সকাল ১১:৪৬ ; বুধবার ;  ২০ জুন, ২০১৮  

বিপ্লবের পঞ্চম বার্ষিকীতে স্বপ্নভঙ্গের তিউনিসিয়া

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

উম্মে রায়হানা।।

তিউনিসিয়ার যে শহরতলীতে একজন সবজি বিক্রেতা শিক্ষিত তরুণ মোহাম্মেদ বুয়াজিজি আত্মাহুতির আগুন জ্বালিয়ে সূচনা করেছিলেন আরব বসন্তের, সেই সিদি বাওজিদে বুয়াজিজির সবজি বিক্রির ভ্যানের একটি প্রতিমূর্তি রয়েছে ভূমি থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে। সেখানে লেখা, ‘সব কিছুর ওপরে তিউনিসিয়া।’ 

সেখানেই খেলা করছিলো দুই কিশোর। তাদের স্বপ্নের কথা জানতে চাওয়া হলে বারো বছরের দুই কিশোরের একজন অস্ত্রের প্রতি মোহের কারণে পুলিশ হওয়ার ইচ্ছার কথা জানায়। অপরজন চান ফুটবল তারকা হতে।

এদের এই ইচ্ছেগুলোকে কিশোরবয়সের ছেলেমানুষি স্বপ্ন বলে এড়িয়ে যাওয়ার কোন পথ খোলা নেই সম্ভবত। কেননা বিপ্লবের পাঁচ বছর পরও জাতীয় ফুটবল দলই তিউনিসিয়ার মানুষের একমাত্র সম্মানজনক অবস্থান। একদলীয় শাসন ব্যবস্থার পথে ধাবিত দেশটিতে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে পুলিশি ক্ষমতা।     

পাঁচ বছর আগে, ২০১০ সালের এই দিনে কর্মসংস্থানের দাবিতে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন মোহাম্মেদ বুয়াজিজি নামের ওই তরুণ। সড়কের ওপর সবজি বিক্রি করার অনুমতিপত্র না থাকায় তাকে অপমান করেন এক সরকারি কর্মকর্তা। প্রতিবাদে আত্মহত্যা করে লাখো তরুণের কর্মসংস্থানের দাবিকে সামনে আনতে সক্ষম হন তিনি। বুয়াজিজির আত্মাহুতির ফলে গোটা আরব জুড়ে যে বিপ্লবের সূচনা হয় তারই পরিণতি আজকের তিউনিসিয়া।

বুয়াজিজির মৃত্যুর পঞ্চম বার্ষিকীতে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন তিউনিশিয়ার ন্যাশনাল ডায়লগ কোয়ারটেট এবং তিউনিশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মনোনীত প্রতিনিধিরা। তবে এ সমস্ত কর্মকাণ্ড জেসমিন বিপ্লব নামে পরিচিত জনগণের অপ্রতিরোধ্য শক্তি ও সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দিলেও আজকে এসে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব নেই বললেই চলে।

মোহাম্মেদের জ্ঞাতি ভাই আলি বুয়াজিজি বলেন, ‘আমরা একদলীয় শাসনের দিকে ফিরে যাচ্ছি। আমরা স্বাধীনতা হারাচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ দেশে জনগণের কোন সম্মান নেই। বিশেষত গ্রামাঞ্চলে মানুষের অবস্থা আরও করুণ।’

বুয়াজিজি আত্মাহুতির যে আগুন জ্বেলেছিলেন, তাকে মুক্তির মশাল বানিয়ে বহন করেছিলেন উত্তাল জনতা। সেই মিছিলে ছিলেন ৩৩ বছরের আদেল আলিমিও। আলিমি বলেন, ‘বিপ্লবের পর অনেক কিছুই বেশ ভালো অবস্থায় ছিল। প্রথম দুই তিন বছর আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি, স্বাধীনতার সুফলও পেয়েছি। কিন্তু এখন দেশটা ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে।

আলিমি জানান, স্বাধীনতা পেলেও ২০১১ সালের সাধারণ নির্বাচন অথবা ২০১৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেননি তিনি। কারণ হিসেবে বলেন,  বিপ্লবে যোগ দিলেও রাজনীতি নিয়ে মাথাব্যথা নেই তার। বরং তিনি অনেক বেশি চিন্তিত বিপ্লবের পর শহরের সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে। খেলার মাঠগুলো বেসরকারি খাতে চলে গিয়ে জনগণের কাছে দুর্লভ হয়ে গিয়েছে বলে। তরুণদের চিত্ত বিনোদনের সুযোগের অভাব তার মতে একটি বড় রকমের সমস্যা।

