সন্ধ্যা ০৬:০৮ ; রবিবার ;  ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬  

বাংলাদেশে ইতিহাসচর্চার বাঁক পরিবর্তন || দেওয়ান মিনহাজ গাজী

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[আমরা ২০১৫ সালে প্রকাশিত বই থেকে দশটি বই বেছে নিতে অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছি তাদের প্রিয় বই নিয়ে লিখতে। এই প্রস্তাবে যারা সাড়া দিয়েছেন তাদের নিয়েই আমাদের এই আয়োজন। আলতাফ পারভেজের লেখা ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী : ইতিহাসের পুনর্পাঠ’ বইটি প্রকাশ করেছে ঐতিহ্য। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। মূল্য নয়শত নব্বই টাকা।–বি. স.]

 

 

এক.
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়টি রাজনৈতিক সাহিত্য পাঠক মহলে এসেছে। এর প্রায় সবগুলো ’৭১ ও পূর্বাপর সময়ের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে লিখিত। বইগুলোর কোনোটা গবেষণাধর্মী, কোনোটা স্মৃতিচারণধর্মী, কোনোটা আত্মকথামূলক। বইগুলো পাঠক মহলে সমাদৃত হয়েছে, আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে, নিন্দিতও হয়েছে কমবেশি।
লেখক-গবেষক আলতাফ পারভেজের সমকালীন গবেষণাগ্রন্থ ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী : ইতিহাসের পুনর্পাঠ’ এরকমই এক অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত রাজনৈতিক সাহিত্য। একটি স্বাধীন দেশের জন্য বাঙালির চিন্তা-জগৎ গড়ে ওঠা, বেড়ে উঠা, তার জন্ম, তার আকাঙ্ক্ষা, তার যাত্রা, তার অনাকাঙ্ক্ষিত থমকে যাওয়া ইত্যাদির চাপা পড়া প্রকৃত ইতিহাস যারা তালাশ করে বেড়ান- তাদের জন্য এই বইটি এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার । 
লেখক বইটি মোট ৬০০ পৃষ্ঠায় গ্রন্থণা করেছেন। প্রথম দিকের ৪১৮ পৃষ্ঠা পর্যন্ত মূল বিষয়বস্তুর উপর লেখক বিভিন্ন তথ্যসূত্রের উপস্থাপনসহ তার মতামত ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন, বাদ বাকী পৃষ্ঠাগুলোয় মূল বিষয়বস্তুর সাথে সংগতিপূর্ণ বিভিন্ন লেখকের কিছু পুরানো লেখা, ঘটনাপঞ্জি, বিবৃতি, রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র, সাক্ষাৎকার ইত্যাদি সংযোজন করেছেন; কেনো করেছেন, তার ব্যাখ্যা লেখক বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রথম অধ্যায়টি, বইটির ভূমিকারই ব্যাখ্যাগত বিস্তৃতরূপ। লেখক এই অংশটিকে পাঠকের মর্জির উপর ছেড়ে দিয়েছেন, যাতে করে পাঠক বইয়ের এই অংশটিকে লেখকের পর্যবেক্ষণের প্রাথমিক স্তর বা ভূমিকার বিন্যাস হিসাবে ধরে নিয়ে দৃষ্টিনিবদ্ধ করতে পারেন বা মনোসংযোগ করতে পারেন। লেখক এই অধ্যায়টির নামকরণ করেছেন ‘অনুসন্ধানের প্রাসঙ্গিকতা, পরিধি, পদ্ধতি, কাঠামো ও সীমাবব্ধতা।’
গোটা বইটিতে লেখক বাংলাদেশের চাপা পড়া রাজনৈতিক ইতিহাসের যেসব স্পর্শকাতর অধ্যায় উত্থাপন করেছেন, অনুসন্ধান করেছেন, তার জন্যে তিনি যদি পাঠকদের বিশেষত নির্মোহ ইতিহাস পিপাসুদের অভিনন্দন ও প্রশংসা পাওয়ার হকদার হন– তবে বইটির ৬ পৃষ্ঠার ভূমিকাটুকুর জন্যে আলাদা করে তিনি একটু সাবাস পেতেই পারেন। কী সব নিঃশঙ্ক উচ্চারণ! ফরমায়েসি ইতিহাসবিদদের প্রতি কী সব সাহসী চ্যালেঞ্জ! অবলীলায় বলছেন, তার লেখা ইতিহাসের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে চায়! 
দেখার বিষয়, প্রথামুখী ওই ইতিহাসবিদ– যারা বছরের পর বছর আমাদের মূলধারার প্রকৃত ইতিহাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা, অবজ্ঞা ও ধামাচাপা দিয়ে আসছিলেন, বিকৃতি ঘটিয়েছিলেন, তারা এখন এই লেখকের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবেন, নাকি না দেখার ভান করে বাণিজ্য তালাশের পুরানো পথেই আকড়ে থাকবেন।
লেখক কোন তাগিদ থেকে ইতিহাসের এই অধ্যায়টকে নাড়াচাড়া করেছেন, আলোতে এনেছেন তার ব্যাখ্যা তিনি তার বইতে শুরুতে পরিষ্কারই বর্ণনা করেছেন। তারই এককালের বিখ্যাত বই ‘অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, কর্নেল তাহের ও জাসদ রাজনীতি’র মাত্র ৬টি পৃষ্ঠার একটি অধ্যায় এতদিন তার জন্য অতৃপ্তি ও অস্বস্তির কারণ হয়েছিল। তারই মুক্তি অন্বেষা বর্তমানের ৬০০ পৃষ্ঠার গ্রন্থ- ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী : ইতিহাসের পুনর্পাঠ’। হ্যাঁ, বিপদজনক এক পুনর্পাঠ!

