমিউনিকেশন্সকে ৫৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অপরাধ ও ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ, মেসেজ ডিসপ্লে বোর্ডের মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সর্বশেষ ট্রাফিক অবস্থা জেনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পুলিশ সদর দফতর থেকে প্রথমে ২৭ কোটি টাকার এ প্রকল্প নেওয়া হলেও পরে প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ কোটি টাকা। অন্যদিকে কন্ট্রোলরুমের জন্য আরও ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

রাজধানীতে সিসিটিভি প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (উন্নয়ন) গাজী মোজাম্মেল হক বলেন, এ প্রকল্পটি বুঝে নিয়ে ব্যবহার উপযোগী করতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও বিটিসিএল-এর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটি কয়েক দফা বৈঠকও করেছে। এ বিষয়ে আরও কয়েকটি বৈঠক শেষে সেগুলো সরেজমিন দেখা হবে। এসব ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণে কন্ট্রোল রুমে যেসব যন্ত্রপাতি রয়েছে সেগুলো ঠিকাদার তালা দিয়ে রেখেছেন। তালা খুলে সেগুলো দেখানোর জন্য ঠিকাদারকেও বলা হয়েছে। নানা কারণে আগে এগুলো বুঝে নেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্তের পর যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে। এজন্য আরও কয়েকদিন সময় লাগবে।

এ প্রকল্প চালু করতে আর কত সময় লাগতে পারে সেটা সুনির্দিষ্ট করে না বললেও গাজী মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আশা করি শিগগিরই কাজটা হয়ে যাবে।’ এতদিনেও বুঝে না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক বিষয় আছে, এজন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষেরই কিছুটা গাফিলতি ছিল।

তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি যেভাবে দেখা হচ্ছে সেটা আসলে তেমন বড় কিছু না। বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় শহরে পাঁচ থেকে ১০ হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। এতবড় ঢাকা শহরে প্রয়োজন তিন থেকে চার হাজার ক্যামেরা। অথচ লাগানো হয়েছে ১৫৫টি ক্যামেরা। এজন্য নতুন করে প্রজেক্ট নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক কাজ হিসেবে মাঠ পর্যায়ে গবেষণাও শুরু হয়েছে। এ প্রজেক্টের আওতায় প্রায় চার হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে। এতে পুরো ঢাকা শহর সিসিটিভির কাভারেজে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। এটা হলে রাজধানীর মানুষ উপকৃত হবে। একইসঙ্গে ট্রাফিক সিস্টেমেরও অগ্রগতি হবে। যানজট নিরসনেও কাজে লাগবে এসব ক্যামেরা।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফলেক কমিউনিকেশন্সের বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজী জাকারিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে সময়মতো প্রকল্পটি বুঝে না নেওয়ার জন্য তিনি পুলিশ প্রশাসনকে দোষারোপ করেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে ইতালির নাগরিক তাভেল্লা সিজার দুর্বৃত্তদের গুলিতে খুন হন। এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গোয়েন্দারা শনাক্ত করেন পাশের একটি বাড়ির সিসিটিভির ফুটেজ দেখে। এর আগে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের লাগাতার অবরোধ ও হরতালের মধ্যে গত জানুয়ারিতে মিরপুর-১ নম্বর সেকশন এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোলবোমা হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। পরে ডিএমপির লাগানো একটি সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে হামলাকারীদের শনাক্ত করে ওয়াদুদ ব্যাপারী নামের এক শ্রমিকদল নেতাকে আটক করে পুলিশ।

গত মে মাসে যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে থেকে এক গারো তরুণীকে অপহরণ করে মাইক্রোবাসের মধ্যে ধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। পরে যমুনা ফিউচার পার্কের নিজস্ব সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ধর্ষক ও মাইক্রোবাস শনাক্ত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ওই ফুটেজের সূত্র ধরে ধর্ষকদের গ্রেফতার করে র‌্যাব। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে গুলশান শপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক মিল্কিকে। পরে ওই শপিং মলের নিজস্ব সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে ঘাতকদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হয়।

/এসটি/ এএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।