এ প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাংবাদিক আয়দা দালিও। অলিম্পিকে তিউনিসিয়া আন্তর্জাতিক সম্মান বয়ে আনলেও, জনপরিসরে কিশোর ও তরুণদের ক্রীড়া চর্চার জন্য প্রশস্ত কোন স্থান নেই বলেই মনে করেন তিনি। অনেক কিশোর ও তরুণকেই খোলা সড়কের ওপর ফুটবল খেলতে দেখা যায়। দালি বলেন, ‘তরুণদের সময় কাটানোর জন্য তিনটি জায়গা আছে, তাদের বাড়ি, ক্যাফে আর ইন্টারনেট।’

শুধু ক্রীড়াচর্চাই নয়, সমস্যা রয়ে গেছে অন্যান্য মৌলিক বিষয়েও। বিপ্লবের শুরু কর্মসংস্থানের দাবি থেকে হলেও সে সংকটের সমাধান হয়নি এখনও। বিপ্লবের আরেক যোদ্ধা রামজি আবদৌলি জানান, পাঁচ বছর ধরে খুঁজেও নিজের যোগ্যতা অনুসারে কোন কাজ পাননি তিনি। হতাশ হয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে ফিরে গেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

তিনি বলেন, ‘দেশে কর্মসংস্থানের অভাবের ফলে এখানে সন্ত্রাসবাদ, দারিদ্র্য আর দুর্নীতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। আমাদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। সরকারকে জনগণের দায়িত্ব নিতে হবে।’ তিনি আরও জানান, তার দেশের অনেক তরুণ আইএসে যোগ দিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন, কারারুদ্ধ হচ্ছেন। প্রাণশক্তিতে ভরপুর তরুণদের এহেন পরিণতি কোনভাবেই কাম্য নয়। 

শুধু সন্ত্রাসবাদই নয়, দেশের শাসনব্যবস্থায় অভিজাততন্ত্রের উত্থানকেও বড় সংকট বলে মনে করেন সচেতন তরুণরা। তরুণ সাংবাদিক জিয়াদ আতিয়া বলেন, ‘তিউনিশিয়ার অনেক সাধারণ মানুষ অভিজাত শ্রেণীর জন্য কাজ করতে বাধ্য হন। তাদের রীতিমত শোষণ করা হয় এবং স্বার্থসিদ্ধির পর ত্যাগ করা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিদি বাওজিদে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তাতে জনগণের কণ্ঠস্বর ফুটে উঠেছিল। সে স্বর এখন রুদ্ধ হয়ে গেছে।’

প্রেসিডেন্ট বেন আলি ১৯৮৭ সাল থেকে তিউনিশিয়া শাসন করে আসছিলেন। ওই অঞ্চলের অন্য অনেক দেশের মধ্যে বেশ সমৃদ্ধিশালী হিসেবেই পরিচিত ছিল তিউনিসিয়া, তবে সেই সমৃদ্ধি আপামর জনতার কল্যাণে কাজে লাগেনি কখনও। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের মদদপুষ্ট সরকার জনগণের মধ্যে থেকে উঠে আসা যে কোন রকম ক্ষোভ ও প্রতিরোধকে কঠোর হাতেই দমন করত। কিন্তু বুয়াজিজির আত্মাহুতিতে পাল্টে যায় তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক দৃশ্যপট।

এরও আগে ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে উইকিলিক্সের মাধ্যমে তিউনিসিয়ার আলি সরকারের কিছু নথি জনসমক্ষে আসে। উইকিলিক্স ছাড়াও গার্ডিয়ান, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলি সরকারের দুর্নীতিকে সামনে আনে। এর ফলে জনমনে ক্ষোভ দানা বেধে ওঠে। মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত টিয়ার গ্যাস দিয়ে বিক্ষোভ দমন করা গেলেও বুয়াজিজির আত্মাহুতির পর তরুণদের মধ্যে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তাকে আর প্রতিরোধ করতে পারেনি আলি সরকার। সূত্র: মিডল ইস্ট আই, আল জাজিরা

/ইউআর/বিএ/ 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।