রাত ০২:২২ ; সোমবার ;  ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৬  

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও বেহালা || শিউলী ভট্টাচার্যী

প্রকাশিত:

‘‘প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন গান্ধর্ব গানই পরবর্তীকালে পরিবর্তনের রূপ ধরে দেশী সংগীতে পরিণত হয়। কিন্তু এই দেশী সংগীত বলতে গ্রাম্য বা লোক সংগীত নয়। তা ছিল শাস্ত্রীয় সংগীতেরই অন্তর্ভুক্ত। তারপর ক্রমানুসারে কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে সংগীতেরও অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়।’’

 

“গীতং বাদ্যং তথা নৃত্যং ত্রয়ং সংগীতমুচ্যতে”  
গীত, বাদ্য এবং নৃত্য এই তিনটি শিল্পকলার সম্মিলনকেই সংগীত নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বাস্তবিক অর্থে এই তিনটি কলাই একটি থেকে আরেকটি সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র বা আলাদা আলাদা পরিচয়ে পরিচিত। কিন্তু আলাদা হয়েও একে অন্যের পরিপূরক, কেননা এই তিনটির একত্র মিলনকেই সংগীত বলে। শুধু গীত যেমন সংগীতের সংজ্ঞা হতে পারে না তেমনি শুধু বাদ্য বা নৃত্যও নয়।
প্রকৃত অর্থে সংগীত বিদ্যা মানুষেরই সৃষ্টি। সংগীতকে শুধুমাত্র একক কোন শিল্পকলাতেই আবদ্ধ করা যায় না, কারণ এটি বিজ্ঞানেরও অংশ এবং এই বিজ্ঞানভিত্তিক শিল্পকলা গঠিত হয়েছে অনেক যুগের মানুষের অবদানের ভিত্তিতে। তাই ঠিক কবে এবং কোথায় সংগীতের সৃষ্টি, তার নির্ধারিত কোন সময় বা স্থান নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
“সংগীতের ইতিহাস” কালের বা সময়ের বিভাজন মাত্র। প্রত্যেক যুগের অবস্থা-অবস্থান অনুযায়ী সংগীতের উন্নতি সাধন হয়ে থাকে। সংগীতের তাত্ত্বিক গবেষকগণ সংগীতের উন্নতি সাধনে ক্রমানুসারে চারটি যুগের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন-
 (১) অতি প্রাচীন যুগ (২) প্রাচীন যুগ (৩) মধ্য যুগ (৪) বর্তমান বা আধুনিক যুগ।
প্রত্যেক যুগে সংগীতের উন্নতি তৎকালিন সময়কে করেছে সমৃদ্ধ। 
সিন্ধু সভ্যতাকে যদি প্রাকবৈদিক সময়কাল ধরা হয় তাহলে বলা যায় যে, বৈদিক যুগের পূর্বেও ভারতে সংগীত কলার প্রসার ঘটেছিল। স্টুয়ার্ট পিগ্ট তাঁর Prehistoric India গ্রন্থে বলেছেন- “নৃত্যের সঙ্গে অনেক সহযোগী বাদ্যের নিদর্শন সে সময়ে ছিল। তাছাড়া তন্ত্রীযুক্ত বীণা জাতীয় বাদ্যযন্ত্রও সে যুগে ব্যবহৃত হতো। এগুলিতে ধ্বনিত হতো সাতটি স্বর।”
আর্য সভ্যতার শুরুর সময়কেই বৈদিক যুগের প্রারম্ভ কাল বলা হয়ে থাকে। আর্যরা প্রথমে যে জায়গায় বসতি স্থাপন করেন তা বৈদিক সাহিত্যে ‘সপ্তসিন্ধু’ নামে উল্লিখিত হয়েছে। বৈদিক যুগকে শিল্পী হ্যাভেল বলেছেন- “an age of wonderful artistic riches.” সত্যিই সব দিক থেকে বৈদিক যুগ শুধু ভারতের নয়, বিশ্বসভ্যতার একটি স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। এই স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ে রয়েছে সাহিত্য, শিল্প, দর্শনের সঙ্গে সংগীতের স্বাক্ষর। বৈদিক যুগে স্ত্রী-পুরুষ সমভাবে সংগীতের চর্চা করতেন। কোন রকম বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হতো না কাউকেই। মেয়েদের বীণা বাজানো সে যুগে একটি সম্মানজনক বিষয় ছিল। তখনকার সমাজ ব্যবস্থায় শিল্পীদের স্থান ছিল সম্মানের। শিল্পীদের স্থান সম্মানজনক হওয়ার কারণে সামান্য জনপ্রিয়তা বা প্রলোভনের গুরুত্ব তাদের কাছে ছিল অতি নগণ্য। তাঁরা শিল্পকলার চর্চা করতেন শুদ্ধভাবে এবং তা ছিল যথেষ্ট সময় সাপেক্ষ। শিল্প সাধনার জন্য তাঁরা কঠিনতর সময় ব্যয় করতেন এবং বৈষয়িক কোন আকর্ষণ তাঁদের কাছে কোন রকম গুরুত্ব পেতো না।
