সন্ধ্যা ০৬:০৮ ; রবিবার ;  ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬  

সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচের নোবেল ভাষণ : হেরে যাওয়া যুদ্ধের কথা

প্রকাশিত:

‘‘২০১৫ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী বেলারুশের লেখক সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচ গত সোমবার নোবেল ভাষণ দিয়েছেন। জ্যামী গ্যামব্রেল অনূদিত ইংরেজি থেকে বাংলায় তর্জমা করেছেন ফাহমিদা দ্যুতি’’ 

 

এই মঞ্চে আমি একা দাঁড়িয়েছি— এমন নয়। আমার চারপাশে মানুষের কণ্ঠস্বর আছে, হাজার হাজার কণ্ঠস্বর। আমার ছোটবেলা থেকে কণ্ঠস্বরগুলো আমার সঙ্গেই আছে। আমার বেড়ে ওঠা গ্রাম এলাকায়। আমরা ছোটরা বাইরে খেলাধুলা করতে পছন্দ করতাম। তবে সন্ধ্যা নামলেই আমরা ফিরে আসতাম। কারণ তখন নিজেদের কুড়েগুলোর সামনের বেঞ্চে জড়ো হতেন গ্রামের নারীরা। তাদের ক্লান্ত কণ্ঠ আমাদেরকে চুম্বকের মতো টানত। তাদের কারো স্বামী, বাবা কিংবা ভাই ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমাদের গ্রামে কোনো পুরুষ মানুষ দেখেছি বলে মনে পড়ে না। যুদ্ধের সময়ে বেলারুশের প্রতি চারজনের মধ্যে একজন মারা গেছে। তাদের মৃত্যু হয়েছে হয় যুদ্ধ করতে করতে, নয়তো মতাদর্শের বিরোধিতার কারণে। যুদ্ধের পরে আমরা ছোটরা নারীদের জগতে বড় হয়েছি। আমার সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট মনে আছে যে বিয়ষয়টি সেটি হলো, নারীরা মৃত্যু নিয়ে নয়, বরং ভালোবাসা নিয়ে কথা বলতেন। তাদের গল্পের মধ্যে থাকত তাদের ভালোবাসার মানুষটিকে যুদ্ধে যাওয়ার আগের দিন বিদায় দেয়ার কথা। ভালোবাসার মানুষদের জন্য অপেক্ষায় থাকার কথা বলতেন তারা। তাদের গল্পে আরো উঠে আসত কিভাবে তারা তখনও প্রিয়জনদের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় আছেন। বহু বছর চলে গেছে; তবু তারা অপেক্ষায় আছেন। তাদের কারো কারো কথা এমন ছিল— ওর হাত-পা না থাকুক; তবু আমি ওকে চাই। আমিই ওকে বয়ে বেড়াতাম। হাত নেই, পা নেই। আমার মনে হয়, ভালোবাসা কী জিনিস আমি ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি। 

তাদের সম্মিলিত কণ্ঠের কয়েকজনের সুর এখানে তুলে ধরছি-

প্রথম কণ্ঠস্বর
আপনারা এ সম্পর্কে এতকিছু জানতে চান কেন? বিষয়টি তো খুব দুঃখের। যুদ্ধের সময় আমার স্বামীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বার্লিন পর্যন্ত সারা পথ আমি ট্যাঙ্কের ক্রুদের সঙ্গে ছিলাম। আমার মনে আছে, আমরা রাইখস্ট্যাগ বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। তখনও সে আমার স্বামী হয়নি। সে আমাকে বলল, চলো আমরা বিয়ে করি। আমি তোমায় ভালোবাসি। শুনে আমি খুব বিচলিতবোধ করলাম— আমাদের জীবন তখন ছিল ময়লা আবর্জনা, রক্ত আর গোটা যুদ্ধের ভেতর। অশ্লীল কথাবার্তা ছাড়া আর কিছু আমাদের কানে আসেনি তখন। উত্তরে আমি বললাম, আমাকে আগে নারীর মর্যাদা দাও: আমাকে ফুল উপহার দাও। আমার কানে কানে আবেগময় মিষ্টিকথা বলো। সেনানিবৃত্তি পেলে আমি বিয়ের পোশাক তৈরি করে নেব। আমি এতটাই বিচলিত ছিলাম, মনে হলো ওকে মার দিয়ে বসি। সেও সব বুঝতে পারছিল। ওর একপাশের চোয়াল পুড়ে গিয়েছিল। লাল দাগ হয়ে গিয়েছিল। দেখতে পেলাম, ওর চোয়ালের দাগের ওপর দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। ওকে বললাম, ঠিক আছে বিয়ে হবে। ঠিক এভাবেই বলেছিলাম ওকে। বিশ্বাসই হয়নি, আমি সত্যিই এভাবে একথাগুলো বলেছিলাম ওকে। আমাদের চারপাশে তখন ছাই, ভাঙা ইটের গুড়ো আর সব মিলিয়ে যুদ্ধ ছাড়া আর কিছু ছিল না। 

দ্বিতীয় কণ্ঠস্বর
