রাত ০৯:১১ ; মঙ্গলবার ;  ১৬ জুলাই, ২০১৯  

বাংলাদেশি ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন, ভারতীয় অধ্যাপক বরখাস্ত

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

রঞ্জন বসু, দিল্লি।।

ভারতের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় দিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি বা জেএনইউ-তে এক বাংলাদেশি ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন করে বরখাস্ত হলেন ওই প্রতিষ্ঠানের এক অধ্যাপক। বাংলা ট্রিবিউন জানতে পেরেছে, বরখাস্ত হওয়া অধ্যাপকের নাম আরশাদ আলম, তিনি জেএনইউ-তে ডিপার্টমেন্ট অব সোশ্যাল স্টাডিজে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরের পদে ছিলেন।

জেএনইউ শুধু ভারতের হাতেগোনা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরই একটি নয়, অনেকেই মনে করেন এটি ভারতে জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রতি বছরই বিদেশ থেকে বহু ছাত্রছাত্রী ও গবেষক এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। এখানে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশেরও বহু ছাত্রছাত্রীর স্বপ্ন। কিন্তু অধ্যাপকের হাতে নির্যাতিত ওই বাংলাদেশি ছাত্রীর জেএনইউ-তে এসে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা একেবারে দুঃস্বপ্নের মতো।

বাংলাদেশি ওই ছাত্রীর নাম-পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সঙ্গত কারণেই প্রকাশ করেনি। তবে তার অভিযোগ নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে কয়েক মাস ধরে। বাংলা ট্রিবিউন জানতে পেরেছে, ওই তরুণী অধ্যাপক আরশাদ আলমের অধীনে রিসার্চ স্কলার হিসেবে গবেষণা করছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিদ্যা বিভাগেই। কিন্তু অধ্যাপক তাকে নিজের বাড়িতে অন্য ছুতোয় ডেকে পাঠিয়ে যৌন নির্যাতন করেছেন বলেই অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশি ওই রিসার্চ স্কলারের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পরই তার তদন্তের ভার দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জেন্ডার সেন্সিটাইজেশন কমিটি অ্যাগেইনস্ট সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট’-কে। ওই কমিটি তাদের তদন্ত শেষ করে গত আগস্ট মাসে অধ্যাপক আলমকে দোষী বলে রায় দেয়। কিন্তু সেই রিপোর্টের পরও অধ্যাপক আলমের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিতে চার মাসেরও বেশি সময় গড়িয়ে যায়।

অবশেষে গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় জেএনইউ-র সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক সংস্থা এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল বা ইসি-র বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় ওঠে। কমিটির রিপোর্টে যেভাবে অধ্যাপক আরশাদ আলমকে সরাসরি দোষী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে তাতে তাকে বাঁচানোর খুব একটা সুযোগ ছিলও না। ফলে ইসি তাকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেনি।

বরখাস্ত করার কারণ হিসেবে তারা ‘সেক্সুয়াল অ্যাবিউস’ বা যৌন নির্যাতনের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কমিটির এক সদস্য বাংলা ট্রিবিউনের কাছে স্বীকার করেছেন আরশাদ আলমের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগটি ছিল ধর্ষণের। পরে অভিযোগকারী বাংলাদেশি ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলেই সম্ভবত জেএনইউ কর্তৃপক্ষ ধর্ষণের বদলে যৌন নির্যাতন কথাটি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন।

বরখাস্ত হওয়া অধ্যাপক আলম জেএনইউ-র ঝকঝকে ও মেধাবী শিক্ষকদের একজন বলেই পরিচিত ছিলেন। তিনি নিজেও জেএনইউ-র সাবেক ছাত্র। এই প্রতিষ্ঠানের আগে তিনি দিল্লির আরেকটি প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া’তে পড়িয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল ফোর্ড ফেলো হিসেবে তিনি জার্মানির এরফার্ট ইউনিভার্সিটিতেও ছিলেন।

কিন্তু জেএনইউ কর্তৃপক্ষের চরম পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া কোনও রাস্তা ছিল না। কারণ ইদানীং বিভিন্ন যৌন নির্যাতনের ঘটনার জেরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংঘাতিক বদনাম হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি সরকারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও জেএনইউ-এর দিকেই আঙুল তুলেছে।

গত সপ্তাহেই ভারতের শিক্ষামন্ত্রী স্মৃতি ইরানি দেশের পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, দেশের যে ১০৪টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত অভিযোগের তথ্য তাদের কাছে আছে তাতে দেখা যাচ্ছে জেএনইউ-তেই সবচেয়ে বেশি অভিযোগ জমা পড়ছে। ২০১৩-১৪ সালে জেএনইউ-তে এমন অভিযোগ জমা পড়েছে ২৫টি, যা ভারতে সর্বোচ্চ।

দিল্লি মহিলা কমিশনের চেয়ারপারসন স্বাতী মালিওয়ালও বলেছেন, দিল্লির ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় বা আইআইটি থেকে গত এক বছরে মোট ১০১টি যৌন নির্যাতনের অভিযোগ জমা পড়েছে, আর তার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই জেএনইউ থেকে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, দক্ষিণ দিল্লিতে আরাবল্লির পাহাড়ের ভাঁজে সবুজে ঘেরা বিস্তীর্ণ জেএনইউ ক্যাম্পাসে বহুদিন ধরেই সব কিছু ঠিকঠাক চলছে না।

আর যেহেতু এবারের ঘটনায় নির্যাতিত একজন বিদেশি নাগরিক, তাই দায় ছিল দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার। তবে গত রাতে ইসি’র সিদ্ধান্ত ঘোষিত হওয়ার পর ওই বাংলাদেশি রিসার্চ স্কলার এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া জানাননি।

অধ্যাপক আরশাদ আলমের মোবাইল ফোনও একটানা বেজে গেছে, তিনি ফোন ধরেননি বা টেক্সটেরও জবাব দেননি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় তাকে বরখাস্ত করলেও এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত তার ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইট থেকে তার প্রোফাইল সরানো হয়নি।

 

/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।