সমগ্র আর্যজাতির প্রাচীনতম গ্রন্থ ‘বেদ’। বেদের চারটি ভাগ রয়েছে। যেমন- ঋক্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদ। এদের মধ্যে ‘সামবেদ’-কে ভারতীয় সংগীতের উৎস বলা হয়ে থাকে, যদিও এই বিষয়টি নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। কারণ বৈদিক সভ্যতার আগেও ভারতে সভ্যতা ছিল এবং অনার্য, দ্রাবিড় প্রভৃতি জাতির ভাষা ও সংগীতও ছিল। তবে এটা ঠিক যে, সামবেদের যুগে ভারতীয় সংগীতের এক সুস্পষ্ট রূপ দেখতে পাওয়া যায়।
বৈদিক যুগে বহু রকমের বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন ছিল– বৈদিক সাহিত্যে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। বৈদিক যুগের বাদ্যযন্ত্র হিসাবে ক্ষৌণী, আঘাতী, ঘাতলিকা, কাণ্ডি, বাণ, ঔদুস্বরী, কাত্যায়নী, পিনাকী, পিচ্ছোরা প্রভৃতি বেণু ও বীণার নাম পাওয়া যায়। এছাড়াও দুন্দুভি, ভূমি-দুন্দুভি, গর্গর, পিঙ্গ, নাড়ী, বনস্পতি, অদম্বর, কর্করি ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রেরও উল্লেখ রয়েছে।
ধনুর্যন্ত্রের উল্লেখও বৈদিক সাহিত্যে রয়েছে। এই ধনুর্যন্ত্র থেকেই পরবর্তী যুগে বেহালার সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেক গবেষক মনে করেন। বৈদিক যুগের যে সংগীত তাকে গান্ধর্ব (যা মার্গ সংগীত নামেও পরিচিত ছিল) সংগীত বলে অভিহিত করা হতো।
শার্ঙ্গদেব তাঁর “সংগীত রত্মাকর” গ্রন্থে গান্ধর্ব গানের পরিচয় দিতে গিয়ে এই শ্রেণির সংগীতকে উচ্চমার্গীয় সংগীত নামে উল্লেখ করেছেন। তাঁর গ্রন্থের প্রবন্ধ অধ্যায়ে তিনি গান্ধর্ব গানের দুইটি শ্রেণির কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন ‘মার্গ’ ও ‘দেশী’। গান্ধর্ব গানের সূত্র নির্ধারণ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন– অনাদি কাল ধরে গুরুশিষ্য পরম্পরায় গান্ধর্বরা (এক ধরনের জাতি বিশেষ) সংগীতের অনুশীলন ও প্রচার করে আসছে যা শাস্ত্রীয় সংগীতের সমস্ত নিয়মাবলী মেনে চর্চা করা হতো, তাকেই গান্ধর্ব গীত বলা হতো। 
প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন গান্ধর্ব গানই পরবর্তীকালে পরিবর্তনের রূপ ধরে দেশী সংগীতে পরিণত হয়। কিন্তু এই দেশী সংগীত বলতে গ্রাম্য বা লোক সংগীত নয়। তা ছিল শাস্ত্রীয় সংগীতেরই অন্তর্ভুক্ত। তারপর ক্রমানুসারে কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে সংগীতেরও অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়। সংগীতের পরিবর্তন বলতে এখানে বাদ্যযন্ত্র বা যন্ত্রসংগীতের বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ্য। বৈদিক পরবর্তী প্রত্যেক যুগেই নৃত্য, গীত ও বাদ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেসব বাদ্যযন্ত্রের বিভিন্ন প্রকার নামও পাওয়া যায়। যা পরবর্তীতে বহু পরিবর্তিত ও পরিশোধিত হয়ে সামনে এসেছে।