চেরনোবিল নিউক্লিয়ার কারখানার নিকটে আমরা থাকতাম। আমি বেকারিতে কাজ করছিলাম, পেস্ট্রি তৈরি করছিলাম। আমার স্বামী ওখানকার জ্বালানি তত্ত্বাবধায়কের কাজ করত। আমাদের বিয়ে হয়েছিল সবে। দোকানে যাওয়ার সময়ও আমরা দুজনে একজন আরেকজনের হাত ধরাধরি করে যেতাম। যে দিন পারমাণবিক চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটে সেদিন আমার স্বামী দমকলের দায়িত্বে ছিল। যে সাধারণ পোশাকে ওরা ছিল ওই অবস্থাতেই ওরা এগিয়ে যায়। নিউক্লিয়ার পাওয়ার স্টেশনে বিস্ফোরণ ঘটেছিল। কিন্তু ওদেরকে বিশেষ কোনো আলাদা পোশাক দেয়া হয়নি। আমাদের জীবন এমনই ছিল, জানেন তো। সারা রাত কাজ করে ওরা আগুন নেভায়। আর জীবন সংহারী তেজক্রিয়ার সংশ্রব লাভ করে। পরের দিন সকালেই বিমানে ওদেরকে মস্কোতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরীক্ষায় দেখা যায় ওদের শরীরে তীব্র তেজস্ক্রিয়ার আক্রমণ ঘটেছে। এরকম তেজস্ক্রিয়ায় আক্রান্ত হলে কয়েক সপ্তাহের বেশি বাঁচে না মানুষ। আমার স্বামীর স্বাস্থ্য ভালো ছিল। ও ছিল অ্যাথলেট। আক্রান্তদের মধ্যে সবার শেষে মৃত্যু হয়েছিল ওর। আমি মস্কোতে ওর হাসাপাতালে পৌঁছলে আমাকে বলা হলো, ওকে বিশেষ বিচ্ছিন্ন এক চেম্বারে রাখা হয়েছে। কাউকে যেতে দেয়া হচ্ছে না ওর ওখানে। আমি ওদের অনুনয় করে বললাম, কিন্তু আমি তো ওকে ভালোবাসি। বলা হলো, সৈনিকেরা ওদের দেখাশোনা করছে। কোথায় যাচ্ছেন আপনি বুঝতে পারছেন? আমি বললাম, আমি ওকে ভালোবাসি। ওরা আমার সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিল, আপনি যাকে ভালোবাসেন সে লোকটি আর আগের মতো নেই। তার কাছে কারো ছোঁয়াচে সংস্পর্শ আনা যাবে না এমন এক বস্তুতে পরিণত হয়েছেন উনি। বুঝতে পারেছেন এখন? আমি নিজেকেই বার বার বলতে লাগলাম ওই একই কথা, আমি ওকে ভালোবাসি; আমি ওকে ভালোবাসি। ভবনে আগুন লাগলে জরুরি নামার যে ব্যবস্থা থাকে তেমন একটা পথ বেয়ে উঠে আমি রাতেরবেলা ওকে দেখার চেষ্টা করতাম। রাতের দারোয়ানকে অনুরোধ করতাম ভেতরে যেতে দিতে। ওদের কাউকে কাউকে হাতে টাকা গুজে দিয়েছি যাতে আমাকে ভেতরে যেতে দেয়। আমি ওকে ছেড়ে যাইনি। ওর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি ওর সঙ্গে ছিলাম। ওর মৃত্যুর কয়েক মাস পরে আমার একটা ছোট মেয়ে হলো। কিন্তু মেয়েটা মাত্র কয়েক দিন বেঁচে ছিল। কত সাধের মেয়েটা! মেয়েটা পেটে আসার পর আমরা ওকে নিয়ে আনন্দে কত উত্তেজিত হতাম। আর আমিই মেয়েটাকে মেরে ফেললাম। মেয়ে আমার জীবন বাঁচিয়ে দিয়ে গেল। সব তেজস্ক্রিয়া ওর শরীরে ধারণ করে চলে গেল মেয়েটা। দেখতে খুব ছোট ছিল ওর শরীরটা। কিন্তু আমি ওদের দুজনকেই খুব ভালোবাসতাম। ভালোবাসাকে কি কোনোভাবে হত্যা করা যায়? ভালোবাসা আর মৃত্যু এত নিবিড় কেন? ভালোবাসা আর মৃত্যু একসঙ্গেই আসে। নিদারুণ এই সত্যকে কে ব্যাখ্যা করতে পারে? কবরের পাশে আমি নতজানু হই।  

তৃতীয় কণ্ঠস্বর  
জীবনে প্রথম এক জার্মানকে হত্যা করি, তখন আমার বয়স দশ বছর এবং ততদিনে মতাদর্শের বিরোধিতার মিশনে আমি দীক্ষালাভ করছি। ওই জার্মান সৈনিকটা মাটির ওপর আহত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েছিল। আর আমাকে বলা হয়েছিল তার পিস্তলটা নিয়ে নিতে। আমি দৌড়ে গেলাম তার কাছে। কিন্তু সে দুহাতে পিস্তলটা আঁকড়ে ধরে আমার মুখের দিকে তাক করল। তবে পিস্তলটা দিয়ে প্রথম গুলটিা সে ছুড়তে পারল না। আমি ছুড়লাম।
এই ঘটনায় আমি তেমন ভীত হয়েছিলাম— তা নয়। যুদ্ধের সময় আমি তার কথা ভাবিনি কখনও। অনেক অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল যুদ্ধে। আমরা বেঁচেছিলাম মৃতদের মাঝেই। অনেক বছর পরে ওই জার্মানকে হঠাৎ স্বপ্নে দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। হঠাৎ করেই শুরু; এরপর মাঝে মাঝেই দেখতে লাগলাম একই স্বপ্ন। স্বপ্নে দেখতাম আমি আকাশে উড়ে যাচ্ছি; সে আমাকে ওপরের দিকে উড়ে যেতে দিচ্ছে না। আমি ওপরে ওঠার চেষ্টা করছি। সে যখন ধরে ফেলছে আমি তার সঙ্গে নিচে খাঁদের মতো একটা জায়গায় পড়ে যাচ্ছি। আমি ওখান থেকে বের হওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াচ্ছি। কিন্তু সে আমাকে উঠতে দিচ্ছে না। তার কারণে আমি ওখান থেকে উড়ে চলে আসতে পারছি না। 
