ভোর ০৬:১৭ ; রবিবার ;  ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬  

বিজয়ের কথা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁদের জীবন ছিলো অনেক ঘটনাবহুল। শঙ্কা, উত্তেজনা এবং ঝুঁকিসহ কতকিছুই না তাঁদের পেড়োতে হয়েছে। যুদ্ধের এই পুরো নয় মাস থেকে আমরা তুলে এনেছি বিজয়ের দিন ও বিজয়ের পূর্বাভাসের সময়গুলো। 


 

হঠাৎ আলো জ্বলে উঠলো : মিহির সেনগুপ্ত

১৬ ডিসেম্বর আমি পশ্চিমবঙ্গের বাড়িতে ছিলাম। জায়গাটার নাম হচ্ছে হুগলী জেলার ভদ্রেশ্বর। সেদিন আমরাও বিজয় উৎসব পালন করেছি। 
কাগজ প্রকাশন আমার যে বইটি ছেপেছে– শরণার্থীর মুক্তিযুদ্ধ– সেখানে আমি বলেছি, আমি ওয়ার ক্যাম্পগুলো ঘুরে বেড়িয়েছি। যা আসলে ছিলো মেডিক্যাল ক্যাম্প। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দেওয়া হতো সেখানে। হাসনাবাদ, বসিরহাট, হিঙ্গলগঞ্জ এইসব জায়গাগুলো। এগুলো সরকারি বেসরকারিভাবে পরিচালিত হতো। ইনডিভিজুয়াল গ্রুপও ছিলো। 
বিজয়ের সংবাদ পেলাম– তখনতো এখানে ব্ল্যাক আউট, যুদ্ধের সময়টায়– হঠাৎ আলো জ্বলে উঠলো। তখনতো টিভি নাই, রেডিও খুলে ঘোষণা শুনছি। এটা রাতের দিকে। পুরো পশ্চিমবঙ্গ আলোকিত হয়ে উঠলো একসাথে। সে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। আমরা সবাই মানে পরিবারের লোকেরা, পাড়া প্রতিবেশি এবং ওই অঞ্চলে যারা শরণার্থী ছিলো বা যারা সেটেল হতে গিয়েছিলো বিশেষ করে কৈবর্ত যারা– তারা সবাই ছিলো। 
ওই সময়টার কথা বলে বোঝানো যাবে না। এটা তুমি অনুভব করার চেষ্টা করো। সব লোক বাইরে বেরিয়ে আসছে। এগুলো আমি বলতে পারবো না। চোখে জল এসে যায়। 
পরাজিত সৈন্যদের আমি দেখিনি। তবে তাদের কথা শুনেছি। তাও এদেশে যখন এসেছি তখন। তাদের কী অবস্থা হয়েছিলো। তাদের কেউ কেউ ভুট্টা ক্ষেতে লুকিয়ে রয়েছে। দলছুট হয়ে পড়েছে। খেতে পাচ্ছে না। সেটাও একটা করুণ অবস্থা। 
আর আমি তো মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে শুরু থেকেই যোগাযোগ রেখেছিলাম। বিশেষ করে হিলি সীমান্তে। এইখানে আমি একমাস ছিলাম যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময়। তখন দেখেছি যারা ট্রেনিং নিতে এসেছে সেই ছেলেদের। পশ্চিম দিনাজপুরে বালুরঘাট বলে একটা জায়গা আছে সেখানে। তো বালুরঘাট বাজারে যেদিন পাকিস্তানী গোলা এসে পড়লো তখন চলে এলাম। 
না, আমার ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধ করার চিন্তা ছিলো না বা সেই সুযোগ এবং পরিস্থিতিও ছিলো না। 
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা কী বলবো। আমি গোটা উপমহাদেশের কথাই বলছি যে, এই উপমহাদেশটা একেবারেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ বেশি নষ্টের দিকেই যাচ্ছে। এর ভালো দিক কি নেই? –আছে। কিন্তু যতটুকু অগ্রসর হবার কথা ছিলো ততটুকু হয়নি। কখনো কখনো এমন ঘটনা ঘটে দেখে মনে হয় যেন হাজার বছর পিছিয়ে যাচ্ছি। এটা আমি বাঙালির কথা মাথায় রেখেই বলছি।
আর হ্যাঁ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যে হচ্ছে সেটা ভালো দিক। এত বছর পর তা সম্পন্ন করা গেছে।