খ্রিস্ট্রিয় দ্বাদশ শতাব্দী থেকে ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণ নতুন রূপ ধারণ করে সামনে আসে, যাকে বলা হয়েছে মুসলমান সভ্যতা। ঐ সময়ে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদান শুরু হয়। ফলে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও ঘটতে থাকে। একই সঙ্গে ভারতীয় সংগীতেরও নানা পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তন আলাউদ্দিন খিলজির রাজত্বকাল (১২৯৬-১৩১৬) থেকে। এই কালটি সংস্কৃতিচর্চার পক্ষে খুব একটা অনুকূল ছিল না। তথাপি এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সে আমলের একটি উজ্জ্বল দিক হচ্ছে এই যে, মুঘল আমলে শিল্প সংস্কৃতির যে বিকাশ ঘটে তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল এই সুলতানী আমলে। সে আমলে সংগীতের যে বিকাশ ঘটে তার বিবরণ পাওয়া যায় জীয়াউদ্দীন রচিত “তারিখ-ই ফিরুজশাহী” (১৩৫৯) গ্রন্থে। তখন রবাব যন্ত্রের অধিক প্রচলন ছিল।
মধ্য যুগকে (আলাউদ্দিন খিলজীর রাজত্বকাল) সংগীতের উন্নতির দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মানা হয়। সে সময় একটি সম্ভ্রান্ত তুর্কী পরিবারে অন্যতম সংগীতজ্ঞ আমির খসরু জন্মগ্রহণ করেন, যার দ্বারা ভারতে বিশেষ করে উত্তর ভারতে সংগীতের বহুল সৃষ্টি, প্রচার ও প্রসার হয়। তাঁর সৃষ্টিতে মিশ্রণের বৈশিষ্ট বিশেষ লক্ষণীয়। যেমন এক রাগের সাথে অন্য রাগের মিশ্রণে নতুন রাগ সৃষ্টি, বাদ্যযন্ত্রের পরিবর্তন, মূর্চ্ছনার পরিবর্তন, সাতটি স্বরের মূর্চ্ছনার মধ্যে তিনি শুদ্ধ এবং বিকৃতরূপের একসঙ্গে প্রয়োগ করে স্বরের সংখ্যা বর্ধিত করেছেন যার ফলে বারোটি স্বরযুক্ত সপ্তক সৃষ্টি হয় এবং ঠাটেরও উদ্ভব হয়। প্রাচীন বীণা জাতীয় বাদ্যযন্ত্রেরও তখন অনেক পরিবর্তন হতে থাকে। গবেষণার ফল স্বরূপ বিভিন্ন প্রকার বাদ্যযন্ত্রেরও বিকাশ ঘটতে থাকে। যন্ত্র সংগীতে আমীর খসরুর অবদান উল্লেখযোগ্য। H. A. Popley  বলেছেন-“The Sitar, a modification of Vina was probably first introduced by him.”
প্রাচীনকালের সুমিষ্ট বেদমন্ত্র থেকে উদ্ভুত ‘সামবেদ’ (সাম অর্থ সুর) ‘ঋক্’ মন্ত্রের সাথে সংযোজিত হয়ে সামগানে রূপ লাভ করে এবং বিকশিত হয়। পরবর্তী সময়ে বৈদিকোত্তর লৌকিক সংগীত এবং মার্গ ও দেশীয় সংগীতের মধ্যে একটি নিবিড় যোগসূত্র স্থাপিত হয় এবং দেশী গান বা রাগ মার্গ শ্রেণীর (শাস্ত্রীয় ধারার) মর্যাদা লাভ করে।
এরপর বৈদিক সাহিত্যের যুগ যতই সমাপ্তির দিকে এগিয়ে আসছিল সমাজ ও সভ্যতার চিত্র ততই পরিবর্তিত হচ্ছিল।
উল্লেখ্য যে, প্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দেশগুলোর যোগসূত্র সেই সময় থেকেই আরম্ভ হতে থাকে। ভারত থেকে পারসীয়ানদের মাধ্যমে সাংগীতিক সামগ্রী আরবে পৌঁছায় এবং যেখান থেকে ইউরোপে তা প্রসার লাভ করতে থাকে।
