ভোর ০৬:৩৮ ; শনিবার ;  ১৮ নভেম্বর, ২০১৭  

‘একাত্তরে ২৩ জনের গর্ভপাত করিয়েছি’

প্রকাশিত:

উদিসা ইসলাম।।

মুক্তিযুদ্ধের সময় রাহেলার (ছদ্মনাম) বয়স ছিল ২৫। ছিলেন বগুড়ার শেরপুর এলাকায়। জুনের মাঝামাঝিতে তাদের গ্রামে হামলা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ওই সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা বীভৎসতার সীমা কতটা ছাড়িয়েছিল তার জ্বলন্ত সাক্ষী তিনি। চোখের সামনে কোলের সন্তানকে পা ফেড়ে দুভাগ করে দিয়েছিল রাজাকাররা। বিস্ফারিত চোখে যে বর্বরতা দেখেছেন তা বলতেও শিউরে ওঠেন। বিশ বছর ধরে রাহেলার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন এই প্রতিবেদক। অবশেষে তার সাক্ষাৎকার প্রকাশের অনুমতি মিলল। ৭০ বছর বয়সী রাহেলা এখন থাকেন চাপাইনবাবগঞ্জে- ভিন্ন পরিচয়ে, অন্যের আশ্রয়ে।

‘যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে একজন মরে গেছে হাতের ওপর। সবার শরীরে ছিল উকুনের বাসা। ওই ২৩ নির্যাতিত নারীর কে কোথায় আছে জানি না কিন্তু আমার জীবন একাত্তুরেই শেষ।’


যুদ্ধের শুরুতে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন কীভাবে?

আমার স্বামী যুদ্ধে যান এপ্রিলের শুরুতে। সাত মাসের সন্তান নিয়ে আমি বাসায় একা। আশপাশের বাসাবাড়ি খালি হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি যাইনি। যদি উনি ফেরেন, যদি কোনও কাজে লাগে। আবার এও ভাবছিলাম, কোথায় যাব? হারায়ে যাব কিনা। আমরা কিছু মানুষ তখন গ্রামে। রোজই ভয়ে থাকি। এলাকার বদ লোকেরা নানা কুকথা ছড়ায়, ভয় ছড়ায়, যুদ্ধের ভয় দেখায়। একদিন রাতে গ্রাম পুড়িয়ে দিলো। বাড়ির পেছনের ডোবায় ছেলেকে নিয়ে শুয়ে আছি, সামনে পুড়ে যাচ্ছে আমার বাড়ি। সে কী চিৎকার, সে কী বিভৎসতা, পোড়া গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে। দম আটকে আসে আজও।


তারপর?

স্বামীতো আগেই গেছে। একদিন অন্ধকারে পুকুরের ঢালে শুয়ে দেখছি চারপাশ। পিঁপড়ার কামড়ে চিৎকার দিলো কোলের ছেলে। অন্ধকারে চিনি নাই। কারা জানি এসে ছোঁ মেরে ছেলেকে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল। ছেলে ততক্ষণে শেষ। আমি টের পাই। হাছাড়ি পাছাড়ি করে উঠে যখন ওদিকে দৌড়াই। আমাকে ধরে একজন। আরেকজন মুখ বেঁধে ফেলে। চোখ দিয়ে জল ঝরছিল। মুখে তখন শব্দ নাই। আমার কোলের মানিককে দুই পা ধরে ছিড়ে ফেলে দেয় ওরা। আল্লাহ আমারে শক্তি দিয়েছিল বলে আজও বেঁচে আছি।


আপনাকে ধরে নিয়ে গেল?

আমাকে আগে পোড়াবাড়ির উঠানেই ওরা ভোগ করলো। তারপর ফেলে রেখে গেল। ভোররাতের দিকে আমি আমার ছেলেকে মাটিচাপা দিয়ে ওই এলাকা ছেড়ে পরের দিন রাতে রওনা দেই। বাঁশঝাড়, নদী, জঙ্গল পার হয়ে কোথায় কোনদিকে যাচ্ছিলাম জানি না। খালি চলতে থাকলাম। কেউ খেতে দিলে খাই। ঘুম আসলে রাতের বেলা কোনও জায়গায় ঘুমায়। এরপর এক লোক আমারে রাস্তায় দেখে জানতে চাইলো আমার সঙ্গে কেউ আছে কিনা। কেউ নেই জানাতে সে বলল, আমি রান্নার কাজ করে দিব কিনা। তারপর আমাকে ক্যাম্পে নিয়ে গেল রান্নার কাজ দেখিয়ে দিলো। আমি তখনও জানি না সেটা পাকিস্তানিদের ক্যাম্প।

যখন জানলেন তখন কী করলেন?

