রাত ০২:১৯ ; সোমবার ;  ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৬  

রংয়ের আলোয় দিনপার

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সানি করিম।।

ভাইয়া, আমি গাড়িতে উঠবো, গাড়ি চালাবো- ৯ বছরের সাজ্জাদের চোখে খুশির ঝিলিক সকালের মিষ্টি রোদকে আরো ঝলমলে করে তুললো। ওদিকে জান্নাত, পাখি, স্মৃতি, মিম, শান্ত, জয়, মারিয়া, রহিম- এক ঝাঁক কচিকন্ঠের কলরব শোনা যাচ্ছে দোলনার ওপাশ থেকে, দোলনায় উঠতে ওদের আর তর সইছে না। খাদিজা, জুঁই, কল্পনা বিশাল ড্রাগনের মূর্তিটার দিকে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, তাদের প্রশ্ন- এটা কি কামড়াবে? ১২ ডিসেম্বর এরকমই কিছু আনন্দঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়েছিলো শ্যামলী শিশুমেলায়। তেজগাঁও শিল্প এলাকার একঝাঁক শিশুদের নিয়ে লাইট অফ হোপ আয়োজন করেছিল আনন্দ ভ্রমণের। তাদের সহযোগী ছিল বিশ্বখ্যাত রং বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান জতুন বাংলাদেশ।

শিশুদের কাছে সেদিনের সকালটা এসেছে একদমই অন্যরকম খুশির আমেজ নিয়ে। ঘুম ভেঙ্গেই তারা দেখলো তাদের নিয়ে শিশুমেলায় যাবার জন্য বাস এসে হাজির। নতুন পাওয়া জামা পরে হৈ হৈ রৈ রৈ করতে করতে বাসে উঠে বসলো। যাত্রাপথে তাদের গান আর উচ্ছ্বাসে পুরো বাস সরব হয়ে রইল। তাদের সাথে আনন্দে যোগ দিল লাইট অফ হোপ এবং জতুনের কর্মীরাও।

প্রাণচঞ্চল এইসব কচিকাঁচার কলরবে সেদিন মুখর হয়ে উঠে শিশুমেলা। সুশৃঙ্খলভাবে তাদের বিভিন্ন রাইডে চড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়।  প্রথমবারের মতো শিশুপার্কে বেড়াতে এসে প্রতিটি শিশুই ছিল আনন্দে উচ্ছল। খেলনা উপহার পাওয়াতে তাদের আনন্দ বেড়ে গেল আরও অনেকগুণে। এর আগে তেজগাঁও ওভারব্রিজের নিচে লাইট অফ হোপ পরিচালিত স্কুল দেয়ালকোঠায় এই শিশুদের অংশগ্রহণে আয়োজিত হয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার।

জতুন বাংলাদেশের প্রতিনিধি নওরিন হক বলেন, তার প্রতিষ্ঠান সমাজের শিশুদের জন্য উন্নয়নমূলক যেকোনও কাজে সহায়তা করতে আগ্রহী।

লাইট অফ হোপের প্রধান নির্বাহী ওয়ালিউল্লাহ ভূঁইয়ার মতে স্বেচ্ছাসেবী এই সংস্থাটি শিশুদের কাছে শিক্ষাকে আরও আকর্ষণীয় ও আনন্দময় করে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। যেহেতু এসব শিশুরা সমাজের পশ্চাৎপদ একটি জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, তাদের জন্য এরকম একটি আয়োজন নিঃসন্দেহে আনন্দের।এ লক্ষ্যে তারা চালাচ্ছেন আরো একটি কার্যক্রম, যেটি এরই মধ্যে পরিচিতি পেয়েছে ‘পড়ুয়া’ নামে।

শিশুদের পড়াশোনা নয়, পাশাপাশি মানসিক উন্নতির কথা বিবেচনা করেই লাইট অব হোপের মূল লক্ষ্য। তাদের ব্যাখ্যা- সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হওয়ার পর তো স্কুলে একটি লাইব্রেরি থাকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা শিশুদের সৃজনশীল হতে বলছি কিন্তু তাদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধির জন্য সঠিক উপকরণ কিন্তু আমরা স্কুলে দিচ্ছি না। আমি অনেক স্কুলে দেখেছি বাচ্চারা ক্লাস ৪-৫ এ উঠে গেছে কিন্তু এখনও সঠিকভাবে বাংলা পড়তে পারে না। গল্পের বই পড়তে পড়তে যদি একটি বাচ্চার রিডিং স্কিল বাড়ে এবং নিজের মতো করে লেখার ক্ষমতা বাড়ে তাহলে শিক্ষক বা অভিভাবক হিসাবে আর গল্পের বইকে না বলার কোন যৌক্তিকতা নেই?  

লাইট অব হোপ:

উদ্যমী কিছু তরুণের হাত ধরে স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করে ‘লাইট অব হোপ’। সেই গল্পটাও একটু ভিন্ন।স্বপ্নের পথে প্রথম পদক্ষেপ ছিল ২০১৩ সালে ডেল আয়োজিত এডুকেশন চ্যালেঞ্জে অংশ নেওয়া। সেখানে সারা বিশ্বের শিক্ষার্থীদের পাঠানো ৮১৬টি প্রজেক্টের মাঝে বাংলাদেশের লাইট অব হোপ তৃতীয় স্থান লাভ করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যেটা হয়, পুরস্কার জিতে প্রজেক্টের আর তেমন অগ্রগতি দেখা যায় না। কিন্তু লাইট অব হোপের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। শুধু পুরস্কারের অর্থ জিতে তারা পাঁচজনে থামেননি, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার পটুয়াভাঙ্গা গ্রামের পরশমণি শিক্ষা একাডেমিতে তারা সোলার প্যানেল স্থাপনের মধ্য দিয়ে স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপটি বাস্তবে সম্পন্ন করেন। ১৪ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে হস্তান্তর করা হয় ল্যাপটপ, প্রোজেক্টরসহ ই-শিক্ষার সব উপকরণ।

আধুনিক শিক্ষার সব সুবিধা নিয়ে স্কুলটিতে শিক্ষার্থীরা এখন স্বপ্ন দেখছে নতুন কিছু করার। লাইট অব হোপ শুধু শিক্ষা উপকরণই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয়নি, সেখানকার শিক্ষকদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করেছে। তা ছাড়া অভিভাবকদের স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, বাল্যবিবাহ, পরিবেশগত পরিবর্তন বিষয়ে স্কুলের মাধ্যমে সচেতন করে তুলছে। বাংলাদেশ সরকার প্রবর্তিত সব কটি অনলাইন সার্ভিসই এই স্কুলে পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে স্কুলটি হয়ে উঠেছে শিক্ষা ও তথ্য-যোগাযোগের একটি সেতুবন্ধ।এই কর্মযজ্ঞের পাঁচজন কাণ্ডারি হলেন ওয়ালি, মারুফ, শোয়েব, মোমেল ও তৃপ্তি।

/এআই/এফএএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।