এই একই স্বপ্ন আমি দেখেছি। দশকের পর দশক ধরে এই স্বপ্ন আমাকে তাড়া করে ফিরেছে। 
আমার ছেলেকে এই স্বপ্নের কথা বলতে পারিনি; তার বয়স অল্প ছিল। তার চেয়ে বরং রূপকথার গল্প পড়ে শুনিয়েছি ছেলেকে। আমার ছেলে এখন বড় হয়েছে। কিন্তু এখনও আমি তাকে এই স্বপ্নের কথা বলতে পারি না। 

ফ্লবেয়ার নিজেকে মানব-কলম বলেছেন। আমি বলব, আমি হলাম মানব-কর্ণ। রাস্তায় হাঁটার সময় শব্দ, শব্দবন্ধ, বিস্ময়বোধের প্রকাশ ইত্যাদি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করে থাকে। তখন মনে হয়, কত কত উপন্যাস চিহ্নহীন অবস্থায় আড়ালে চলে যাচ্ছে। অন্ধকারের আড়ালে চলে যাচ্ছে। মানব জীবনের কথোপকথনের দিকটা আমরা সাহিত্যের জন্য ধরে রাখতে পারিনি। এই দিকটাকে আমরা ভালো করে বুঝিনি; এই দিক নিয়ে আমরা বিস্ময়বোধ করিনি কিংবা এখান থেকে আনন্দও পাইনি। কিন্তু মানব জীবনের এই দিকটা আমাকে মুগ্ধ করে, টানে, আমাকে বন্দি করার মতো করে আটকে রাখে। মানুষের কথোপকথন আমার খুব ভালো লাগে। একাকী মানুষের কণ্ঠ শুনতেও আমার ভালো লাগে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভালো লাগা এবং গভীর আবেগ হলো মানুষের কথোপকথনকে পছন্দ করা। 
আমার এই মঞ্চে আসার পথটা বেশ দীর্ঘ। প্রায় চল্লিশ বছর দীর্ঘ। এই সময়ে আমি জনে জনে দেখা করেছি; একজনের কণ্ঠ থেকে আরেক জনের কণ্ঠের কাছে গিয়েছি তাদের একান্ত কথা শুনতে। এই পথ অনুসরণ করার কাজটা সব সময় ঠিকমতো করতে পেরেছি— বলতে পারছি না। কতবার ঘাত-অভিঘাত সামনে এসেছে, কতবার ত্রস্ত হয়ে পড়েছি। এসব অভিজ্ঞতা হয়েছে মানুষের কারণেই। আনন্দের অভিজ্ঞতা লাভ করেছি, তার বিপরীত অভিজ্ঞতাও পেয়েছি। যা শুনেছি ভুলে যেতে ইচ্ছে করেছে, মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, যখন অজ্ঞতার মধ্যে ছিলাম সেই অবস্থাটাতে ফিরে যাই। একাধিকবার আমি মানুষের উচ্চতম মহিমাও দেখেছি। আনন্দে চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে হয়েছে। 
আমাদের দেশে ছোটবেলা থেকে আমাদের মৃত্যুবরণ করা শেখানো হয়েছে। আমাদেরকে মৃত্যু চেনানো হয়েছে। আমরা শুনেছি, মানুষের অস্তিত্বের কারণটাই হলো একটা মহিমান্বিত উদ্দেশ্য: তার যা কিছু আছে অন্যের জন্য ত্যাগ করতে হবে। নিজেকে পুড়িয়ে, নিজেকে উৎসর্গ করে দিতে হবে অন্যের জন্য। মানুষকে অস্ত্র দিয়ে ভালোবাসতে শেখানো হয়েছে আমাদেরকে। অন্য কোনো দেশে আমার জন্ম হয়ে থাকলে আমি এই পথে চলতে পারতাম না। 
অশুভ শক্তি সব সময়ই নিষ্ঠুর। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে মন শক্ত রাখতে হবে। ঘাতক আর ঘাতকের বলি— উভয়ের মাঝেই আমরা বেড়ে উঠেছি। আমাদের বাবা-মায়েরা ভয়ের মধ্যে থাকলেও আমাদেরকে সেসব সম্পর্কে কিছু বলেননি। তবু আমরা বুঝেছি, আমাদের জীবনের বাতাসটাই ছিল বিষাক্ত। অশুভ শক্তি আমাদের ওপর সব সময় তীক্ষ্ম নজর রাখত। 
আমি পাঁচটি বই লিখেছি। তবে আমার মনে হয়, সবগুলো মিলিয়ে একটাই বই। এক স্বপ্নরাজ্যের ইতিহাসের বই। 
ভারলাম সালামভ একবার লিখেছিলেন, মানবতার সত্যিকারের নবায়নের স্বার্থে আমি বিশাল এক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। অবশ্য সে যুদ্ধে আমাদের পরাজয় ঘটেছিল। আমিও সেরকম যুদ্ধের ইতিহাসকে পুননির্মাণ করি। যুদ্ধের জয়-পরাজয়সহ পুননির্মাণ করে থাকি। সে ইতিহাসে থাকে মানুষ কিভাবে পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, সূর্যরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। অবশেষ হিসেবে থেকেছে শুধু রক্তের সমুদ্র আর লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের ধ্বংসাবশেষ। একটা সময় ছিল যখন বিশ শতকের কোনো রাজনৈতিক ধারণাই সমাজতন্ত্রের (কিংবা সমাজতন্ত্রের প্রতীক অক্টোবর বিপ্লবের) সঙ্গে তুলনীয় হতে পারেনি। তখন পশ্চিমের এবং পৃথিবীর সবখানেকার বুদ্ধিজীবিদের এতটা শক্তি আর আবেগের সঙ্গে টানতে পারেনি আর কিছুই। রেমন্ড আরন রাশিয়ার