ভৌগলিক সীমারেখায় উত্তর ভারত, মধ্য ভারত ও দক্ষিণ ভারত এই তিন বিভাগের অস্তিত্ব যদিও বিদ্যমান কিন্তু ১৪শ শতাব্দী পর্যন্ত উত্তর-দক্ষিণ বলে সংগীতের কোন ভেদ ছিল না। তখন এক অখণ্ড সংগীত ধারা ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। গান্ধর্ব বা মার্গসংগীত থেকে প্রবন্ধ সংগীত এবং প্রবন্ধ সংগীত থেকে ধ্রুপদ সংগীত এই রূপ পরিবর্তন তখন পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ভারতবর্ষে মুঘলদের আগমনের পর সংগীত ধারায় এক নতুন পরিবর্তন সাধিত হয়। ঠিক ঐ সময়েই উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় সংগীত নামে দুই ধারার সংগীতের আবির্ভাব ঘটে। দক্ষিণ ভারতীয় সংগীত কর্ণাটকী সংগীত ও উত্তর ভারতীয় সংগীত হিন্দুস্তানী সংগীত রূপে পরিচিতি লাভ করে। শুধু তাই নয়, বহির্বিশ্বের সাথেও ব্যবসায়িক যোগসূত্র তখন থেকেই আরও বেশী সুদৃঢ় হতে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই তথ্য পৌঁছে গিয়েছিল যে, প্রাচুর্য এবং ঐশ্বর্যের সমৃদ্ধশালী দেশ হচ্ছে ভারতবর্ষ। যদিও এর অনেক আগে থেকেই ভারতে বিদেশীদের আগমন এবং স্থায়ীভাবে বসবাসও শুরু হয়ে গিয়েছিল কিন্তু তারা ব্যবসায়িক সূত্র ধরেই শুধু নয় স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যও চলে এসেছিলেন।
মুঘল শাসনের শুরুর দিকে ভারতের সাংগীতিক পরিস্থিতি খুব একটা সন্তোষজনক ছিল না। কোন কোন মুঘল শাসক সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতায় রুচিশীল ছিলেন না। কিন্তু সংগীতজ্ঞদের সাধনা কখনই থেমে থাকেনি। তাঁরা তাঁদের কর্তব্যে কোন রকম ত্রুটি রাখেননি, যার ফলস্বরূপ আমরা সংগীতের এই পরিবর্তন পরিশোধন দেখতে পাই।
মুঘল শাসনামলে সংগীতের অনেক উন্নতি হয়েছিল মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে। সম্রাট আকবর সংগীতের একজন মহান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর আমলে সংগীতজ্ঞদের অবাধ সৃষ্টির সুযোগ ছিল। কী কণ্ঠ সংগীত, কী যন্ত্র সংগীত বা নৃত্য কোন কিছুতেই সৃষ্টি বা প্রচার-প্রসারের কোন প্রকার বিধি নিষেধ তখন ছিল না। তাঁর আমল সমগ্র সংস্কৃতির উন্নতির এক উজ্জ্বলতর অধ্যায়।
উল্লেখ্য যে, ভারতবর্ষে তখন অনেক জাতি-গোষ্ঠীর সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটছিল। মুঘল শাসনের শুরুর আগেই ভারতে ইউরোপীয় জাতি গোষ্ঠীর আগমন শুরু হয়ে গিয়েছিল। তারা ব্যবসায়িক সূত্রে ভারতবর্ষে আসতেন এবং তাদের মনোরঞ্জনের জন্য শিল্পীদের সাথে করে নিয়ে আসতেন। ফলে ইউরোপীয় সংস্কৃতির মিশ্রণও ঘটছিল স্বভাবিকভাবেই।
ইউরোপীয়দের আগমন দক্ষিণ ভারতের সমুদ্রপথে শুরু হয়েছিল এবং তারা সেই সব অঞ্চলকেই তাদের ব্যবসায়িক স্থান বা ঘাটি বানিয়েছিলো। ফলে তাদের সংস্কৃতির মিশ্রণটাও সেখান থেকেই শুরু হয়। বাদ্যযন্ত্র হিসেবে তারা সাথে করে নিয়ে আসতেন- বেহালা, পিয়ানো, গীটার, ক্ল্যারিওনেট ইত্যাদি আরও অনেক ধরনের বাদ্যযন্ত্র।
এই সব বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে বেহালা নামক বাদ্যযন্ত্রটি নিয়ে সংগীতের ইতিহাসে অনেক মতভেদ আছে যা এই লেখাটিতে বিশদভাবে বর্ণনা এই মূহূর্তে সম্ভব নয়। পরবর্তীতে এর ঐতিহাসিক বিবরণ ও ব্যবহারের বর্ণনা উল্লেখ করা যেতে পারে। তবে সংক্ষেপে বলা যায় যে, বেহালা ভারতীয় প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র বাহুলীন বা বৈদিক যুগের বাদ্যযন্ত্র পিনাকী’রই পরিবর্তিত ও পরিশোধীত সংস্করণ। তবে বর্তমানে বেহলার যে বৈজ্ঞানিক রূপ আমরা দেখতে পাই তা অবশ্যই ইউরোপের অবদান। 

