সকাল ০৯:২২ ; শুক্রবার ;  ১৭ আগস্ট, ২০১৮  

কেউ শরণার্থী হতে চায় না

প্রকাশিত:

আরশাদ আলী।।

বিশ্বব্যাপী অভিবাসীদের নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নানা কল্প-কাহিনী। এসব কল্প-কাহিনী অভিবাসীদের নিয়ে বিশ্বের নানা দেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। অভিবাসীদের নিয়ে মানুষের ভুল ধারণা ভাঙাতে ও দুনিয়াজুড়ে অভিবাসনবিরোধী পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাসহ অভিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের বিষয়টি সামনে আনতে ইন্টারনেটে শুরু হয়েছে এক নতুন প্রচারণা। ‘আই অ্যাম এ মাইগ্র্যান্ট’ নামের এই প্রচারণার যৌথ উদ্যোক্তা অভিবাসনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা (আইওএম) ও ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা জেসিডব্লিউআই। আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসকে সামনে রেখে গত বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়  http://iamamigrant.org/ নামের ওয়েবসাইটটি।

দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজারো অভিবাসীর জীবনের গল্প সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে পারবে এই সাইটে। এতে অভিবাসীদের জীবনের গল্পের পাশাপাশি থাকবে তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত। তারা কোন দেশের বংশোদ্ভূত এবং বর্তমানে কোথায় বাস করছেন—এক নজরে পাওয়া যাবে সে তথ্যও।

আয়োজকদের আহ্বানে দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অভিবাসীরাও দিয়েছেন সাড়া। লিখে চলেছেন নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা। বুধবার চালু হওয়ার পর শুক্রবার পর্যন্ত কয়েকশ অভিবাসী তাদের জীবনের নানা কথা তুলে ধরেছেন।

 

এরকমই একজন মানবাধিকার কর্মী এলিজাবেথ। বাবা-মা ইকুয়েডরের নাগরিক ছিলেন। নিপীড়ক শাসকের হাত থেকে বাঁচতে পাড়ি জমান অন্যদেশে। পথে থাইল্যান্ডের নিকটে একটি শরণার্থী শিবিরে জন্ম হয় এলিজাবেথের। এরপর বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। বেড়ে ওঠেন সেখানেই। এরপর কাজ করেছেন ডোমিনিকান রিপাবলিকে। অধ্যয়ন করেছেন জাপানের টোকিওতে। এখন ইকুয়েডরে একটি শরণার্থী শিবিরে কাজ করছেন।

আই অ্যাম এ মাইগ্র্যান্ট সাইটে এলিজাবেথ যা লিখেছেন তা তুলে ধরা হলো-

যখন কোন দেশ থেকে আমি এসেছি জিজ্ঞেস করা হয় তখন আমি দ্বিধায় পড়ে যাই। আমার বাবা-মা কম্বোডিয়া থেকে এসেছেন, কিন্তু আমি সেখানে কোনওদিন থাকিনি। থাইল্যান্ডের নিকটে একটি শরণার্থী শিবিরে আমার জন্ম হয়। কিন্তু সেখানকার কোনও স্মৃতি আমার নেই।

তখন আমার বয়স মাত্র তিন বছর। আমার বাবা-মা যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। এখানেই আমি বিশ বছর বয়স পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী অভিভাবকদের সন্তানদের মতোই আমাকেও বহু দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে লড়াই করতে হয়েছে, যা আমাকে অন্যত্র থাকার দিকে নিয়ে গেছে। যখন আমার বয়স ১৫, মা আমাকে প্রথমবারের মতো কম্বোডিয়াতে নিয়ে যান। ওই সময় দেশটির নিপীড়ক শাসনব্যবস্থা উচ্ছেদের মাত্র ২০ বছর পার হয়েছে। পুরো দেশটি নতুন করে গড়ে উঠছিল। জীবনে প্রথমবারের মতো আমি সেবার দেখলাম দারিদ্র্যের ভয়াবহতা আর দেশ ছেড়ে যেসব মানুষ পালাতে পারেনি তাদের ওপর যুদ্ধের ভয়াবহতা। আমার মা-বাবার যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস খুব সহজ ছিল না। কিন্তু তারা ওইখানে যেসব সুবিধা পেয়েছেন কম্বোডিয়া থাকলে হয়ত তা পেতেন না।

কলেজে পড়াশোনা শেষ করার পর পিস করপোরেশনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ডোমিনিকান রিপাবলিকে কাজ করি। সেখানে আমি জানলাম কখনও বহমান পানি খাওয়া যাবে না কিংবা সারাক্ষণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া যায় না। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে আমি রোটারি পিস ফেলোশিপ পেয়ে জাপানের টোকিওতে অধ্যয়নের সুযোগ পাই। টোকিও বিশ্বের অন্যতম আধুনিক শহরগুলোর একটি। এ শহরে এত সৌজন্যবোধ আমি দেখেছি যার কল্পনাতেও ছিল না।  বিদেশে আমি কোথায় বাস করছিলাম তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এখানে থেকেও আমার মধ্যে পরিবার ও যুক্তরাষ্ট্রের ফেরার তাড়না কাজ করছিল। কিন্তু বিশ্বকে জানার জন্য আমি সেখানে থাকতে নিজেকে বাধ্য করি। এখন আমি ইকুয়েডরের কুইটোতে অবস্থান করছি এবং একটি শরণার্থী পুনর্বাসন কর্মসূচিতে কাজ করছি। ইকুয়েডরে বাস করা স্বচ্ছন্দ্যের।  কখনও ভাবিনি আমি স্পেনিশ ভাষা শিখব অথবা শরণার্থীদের সঙ্গে কাজ করব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করার এই সিদ্ধান্ত একান্তই আমার নিজের নেওয়া। যেসব দেশে গেছি মনে হয়েছে সবগুলো দেশই  আমার। জীবনে এসব সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি বলে আমি গর্বিত। শরণার্থী কেউ ইচ্ছে করে হয় না। কিন্তু আমি যেসব সুবিধা ভোগ করছি আমরা সবাই একত্রিতভাবে তা শরণার্থী, অভিবাসী ও তাদের শিশুদের দিতে পারি।

/এএ/বিএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।