বিপ্লবকে বলেছেন ‘বুদ্ধিজীবিদের আফিম’। তবে সমাজতন্ত্রের ধারণা কমপক্ষে দুহাজার বছর আগেকার। প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বিষয়ক উপদেশের মধ্যে সমাজতন্ত্রের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। অ্যারিস্টোফেনের আদর্শের স্বপ্নের মধ্যে বলা হয়েছে, একটা সময় আসবে যখন সবকিছু সবার অধিকারে থাকবে। টমাস মোর, টমাসো ক্যাম্পানেলা, পরবর্তীতে সেইন্ট সিমোন, ফুরিয়ার এবং রবার্ট ওয়েনের মধ্যে দেখা যায় সমাজতন্ত্রের ধারণা। রুশ মানসে একটা সহজাত বৈশিষ্ট্য আছে; সে বৈশিষ্ট্যটা সমাজতন্ত্রের আদর্শকে বাস্তবে রূপদান করতে চায়।  
বিশ বছর আগে আমরা সোভিয়েতের ‘লোহিত সাম্রাজ্য’কে অভিশাপ আর অশ্রুতে বিদায় জানিয়েছি। ইতিহাসের পর্যবেক্ষণ হিসেবে আমরা এখন সে অতীতের দিকে অধিকতর নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তাকাতে পারি। কাজটা বেশ গুরুত্বের; কারণ সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত যুক্তিতর্ক শেষ হয়ে যায়নি। একটা নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, সে প্রজন্মের মানুষদের কাছে আছে পৃথিবীর ভিন্ন চিত্র। তবে অনেক উঠতি বয়সীই এখন মার্ক্স এবং লেনিন পড়ছে। রাশিয়ার শহরে নতুন নতুন জাদুঘর তৈরি হয়েছে স্টালিনের নামে। তাঁর সম্মানে নতুন নতুন সৌধ তৈরি হয়েছে। 
‘লোহিত সাম্রাজ্য’ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ‘লোহিত মানব’ বা সম-সোভিয়েত ব্যক্তি তো রয়ে গেছে। তার টিকে থাকার ক্ষমতা আছে। 
আমার বাবা সম্প্রতি মারা গেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সমাজতন্ত্রে তাঁর বিশ্বাস ছিল অটল। তাঁর কাছে দলের সদস্যের কার্ডও ছিল। সোভিয়েত মানস বোঝানোর জন্য অবমাননাকর বিশেষণ ‘সোভক’ ব্যবহার করা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। কারণ তাহলে আমার বাবা, বন্ধুবান্ধব এবং আরো সব নিকটজনদের জন্যও এই বিশেষণটা ব্যবহার করতে হবে। তারা সবাই একই জায়গা থেকে এসেছেন, সমাজতন্ত্র থেকে। তাঁদের মধ্যে অনেকেরই বড় বড় আদর্শ আছে। কেউ কেউ আবার বড় বড় রোমান্টিক। আজকের দিনে তাঁদের কাউকে কাউকে দাসত্বের রোমান্টিক বলা হয়। মানে স্বপ্নরাজ্যের দাস। আমার বিশ্বাস তাঁরা সবাই অন্য রকম জীবন যাপন করতে পারতেন। কিন্তু তাঁরা সোভিয়েত জীবন যাপন করেন। কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি বহুদিন। এক সময়ের ইউএসএসআর নামক দেশটির বিশাল এলাকা আমি ঘুরে বেড়িয়েছি এবং হাজার হাজার রেকর্ডারে টেপ করে রেখেছি মানুষের কথা। এটাই ছিল সমাজতন্ত্র; সোজা কথায়, এটাই ছিল আমাদের জীবন। আমি একটু একটু করে দেশীয় এবং ঘরোয়া সমাজতন্ত্রের ইতিহাস সংগ্রহ করেছি। দেখার চেষ্টা করেছি, কিভাবে এই ইতিহাস মানুষের মনোজগতে নিজের প্রভাব ফেলে গেছে। মানব নামের খুব ছোট এই পরিসরটাই আমাকে টানে খুব। মানে একজন ব্যক্তিমাত্র। আসলে ব্যক্তি মানুষের ওপরেই তো সবকিছু ঘটে। 
যুদ্ধের অল্প কিছুদিন পরেই থিয়োডর অ্যাডর্নো খুব বেদনাহত হয়ে লিখলেন, আউসভিসের পরে কবিতা লেখা অসভ্যতার কাজ। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে চাই আমার শিক্ষক অ্যালেস অ্যাডামোভিসের নাম। তিনি অনুভব করেছেন, বিশ শতকের দুঃস্বপ্ন সম্পর্কে গদ্য লেখা মানে ভ্রষ্টাচার করা। নতুন কিছু তৈরি করার কথা না। আপনি শুধু সত্যকে যেভাবে দেখেছেন সেভাবে তুলে ধরুন। প্রয়োজন মহৎ সাহিত্য। বাস্তব চিত্র যারা দেখেছেন তারাই কথা বলবেন। নিটশের কথা মনে পড়ছে। তিনি বলেছেন, কোনো শিল্পীই বাস্তবতার সমান হতে পারেন না। তিনি বাস্তবতাকে ওপরে তোলার ক্ষমতা রাখেন না।  