মিহির সেনগুপ্ত : কথাসাহিত্যিক     


 

রাস্তায় প্রচুর মানুষ বেরিয়ে এসেছে : মুহম্মদ নূরুল হুদা

১৬ ডিসেম্বর আমি ঢাকা শহরেই ছিলাম। ওই সময় আমি, হুমায়ূন কবির– ওই সময় আমাদের একটা গ্রুপ ছিলো, যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন যে চিফ ইঞ্জিনিয়ার তার সঙ্গে যারা গেরিলা যুদ্ধ করতো তাদের একটা লিয়াজো ছিলো। তখন আমরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলাম। ১৪ তারিখে আমি ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোডের একটি দোতালা বাসায় ছিলাম। বাসার নাম্বারটা আমার মনে নেই, তবে তা রাস্তার কাছাকাছিই ছিলো। এই বাসাটি আমাদের এলাকার একজন অধ্যাপক, তার নাম আলী আহম্মদ, উনি ময়মনসিংহ ক্যাডেট কলেজে পড়াতেন। অংকের শিক্ষক ছিলেন। তিনি তার কলেজের কিছু জুনিয়র ছাত্রদের ওই বাসায় আশ্রয় দেন। আমিও তাদের সঙ্গে আশ্রয় নিলাম। তখন তো আমি অনার্স কমপ্লিট করে ফেলেছি। ওদের সঙ্গে থাকায় কেউ আমাকে সহজে শনাক্ত করতে পারবে না, এটা ছিলো উদ্দেশ্য। ওখান থেকে ১৪ তারিখ রাতেই চলে এসেছি। 
১৫ তারিখের বিকেল থেকে আমাদের মনে হতে লাগলো ঘটনাপ্রবাহ উল্টে যাচ্ছে। সারারাত দুঃশ্চিন্তার মধ্যে কাটলো। কেউ ঘুমাতে পারলাম না। 
জিগাতলার ইপিআর গেট থেকে হঠাৎ করে সৈন্যরা বের হয় আর এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। তখন কিন্তু মুক্তিযোদ্ধরা ঢুকে পড়েছে। কে কোথায় আছে জানে না। আমরা গেরিলা গ্রুপে যারা ছিলাম– আমি আমার পরবর্তী কাজ কী সেটা জানি। এরপর সেখানে কে আছে সেটা আমি জানি না। 
ওই সময় আমি কিছু প্যাকেট এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছে দিতাম। এটাই আমার কাজ। সেই প্যাকেটে কী আছে আমি তা জানতাম না। গ্রেনেডও থাকতে পারে। বিস্ফোরকও থাকতে পারে। টাকা পয়সাও। আমাদের মূল কাজটা ছিলো লিয়াজো মেইনটেনন করা। 
যেদিন মুহসীন হলে রেইট হলো। সেদিন আমরা কয়েকজন– আমি আর হুমায়ূন আহমেদ হলের ভেতরে ছিলাম। রফিক নওশাদ ছিলো। রফিক কায়সারও ছিলো। হুমায়ূন কবির হলে থাকতো না, তার বোনের বাসায় থাকতো। 
তো তখন থেকেই বলা হলো, তোমরা এখন যে যার মতো করে আলাদা হয়ে যাও। বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। তবে এসময় র‌্যানডন কিলিং হবে সেফটিতে চলে যাও। 
সকাল থেকেই বুঝতে পারলাম একটা ফয়সালা হয়ে যাবে। ইন্ডিয়ান প্লেন থেকে সারেন্ডারের কাগজপত্র ফেলা হলো। 