মুজিব বাহিনীকে নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক ও অস্পষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান বা আচরণগুলো তুলে ধরতে লেখক মোটেও কাপর্ণ্য করেননি। আমি মনে করি কলকাতার ভবানিপুরস্থ ২১ রাজেন্দ্র রোডের বিলাসবহুল সানি ভিলায় অবস্থান করেই তারা চিত্তরঞ্জন সুতারের হাতে নিজেদের সঁপে দেন এবং ‘র’-এর পাতা ফাঁদে অনিচ্ছাকৃতভাবে জড়িয়ে পরেন– বিতর্কের সূত্রপাত সেখান থেকেই

দুই. 
পাকিস্তানী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে যারা প্রথম একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের ধারণা পোষণসহ ওই রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে ভাবতেন, গোপন চিন্তার বিনিময় করতেন, উদ্বুদ্ধ করতেন নবীনদের, সংগঠিত করতেন, এবং অনিবার্য যুদ্ধটিকে রাজনৈতিকভাবে আলিঙ্গন করেছিলেন পরম মমতায় আর শ্রদ্ধায়– বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন তারা অপাংক্তেয়। তাদের আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ লুন্ঠিত হয়েছে অনেক আগে, একেবারে প্রথম প্রহরে! ওই অগ্রসরমান চিন্তার মূলধারক ছিলেন– সিরাজুল আলম খান, চৈতন্য বৈকল্যের এই দেশে ইতিহাসের ফেরিওয়ালাদের কাছে যার নাম যথাযথ অনুসন্ধানের দাবি রাখেনি, এখন আর অনেকের কাছেই তিনি উচ্চারিত নন এবং তিনি নিজেও বিস্ময়করভাবে নীরব। এই লেখক তাকেই অনুসন্ধান করেছেন, তালাশ করেছেন অগণিত সূত্রে, কারণ, তাকে কেন্দ্র করেই মুজিব বাহিনী, পরবর্তীকালে তাকে কেন্দ্র করে গণবাহিনী। সে এক উত্তাল সময় এসেছিল বাংলাদেশে!
লেখক তার গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে সিরাজুল আলম খান গঠিত নিউক্লিয়াস যা পরবর্তীকালে বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী নাম পায়– তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। খুবই বিশদ সেই আলোচনা। 
তৃতীয় অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধকালে মুজিব বাহিনী নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক এবং বাহিনীটিকে নিয়ে ভারতীয় ভূমিকাসহ আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহের দ্বন্দ্ব, স্বার্থ ও ষড়যন্ত্রের আচরণগত বহুবিদ প্রেক্ষিত নিয়ে তার ব্যাপকভিত্তিক অনুসন্ধান তুলে ধরেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এমন সব অগণিত তথ্যসূত্র তিনি পর্যবেক্ষণে এনেছেন যার অনেকগুলো নতুন। 
যুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে, তাদের কর্মপদ্ধতি, কর্মপরিধি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হতেই পারে, বিতর্ক থাকতেই পারে। তারা জেনে বুঝে হোক–না জেনে বুঝে হোক কিছু বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন বা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন বা পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছিলেন– এগুলোই ইতিহাসের অনুসন্ধানের বিষয়। কিন্তু তা না করে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টির বীজ রোপনকারী এই মূল ধারাটি- যারা তাদের সাহসিকতা ও আপোষহীন লড়াইয়ের ব্যাপকতা দিয়ে বাংলাদেশ নামক মহাকাব্যিক শব্দটিকে অনিবার্য পরিণতির দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন– তাদের অবজ্ঞা করা, অবহেলা করা অবমূল্যায়ন করা– প্রচলিত ইতিহাসের ক্ষুদ্রতা এবং নষ্টামীও বটে। এক্ষেত্রে বর্তমান লেখকের নির্মোহতা প্রচলিত ইতিহাসচর্চার গণ্ডিকে অতিক্রম করেছে অসাধারণভাবে।