তৎকালীন সময়ে ভারতে অনেক পরিপূর্ণ বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার থাকা সত্বেও বেহালা নামক বিদেশী বাদ্যযন্ত্রটির ভারতীয় সংগীতে স্থান প্রাপ্তি একটি লক্ষণীয় বিষয়। অনেক বাদ্যযন্ত্র ইউরোপের দেশগুলি থেকে এখানে আসতো। তার মধ্যে বেহালা নামক বাদ্যটিই তার নিজস্ব গুণে একটি স্বকীয় স্থান দখল করে নিয়েছে। এ বিষয়ে প্রথমেই যার অবদানের কথা স্বীকার করতে হয় তিনি হলেন দক্ষিণ ভারতের একজন গুণী মনীষী বালুস্বামী দীক্ষিতার (১৭৮৬-১৮৫৮)। তিনি একজন ইউরোপীয় বেহালা বাদকের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেন এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। জনশ্রুতি অনুসারে, দক্ষিণ ভারতের সাঙ্গীতিক ইতিহাসে বালুস্বামী দীক্ষিতার প্রথম ব্যক্তি যিনি বেহালায় সর্বপ্রথম সফলতার সাথে শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশন করে ভারতীয় সংগীতে এই বাদ্যযন্ত্রটিকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করেন। তারপর ধীরে ধীরে এর প্রচলন বাড়তে থাকে এবং সম্পূর্ণ দক্ষিণ ভারতীয় সংগীত ধারায় বেহালার ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। বর্তমানে বেহালা দক্ষিণ ভারতীয় সংগীতের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম সংগীত বাদ্যযন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
দক্ষিণ ভারতের তুলনায় উত্তর ভারতের শাস্ত্রীয় সংগীত ধারায় বেহালার ব্যবহার তুলনামূলকভাবে দেরিতে শুরু হয়। এর কারণ হিসেবে তৎকালীন সময়ে উত্তর ভারতে সেতার ও সরোদের মত পরিপূর্ণ শাস্ত্রীয় তন্ত্রীবাদ্যযন্ত্র এবং সারেঙ্গীর মতো সঙ্গত বাদ্যযন্ত্রের অধিক প্রচলন মনে করা যেতে পারে। তবে পরবর্তীতে শাস্ত্রীয় সংগীত ধারায় বেহালা তার নিজের আসন পাকাপোক্ত করে নেয় বিভিন্ন গুনী বাদকের হাত ধরে। তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম যার নাম ইতিহাসে পাওয়া যায় তিনি হলেন শ্রী গগন বাবু। তাঁর সম্পর্কে এর বেশী তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর পরবর্তীতে উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি শুধুমাত্র বেহালাই নয়, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী ছিলেন এবং বিশ্বের সংগীত জগতে উত্তর ভারতীয় সংগীতের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়ে সংগীত জগৎকে করেছেন সমৃদ্ধ। তাঁরই হাত ধরে তাঁর শিষ্য পণ্ডিত ভি. জি. যোগও বিশ্বের সংগীত জগতে বিশেষ এই বাদ্যযন্ত্রের প্রচার-প্রসারে অতুলনীয় অবদান রেখে গেছেন। যদিও শাস্ত্রীয় বাদনের অনেক আগে থেকেই বাংলা অঞ্চলে লঘু সংগীতের বিভিন্ন ধারায় বেহালার ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়।