১৪ তারিখ ঠিক একটা কি দেড়টার দিকে দেখলাম ট্রাক ভর্তি পাকিস্তানী আর্মি বেরিয়ে উত্তর দিকে অর্থাৎ মিরপুরের দিকে যাচ্ছে। যাওয়ার পথে কী পরিমাণ যে বৃষ্টির মতো গুলি করতে করতে যাচ্ছে। কখনও কখনও ঘরের ভেতর গুলি ঢুকে পড়ছে। তখন বাচ্চাদের চিল্লাফাল্লা শুনে আমাদের ঘরটা কিন্তু টার্গেট হয়ে গেল। আমি দেখলাম এখান থেকে পালানো ছাড়া পথ নেই। তখন পেছনের দিকের একটা বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। সেই বাড়ির চারপাশে তখন মিলেটারি ঘিরে ফেলেছে। ওই বাড়িতে এক মহিলা আছেন তাকে বললাম, মা আমাকে বাঁচান। উনি বললেন, বাবা আমার জীবন থাকতে তোমার কিছু হবে না। তখন একটা আলমারি টেনে তার পেছনের দিকে আমি লুকিয়ে পড়লাম। বাড়ির দরোজাটা খোলা রেখেই তিনি বসে থাকলেন। অবাক কাণ্ড, আর্মিরা বাড়ির ভেতর ঢুকে নাই। জিজ্ঞেস করেছে ভেতরে কেউ আছে কিনা? উনি বলেছেন, কেউ নেই। দরোজা জানালা খুলে রেখেছি দেখতে পাচ্ছো না? এটা বেশিক্ষণ না, ঘণ্টাখানেক আলমারির ফেছনে লুকিয়ে ছিলাম। তারপর সেখান থেকে পালালাম। 
পাকিস্তানী সৈন্যরা সারেন্ডার করতে যাওয়ার সময়ও কিন্তু গুলি করছিলো। শেরাটনের কাছে এসে ওরা কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা বা ইন্ডিয়ান আর্মির উপর গুলি ছুড়েছিলো। সাধারণ মানুষের উপরেও গুলি ছুড়েছে নির্বিকারভাবে।
আমরা রেসকোর্সের দিকে যেতে শুরু করলাম। কিন্তু এলিফেন্ট রোডের পর থেকে আর যেতে পারছিলাম না। ওইখান থেকেই নানা ধরণের বাধা আসতে শুরু করলো। আমরা শাহবাগ পর্যন্তই যেতে পেরেছি। 
তখন রাস্তায় প্রচুর মানুষ বেরিয়ে এসেছে। মানুষ কম ছিলো সকালের দিকে। দুইটা আড়াইটার দিকে মানুষ বেরুতে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারা জড়ো হতে থাকে। জিপ নিয়ে ঘুরতে থাকে। শ্লোগান দিচ্ছে গান গাইছে। পতাকা উড়েছে। চিৎকার করেছে। ফাঁকা গুলি করেছে। উচ্ছাস যাকে বলে!
১৫ তারিখে যখন বুঝতে পারলোম বাংলাদেশ স্বাধীন হচ্ছে। তাহলে আমার অবশ্যই একটা নতুন স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবো। ১৬ তারিখ একটা ষোড়শ বাহিনিও তৈরি হয়েছিলো। যারা আসলে মুক্তিযোদ্ধা না। তারা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জাহির করলো। এই ষোড়শ বাহিনির দাপট দেখে একটা মিশ্র অনুভূতি হলো, ভাবছিলাম যেই স্বাধীনতা আমরা পেয়ে গেলাম সেটা আমরা কীভাবে রক্ষা করতে পারবো?
ভেতরে তো বিজয়ের আনন্দ ছিলোই। সেদিনই কবিতা লিখেছিলাম– ‘তোমার হাড়গোড় জ্যোৎস্না রাতে উড়ে যাওয়া সাদা কবুতর।’ 