সত্য একটিমাত্র হৃদয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না, একজনের মানসের সঙ্গে খাপ খেয়ে চলে না— এ বিষয়টি আমাকে সব সময় ভাবিয়েছে। সত্য অপরিমেয়; সত্যের মধ্যে আছে বৈচিত্র্য; সত্য সারা পৃথিবীতে ছড়ানো ছিটানো। দস্তয়েভস্কি মনে করতেন, সাহিত্যে যতটুকু মানবতা ধরা আছে তার চেয়ে বেশি মানবতা আছে মানবতার নিজের কাছেই। তাহলে আমি কী কারছি? আমার কাজটা কী? আমি প্রাত্যহিক জীবনের আবেগ অনুভূতি, চিন্তাচেতনা এবং শব্দকে সংগ্রহ করি। আমার সময়ের জীবনকেই সংগ্রহ করি আমি। আমি মানুষের আত্মার ইতিহাস বিষয়ে জানতে আগ্রহী। আত্মার প্রাত্যহিক জীবন এবং এর মতো ছোটখাটো বিষয়কে ইতিহাসের সামগ্রিক চিত্র অগ্রাহ্য করে থাকে কিংবা অবহেলা করে থাকে। আমি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস নিয়ে কাজ করি। এখনও আমাকে প্রায়ই শুনতে হয়, আমি যা লিখছি সেটা সাহিত্য নয়; আমার লেখাকে বড়জোর দলিল বলা যায়। আজকের দিনে সাহিত্য কী? কে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন? আমাদের জীবন আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিসম্পন্ন। আধার আর আঙ্গিকের মধ্যে ফাটল তৈরি হয়। আধার আঙ্গিককে ভেঙে ফেলে পরিবর্তন করে। সব আধারই তার আধেয়র কিনারা উপচে পড়তে পারে। সংগীত, চিত্রকলা, এমনকি দলিলের শব্দও দলিলের সীমানা পার হয়ে যেতে পারে। বাস্তবতা আর কল্পনার বুননের মাঝে আর কোনো সীমানা রেখা নেই। একটার প্রবাহ আরেকটার জগতে অহরহ ঢুকে যেতে পারে। প্রতক্ষদর্শীরাও নিরপেক্ষ নন। গল্প বলার সময় মানুষ নিজেও খানিকটা তৈরি করে নেয়। ভাস্কর যেমন পাথরের সঙ্গে সংগ্রাম করে ভাস্কর্য তৈরি করেন তারাও তেমনি সময়ের সঙ্গে লড়াই করে গল্প তৈরি করেন। তারা অভিনেতা এবং স্রষ্টাও। 
আমার আগ্রহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানুষদের প্রতি। বরং বলতে পারি, তারা ক্ষুদ্র হলেও মহান। কারণ তাদের দুর্ভোগ তাদের পরিচয়কে ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে দিয়ে থাকে। আমার বইগুলোতে এই মানুষেরাই তাদের নিজেদের ইতহাস বয়ান করে থাকেন। তাদের সেই বয়ানের ভেতরে বড় ইতিহাসও চলে আসে। আমাদের জীবনে কী কী ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে এতসব বুঝে দেখার সময় আমাদের থাকে না। আমরা শুধু ঘটনাগুলো বয়ান করতে চাই। শুরুতে বলা যায়, যা যা ঘটেছে সেসব কমপক্ষে মুখে বলে প্রকাশ করা তো উচিত আমাদের। আমরা সে কাজটা করতেও ভয় পাই। আমরা অতীতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতেও পারি না। দস্তয়েভস্কির ‘ডেমনস’-এ আলাপের শুরুতেই শাতোভ স্তাভরোজিনকে বলে, তুমি আমি দুটো জীব; আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছে সীমাহীন অসীমে। এই জগতে এটাই শেষ সাক্ষাৎ। সুতরাং তোমার ওই সুর বাদ দিয়ে মানুষের মতো করে কথা বলো। কমপক্ষে একটি বারের জন্য মানুষের কণ্ঠে কথা বলো। 
আমার প্রধান চরিত্রদের সঙ্গে আমার কথাবার্তাও অনেকটা এরকম করেই শুরু হয়। অবশ্য তারা তাদের নিজের সময় থেকে কথা বলেন। তারা শূন্যের ভেতর থেকে কথা বলতে পারেন না। তবে মানুষের মানস জগতে পৌঁছনো খুব কঠিন কাজ। কারণ পথে অনেক অনেক টেলিভিশন আর খবরের কাগজের ছড়াছড়ি। আরো আছে শতাব্দীর কুসংস্কার, সময়ের পক্ষপাতিত্ব, প্রতারণা ইত্যাদি। 
সময় কিভাবে গড়িয়েছে; ধারণা কিভাবে মরে গেছে, মৃত আদর্শের পথ কিভাবে আমি অনুসরণ করেছি— এসব দেখানোর জন্য আমার ডায়েরি থেকে কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে শোনাতে চাই।  

১৯৮০—১৯৮৫

যুদ্ধ সম্পর্কে আমার একটা বই লেখা চলছে। যুদ্ধ নিয়ে কেন লিখছি? কারণ আমরা হলাম যুদ্ধের মানুষ। আমরা সব সময় যুদ্ধের ভেতরই ছিলাম, কিংবা যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ছিলাম। ভালো করে খেয়াল করে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবেন, আমাদের সবার চিন্তাচেতনার সবকিছু যুদ্ধকেন্দ্রিক। বাড়িতে, রাস্তাঘাটে— সবখানে। সে কারণেই আমাদের দেশে মানুষের জীবন এত সস্তা।
শুরু করেছি সন্দেহ নিয়ে: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে আরেকটা বই? কিসের জন্য? 
