রাত ০৩:৩৭ ; শুক্রবার ;  ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৯  

শিবিরের বুকে লাল-সবুজ, ব্যানারে ‘স্বাধীনতা এনেছি, স্বাধীনতা রাখবো’!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট ।।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা আল বদর সেজে বুদ্ধিজীবীসহ বাঙালিদের হত্যার উৎসবে মেতে উঠেছিল বিজয়ের ৪৪ বছর পর সেই সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের নতুন প্রজন্মের নেতা-কর্মীরা এবার রাজধানীর রাস্তায় প্রকাশ্যে করেছে বিজয় র‌্যালি। রীতিমতো পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বিজয় দিবসের সকালে রাজধানীতে চার ভাগে বিভক্ত হয়ে বিজয় র‌্যালি করেছে সংগঠনটি। এমনকি তাদের ব্যানারে লেখা ছিল ‘স্বাধীনতা এনেছি, স্বাধীনতা রাখবো’!

অথচ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী হিসেবে অভিযুক্ত এ সংগঠনসহ তাদের মূল সংগঠন জামায়াতের রাজনীতি মার্চ মাসের মধ্যে নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল।   

জানা গেছে, বিজয় দিবস উপলক্ষে বিএনপি’র সঙ্গে যৌথভাবে র‌্যালি করার প্রস্তাব দিয়েছিল জামায়াত-শিবির। কিন্তু বিএনপি সে প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এককভাবে র‌্যালি করে শিবির। ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম নামে  চারটি ভাগে নেমে সকালে বিজয় মিছিল শুরু করে শিবির কর্মীরা।এসব র‌্যালিতে দলটির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নেতা-কর্মী অংশ নেয়।

এদিনে একেকটি বিজয় র‌্যালিতে তাদের একেক রকম প্রস্তুতি লক্ষ্য করা গেছে। ঢাকা মহানগরী পূর্ব শাখার র‌্যালিতে অংশ নেওয়াদের মধ্যে সামনের দুই সারির নেতা-কর্মীদের পরিধানে ছিল বাংলাদেশের পতাকার লাল-সবুজ টি-শার্টসহ রঙ-বেরঙের নানা ধরনের পোশাক, অনেকে শার্টের ওপরে এই টি-শার্ট চাপিয়ে র‌্যালিতে অংশ নেন।পেছনে অনেকের মাথায় ছিল লাল-সবুজ রঙের ফেটি, হাতে ছিল বাংলাদেশের পতাকা।আর সামনে বহন করা ব্যানারে লেখা ছিল ‘স্বাধীনতা  এনেছি, স্বাধীনতা রাখবো’! একই রকম প্রস্তুতি নিয়ে র‌্যালি করেছে সংগঠনটির রাজধানী পশ্চিম শাখাও। তাদের টি-শার্টের বুকে ছিল হলুদ রঙে বাংলাদেশের মানচিত্র। এদিন রঙিন সাজে নেমেছিল দলটির দক্ষিণ শাখার নেতা-কর্মীরা। তারা মহান বিজয় দিবস লেখা প্ল্যাকার্ডও বহন করে।এছাড়া সংগঠনটির ঢাকা উত্তর শাখার ইংরেজিতে লেখা ব্যানারে ‘কালারফুল র‌্যালি’ লেখা থাকলেও তাদের স্বাভাবিক পোশাকেই দেখা গেছে। র‌্যালিতে বাংলাদেশের পতাকাও বহন করা হয়।     

  

এ বিষয়ে ছাত্র শিবিরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা মহানগরী পূর্ব শাখা ছাত্র শিবিরের র‌্যালিটি শুরু হয় সকাল ৭টায় বনশ্রী এলাকা থেকে। দলটির কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ইয়াছিন আরাফাতের নেতৃত্বে এ র‌্যালিতে শাখা সভাপতি এম শামিম, সেক্রেটারী শরিফুল ইসলামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। 

ঢাকা মহানগরী উত্তর শাখার শিবিরের র‌্যালিটি শুরু হয় বসুন্ধরা এলাকায়  সকাল সাড়ে ৮টায়। কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক মোবারক হোসেনের নেতৃত্বে এ র‌্যালিতে শাখা সভাপতি হাসান জারিফসহ শাখার বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।    

ঢাকা মহানগরী পশ্চিম শাখা শিবিরের র‌্যালিতে নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রীয় মানবাধিকার সম্পাদক শাহ মো. মাহফুজুল হক ও শাখা সভাপতি সুলতান মাহমুদ। সকাল ৮টায় ধানমণ্ডি ১৫ এলাকায় এ র‌্যালি শুরু হয়ে আশপাশের এলাকা প্রদক্ষিণ করে।

ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখা শিবিরের র‌্যালিটি বের হয় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে সকাল ৭টায়। এতে নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক আনিসুর রহমান বিশ্বাস। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মাদ্রাসা বিষয়ক সম্পাদক নুরুল হক, শাখা সভাপতি সাদেক বিল্লাহসহ দলটির উল্লেখযোগ্য নেতা-কর্মী।

লেখক ও অধ্যাপক মুনতাসির মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তারা মিছিল করতে চাইলে আমরা কী করতে পারি? আমাদের কিছুই করার নাই। তাদের আমরা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতে পারি, কিন্তু তাতে কী হবে? তারা তো এই দেশের নাগরিক। তাদের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে। তারা যে ভণ্ডামির রাজনীতি করে, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে এগুলো রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে।’

এবিষয়ে শহীদ আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে তারা অস্তিত্ব নিয়েই সংকটে পড়েছে। তারা শেষ সময়ে এমন কিছুর চেষ্টাতো চালাবেই। এটা এমন কিছু না। আমাদের বিজয় মিছিলের কাছে, আমাদের জয়বাংলা স্লোগানের কাছে ওদের মিছিল খুবই নগন্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ছয়মাস বা একবছর পর ওদের চিহ্ন থাকবে না। ওরা হারিয়ে যাবে। ওরা ওদের শেষ চেষ্টাতো করবেই।’

প্রসঙ্গত মুক্তিযুদ্ধকালে এই সংগঠনটির নাম ছিল ইসলামী ছাত্র সংঘ। সংগঠনটির তদানীন্তন কেন্দ্রীয় নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ আল-বদর বাহিনী গঠন করে দেশকে মেধাশূন্য করার ঘৃণ্য নেশায় মেতে ওঠে। তারা দেশের সূর্য সন্তান বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং নৃশংসভাবে হত্যা করে। স্বাধীনতার পর হাতের রক্তের দাগ মুছে ফেলতে দলটির নাম পাল্টে ফেলে এর চতুর নেতারা। দলের নতুন নামকরণ করা হয় ইসলামী ছাত্র শিবির। একইসঙ্গে অন্যান্য জামায়াত নেতার মতো ছাত্রসংঘের নেতারাও এসব হত্যাকাণ্ডের দায় বারবার অস্বীকার করতে থাকে।

তবে দীর্ঘদিন পার হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। সেই বিচারে তদানীন্তন ইসলামী ছাত্র সংঘের দুই শীর্ষ নেতা কামারুজ্জামান সোহাগপুরে গণহত্যার নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যার অভিযোগে সর্বোচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। এরই মধ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।  

/এসটিএস/এআরআর/টিএন/

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।