মুহম্মদ নূরুল হুদা : কবি



 
মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঘটছে : কায়সার হক

আমরা দিনাজপুরে যুদ্ধ করছিলাম। নভেম্বর থেকে একেবারে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিলাম দিনাজপুর শহরের দক্ষিণ দিকে রামসাগর বলে একটা পাহাড় আছে সেখানে। সেখানে একটা দীঘি আছে যেটাকে রামসাগর দীঘি বলে। ওখানে পাকিস্তানীরা দীঘির চারপাশ জুড়ে ছোট ছোট দূর্গ বানিয়েছিলো। গ্রামের লোকদের তাড়িয়ে তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে টিন-বেড়া খুলে এনে এই দূর্গ বানিয়েছিলো। আমাদের অপারেশনের এরিয়া ছিলো ওটাই। প্রথমে অক্টোবরে আমরা সেখানে গেলাম। অবস্থা বুঝে আমাকে আবার পাঠানো হলো দিনাজপুর শহরে, মেইন ক্যাম্পে। সেখানে একটা কম্পানি গঠন করে তাদের নিয়ে গেলাম অপারেশন স্থলে। পরে আরো কয়েকটি কম্পানি এসে যোগ দেয় আমাদের লোকবল বাড়ানোর জন্য। তারপর আমরা আক্রমণ শুরু করলাম এবং একটা একটা দূর্গ থেকে তাদের তাড়াতে শুরু করলাম। ব্যাপারটা মোটেও সহজ ছিলো না। কারণ অনেকগুলো দূর্গ। তাদের সঙ্গে অত্যাধুনিক অস্ত্রসস্ত্র ছিলো। আমাদের আক্রমণগুলো হতো সাধারণত ভোরবেলায়। এভাবেই মোটামুটি আমরা ষোল ডিসেম্বরের কাছাকাছি চলে এসেছি। অবশ্য তখনও মূল ক্যাম্পে আক্রমণ করা বাকি। পাকিস্তানীরাও আমাদের পাল্টা আক্রমণ করার চেষ্টা করেছিলো। একদিন আচমকা ভোরবেলায় পেছনের নদীর ওইপাড় থেকে আক্রমণ করে বসলো। আগেভাগে এটা বুঝতে পেরে আমরা গোলাগুলি শুরু করি। ফলে তারা পিছু হটে যায়। 
১৫ ডিসেম্বর উপর থেকে খবর এলো শহরের মূল ক্যাম্পে যেনো আক্রমণ না করি। খবর শুনে মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঘটছে। সেটা সম্ভবত পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পন জাতীয় কিছু হবে। এটা জানতে পেরেছি মিত্র বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করে। নদীর নিচ দিয়ে তারের মাধ্যমে এই খবর আমাদের কাছে আসে। এর মধ্যেই আমাদের পশ্চিম দিকে আরেকটি টিম ছিলো। তারা আক্রমণ করে বসে এবং সেখানে ক্যাপ্টেন ইদ্রিস পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। 
১৫ ডিসেম্বর রাতে হঠাৎ করে গ্রুম গ্রুম আওয়াজ আসতে থাকলো। আমরা ভাবলাম কী ব্যাপার? ওরা আবার ট্যাঙ্ক নিয়ে আক্রমণ করতে এলো কিনা? আমরাও তাড়াহুড়ো করে যে যার মতো প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। কিন্তু দেখলাম আসলে তা নয়, পাকিস্তানী আর্মিরা তাদের তল্পিতল্পা নিয়ে সারিবদ্ধভাবে গাড়িতে করে আত্মসমপর্ণের জন্য সৈয়দপুর ক্যান্টমেন্টের দিকে যাচ্ছে। ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রুপগুলোকে একত্রিত করে ফেলেছে।

