রাত ০২:২২ ; সোমবার ;  ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৬  

তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও দেশে না কমাতে অনড় সরকার

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

শফিকুল ইসলাম।।

বিশ্ববাজারে প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের দাম গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে। ২০০৪ সালের পর গত ১১ বছরে এত কম দামে আর কখনওই জ্বালানি তেলের দাম নামেনি। গতকাল সোমবার বিশ্বের পণ্যবাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৩৬ দশমিক শূন্য ৫ ডলার (প্রতি ডলার ৮০ টাকা) নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের হিসেবে যার দাম দাঁড়ায় মাত্র দুই হাজার ৮৮৪ টাকা।

এরপরেও দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম না কমানোর বিষয়ে অনড় রয়েছে সরকার। শুরু থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার কথা বললেও মঙ্গলবার বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি আবারও জানিয়েছেন- আপাতত জ্বালানি তেলের দাম কমানোর পরিকল্পনা সরকারের নেই।

বেসরকারি একটি সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে আগে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ছিল ১৪৭ মার্কিন ডলার। জানুয়ারি মাসে তা ৫৮ ডলারে নেমেছে। তেলের দাম বেশি থাকায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে প্রতি বছরে ৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। এখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ায় সরকারের লোকসান কমিয়ে আনা হচ্ছে। বর্তমানে তেলের যে দাম, তা অব্যাহত থাকলে আগামী দুই বছরে সরকারের লোকসান বা ভর্তুকি তুলে লাভ হবে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। লোকসান বা ভর্তকি উঠে এলে তেলের দাম কমানো যেতে পারে বলে জানিয়েছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত চলতি বছরের ৫ জুন ২০১৫-১৬ বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনেও বলেছিলেন, অল্প হলেও জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হবে। এর আগের দিন ৪ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায়ও অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, জ্বালানি তেলের দাম কমায় সাশ্রয় করা অর্থ অগ্রাধিকার খাতে সঞ্চালন করা হবে। তবে দাম কমানোর কোনও পরিকল্পনা নাই। দাম কমালে পার্শ্ববর্তী দেশে তা পাঁচার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি আরও জানিয়েছিলেন, এই মূহূর্তে জ্বালানি তেলের দাম কমালে তার কোনও ইতিবাচক প্রভাব জনজীবনে পড়বে না। কারণ ট্রাক ভাড়া কমবে না। ট্রাক ভাড়া না কমলে পরিবহন ব্যয় কমবে না। পরিবহন ব্যয় না কমলে জিনিসপত্রের দামও কমবে না। বাস ভাড়া, লঞ্চ ভাড়াও কমবে না। তাই যদি হয় তাহলে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে লাভ কি?

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তো বটেই অন্য যেকোনও দিক বিচার করলে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা উচিত। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজার দর অনুযায়ী সরকার তেল কেনে। তবে দাম কতটুকু সমন্বয় করা হবে তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি মাথায় রেখে প্রতি তিনমাস পরপর জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার একটি পলিসি নিয়ে সরকার চিন্তা-ভাবনা করতে পারে। আমাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একটি বিষয় সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল।

চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর) বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের গড়মূল্য ছিল ব্যারেলপ্রতি ৫৪ ডলার। পরের তিন মাস (এপ্রিল, মে ও জুন) সময়ে গড় দরও কিছুটা বেড়ে প্রতিলিটার অপরিশোধিত তেলের মূল্য দাঁড়ায় ৬১ ডলার। অথচ এক বছর আগে এই তেল কিনতে হয়েছে ১১০ থেকে ১১৫ ডলার দরে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব অনুযায়ী দীর্ঘদিনের লোকসানের কারণে বিপিসির মোট দায়-দেনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের কাছে ঋণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। আর বছর খানেক ধরে তেলের দাম কম থাকায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, গত ২২ এপ্রিল পর্যন্ত বিপিসির মুনাফা হয়েছে ৩ হাজার ৪৫৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