আমাদের স্বাধীনতা হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো প্রাপ্তি নয়। ১৯৬২ সালে গঠিত ‘নিউক্লিয়াস’ তৎকালীন ছাত্র যুব-সমাজের মধ্যে ক্রমে ক্রমে যে লড়াকু মেজাজ তৈরি করেছিলেন, যে আপোষহীন দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছিলেন তাই স্বাধীনতার চূড়ান্ত সংগ্রামকে অনিবার্য করেছিল। ভুলে গেলে চলবে না– তৎকালীন জাতীয় নেতৃত্বের পুরোধা অংশই আপোষ ও সংগ্রামের দোলায় দুলছিলেন। প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক মেঘনার সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুকে ইয়াহিয়ার সাথে আপোষ করতে বলেছিলো।” কোনো কোনো ইতিহাস গ্রন্থে এটাও পাওয়া যায় যে, ২৫ মার্চ-এর ভয়াল রাতেও আওয়ামী লীগের সবোর্চ্চ স্তর থেকে ২৭ মার্চ হরতাল কর্মসূচির ঘোষণা এসেছিলো। আপোষকামীদের অন্য বিষয়গুলো নাইবা বললাম। মূলত স্বাধীনতার প্রশ্নে সিরাজুল আলম খানের নিউক্লিয়াস যা পরবর্তীকালে বিএলএফ বা মুজিববাহিনী– সেটাই স্বাধীনতার মূল স্রোত হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেদিন– সেখানে আলো ফেলা তাই ইতিহাসবিদদের বড় রকমের দায়।
মুজিব বাহিনীকে নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক ও অস্পষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান বা আচরণগুলো তুলে ধরতে লেখক মোটেও কাপর্ণ্য করেননি। আমি মনে করি কলকাতার ভবানিপুরস্থ ২১ রাজেন্দ্র রোডের বিলাসবহুল সানি ভিলায় অবস্থান করেই তারা চিত্তরঞ্জন সুতারের হাতে নিজেদের সঁপে দেন এবং ‘র’-এর পাতা ফাঁদে অনিচ্ছাকৃতভাবে জড়িয়ে পরেন– বিতর্কের সূত্রপাত সেখান থেকেই। প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাকের ভাষ্যমতে এই চিত্ত সুতারই কলকাতায় শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিনিধি ছিলেন, এই সুতারই ভারত সরকারের যোগসূত্র, এই সুতারের মাধ্যমেই ভারতীয় জেনারেল উবানের আবির্ভাব। 
’৭১-এর পূর্বাপর সময়ে এই চিত্তরঞ্জন সুতারের ভুমিকা খুবই রহস্যঘেরা। লেখক-গবেষক মঈদুল হাসানের মতে, তাজউদ্দিনের মন্ত্রিসভা গঠন ও বেতার ভাষণ রদের ব্যাপারে সুতার খুব তৎপর ছিলেন। লেখক রইসউদ্দিন আরিফের তথ্য অনুযায়ী, এই সুতার ৭৫-এর ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে হঠাৎ বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। এই সুতারকেই আবার ৯০ দশকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কিছু জেলার সমন্বয়ে একটি হিন্দুরাষ্ট্র গঠন বা স্বাধীন বঙ্গভূমির দাবি উত্থাপন করতে দেখা যায়। যদিও একাত্তর সালের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকরা এবং জেনারেল উবানও তার বিখ্যাত বইতে চিত্তরঞ্জন সুতার সম্বন্ধে বিস্ময়করভাবে নীরব। মুক্তিযুদ্ধের ভবিষ্যত অনুসন্ধানকর্মে চিত্তরঞ্জন সুতার নামটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। বর্তমান লেখকও তার গ্রন্থে সুতারের জন্ম-মৃত্যু-কর্ম-নিবাস নিয়ে মৃদু আলোকপাত করেছেন। মুজিব বাহিনী বিষয়ক আলোচনা তাঁকে ছাড়া সম্ভব নয়। 
এইরূপ আলোচনা থেকে মোটা দাগে যে প্রশ্নটি মুজিব বাহিনীকে কেন্দ্র করে জোরালোভাবে উঠে আসে তা হলো, বাহিনীটি সম্মুখ যুদ্ধে কেনো গেলো না এবং কিছু পরিমাণে দেশের ভেতরে ঢুকলেও তাদের কোনো যুদ্ধের ইতিহাস নেই কেনো? সশস্ত্র প্রশিক্ষিত, আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত এবং শিক্ষিত তরুণ যুবকের সম্মিলন হয়েও তারা কেনো সংঘবদ্ধভাবে সম্মুখ সমরে নামলো না। এটি এক বিরাট প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আলতাফ পারভেজের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা ছিল, হতাশাও আছে, ভবিষ্যত অনুসন্ধান জারির অঙ্গিকারও আছে। 
এটা অনেকটা পরিষ্কার, ইতিহাসের কিছু জট খুলবে না। কারণ সময়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছেন। যারা এখনো বেঁচে আছেন নিজেকে বিকিয়ে না দিয়ে, আত্মমর্যাদা নিয়ে, তারা অবশেষে নীরবতা ভাঙবেন, মুখ খুলবেন– এমন আশাও সহজ নয়; কারণ ইতিহাসের দায় যে অনেক ভারী।
লেখক তার বইয়ের চতুর্থ অধ্যায় থেকে সপ্তম অধ্যায় পর্যন্ত সদ্য স্বাধীন দেশে মুজিব বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিভাজক রেখাগুলোর উপর আলোকপাত করেছেন। এ পর্যায়ের বিভিন্নরূপ বিশ্লেষণে লেখকের অনুসন্ধান কর্মের গভীরতা অনুধাবন করা যায়। সংশ্লিষ্ট কোনো সূত্রকে তিনি খাটো করেননি, অবহেলা করেননি– তা নিকটবর্তী হোক বা দূরবর্তী– যাচাই করেছেন নিষ্ঠার সাথে। 