যেটা চিন্তা করলে খুব খারাপ লাগে যে, সেই সময়ই কিছু ছোট ছোট মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রুপ উল্লাসে মেতে পাকিস্তানী সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করে এবং কয়েক জায়গায় পুঁতে রাখা ল্যান্ড মাইনের কবলে পড়ে। এটার কোনো দরকারই ছিলো না। 
১৬ ডিসেম্বর সকালে আমরা সার্কিট হাউসে অবস্থান করছিলাম। পরে পুরো দিনাজপুরকে সেক্টর ৬-এর দায়িত্বে বুঝিয়ে দিয়ে আমরা অপেক্ষা করছি পরবর্তী নির্দেশনার জন্য। আমাদের বেশিরভাগ ছেলেপেলেই ছিলো ওই এলাকার। ওদেরকে ছুটি দেওয়া হলো বাড়িতে দেখা করে আসতে। আমরা বাকিরা বগুড়া চলে গেলাম। বগুড়া গিয়ে আমি বাড়িতে খবর নিতে টেলিগ্রাম করলাম। চারদিকে মাইকে ঘোষণা হচ্ছে। আমরা বুঝতে পারছি সারেন্ডারের কাজকর্ম চলছে। 
এসময় আমার অনুভূতি ছিলো যে, হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক শেষ হলো। এই পরিণতিই আমরা মেনে নিতে পারতাম, অন্য কিছু নয়। আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো ওদেরকে এদেশ থেকে বের করা। বাংলাদেশের উপর থেকে তাদের দখলদারিত্বকে শেষ করে দেওয়া। ওই সময় তাদের চেহারায় পরাজিত সৈন্যের ছাপই ছিলো। কিন্তু এখন এতবছর পর তারা যেসব বলছে তা আসলেই হাস্যকর। এরমধ্যেও তাদের কয়েকজন যারা অনুভূতিসম্পন্ন তারা পুরো ব্যপারটা স্বীকার করেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমাও চেয়েছেন।   
একটা ব্যাপার ভাবতে ভালো লাগে আবার অবাকও হই যে, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের বেশিরভাগই গ্রামের অল্প বয়সী সাধারণ ছেলেপুলে। দেশ স্বাধীন হবার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আসলে তাদেরই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য তাদের দুর্ভোগ খুব একটা দূর করতে পারেনি।   

কায়সার হক : কবি


 

