রাত ০৪:২৯ ; সোমবার ;  ২০ মে, ২০১৯  

১৮ ডিসেম্বর মুক্ত হয় রাজশাহী, নওগাঁ, সৈয়দপুর

প্রকাশিত:

রাজশাহী, নওগাঁ, নীলফামারী প্রতিনিধি।।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ। তবে স্বাধীনতার স্বীকৃতি পাওয়ার পরও দেশের কিছু কিছু এলাকা পাকিস্তানি হানাদারদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা সেসব এলাকা দখলদারমুক্ত করে পাকিস্তানি বাহিনীকে দেশছাড়া করেন। সেই ধারাবাহিকতায় ১৮ ডিসেম্বর মুক্ত হয় রাজশাহী, নওগাঁ, নীলফামারীর সৈয়দপুরসহ দেশের বেশ কিছু অঞ্চল।

১৮ ডিসেম্বর রাজশাহীবাসীর স্মৃতিপটে আঁচড় কেটে যাওয়া একটি উল্লেখযোগ্য দিন। এ দিন রাজশাহী মুক্ত দিবস। মুক্তিবাহিনী, মিত্রবাহিনী ও গেরিলা যোদ্ধাদের ক্রমাগত আক্রমণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর কোণঠাসা হয়ে পড়লেও রাজশাহীতে স্বাধীন দেশের প্রথম পতাকা ওড়ে দুই দিন পর। দীর্ঘ ৯ মাস পর বিভীষিকাময় সময়ের অবসান ঘটে। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজশাহী অঞ্চল ছিল ৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে বিদেশি প্রতিনিধিদের মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতি জানাতে মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত পার হয়ে আসেন। ২৩ জন মুক্তিযোদ্ধা রাজশাহী শহরে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শুরু করেন তাদের অ্যাকশন অপারেশন। রাজশাহীর নারীরাও অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। এ সময় পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসরদের নির্যাতন হত্যাযজ্ঞ বাড়তে থাকে। পরাজয় আঁচ করতে পেরে তারা শুরু করে ত্রাস, হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও নির্যাতনসহ নানা নিপীড়ন। পাকিস্তানি বাহিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমিতে হত্যা করে চার হাজার মানুষকে। দোসরদের মদদে বিভিন্ন কায়দায় লোকজনকে হত্যা করে রাজশাহীর পদ্মা নদীতে ফেলে দেয় পাকিস্তানি সেনারা।

এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা ঢুকে পড়তে থাকেন রাজশাহীর বিভিন্ন অঞ্চলে। ২৫ নভেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুর চরে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবন্ত অবস্থায় বালির মধ্যে পুঁতে হত্যা করে। ঘটনাটি ‘বাবলা বন হত্যাকাণ্ড’ নামে পরিচিত।

 

মিত্র বাহিনীর বিমানকে স্বাগত জানাতে রাজশাহীবাসী যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তখন পাকিস্তানি সেনাদের বিমান বোমা ফেলতে থাকে রাজশাহীতে।

তবে লালগোলা সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর গিয়াস উদ্দিন আহমদ চৌধুরী ও শেখপাড়া সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর রশিদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের সঙ্গে লড়াই করে মুক্ত করে ফেলেন রাজশাহীর গ্রাম অঞ্চল। মহদিপুর সাবসেক্টর কমান্ডার মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর রাজশাহী অ্যাডভান্সের পরিকল্পনা নিলেন। ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রেহাইচরে শহীদ হন তিনি। একপর্যায়ে মুক্ত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এরপর মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী দ্রুত গতিতে রাজশাহীর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কোনও ধরনের বাধা ছাড়াই রাজশাহী শহরে বীরদর্পে ঢুকে পড়েন তারা। এ সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হল, জেলখানা ও বিভিন্ন বন্দিশালা থেকে বেরিয়ে আসতে থাকেন নির্যাতিত মানুষ। স্বজন হারানোর কষ্ট আর স্বাধীনতার উল্লাসে গোলাপ পানি ও ফুলের পাপড়ি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা-মিত্রবাহিনীকে বরণ করে নেয় রাজশাহীর মানুষ।

নওগাঁ

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের পরপরই নওগাঁয় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। নওগাঁ ছিল ইপিআর ৭ নম্বর উইংয়ের হেডকোয়ার্টার। ১৮ মার্চ নাগাদ এর কমান্ডিং অফিসার ছিলেন পাঞ্জাবী মেজর আকরাম বেগ। দু’জন ক্যাপ্টেনের একজন ছিলেন পাঞ্জাবী নাভেদ আফজাল, অন্যজন বাঙালি ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন। ২৫ মার্চের আগে মেজর আকরামের স্থলে বাঙালি মেজর নাজমুল হক নওগাঁয় ই পি আর এর কমান্ডিং অফিসার হিসাবে বদলি হয়ে আসেন। দেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য রেখে মেজর বেগ তাকে চার্জ বুঝিয়ে দিতে অসম্মত হন। পরবর্তীতে কৌশলে ২৪ মার্চ মেজর আকরাম বেগ ও ক্যাপ্টেন নাভেদ আফজালকে গ্রেফতার করা হয়। সেই সঙ্গে পশ্চিম পাঞ্জাবের ঝিলামের অধিবাসী নওগাঁ মহকুমা প্রশাসক নিসারুল হামিদকেও গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা বন্দী অবস্থায় স্বপরিবারে নিহত হন। ফলে নওগাঁ মহকুমা সদ্য ঘোষিত স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের মুক্ত এলাকায় পরিণত হয়। এসময় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ নওগাঁর প্রশাসনিক দায়িত্বভার গ্রহণ করে।