তবে এটা বোধহয় সত্য, জাসদ গঠন প্রক্রিয়াকালে একঝাঁক নৈরাজ্যবাদী দলটির কাঁধে ভর করে এবং একপর্যায়ে তারা দলটিকে তাদের কাঙ্খিত পথে নিয়ে যায়। তারা কেবল দলটিকে ধ্বংস করে, প্রশ্নবিদ্ধ করেই কাজ শেষ করেনি বাংলাদেশের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির সমস্ত সম্ভাবনাকে আতুড়ঘরে হত্যা করে

তিন.
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ তত্ত্বাবধানে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত মুজিব বাহিনীর প্রকৃত সংখ্যা কত, এটা এক জটিল প্রশ্ন। বোধকরি এর কোনো উত্তর আর নেই। ৮-১০ হাজার, ১০-১২ হাজার, মতান্তরে সর্বোচ্চ ২০ হাজার। অদ্ভুত ঘটনা হলো, এই বাহিনীটি যখন স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি অস্ত্রসমর্পণ করে তখন বাহিনীটির অফিসিয়াল সংখ্যা দাঁড়ায় ৭০ হাজার! যাদের প্রায় সবার মুক্তিযোদ্ধা সনদপ্রাপ্তির সৌভাগ্য হয় এবং সনদে সাক্ষর প্রদান করেন শেখ ফজলুল হক মণি এবং স্বরাষ্ট্র সচিব তসলিম আহমদ। বিস্ময়কর হলো এই আমলা তসলিম আহমদ যুদ্ধের নয়টি মাস ঢাকায় অবস্থান করে পাকবাহিনীর বিশ্বস্ততা অর্জনে সফল ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের এই উদার সনদ বিতরণ দেশটাকে আজো খোঁচাচ্ছে।
এখানে একটি ছোট প্রশ্ন উঁকি মারবেই। যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি থাকা অবস্থায়, সম্মুখ সমরের সেক্টর কমান্ডাররা থাকা অবস্থায়, শেখ মণিকে কেনো মুজিব বাহিনীর পক্ষে আলাদা করে সনদ প্রদান করতে হবে? তারা একটি ভিন্ন বাহিনী– এই কথা প্রকৃতই যুক্তিগ্রাহ্য নয় কারণ আরো অনেক বাহিনী যুদ্ধের ময়দানে ক্রিয়াশীল ছিলো, তাদের এমনটা করতে হয়নি– অনেকে সনদ নেওয়া বা প্রাপ্তির প্রয়োজন অনুভব করেননি, করেন না আজো। এই লেখক, তার বইয়ের প্রথমাংশে এ সংক্রান্ত তাবৎ বিষয়ের ময়নাতদন্ত করেছেন দক্ষতার সাথে। তবুও অনুসন্ধান জারি থাকুক।
মুজিব বাহিনীর অভ্যন্তরের যুদ্ধকালীন মতবিরোধ কেমন তীব্রতর আকার ধারণ করেছিল, লেখক বইটিতে তার আদ্যপান্ত তুলে ধরেছেন। আদর্শিক মতবিরোধের মাঝে– প্রধান দুই নেতার ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বও একাকার হয়েছিল, ফলে ভাঙনটি অনিবার্য ছিল। মুজিব বাহিনীর মূল ও মেধাবী আদর্শিক অংশটিকে সিরাজুল আলম খান তার প্রজ্ঞাময় নেতৃত্ব দিয়ে নিরংকুশভাবে ধরে রাখতে পারলেও অপর অংশের নেতা শেখ মণির ক্ষমতার মূল ভিত্তি ছিলেন– মামা, এটা যুদ্ধকালীন সময়েও, যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশেও। এই অংশটিতেও মতবিরোধটাও লক্ষণীয়। স্বাধীনতার পর এই এভাবেই মুজিব বাহিনীর নেতাদের দ্বন্দ্ব-বিরোধ সরকার প্রধানের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
