রাত ০৯:৫৯ ; শুক্রবার ;  ১৮ অক্টোবর, ২০১৯  

নতুন বাংলাদেশিদের প্রথম বিজয় উদযাপন

প্রকাশিত:

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক ।।

দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দিদশা থেকে মুক্তির পর এবারই প্রথম বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বিজয় দিবস পালন করছেন বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ছিটমহলের বাসিন্দারা। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড় ও নীলফামারীর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ১১১টি ছিটমহলের প্রায় সবগুলোতেই মহাধুমধামে বিজয় দিবস পালন করছেন এসব নতুন নাগরিক। প্রথম দেশ পাওয়া তাই প্রথম বিজয় উৎসব পালনে তাদের ছিল বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস। এরমধ্যে নীলফামারীতে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের নেতৃত্বে দেশের প্রথিতযশা একদল সঙ্গীত শিল্পীর অংশগ্রহণে সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে মিলেমিশে মহানন্দে পালিত হয় নতুন নাগরিকদের বিজয় উৎসব। উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো জানাচ্ছেন আমাদের প্রতিনিধিরা।   

পঞ্চগড় :

সদ্য বিলুপ্ত পঞ্চগড়ের ৩৬টি ছিটমহলের নতুন বাংলাদেশিরা নেচে গেয়ে আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে এবারই প্রথমবারের মতো বিজয় দিবস উদযাপন করেছেন।

নতুন বাংলাদেশিদের সঙ্গে ছিলেন সরকারের দু’জন মন্ত্রীও। নতুন ও পুরনো বাংলাদেশিরা মিলে মিশে একাকার হয়েছিলেন। সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিলো ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ এ স্মৃতি সবার মনে অটুট থাকবে এমন কথা বলছিলেন সদ্য বিলুপ্ত ছিটবাসী বাংলাদেশি নাগরিকরা।

বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে স্থানীয়দের সঙ্গে নতুন বাংলাদেশিদের ভিড়। ছবি: পঞ্চগড় প্রতিনিধি

এদিন বিকেল ৩টায় মফিজার রহমান কলেজ মাঠে প্রথমবারের মতো বিজয় উল্লাস অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজমুল হক প্রধান ও পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন বক্তব্য রাখেন।

এসময় দুটি হেলিকপ্টারে সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও টেলি যোগাযোগ মন্ত্রী তারানা হালিম অনুষ্ঠান স্থলে এসে পৌঁছান। শুরু হয় জাতীয় সংগীত।

দুই মন্ত্রী, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও তার দলসহ পঞ্চগড়ের ৩৬টি ছিটমহলের নতুন ও পুরনো বাংলাদেশি, জেলা প্রশাসন পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দসহ হাজারও মানুষ দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গান।

জাতীয় সংগীত পরিবেশন শেষে শামসুর রহমানের লেখা কবিতা আবৃত্তি করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

এরপর ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বাংলাদেশের নতুন ভূখণ্ড গাড়াতি এলাকায় গ্রামীণ ফোনের থ্রিজি মোবাইল টাওয়ার উদ্বোধন করেন। এসময় গ্রামীণ ফোনের সিও রাজীব শেঠী, পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, পুলিশ সুপার মো. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

এরপর প্রখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও তার দল প্রথমে দেশের গান ও পরে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করেন। পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার গাড়াতি এলাকায় ভিন্নধারার বিজয় উৎসবের আয়োজনে নতুন ভূখণ্ডগুলোতে সাজ সাজ রব পড়ে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, গ্রামীণ ফোন ও একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল যৌথভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

লালমনিরহাট:

লালমনিরহাটের ভেতর সদ্য বিলুপ্ত ৫৯টি ছিটমহলের নতুন বাংলাদেশিরা নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মহাধুমধামে মহান বিজয় দিবস পালন করছেন। ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের ৪৪ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান জাঁকজমকপূর্ণ করতে নানা বয়সী নারী-পুরুষ মেতেছিলেন বিজয় উল্লাসে। তাদের এই উল্লাস ভাগাভাগি করে নিতে সদ্যবিলুপ্ত ছিটমহলের আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দারাও বিজয় র‌্যালিতে অংশ নেন।

সদর উপজেলার ভেতরে সদ্যবিলুপ্ত ১৫২ নম্বর ভিতরকুটি (বাঁশপচাই) ছিটমহলে গিয়ে দেখা যায়, সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই জাতীয় সংগীত গেয়ে বাঁশপচাই ঈদগাঁ মাঠে কাপড়ের তৈরি অস্থায়ী শহীদ মিনারের পাশে জাতীয় পতাকা ওঠানো হয়। বিজয় দিবসের কর্মসূচির শুভসূচনা করেন লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক এ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান। অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে প্রীতিভোজেরও আয়োজন করা হয়। এছাড়া লালমনিরহাটের পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে মহান বিজয় দিবসের কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

কুড়িগ্রাম:

দেশের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর প্রথম বিজয় দিবসকে স্মরণীয় করতে ব্যাপক উৎসাহ আর আনন্দের মধ্য দিয়ে দিবসটি উৎযাপন করেছেন বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়ার অধিবাসীরা। শিশু-কিশোর আর নানা বয়সের মানুষের অংশগ্রহণে সার্বজনীন অনুষ্ঠানে পরিণত হয় বাংলাদেশের সীমানাভুক্ত নতুন এ অঞ্চলের আয়োজন।