আমার এক ভ্রমণে এক নারীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। যুদ্ধের সময় তিনি মেডিক্যালের ছাত্রী ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে এক গল্প শুনলাম: তাঁরা লাডোগা হ্রদ পার হচ্ছিলেন। তখন শীতের দিন। হ্রদের পানিতে তাঁদের নড়াচড়া দেখেই শত্রুরা টের পেয়ে যায়। তাঁদেরকে উদ্দেশ করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় শত্রুরা। বরফাচ্ছন্ন পানির নিচে মানুষজন ঘোড়া— সব ডুবে চাপা পড়ে যায়। ঘটনাটা রাতের বেলা ঘটেছিল। হাতের কাছে একজনকে পেয়ে তিনি জাপটে ধরেন এবং টানতে টানতে তীরের দিকে নিয়ে আসেন। তিনি মনে করেছিলেন আহত কেউ। তিনি বলেন, আমি যাকে তুলছিলাম তার পরনে কোনো কাপড় ছিল না। তার ওপরে তো ভেজা ছিলই। ভাবলাম, তার কাপড়চোপড় সব ছিড়ে গেছে। ডাঙায় তুলে আনার পরে দেখলেন, তিনি যাকে মানুষ মনে করে টেনে তুলেছেন সে আসলে মানুষ নয়, সেটা বড় আকারের একটা মাসিন মাছ। যুদ্ধের কারণে মানুষেরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। কিন্তু অন্যান্য প্রাণী পাখি, মাছ— এরা কী করেছে? 
আমার আরেক ভ্রমণে শোনা আরেক নারীর ঘটনা। যুদ্ধের সময় তিনি মেডিক্যালের ছাত্রী ছিলেন। একবার তিনি যুদ্ধের ভেতর গোলার আঘাতে সৃষ্ট এক গর্তে টেনে নিয়ে আসেন এক আহত অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকা এক সৈনিককে। আড়ালে নিয়ে আসার পর দেখতে পান আহত সৈনিকটি জার্মান। লোকটার পা ভেঙে গেছে, প্রচণ্ড রক্ত ঝরছে বিভিন্ন ক্ষত জায়গা থেকে। সে তো শত্রু। তার জন্য কী করার আছে? ঐ নারীর নিজের পক্ষের অনেকেই তো মারা যাচ্ছে! কিন্তু তিনি জার্মান সৈনিককে ব্যান্ডেজ করে দিলেন এবং ওখান থেকে হাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে এলেন। বাইরে এসে দেখেন, এক রুশ সৈনিক অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তাকেও টেনে আনলেন নিরাপদে। জ্ঞান ফেরার পর রুশ সৈনিক জার্মান সৈনিককে হত্যা করতে চাইল। জার্মান সৈনিকটিও জ্ঞান ফেরার পর মেশিনগান জাপটে ধরে রুশ সৈনিকটিকে মারতে উদ্যত হলো। ওই নারী বলেন, ওদেরকে থামানোর জন্য আমি একবার এর গালে আরেকবার ওর গালে চড় মারতে থাকি। ততক্ষণে আমাদের সবারই পা রক্তের ভেতর ডুবে আছে। তাদের দুজনের রক্ত মিশে একাকার হয়ে গেছে। 
এরকম যুদ্ধের কথা আমিও আগে শুনিনি। নারীর যুদ্ধ। এখানে কোনো বীরের কথা বলা হয়নি। একদল লোক আরেক দল লোককে বীরত্বের সঙ্গে হত্যা করছে তেমন নয়। নারীদের পৌনঃপুনিক বিলাপের কথা মনে আছে, যুদ্ধের পরে মাঠের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেলে দেখতে পেতেন, ওরা চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে আছে। সবার বয়স খুব কম। দেখতে খুব সুন্দর। ওখানে, মাঠের মধ্যে পড়ে আছে ওরা, চোখ আকাশের দিকে তাকানো। দুপক্ষের ওদের সবার জন্যই আপনার দুঃখবোধ হতো। 
এই যে এই দৃষ্টিভঙ্গি— ‘দুপক্ষের ওদের সবার জন্য’— এখান থেকেই আমি ধারণা পেয়েছি আমার বইয়ের। যুদ্ধ তো হত্যা ছাড়া আর কিছু নয়। এভাবেই যুদ্ধ নারীদের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে আছে। এই যে, এই লোকটা হাসি মুখে কথা বলছিলেন, ধুমপান করছিলেন; কিন্তু এখন আর তিনি নেই। মানুষদের চলে যাওয়া নিয়েই বেশি কথা বলতেন নারীরা। তাদের কথায় থাকত যুদ্ধের সময়ে সব কিছু কেমন করে নাই হয়ে যেতে পারে, মানুষ এবং মানুষের সময় কেমন করে নাই হয়ে যায়। হ্যাঁ, রণাঙ্গনের জন্য তাঁরা স্বেচ্ছাসেবা দিয়েছেন মাত্র সতেরো আঠারো বছর বয়সে। কিন্তু তাঁরা কাউকে হত্যা করতে চাননি। তবু তাঁরা মৃত্যুকে বরণ করতে প্রস্তুত ছিলেন। মাতৃভূমির জন্য জীবন দিতে তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন। স্টালিনের জন্য জীবন দিতে তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন। ইতিহাস থেকে এইসব কথা আপনারা মুছে দিতে পারবেন না। 