যুদ্ধ কেবল মানচিত্র বদলায় না, জনগোষ্ঠীর মাঝে নতুন চিন্তা-চেতনা, স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষারও জন্ম দেয়। যে দেশ এগুলো ধারণ করতে পারে– সে দেশ অগ্রগতির পথে হোঁচট খায় না। যুদ্ধ আমাদের মানচিত্র বদলে দিয়েছিল ঠিক, কিন্তু স্বপ্নের দ্বার খুলতে পারেনি। পুরানো ধাঁচের বিধি ব্যবস্থাপনাকে নতুন দেশে পুনরায় আঁকড়ে ধরায়, সমাজে দ্বন্দ্ব বেড়েছে, অনৈক্য বেড়েছে, সংঘাত বেড়েছে, লুণ্ঠন বেড়েছে, নৈরাজ্য বেড়েছে সেই সাথে দ্রুতলয়ে বেড়ে উঠছিল মানুষের হতাশা। এখানেই বোধকরি লেখক খোঁজ করেছেন জাসদ ও গণবাহিনী সৃষ্টির পটভূমি। 
লেখক রাজনীতিক সাঈদ তারেকের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ পূর্ববর্তীকালে ‘মুজিবের কানের কাছে স্বাধীনতা নিয়ে সর্বক্ষণ ঘ্যানর ঘ্যানর করতে থাকা’ সিরাজুল আলম খানের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পর্কটি ছিল পারস্পরিক ভালোবাসা বিশ্বাস ও নিভর্রতার। এই সম্পকটি স্বাধীন দেশে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, শুধু সিরাজ নন তাজউদ্দিনও মুজিবের কাছে সময়ের ভিকটিমে পরিণত হন। এই দুই বিশ্বস্ত রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে মুজিবের দূরত্ব তৈরির ভূমিকাটি পালন করে যাচ্ছিলেন মুজিব বাহিনীর অপর নেতা শেখ ফজলুল মণি এবং এক্ষেত্রে তিনি সফল। মণি ক্ষমতার কেন্দ্রে কারো অংশিদারীত্ব চাননি। সদ্য স্বাধীন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে যেখানে প্রয়োজন ছিল ঐক্য এবং নিবিড় ঐক্যের। 
অনেক একচোখা ইতিহাসবিদরা বাংলাদেশের তৎকালীন অস্থির সময়ের যাবতীয় দায়ভার সিরাজুল আলম খান, জাসদ ও অপরাপর প্রতিবাদী শক্তিসমূহের উপর চাপিয়ে দিয়ে তৃপ্তিবোধ করে থাকেন। তারা দেশটির জন্ম প্রক্রিয়ার গভীরে ঢুকতেই নারাজ। 
তবে এটা বোধহয় সত্য, জাসদ গঠন প্রক্রিয়াকালে একঝাঁক নৈরাজ্যবাদী দলটির কাঁধে ভর করে এবং একপর্যায়ে তারা দলটিকে তাদের কাঙ্খিত পথে নিয়ে যায়। তারা কেবল দলটিকে ধ্বংস করে, প্রশ্নবিদ্ধ করেই কাজ শেষ করেনি বাংলাদেশের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির সমস্ত সম্ভাবনাকে আতুড়ঘরে হত্যা করে। ওরা এখন বিলিয়মান দলটির কোনো অংশের সাথে সম্পৃক্ত হয়েও, না হয়েও, বিভিন্নভাবেই শোভাবর্ধন করে যাচ্ছেন। আর দলটির স্রষ্টারা, অগণিত আন্তরিক কর্মী যাবতীয় পাপ-তাপ ধারণ করে রক্তক্ষরিত। এটা ইতিহাসের নিষ্ঠুরতাও বটে।