বিশ্বব্যাংক গত ফেব্রুয়ারি মাসের আন্তর্জাতিক বাজার দর অনুযায়ী বিপিসির মুনাফার একটি হিসাব তৈরি করেছে। সে সময়ে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দর ছিল প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলারের বেশি। ওই সময় প্রতি লিটার অকটেন ও পেট্রোলের উৎপাদন ব্যয় ছিল ৫৬ টাকা ৮৫ পয়সা। গ্রাহকের কাছে তা বিক্রি করা হয়েছে যথাক্রমে ৯৯ ও ৯৬ টাকা লিটার দরে। বিপণন কোম্পানি ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কমিশন বাদ দিয়ে বিপিসির মুনাফা হচ্ছে ৩৫ টাকা ৪৯ পয়সা। একইভাবে প্রতি লিটার কেরোসিনে বিপিসির মুনাফা হচ্ছে ১৩ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিজেলে ১৪ টাকা ৬৮ পয়সা, ফার্নেস অয়েলে ১৯ টাকা ৫৭ পয়সা এবং প্রতি লিটার জেট ফুয়েলে (বিমানের জ্বালানি) বিপিসির মুনাফা হচ্ছে ১৮ টাকা ৭৫ পয়সা।

আবার একইসঙ্গে সরকারও এ থেকে কর হিসেবে আদায় করছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। যেমন- অকটেন ও পেট্রোলে সরকার প্রতি লিটারে সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হিসেবে আদায় করছে ১৫ টাকা ১৮ পয়সা এবং বাকি ডিজেল থেকে শুরু করে বাকি পণ্যে প্রতি লিটারে কর নিচ্ছে ৮ টাকা ৩২ পয়সা। এত মুনাফার পাশাপাশি সরকারের অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে ভর্তুকি বাজেট থেকে। গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেলে সরকারের ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অথচ সর্বশেষ হিসাবে এই বরাদ্দ থেকে ভর্তুকি খাতে সরকারের ব্যয় হয়েছে মাত্র ৭০০ কোটি টাকা।

এদিকে গোল্ডম্যান স্যাক্সের বিশ্লেষকরা আগাম পূর্বাভাস দিয়ে জানিয়েছে, আগামী ২০২০ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের গড় মূল্য হয়তো ৫০ (প্রতিলিটার) ডলারেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এরকম এক পরিস্থিতিতে বিপিসি আগামী ছয় মাস তেল আমদানির জন্য জাহাজ ভাড়ার (প্রিমিয়াম) যে চুক্তি করেছে, তাও আগের তুলনায় কম।

এ প্রসঙ্গে বিপিসির চেয়ারম্যান এএম বদরুদদোজা বলেন, আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি তেল আমদানির জন্য জাহাজ ভাড়াসহ তারা যে চুক্তিপত্র করেছেন, তাতে আগের ছয় মাসের তুলনায় ব্যয় কম হবে বলে মনে হয়। তাই দেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ে সরকারি কোনও উদ্যোগের খবর তার জানা নাই বলে জানিয়েছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেছেন, বাংলাদেশে তেলের দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা না করার বিষয়টি মূলত সরকারি নীতির ওপর নির্ভর করছে। যে কারণে বিশ্ববাজারে দাম কমলেও বাংলাদেশের বাজারে সরাসরি এর কোনও প্রভাব পড়ে না। সরকার ঠিকভাবে জ্বালানি তেল ক্রয় ও বিক্রি বাবদ আয় করা উদ্বৃত্ত অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করতে পারলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও দেশীয় বাজারে পরিস্থিতি সামলে রাখতে পারবে। স্থানীয় বাজারে তেলের দাম কমানো হলেও, এর প্রভাব পরিবহন খরচ কিংবা পণ্যের দামে কোনও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না। এতে মূলত ব্যবসায়ীরাই লাভবান হবেন।

/এসআই /এএইচ/

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।