উত্তর শুনে কর্নেল ভড়কে যায় : শামছুজ্জামান সেলিম

১৬ ডিসেম্বর আমাদের বাহিনী ছিলো মানিকনগর গ্রামে। ঈশ্বরদী শহর থেকে মাইল তিনেক ভেতরে মানিকনগর গ্রাম। বিকেল ৪টার দিকে হঠাৎ ফাঁকা গুলির শব্দ হচ্ছিল। ব্যাপারটা স্বাভাবিক ছিলো না। কারণ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পেটের ভেতরে থেকে আকাশে ফাঁকা গুলি ছোড়া আর আত্মহত্যা করার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। সে সময় ফোন এত সহজলভ্য ছিল না। আমরা প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা করে জানলাম যে, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। যারা নিয়মিত রেডিও শুনতেন তারা জানালেন, মিত্রবাহিনীর কাছে নিয়াজি আত্মসমর্পণ করেছে। তখন আমাদের ছেলেরাও কিছু গুলি ফুটিয়ে বিজয় উল্লাসে মেতে উঠেছে।
ঈশ্বরদীতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে ২১ ডিসেম্বর। ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্রে এলিফ্যান্ট ডিভিশনের বিগ্রেডিয়ার রঘুবীর সিং-এর কাছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিগ্রেডিয়ার মঞ্জুর আহমেদ আত্মসমর্পণ করেন। দিন কয়েক পূর্বে একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে ঈশ্বরদীতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ওখানে যে সব তথ্য দেয়া হয়েছে তার সবটা সঠিক নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে ইদানিং যে সব তথ্য পরিবেশন করা হচ্ছে তা যথেষ্ট একপেশে এবং বিভ্রান্তিকর। ঐ রির্পোটে এমন একজনের বরাত দিয়ে ইতিহাস বলানো হয়েছে যে, তিনি সেদিন ঈশ্বরদীতে উপস্থিতই ছিলেন না।
সে যাই হোক, আমরা আমাদের বাহিনী নিয়ে ১৮ ডিসেম্বর প্রথমবারের মত ঈশ্বরদীতে প্রবেশ করি। শের শাহ্ সড়ক এবং নতুন বাজারে যাই। তখনও পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেনি। বিহারিদের মধ্যে আমরা অস্থিরতা দেখতে পাই। বিহারিরা তখনো সশস্ত্র ছিল। আমরা আমাদের বাড়িঘর ধংসস্তুপ হিসেবে দেখলাম। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, উঠানে মাটি খুঁড়ে বাংকার বানানো হয়েছে। আমাদের কিছু কিছু আত্মীয়স্বজন এবং পার্টি নেতা-কর্মিদের খোঁজ নিতে গিয়ে জানলাম ভয়ানক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে রাজাকার, বিহারি এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। দুপুরের পর আমরা ঈশ্বরদী ছেড়ে আসি। এরপর আমরা ২১ ডিসেম্বর আমাদের বাহিনীকে নিয়ে ঈশ্বরদী শহরে চলে আসি।
১৬ ডিসেম্বরের কয়েকদিন পূর্বের এবং পরের এমন অনেক স্মৃতি রয়েছে যা এভাবে লিখে শেষ হবে না। তবে একটি ঘটনার কথা বলেই এবারের মত শেষ করতে চাই। সম্ভবতঃ ১৭ ডিসেম্বর হবে। তখন খুব সকাল। আমাদের ছেলেদের শোরগোল শুনে আইকে রোডের দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম রাস্তার ধারে একটা জটলা; একটা মানুষকে ঘিরে উত্তেজিত অবস্থায় আছে। গিয়ে দেখলাম সেখানে আমাদের বাহিনীর নাসিম, মুক্তার হোসেন ভান্টুসহ অনেকেই আছে। দেখলাম একটা খাটো আকারের মাঝ বয়সী মানুষ, গায়ের রং শ্যামলা। হাফ শার্ট এবং প্যান্ট পরা। বগলে একটা ব্যাগ রয়েছে। লোকটা ভান্টু এবং নাসিমকে বলছে, ‘আপলোগ ছুরি মাৎ মারো, গোলিছে মার’! সংক্ষেপে বিষয়টা এমন, ধৃত লোকটা পাকিস্তানী বালুচ রেজিমেন্টের সদস্য। আলহাজ টেক্সটাইল মিলে তার বাহিনীর সঙ্গে ছিল। খুব ভোরে সেখান থেকে সে পালিয়ে ভারত যাওয়ার চেষ্টা করছিল। ভারতে যেতে পারলে সেখান থেকে পাকিস্তান যেতে পারবে বলে মনে করেছিল। কিন্তু রাস্তায় আমাদের বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যায়। তার মনে হয়েছিল তাকে মেরে ফেলা হবে। ওদের ধারণা ছিলো ‘মুক্তিরা’ কোনো পাকিস্তানী সেনা সদস্যকে জীবিত ছেড়ে দেয় না।
আমাকে দেখার পর ওর কেনো যেন ধারণা হয়েছিল আমি হয়তো ওকে বাঁচাতে পারি। হঠাৎ লোকটি ওর বগলে থাকা ব্যাগটি আমার সম্মুখে খুলে ধরলো। আমরা সকলেই দেখলাম ব্যাগটি পাকিস্তানী একশত ও পঞ্চাশ টাকার বান্ডিলে ঠাসা। ও তখন আবার বলতে শুরু করলো, ‘আপ রুপিয়া লে লিয়ে ভাই, মেরে বাঁচা লিয়ে’। ও আরো বললো সে আলহাজ টেক্সটাইল মিল থেকে এসেছে, ওখানে ওর সাথীরা আছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, ওকে টাকাসহ এলিফেন্ট ডিভিশনের কর্নেলের কাছে নিয়ে যাওয়া হোক। নাসিমের নেতৃত্বে আমাদের ছেলেরা ওকে কর্নেলের কাছে নিয়ে যায়। পরে নাসিম এবং আমাদের ছেলেদের মুখে রিপোর্ট শুনলাম। প্রথমে কর্নেল খুব অবাক হয়েছিল টাকাসহ ওকে তার কাছে নিয়ে যাওয়ায়। কর্নেল বলেছিল, কিউঁ এধার লে আয়া ভাই, এ তো দো পয়সাকা এক বুলেট কি মামলা থি। নাসিম বলেছিল, ও তো যুদ্ধবন্দি ওকে কেনো মারবো? উত্তর শুনে কর্নেল ভড়কে যায় এবং একজন হাবিলদারকে দিয়ে ঐ বালুচকে আলহাজ মিলে পাঠিয়ে দেয় এবং টাকাগুলো বুঝে নিয়ে রশিদ দিয়েছিলন কর্নেল। আমার যতদুর মনে পড়ে ঐ ব্যাগে লক্ষাধিক পাকিস্তানী টাকা ছিলো। 

শামছুজ্জামান সেলিম : রাজনীতিক


 

গ্রন্থনা ও শ্রুতিলিখন : জাহিদ সোহাগ

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।