সিরাজুল আলম খানের অনুসারীরা কেবল ‘মুজিব বাহিনী’তেই ছিলেন না বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রণাঙ্গনেও ছিলেন। এই অগণিত দেশপ্রেমিক যোদ্ধারা নতুন দেশ গড়ে তোলার ব্যাপারে কোনো অবদানই রাখতে পারছিলেন না

চার.
মুজিব বাহিনীর ক্ষমতাকেন্দ্রীক ধারাটির মূল চালক– শেখ ফজলুল হক মণি বলেছিলেন, ‘মুজিবের শাসন চাই– আইনের শাসন নয়’(বাংলার বাণী, ২৬ সেপ্টেম্বর ৭২)। রাষ্ট্রীয় সংস্কারমূলক বিভিন্ন কর্মসূচী উত্থাপন করতে থাকা মণির প্রতিপক্ষ অংশ তখনও সংগঠিত আকারে মাঠে নেই, অপরাপর বিদ্রোহী শক্তিসমূহ তখনও সক্রিয় নয়। প্রখ্যাত সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ লিখেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের পর যাদের কাছে এদেশটা ব্যক্তিগত সম্পত্তিরূপে প্রতিয়মান হয়ে উঠে, তারা অবাধ লুণ্ঠন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা যেন ন্যায়সঙ্গত করেই তুলেছিল; নিরাপত্তাহীন মানুষের জীবনটা অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে সস্তা হয়ে দাঁড়ায়। বাহাত্তরের গোড়ার দিক থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র সন্ধ্যার সাথে সাথে যেন গভীর রাত্রি নেমে আসতো।’ 
প্রকৃত অর্থেই মানুষ, এ জাতীয় ‘মুক্তিলাভ’ থেকে মুক্তি লাভ করতে চেয়েছিল। শেখ মণির ওই রকম অপরিণামদর্শী তত্ত্ব উত্থাপন সদ্য জন্ম নেয়া দেশে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আইনহীনতার কিরূপ নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল– তা নিবিড় অনুসন্ধানের বিষয়। তবে এটা নিশ্চিত, অনুসন্ধানের গভীরতায় শেখ মণি প্রসঙ্গ শুধু ওখানেই থেমে থাকবে না। বর্তমান গ্রন্থে তার প্রবল আঁচ পাওয়া যায়।
সিরাজুল আলম খানের অনুসারীরা কেবল ‘মুজিব বাহিনী’তেই ছিলেন না বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রণাঙ্গনেও ছিলেন। এই অগণিত দেশপ্রেমিক যোদ্ধারা নতুন দেশ গড়ে তোলার ব্যাপারে কোনো অবদানই রাখতে পারছিলেন না। অথচ এদের প্রায় সবাই ছিলেন মেধা-প্রজ্ঞায় অনন্য এবং রাজনৈতিক ধ্যান ধারণায় পুষ্ট। ফলে এদের মধ্যে ক্রমে ক্ষোভ দানা বাঁধ ছিল। তবুও সিরাজুল আলম খানরা দেশ পুনর্গঠনের জন্য নেতা মুজিবের কাছে চাপ রাখছিলেন, নতুন নতুন কর্মসূচি উত্থাপন করছিলেন। কিন্তু সবকিছু বিফলে যায় প্রত্যাখ্যাত হয়। 
অনেক আন্দোলন সংগ্রামের ও সিদ্ধান্তের সাক্ষ্য বহনকারী ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সংগঠনটির মূল ধারাটিকে সিরাজুল আলম ধরে রেখেছিলেন নিপুনতার সাথে। ছাত্রলীগের মধ্যে বিভাজকরেখা স্পষ্টতই ছিল। সেই বিভাজনকে ভাঙনে রূপ দিলেন মুজিব নিজেই। একই দিনে ডাকা উভয় অংশের সম্মেলনে প্রধান অতিথি মুজিব নিজে। অভিভাবক মুজিব, জাতির প্রাণপুরুষ মুজিব– ক্ষমতাকেন্দ্রীক অংশটিকে আলিঙ্গন করলেন আর অন্য অংশটিকে অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন। কিন্তু কেন? কোনো অংশের ডাকে না গিয়ে যদি তিনি প্রকৃতই অভিভাবকত্ব করতেন– পরবর্তী ইতিহাস ভিন্ন ধাঁচের হতো, এটা নিশ্চিত। 
নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির অঙ্গিকারসহ নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ, মুজিব বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের আনুষ্ঠানিক বিভক্তি, রক্ষী বাহিনী গঠন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের লাগামহীনতা, রাষ্ট্রীয় অনাচার, অব্যবস্থাপনা, বিরোধীমত দমন, অস্ত্রবাজী, চোরাচালান, ভারতীয় আগ্রাসন ও লুণ্ঠন ইত্যাদির সর্বনাশা প্রেক্ষিত সামনে নিয়ে ছাত্র যুব সমাজের শক্তিকে পুঁজি করে জাসদের যাত্রা এবং ক্ষেত্র বিশেষে তড়িত প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন, দলটির নিয়মতান্ত্রিক যাত্রাপথকে ক্রমে অস্থির করে তোলে। তারাও প্রতিপক্ষ মোকাবেলায় নৈরাজ্যবাদী পদ্ধতিকে আলিঙ্গন করতে থাকে। ঘোষিত রাজনীতির ভুল বিশ্লেষণ দলটির গোপন রাজনীতির অনুশীলনকে প্রশস্ত করে– এখানেই গণবাহিনী গড়ে ওঠার শিকড় নিহিত। ক্ষমতার রাজনীতির বিভিন্নমুখী অসহিঞ্চু আচরণ সদ্য জন্ম নেয়া দলটিকে ঠেলে ধাক্কিয়ে ঐ পথে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। লেখক বিভিন্ন তথ্যসূত্রের বিশ্লেষণসহ ঐ সময়ের বিধ্বংসী রাজনীতিটাকে বা রাজনীতি নামক আত্মঘাতী সময়টিকে এতো যত্ন ও নিষ্ঠার সাথে বইতে তুলে ধরেছেন– যা অসাধারণ। ভবিষ্যত নির্মোহ ইতিহাস চর্চাকারীদের জন্যে বইটি অনেকদিন আলোর যোগান দেবে।