দুবছর আটকে ছিল বইা, প্রকাশ হয়নি। পেরেসত্রয়কা এবং গর্বাচেভের আগে প্রকাশ হয়নি। সেন্সর কর্তা জ্ঞান দান করার সুরে বললেন, আপনার বই পড়ার পরে আর কেউ যুদ্ধ করবে না। আপনার বর্ণনায় যুদ্ধ তো ভয়াবহ। আপনার বইয়ে কোনো বীরের স্থান নেই কেন? আমি কোনো বীরের খোঁজ করতে চাইনি। যুদ্ধের এমন অনেক প্রত্যক্ষদর্শী এবং অংশগ্রহণকারী ছিলেন যাদের কথা কেউ শোনেনি; তাঁদের অভিজ্ঞতার গল্প শুনে ইতিহাস লেখাই হলো আমার উদ্দেশ্য। তাদের অভিজ্ঞতার কথা শোনার জন্য কেউ তাদের কখনও কিছু জিজ্ঞেস করেনি। মহান সব ধারণা সম্পর্কে মানুষেরা কী ভাবে? আমরা জানি না। যুদ্ধের ঠিক পরপরই একজন মানুষ এক রকম যুদ্ধের কথা বলবেন। কয়েক দশক পরে সেটা অবশ্য আরেক রকম যুদ্ধ হয়ে যাবে। ওই ব্যক্তিটির মধ্যেই কিছু না কিছু পরিবর্তন ঘটে যাবে। কারণ তাঁর সারা জীবনটাকেই তিনি নিজের স্মৃতির মধ্যে ভাঁজ করে রেখে দেবেন। তাঁর সামগ্রিক সত্তাকেই রেখে দেবেন স্মৃতির মধ্যে। তিনি ওই বছরগুলোতে কিভাবে জীবন যাপন করেছেন, কী কী পড়েছেন, দেখেছেন, কাদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে, তাঁর বিশ্বাসের মধ্যে কী কী আছে— সব জড়ো হবে তাঁর স্মৃতির মধ্যে। শেষমেষ, তিনি সুখি নাকি অসুখি সেটাও থাকবে। দলিল হলো জীবন্ত মানুষের মতো। আমরা বদলে গেলে সেগুলোও বদলে যায়। 
আমি পুরোপুরি নিশ্চিত, ১৯৪১ সালের যুদ্ধের সময়ের আর কোনো অল্পবয়সী নারীকে পাওয়া যাবে না। ‘লাল’ মানুষদের ধারণার সেটাই ছিল সর্বোচ্চ বিন্দু, রাশিয়ার বিপ্লব এবং লেনিনের চেয়েও উঁচু পর্যায়ের। তাঁদের বিজয়গুলোকেও ম্লান করে দেয়। আমি এই নারীদের খুব ভালোবাসি। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে স্টালিন সম্পর্কে কিছু বলা যেত না। কিংবা যুদ্ধের পরে সবচেয়ে সাহসী ও স্পষ্টবাদী বিজেতাদের সরাসরি ট্রেন বোঝাই করে যে সাইবেরিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল— সে সম্পর্কে তাঁদের সঙ্গে কথা বলা যায় না। যারা সাইবেরিয়া থেকে ফিরে এসেছিলেন তারা সবাই চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের একজনের মুখে একবার শুনেছিলাম, আমরা শুধু যুদ্ধের সময়টাতেই মুক্ত ছিলাম। রণাঙ্গনেই কেবল মুক্ত ছিলাম আমরা। আমাদের মূলধন হলো দুর্ভোগ, আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ হলো দুর্ভোগ, তেল গ্যাস নয়। আমরা এই একটি জিনিসই অবিরাম উৎপাদন করে যেতে পারি। আমাদের দুর্ভোগকে কেন স্বাধীনতায় পরিণত করা যায় না? এ প্রশ্নের উত্তর আমি সব সময় খুঁজে বেড়াই। দুর্ভোগকে স্বাধীনতায় পরিণত করার প্রয়াস কি সত্যিই বৃথা? চাদায়েভ ঠিকই বলেছেন: রাশিয়া একটি স্মৃতি-বর্জিত দেশ। পুরোপুরি স্মৃতিবিলোপের একটা জায়গা, সমালোচনা আর চিন্তার জন্য সচেতনতার একেবারে অনভিজ্ঞতার একটি জায়গা। তবে বড় বড় বইপুস্তক আমাদের পায়ের তলায় স্তুপিকৃত অবস্থায় আছে।  

১৯৮৯
আমি কাবুলে। আর যুদ্ধ বিষয়ে লিখতে চাই না। কিন্তু আমি এখানে একটা বাস্তব যুদ্ধের মধ্যেই আছি। খবরের কাগজ ‘প্রাভদা’য় লেখা হয়েছে : সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আমরা ভ্রাতৃসম আফগান জনগণকে সাহায্য করছি। যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষ আর জিনিসপত্র সবখানে দেখতে পাওয়া। এই হলো যুদ্ধের সময়। 
গতকাল তারা আমাকে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে যেতে চায়নি। বলেছে, ইয়াং লেডি, আপনি হোটেলেই থাকুন। পরে আমরা আপনার জন্য জবাবদিহি করব। আমি হোটেলে বসে আছি আর ভাবছি অন্যদের সাহস আর ঝুঁকির কথা পর্যবেক্ষণ করার মধ্যে খানিকটা অনৈতিকতা আছে। আমি এখানে দু’সপ্তাহ হলো আছি। যুদ্ধ যে পুরুষের পেশি শক্তিসম্পন্ন স্বভাবের ফল— সেকথা এখনও মন থেকে কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারছি না। আর পুরুষের এই স্বভাবটা মেপে দেখার ক্ষমতা আমার নেই। তবে যুদ্ধে প্রাত্যহিক আনুষঙ্গিক বিষয়াদি উঁচু মানের। আমি নিজেই বুঝতে পেরেছি মেশিনগান, মাইন, ট্যাঙ্ক— এগুলো দেখতে তো ভারী সুন্দর। অন্য মানুষদের কিভাবে সর্বোত্তম পন্থায় হত্যা করা যায় তার জন্য মানুষ তো