রাত ০২:২১ ; সোমবার ;  ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৬  

ইকোনমিক জোন স্থাপনের প্রতিবাদে রণসাজে হাজার শ্রমিক

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মোহাম্মদ নুর উদ্দিন, হবিগঞ্জ।।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে ইকোনমিক জোন স্থাপনের প্রতিবাদে মারমুখী ও প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে হাজার হাজার চা শ্রমিক। স্থানীয় লস্করপুর ভ্যালির ২৩ বাগানের শ্রমিকরা ১০ দিন ধরে বাগানের কাজ বন্ধ রেখে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করে আসছে।

ইকোনমিক জোন স্থাপন এলাকায় দেশীয় অস্ত্র, তীর, ধনুক হাতে নিয়ে রণসাজে সজ্জিত হয়ে গায়ে রঙ মেখে ও মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে এসব চা শ্রমিক। প্রতিদিনই তারা এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলন করছে। ইতোমধ্যে প্রতিবাদ সভা, বিক্ষোভ মিছিল, ধর্মঘট, স্মারকলিপিসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে আন্দোলনরত শ্রমিকরা।

শ্রমিকদের দাবি, কোন অবস্থায় এখানে ইকোনমিক জোন স্থাপন হতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে লাশের বন্যা বয়ে যাবে। আর প্রশাসনের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের বোঝানোর চেষ্টা এখনও চলছে বলে জানা গেছে।

প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জেলার চুনারুঘাট উপজেলার চান্দপুর চা বাগান, বেগমখাঁন চা বাগান ও জোয়ালভাঙ্গা চা বাগান এলাকায় ৫১১ একর জমির ওপর স্পেশাল ইকোনমিক জোন স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। ইকোনমিক জোন স্থাপনের সিদ্ধান্তের পর থেকেই সেখানকার হাজার হাজার শ্রমিক প্রতিবাদ করে আসছে। তবে শ্রমিকদের প্রতিবাদে কোন কর্ণপাত করেনি প্রশাসন।

গত ১২ ডিসেম্বর ইকোনমিক জোনের পিলার স্থাপনের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাশহুদুল কবীরসহ প্রশাসনের একটি টিম ঘটনাস্থলে গেলে হাজার হাজার চা-শ্রমিক প্রতিবাদ জানান। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায়ে শ্রমিকদের প্রতিবাদের মুখে পিলার স্থাপন না করে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হন তারা। এরপর থেকেই প্রতিদিন ঘটনাস্থলে দেশীয় অস্ত্র হাতে অবস্থান নেয় শ্রমিকরা। পালন করে আসছে বিভিন্ন কর্মসূচি। গঠন করা হয় ভূমিরক্ষা কমিটি।

সর্বশেষ মঙ্গলবার সকাল থেকেই শ্রমিকরা আবারও বিক্ষোভ মিছিল ও ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয় তারা। প্রতিবাদ সভায় শ্রমিকরা জানান, রক্তের বিনিময়ে হলেও চা শ্রমিকদের ধানচাষের জমিতে ইকোনমিক জোন ঠেকানো হবে। কোন অবস্থায় ইকোনমিক জোন স্থাপন হতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে রক্তের বন্যা বয়ে দেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ চা-বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান উপদেষ্টা কাঞ্চন পাত্র জানান, আমরা জেলা প্রশাসককে ৭ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছি। এক সপ্তাহের মধ্যে ইকোনমিক জোন স্থাপনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক বন্ধসহ কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

তিনি বলেন, ‘আশাকরি প্রশাসন চা শ্রমিকদের লাশের ওপর দিয়ে কোনও অবস্থাতেই ইকোনমিক জোন স্থাপন করবে না। আমাদের বাপ-দাদার জমির ওপর যদি ইকোনমিক জোন স্থাপন করা হয়; তাহলে চা শ্রমিকরা ঘরে বসে থাকবে না। রাস্তায় নেমে পড়বে। তখন প্রশাসন শ্রমিকদের সামলাতে পারবে না।’

বাংলাদেশ চা-বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও চা বাগান ভূমি রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব নৃপেন পাল জানান, আমাদের আল্টিমেটামের পর ইকোনমিক জোন স্থাপনের কাজ বন্ধ না হলে বাংলাদেশের ২৫৮টি চা-বাগানের শ্রমিকরা একসঙ্গে কাজ বন্ধ করে দিবে। ইতোমধ্যে আমাদের দাবি আদায়ের জন্য বাংলাদেশের সকল চা শ্রমিকরা এক হয়ে আন্দোলন করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাব না।

বাংলাদেশ চা-বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাম ভজন কৈরি জানান, চানপুর ও বেগমগঞ্জ শ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে চা শ্রমিক ইউনিয়ন একমত। যারা বাগানে কাজ করে তাদের মজুরির সঙ্গে সেখানকার জমির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। শ্রমিকদের জমি কেড়ে নিলে তাদের মরা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না।

চান্দপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক শামীম আহমদ বলেন, চা শ্রমিকরা বাগানে কোনও কাজ না করে প্রতিদিনই আন্দোলন করে যাচ্ছে, এতে বাগানের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাশহুদুল কবীর বলেন, ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কয়েকবার চা শ্রমিকদের সঙ্গে সভা হয়েছে। এখন কি কারণে তারা বিরোধিতা করছে বুঝে উঠতে পারছি না। আবারও আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। সমাধান হলেই পিলার স্থাপন করা হবে।

/আরএ/টিএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।