বইটির একটা ঘাটতি দিক সম্পর্কে বলবো এবার। যে বিষয় ও সময়কাল নিয়ে লেখক তার চমৎকার রাজনৈতিক সাহিত্যটি সাজালেন, সেই কাল ও বিষয়ের প্রাণপুরুষ মুজিব, সেই সময়কালের অনিবার্য চরিত্র তিনি। সেক্ষেত্রে মুজিবচরিত নিয়ে বইটিতে একটি অধ্যায় রচিত হওয়া বোধকরি বিধেয় ছিল

পাঁচ.
লেখক তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন মুজিব বাহিনীর মূলকাঠামো পরবর্তীকালে পাঁচটি ধারায় বিভক্ত হয়েছে : রক্ষীবাহিনী হিসেবে, বেসামরিক আমলাতন্ত্রে, সিরাজুল আলমের জাসদে, শেখ মণির প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে যুবলীগে এবং আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক লীগে। আমি মনে করি আরো দুটি ক্ষুদ্র ধারার অস্তিত্ব লেখকের নজর এড়িয়ে গেছে। একটি ক্ষুদ্র অংশ ৭২-৭৩ সালের দিকেই স্বপ্নভঙ্গের হতাশা নিয়ে বিতশ্রদ্ধ হয়ে দেশত্যাগ করে। এ ধারার একটি উপ-অংশ ৮০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। অপর একটি ক্ষুদ্র অংশ পুরোপুরিভাবে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে। 
মুজিব বাহিনীর গোটা কাঠামোর কোনো অংশেরই ’৭১-এ শত্রুনিধনের কোনো গৌরবজনক ইতিহাস না থাকলেও স্বাধীনদেশে একে অন্যের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ ও নিধনযজ্ঞের ইতিহাসের অভাব নেই। প্রাণঘাতি এই ইতিহাস পর্বের পুরোধা অংশটির নাম রক্ষীবাহিনী। 
লেখক রক্ষীবাহিনীর গঠন, কাঠামো, বিধিবিধান, দায়মুক্তি, বর্বরতা ও অসহায় আত্মসমর্পন ইত্যাদি ও তৎপরবর্তী ঘটনাবলী নিয়ে অনুসন্ধানের অনেক গভীরে বিচরণ করেছেন। আর্শ্চযের বিষয়, যুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ অস্থায়ী সরকারের হাতে ছিল না– ছিল জেনারেল উবানের নেতৃত্বে ‘র’ এর হাতে, স্বাধীন দেশে সেই মুজিব বাহিনী থেকে যখন আরেকটি বাহিনী গঠনের প্রয়োজন হলো, তখন আবার প্রয়োজন পড়লো সেই উবানের। আবার প্রয়োজন পড়লো বিশেষ প্রশিক্ষণের। আবার প্রয়োজন পড়লো দেরাদুনের। আবার প্রয়োজন পড়লো ভারতীয় প্রশিক্ষকদের। ‘বিশেষ প্রশিক্ষণে’ প্রশিক্ষিত এই রক্ষীবাহিনী কর্মক্ষেত্রে অনেক কঠোরতা দেখাতে পারলেও, অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়ে সরকার প্রধানের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারলেও– যখন তাঁকে ‘রক্ষা করা’র প্রয়োজন আসলো তখন তারা নিজেরা অকার্যকর হয়ে গেল।  