আমি তখন আধপাগল। তবে এক রাতে একটা রাজাকারকে বাগে পেয়ে তাকে কুপিয়ে সেখান থেকে পালাই। পালালাম ঠিকই। কিন্তু ক্যাম্প এলাকা ছাড়ি নাই। জঙ্গলে থাকতাম আর ওই ক্যাম্পের দিকে খেয়াল রাখতাম। মেয়েদের ধরে আনতো। তাদের চিৎকার শোনা যেত। মেয়েদের মেরে ছোট ট্রাকে ফেলে দিতো। অনেককে আবার না মেরে কোথায় জানি রেখে আসতো। এখন বুঝি কেন ধর্ষণ করে মেয়েদের মারতো না। তারা এদেশের মেয়েদের গর্ভে বীজ বপণের আশায় ছিল।

আমি ঠিক করলাম এই মেয়েদের কোথায় রাখা হয় দেখব। শেষে একদিন যখন ৫টা মেয়েকে ক্যাম্প থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে আমি পিছু নেই। শরীরে শক্তি নাই, ঠিকমতো খাওয়া নাই কতদিন, দৌড়ে পারি না। কিন্তু কপাল ভাল, ওখান থেকে এক কিলোমিটার দূরেই একটা জায়গায় গাড়ি থামলো। বড় লাইট দিয়ে চারপাশে আলো ফেলা হচ্ছে। আমি লুকিয়ে আছি। ওরা একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে মেয়েগুলোকে ফেলে চলে গেল।

 

ওটা কোন এলাকা?

যখন ক্যাম্পে কাজ করি তখন এক সুইপার আমাকে বলেছিল এটা সিরাজগঞ্জ। ওরা চলে যাওয়ার পর আমি সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সুড়ঙ্গের মুখে পাহারা। তখন মাস-বছর কিছুই মাথায় নেই। কারও সঙ্গে কথা বলতেও ভয় লাগে। সে রাতেই পাহারায় থাকা দুজন খাওয়ার জন্য একটু দূরে বসলে আমি সুড়ঙ্গে প্রবেশ করি।

দেখি তাদের গোসল খাওয়ার ঠিক নাই। শরীরের কামড়ের ক্ষত। কারও শুধু মাথায় না, শরীরেও উকুন। খেয়াল করলাম এদের মধ্যে কয়েকজন পোয়াতি, পাঁচ মাসের পেটও আছে। কতদিন এভাবে থাকতে হবে সেটা তারা জানে না, আমিও জানি না। এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নিই- যখন কোনও মেয়ে নিয়ে ওরা আসবে তখন শোরগোল লাগিয়ে দেওয়া হবে। এই ফাঁকে আমি আর একজন বের হওয়ার চেষ্টা করবো। তারপর আমরা খাবার যোগাড় করে নিয়ে আসব।

দিন গুনছি কখন আসবে কেউ। কখন বের হব। একসময় দেখি বেশ কয়েকদিন হয় কেউ আসে না। যে রুটি দিয়ে যেত সেও আসে না। আমরা কয়েকজন সুড়ঙ্গমুখে গিয়ে দেখি কেউ নেই। বের হয়ে একটু আগাই, কেউ নাই। এক দুজনের সাথে দেখা হলে বুঝি মানুষের চোখে ভয় নাই। তারপর আমরা একে একে বের হয়ে এসে ঝোপের আড়ালে থাকি। একে একে গোসল করি সবাই। ঘাটে কথা বলে বুঝলাম আমাদের কথা ওরা জানতো না। কিন্তু আমাদের দেখে বুঝেছে আমরা নির্যাতিত হয়েছি। সেখানেই শুনলাম দুই দিন হয় স্বাধীন হয়েছে দেশ। বিশ্বাস করেন, আমরা সবাই বুঝে গেলাম বাড়ির দিকে যাওয়া যাবে না। এখানে যারা ছিল তাদের বেশিরভাগের বাড়ি ছিল সিরাজগঞ্জ, ঈশ্বরদী।


গর্ভবতীদের কী হলো?

আমি আর আরেক বৌদি ছিলেন, নামটা এখন মনে নেই; দুজনে মিলে ২৩ জনের গর্ভপাত করেছি। লম্বা কাঠি ঢুকিয়ে জরায়ুমুখটা খুলে দিলেই বের হয়ে আসে। তীব্র ব্যাথা হয়। সবাই সন্তান জন্মানোর ব্যথাই পেয়েছে। তারপর ওই বৌদি বললেন, এলাকায় এলাকায় ঘুরে এ কাজ আমি তার সঙ্গে করব কিনা। আমি রাজি হইনি। কারণ আর পারছিলাম না। এ জেলা, সে জেলা, এ বাড়ির আশ্রয় সেবাড়ির কাজের মেয়ে এসব করতে করতে চলে এলাম এই এলাকায়।

পাকিস্তানি আর্মিদের ধর্ষণের শিকার ২৩ জনকে মুক্ত করেছি এই শান্তি নিয়েই বেঁচে আছি। আর আমাকে ধর্ষণ করেছিল যে রাজাকার, তাকে সারাজীবন অভিশাপ দিয়ে আসছি- আমার কোল থেকে সন্তান কেড়ে নিয়েছে যে, তারে জানি আল্লাহ ইহকালেই শাস্তি দেয়।

 

/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।