রাষ্ট্রীয় কোনও প্রতিনিধি বা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের কোনও রাজনৈতিক অতিথি আজ দাশিয়ারছড়ায় যাননি। তবে সদ্য বাংলাদেশের নাগরিকের স্বীকৃতি পাওয়া এই মানুষগুলোর আনন্দ দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে তারা এবারই প্রথম এরকম উদযাপনের সুযোগ পেলেন। এই প্রথম মহান বিজয় দিবসের আনন্দ তারা ভাগ করে নিয়েছেন কোনও রকম আশঙ্কা বা দোলাচল ছাড়া।

কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়ায় অস্থায়ীভাবে নির্মিত স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন সদ্য বিলুপ্ত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সা. সম্পাদক গোলাম মোস্তফার নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশিরা। ছবি: কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি।

দাশিয়ারছড়ার কালিরহাট বাজারে সকাল থেকেই মাইকে একের পর এক  মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান বাজছিল। এরই মধ্যে জাতীয় সংগীতের সঙ্গে সঙ্গে উত্তোলন করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। প্রায় অর্ধ শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন দাশিয়ারছড়ার বাসিন্দা আলতাফ হোসেন, নূর আলমসহ স্থানীয় কয়েকজন। এসময় সবাই  সমস্বরে জাতীয় সংগীত গেয়ে উঠেন। পতাকা উত্তোলন শেষে কালিরহাটে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। ‘মহান বিজয় দিবস সফল হোক’ স্লোগানে মুখরিত মিছিলে অংশ নেয় অগণিত শিশু-কিশোর আর শিক্ষার্থীরা। তারাও শহীদ বেদীতে  ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। এরপর শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

ছিটমহল বিনিময় কমিটির অন্যতম সংগঠক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা ট্রিবিউনকে জানান, ‘আমরা অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশের বিজয় দিবস উদযাপন করে আসছি। তবে এবারই প্রথম আমরা বাংলাদেশি হিসেবে বিজয় দিবস উদযাপন করলাম । এজন্য এবারের বিজয় দিবসের আনন্দ আমাদের কাছে অফুরন্ত। আজ গোটা দাশিয়ার ছড়ায় এই আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে।’

গোলাম মোস্তফা আরও বলেন, ‘এতদিন ধরে আমরা কখনও নিজেদের জমিতে, কখনও বা বাড়ির আঙ্গিনায় অস্থায়ী শহীদ মিনার তৈরি করে বিজয় দিবসসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন করে আসছি। এবারে আমাদের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে এখানে বিজয় স্তম্ভ তৈরি করে দিবসটি উদযাপন করা হবে। কিন্তু বাংলাদেশের নতুন ভূ-খণ্ড হিসেবে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কেউ দাশিয়ার ছড়ায় দিবসটি উদযাপনের কোনও উদ্যোগ নেয়নি। আমি দাশিয়ার ছড়া বাসির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে এখানে একটি শহীদ মিনার অথবা একটি মুক্তিযুদ্ধের বিজয় স্তম্ভ তৈরির আবেদন জানাচ্ছি। এর ফলে এখানকার নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।

গত ৩১ জুলাই মধ্যরাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হওয়ার পর দাশিয়ার ছড়াসহ কুড়িগ্রামের ভেতরে ভারতের ১২ টি ছিটমহল বাংলাদেশের মূল ভূ-খণ্ডে যুক্ত হয়।

নীলফামারী:

দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দিদশা থেকে মুক্তির পর এবারই প্রথম বাংলাদেশের সঙ্গে মিশে যাওয়া  নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সদ্যবিলুপ্ত চারটি ছিটমহলের নতুন বাসিন্দারা মহান বিজয় দিবস মহাসমারোহে পালন করছেন। বিজয় দিবসের ৪৪ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান জাঁকজমকপূর্ণ করতে নানা বয়সী নারী-পুরুষ মেতে উঠেছেন বিজয় উল্লাসে।

বিজয় উল্লাস ভাগাভাগি করে নিতে সদ্যবিলুপ্ত ছিটমহলের স্থানীয় বাসিন্দারা বিজয় র‌্যালিতে অংশ নেন। জেলার চারটি বিলুপ্ত ছিটমহল ২৮ নম্বর বড়খানকীবাড়ি ২৯ নম্বর বড়খানকীবাড়ি গীতালদহ ,৩০ নম্বর  বড়খানকীবাড়ী খারিজা গীতালদহ ,৩১ নম্বর নগর জিগাবাড়ি ছিটমহলের ১১৯ পরিবারের ৫৪৫ জন বাসিন্দা একত্রিত হয়ে বড়খানকীবাড়ি গীতালদহ মাঠে বিজয় দিবস পালন করেন।

বুধবার  (১৬ ডিসেম্বর) সকালে বিলুপ্ত ছিটবাসীরা জাতীয় সঙ্গীত খেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্যে দিয়ে দিবসটি পালন শুরু করেছে। সেখানে এখন চলছে বিভিন্ন কর্মসূচি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গয়াবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান শরিফ ইবনে ফায়সাল মুন, বিলুপ্ত ছিটবাসীদের প্রধান মিজানুর রহমান, মতিয়ার রহমান, ফরহাদ হোসেন, জয়নাল আবেদীন প্রমুখ।

এছাড়া শিশুদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, আলোচনা অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণ করা হবে।

/এফএস/টিএন/

 

 

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।