২৫ মার্চ ঢাকা পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণের শিকার হলেও নওগাঁ মুক্ত ছিল প্রায় এক মাস। ২২ এপ্রিল নওগাঁ পাকিস্তানি হানাদারদের দখলে চলে যায়। এসময় মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত পার হয়ে ভারতে অবস্থান নেন।

প্রবাসী মুজিবনগর সরকার পুরো বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে। ৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল নওগাঁ, নবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, হিলি, রাজশাহী, পাবনা ও নাটোর অঞ্চল। প্রথম দিকে ক্যাপ্টেন গিয়াস, পরবর্তীতে মেজর নাজমুল হক এবং তার মৃত্যুর পর মেজর নুরুজ্জামান ছিলেন এই সেক্টরের অধিনায়ক। দেশের ভেতরে পাঠানো  মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ পরিকল্পনা, তাদের ব্যয়ভার বহন ও রসদপত্র সরবরাহের বিষয়ে  মোঃ আব্দুল জলিল তত্ত্বাবধায়ক ও সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের খবর শোনার পর বীর মুক্তিযোদ্ধা জালাল হোসেন চৌধুরী নওগাঁ আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। ১৭ ডিসেম্বর বিশাল মুক্তিযোদ্ধাদের দল নওগাঁ আক্রমণ করে। মুক্তিবাহিনী জগৎসিংহপুর ও খলিশাকুড়ি গ্রামে অবস্থান নিলে দুই বাহিনীর মধ্যকার দুরত্ব একেবারে কমে আসে। রাত পর্যন্ত এ যুদ্ধ স্থায়ী ছিল।

১৮ ডিসেম্বর শনিবার। সকালে বগুড়া থেকে অগ্রসরমান ভারতীয় মেজর চন্দ্রশেখর , পশ্চিম দিনাজপুর বালুরঘাট থেকে নওগাঁ অভিমুখে অগ্রসরমান পিবি রায়ের নেতৃত্বে মিত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী নওগাঁয় প্রবেশ করে। হানাদার বাহিনীর তখন আর করার কিছুই ছিল না। ফলে প্রায় দুই হাজার পাকিস্তানি সেনা নওগাঁ কেডি স্কুল থেকে পিএম গার্লস স্কুল ও সরকারি গার্লস স্কুল থেকে শুরু করে পুরাতন থানা চত্বর ও এসডিও অফিস থেকে শুরু করে রাস্তার দু’পাশে মাটিতে অস্ত্র রেখে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে নতমস্তকে আত্মসমর্পণ করে।

এসময় নওগাঁর বিহারী সম্প্রদায় স্বপরিবারে কেডি সরকারী স্কুলে আশ্রয় নেয়। তৎকালিন নওগাঁ মহকুমা প্রশাসক সৈয়দ মারগুব মোরশেদ মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীকে স্বাগত জানান।

সৈয়দপুর, নীলফামারী

১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর নীলফামারীর সৈয়দপুর পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হয়। ওই দিন ভোরে ৬ নম্বর সেক্টরের  মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনী যৌথভাবে আক্রমণ চালিয়ে সৈয়দপুর সেনানিবাস দখলে নেয়। এ সময় পালিয়ে যায় পাকিস্তানি মিলিটারি ও তার দোসররা।

মুক্তি পাগল হাজার হাজার মানুষ গ্রাম থেকে শহরে প্রবেশ করে। এ দিন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামীলীগ নেতা মরহুম কাজী ওমর আলী ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতৃত্বে শহরে আনন্দ মিছিল করে সৈয়দপুর পৌরসভা কার্যালয়ে ও আওয়ামী লীগ অফিসে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

স্বাধীনতাযুদ্ধে সৈয়দপুরের প্রেক্ষাপট ছিল ভয়াবহ। ২৩ মার্চ যুদ্ধের শুরুতেই এখানে প্রথম শহীদ হন চিরিরবন্দর উপজেলার আলোকডিহি ইউপি চেয়ারম্যান মাহাতাব বেগ। ২৪ মার্চ প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ডা. জিকরুল হক, তুলসীরাম আগরওয়ালা, ডা. সামছুল হক, ডা. বদিউজ্জামান, ডা. ইয়াকুব আলী, যমুনা প্রসাদ কেডিয়া, রামেশ্বরলাল আগরওয়ালা, নারায়ণ প্রসাদ, কমলা প্রসাদ প্রমূখ।

সৈয়দপুর সেনানিবাসে হাত পা বেঁধে রাখা হয় এবং ১২ এপ্রিল তাদের চোঁখমুখ  বেঁধে রংপুর সেনানিবাসের উত্তর পাশে উপশহরে সারিবদ্ধভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়।

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার পদস্থ কর্মচারীদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি সেনা ও তাদের  অবাঙ্গালী দোসরদের  হাতে নিহত হয়েছে অসংখ্য রাজনীতিক ব্যক্তি।

১৯৭১ সালের ১৩ জুন মুক্তিযুদ্ধকালীন সৈয়দপুর শহরে সবচেয়ে বড় গণহত্যা সংঘঠিত হয়েছিল। এ দিন শহরের ৩৫০ জন মাড়োয়ারী পরিবারের সদস্যকে ভারতের হলদিবাড়ি সীমান্তে পৌঁছে  দেওয়ার নামে ট্রেনে তুলে রেলওয়ে কারখানার উত্তর প্রান্তে সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

তবে নাশকতার ইতি টেনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজয় বরণ করে সরে যেতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি সেনারা।

/এফএস/  

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।