শেখ মুজিবুর রহমান ও সিরাজুল আলম খান যখন পরস্পর বিরোধী চূড়ান্ত বৈরি রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত, তখনো তাদের উভয়ের মধ্যে একটি গোপন সমঝোতা ছিল বলে অভিমত প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন লেখক তার গ্রন্থে। আমি তার সাথে একমত নই। এই অভিমত প্রতিষ্ঠিত করতে যেয়ে লেখক মুজিব বাহিনীর দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির এক সংগঠক ও পরবর্তীকালে জাসদ ও গণবাহিনীর এক নেতার সমকালীন সময়ে লিখিত একটি বইকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। মূলত বইটি তার নামকরণের কারণেই নির্মোহ ইতিহাসের সূত্র হতে পারে না। কুচক্রিরা সবসময় কুচিন্তার ধারক হয়। এস্টাবলিশমেন্টকে আঁকড়ে ধরার নোংরা প্রতিযোগিতায় কুচক্রিরা অনেককে তাদের মত করে ফরমায়েসি ইতিহাসের চরিত্র বানিয়ে ফেলে। লেখক এইরূপ জ্ঞানপাপীদের বই নির্মোহ ইতিহাসের উপাদান হিসাবে গ্রহণ করে ঠিক করেননি। 
বইটির একটা ঘাটতি দিক সম্পর্কে বলবো এবার। যে বিষয় ও সময়কাল নিয়ে লেখক তার চমৎকার রাজনৈতিক সাহিত্যটি সাজালেন, সেই কাল ও বিষয়ের প্রাণপুরুষ মুজিব, সেই সময়কালের অনিবার্য চরিত্র তিনি। সেক্ষেত্রে মুজিবচরিত নিয়ে বইটিতে একটি অধ্যায় রচিত হওয়া বোধকরি বিধেয় ছিল। এই জনপদের এযাবৎকালের জনপ্রিয় মানুষটি যার যাদুস্পর্শ ডাকে মানুষ সংগ্রামী হলো, যার নামে যুদ্ধ করলো, জীবন বিলালো অকাতরে– সেই মানুষটি নতুন রাষ্ট্রের নাগরিক প্রাপ্যতা উপলব্ধিতে ঋজুতা হারিয়ে ফেলবেন কেনো? কেনো রাষ্ট্রটি অসহিষ্ণু হয়ে ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়িয়ে যাবে, কেনো তিনি পারিপার্শ্বিকতার কাছে আত্মসমর্পিত হয়ে যাবেন, কেনো এই বিশাল ব্যক্তিত্বের মানুষটি দেশের নাজুক পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রের দিশা হারালেন? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য ঐ সময়ের মুজিবচরিত বিশ্লেষণ প্রাসঙ্গিক ছিল। 
এটা আসলেই কঠিন সত্য যে, আমাদের নির্মোহ ইতিহাস রচনার অনেক উপাদান হারিয়ে গেছে। ইতিহাসের অনেক সূত্র আমাদের ভূ-সীমানার বাইরে, অনেক অনিবার্য সত্য আর তালাশ করেও পাওয়া যাবে না, অনেক বিষয়ই ঝুঁকিপূর্ণও, যা অনেকে বলতে চান না; যারা বলেন তাদের কেউ কেউ আঁকড়ে ধরা অসৎ রাজনীতির বৃত্ত থেকে বলেন, কোনো অপরাধবোধ থেকে তাড়িত হয়ে হয়তোবা কেউ কেউ আবার কিছুই বলেন না, একরাশ বেদনা নিয়ে নির্বাক থেকেই পৃথিবী থেকেই বিদায় নিয়েছেন অনেকে। ইতিহাসের অনেক অনিবার্য চরিত্র কিছুই বলে যাননি, অনেকেই আবার প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের গোপন হিংসার নিষ্ঠুর বলি হয়েছেন। সীমাবব্ধতা সত্ত্বেও লেখক তার গবেষণাকর্মে বিষয়বস্তুর স্বরূপ সন্ধানে ও বিশ্লেষণে যে নির্মোহ গভীরতা দেখিয়েছেন, তা ভবিষ্যতের অনুসন্ধানকারীদের জন্য অনুসরণীয়।

 

লেখক : পেশায় আইনজীবী। 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।