যখন থেকে বাংলা অঞ্চলের লঘু সংগীতের বিভিন্ন ধারায় বেহালা বাদ্যযন্ত্রটি লোকপ্রিয়তা অর্জন করেছিল তখন উত্তর ভারতের শাস্ত্রীয় সংগীত জগতে বেহালা বাদনের প্রারম্ভিক কাল। ১৮০৪ সালে রামনিধি গুপ্ত যখন আখড়াই গানের প্রবর্তন করেছিলেন, ঐ সময়কার সংগীত জগতে বেহালার বিশেষ ব্যবহার ছিল। James Taylor (জেমস্ টেলর) রচিত “টপোগ্রাফি অব ঢাকা”-র বাংলা অনুদিত গ্রন্থ ‘কোম্পানি আমলে ঢাকা’-(পৃ-২১৩)-তে উল্লেখ আছে, বেহালা নামক বাদ্যযন্ত্রটি এই অঞ্চলে (তৎকালীন পূর্ববাংলা) অধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। বিশেষ করে গোসাই এবং বাউল সম্প্রদায়ের শিল্পীরা এই বাদ্যযন্ত্রের মূখ্য বাদক ছিলেন। এ থেকেবলা যায়, বেহালায় শাস্ত্রীয় বাদন আরম্ভ হওয়ার পূর্বে বাংলা অঞ্চলে তথা বাংলাদেশের লোকজ ধারায় এর অধিক প্রচলন এবং জনপ্রিয়তা ছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশে ছড়বাদ্য গোষ্ঠীর মধ্যে বেহালার ব্যবহার অধিক দৃষ্টিগোচর হয়। অন্যান্য ছড়বাদ্য সমূহ যেমন- সারেঙ্গী, দিলরুবা, এস্রাজ তথা লোক বাদ্যযন্ত্র সারিন্দা ইত্যাদির ব্যবহার খুব একটা দেখা যায় না, বলতে গেলে তা প্রায় বিলুপ্তির পথে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগে বাংলাদেশে অনেক গুণী বাদক ছিলেন যারা বিভিন্ন ছড়বাদ্যের শাস্ত্রীয় বাদনের সাথে সাথে সহযোগী বাদকের ভূমিকাও পালন করতেন। দেশভাগের পর তাঁদের অনেকেই বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। ফলে এদেশে গুণী বাদকের সংখ্যা কমতে থাকে এবং শুদ্ধ সংগীতের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। 
বর্তমানে বাংলাদেশে শাস্ত্রীয় সংগীতের অবস্থা-অবস্থান খুব শক্তিশালী নয়। তবুও শাস্ত্রীয় জগতে সেতার, তবলা ও কণ্ঠ সংগীতের ব্যবহার যতটা দেখা যায়, বেহালার ততটা নয়। শাস্ত্রীয় একক বাদনের তুলনায় সংগীতের বিভিন্ন ধারায় সহযোগী বাদ্যরূপে এই বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার কিছুটা লক্ষণীয় কিন্তু খুব একটা শক্তিশালী বলা চলে না। বর্তমানে শাস্ত্রীয় একক বাদন কম দেখা যায়।কারণ গুরুমুখী বিদ্যায় দীর্ঘ সাধনার প্রয়োজন। যা এ সময়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা যায় না এবং রাষ্ট্রীয় তথা সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবও রয়েছে।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের সমাজের ভিত্তি ও উপরিকাঠামোতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ভিত্তি কাঠামোর পরিবর্তন যেমন দৃশ্যমান হয় কিন্তু উপরিকাঠামোর বিশেষ করে উপরিকাঠামোর অন্যতম উপাদান; সাংস্কৃতিক পরিবর্তন তেমন দৃশ্যমান হয় না। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে তা ঘটতে থাকে। এক সময় যা থাকে কর্তৃত্বমূলক অবস্থানে, সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন কারণে তার সেই অবস্থান বিলীন হয়ে যেতে পারে। একসময় বাংলা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বিকাশ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিল যে, বলা হতো “What Bengal things today, India things tomorrow’’ বর্তমানে সে অবস্থা-অবস্থান যে নেই তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাজার সংস্কৃতির বিকাশের এ সময়ে ‘সংগীত’ সম্পর্কে এ কথাটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য।

শুদ্ধ সংগীতের ক্ষেত্রে যে সমস্ত অভাবের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো একদিনে তৈরি হয়নি। এর নেপথ্যে অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক বহুবিধ কারণ জড়িত। এও সত্য যে খুব শীঘ্রই এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। এর জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা যেমন জরুরি তেমনি আমাদেরও প্রয়োজন সংগীত সম্পর্কে সম্যক ধারণা, জ্ঞান অর্জন এবং নিয়মমাফিক চর্চা। এসব ছাড়া শিল্পকলা সম্পর্কিত যা কিছু তৈরি হোক না কেন তাতে নান্দনিকতা বলে কিছু থাকবে না এবং তা মানুষের শিল্পবোধকে সমৃদ্ধ করবে না।

 


শিউলী ভট্টাচার্যী || ডক্টর অব ফিলোসোফি ইন মিউজিক || সহকারী অধ্যাপক || যন্ত্রসংগীত বিভাগ || সরকারী সংগীত কলেজ || আগারগাঁও, ঢাকা।

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।