বেশ চিন্তা-ভাবনা ভালোই খাটিয়েছে। সত্য আর সৌন্দর্যের মাঝের বিবাদ চিরন্তন। আমাকে একটা ইতালিয় নতুন মাইন দেখানো হলো। আমি নারীসুলভ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বললাম, বাহ্ সুন্দর তো! এত সুন্দর কেন এটা? ওরা সামরিক কায়দায় আমাকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিল : কেউ যদি এটার ওপর গাড়ি চালিয়ে কিংবা একটা বিশেষ কোণাকুণিতে এভাবে পা ফেলে, তাহলে আধা বালতি মাংসের পিণ্ড ছাড়া আর কিছু থাকবে না তার। মানুষজন এখানে অস্বাভাবিক বিষয় নিয়ে অতি স্বাভাবিক সুরে কথা বলে যেন এই অস্বাভাবিক বিষয়গুলো বৈধ এবং এখানে চলতেই পারে। তাহলে, জানেন তো, যুদ্ধ এমনই। এসব চিত্র দেখে কারো মাথা খারাপ হয় না। যেমন এখানে একজন মানুষ পড়ে আছে। সে কোনো প্রাকৃতিক শক্তির হাতে নিহত হয়নি। দুর্ভাগ্যবশত আরেকজন লোকের হাতে তার মৃত্যু হয়েছে। 
আমি ‘ব্ল্যাক টিউলিপ’ বোঝাই করা দেখলাম (যে বিমান দস্তার কফিনে যুদ্ধে নিহতদের দেশে নিয়ে যায়) । মৃত সৈনিকদের প্রায়ই চল্লিশের দশকের সামরিক পোশাক পরানো হয়, মানে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা জোধপুরস নামের পাজামা। এখন আর খুব একটা পাওয়া যায় না সেগুলো। এ প্রসঙ্গে সৈনিকেরা বলাবলি করছিল, এগুলোর কয়েকটা শুধু ফ্রিজে রেখে দেয়ার জন্য সরবরাহ করা হয়েছে। এজন্য এগুলো থেকে পুরুষ শুয়রের পচা মাংসের গন্ধ পাওয়া যায়। আমি এসব সম্পর্কে লিখতে যাচ্ছি। আমার আশঙ্কা হচ্ছে আমার দেশের কেউ বিশ্বাস করবে না আমার কথা। আমাদের খবরের কাগজগুলো শুধু সোভিয়েত সৈনিকদের দ্বারা বন্ধুত্বের পথ তৈরি হওয়ার খবর লেখে।  
তাদের অনেকের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। অনেকেই স্বেচ্ছায় এসেছেন। তারা এখানে আসতে চেয়েছেন। লক্ষ করেছি, তাদের বেশিরভাগই শিক্ষিত পরিবার থেকে এসেছেন। বুদ্ধিজীবি মহলের প্রতিনিধি তারা। শিক্ষক, চিকিৎসক, লাইব্রেরিয়ান— এরকম পেশা থেকে এসেছেন। এক কথায় বই পাগলের দল এখানে এসেছেন। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তারা আফগান লোকদের সাহায্য করবেন— সত্যিকারের এমন স্বপ্ন নিয়েই তারা এসেছেন। আর এখন নিজেদের বোকামিতে নিজেরাই হাসেন তারা। বিমানবন্দরে একটা জায়গা আমাকে দেখানো হয়েছে; সেখানে দস্তার শত শত কফিন সূর্যের আলোয় কেমন রহস্যজনকভাবে চকচক করছে। ওখানে আমার সঙ্গে যে অফিসার ছিলেন তিনি না বলে পারলেন না, কে জানে, একদিন আমার কফিনও ওখানে থাকবে। কফিনের মধ্যে ওরা আমাকে আটকে রাখবে। কিসের জন্য যুদ্ধ করছি এখানে? নিজের কথায় নিজেই তিনি যেন ভয় পেয়ে গেলেন। তাড়াতাড়ি করে বললেন, একথাগুলো যেন লিখবেন না। 
রাতে মৃতদেরকে স্বপ্নে দেখি। তাদের সবার চোখে মুখে বিস্ময়ের চিহ্ন। বলেন কী! আমাকে হত্য করা হয়েছে? সত্যিই আমাকে হত্যা করা হয়েছে?  
একদল নার্সের সঙ্গে গাড়ি চালিয়ে একটা হাসপাতালে গেলাম। হাসপাতালটা সাধারণ আফগানদের জন্য। ওখানকার বাচ্চাদের জন্য আমরা খেলনা, চকলেট কুকিজ ইত্যাদি নিয়ে গিয়েছিলাম। প্রায় গোটা পাঁচেক টেডি বিয়ারও নিয়েছিলাম। হাসপাতালে পৌঁছে দেখলাম এটা একটা লম্বা ব্যারাক। বিছানা হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটা কম্বলের বেশি কেউ পায়নি। কোলে বাচ্চা নিয়ে অল্পবয়সী এক নারী আমার দিকে এগিয়ে এলেন। কিছু একটা বলতে চাইলেন। গত দশ বছরে এখানকার প্রায় সবাই সামান্য রুশ ভাষা বলতে পারে। তাঁর কোলের শিশুটির দিকে একটা খেলনা এগিয়ে দিলাম। শিশুটি দাঁত দিয়ে কামড় দিয়ে নিল খেলনাটা। বিস্মিত হয়ে আমি শিশুটির মাকে জিজ্ঞেস করলাম, দাঁত দিয়ে নিল কেন? শিশুটির ছোট শরীর থেকে কম্বলখানা একটু উঠিয়ে দেখালেন তিনি। বাচ্চা ছেলেটার হাত দুটো নেই। মা বললেন, আপনাদের রাশিয়ানরা বোমা ফেলেছিল। সে সময়ের ঘটনা। আমি পড়ে যাচ্ছিলাম। কেউ একজন আমাকে ধরে ঠেকাল। 
আমি দেখেছি, আমাদের গ্য্রাড রকেটগুলো সেখানে গ্রামগুলোকে কিভাবে চষা জমি বানিয়ে ফেলেছে। আফগানদের একটা কবরস্থানে গিয়েছি আমি। কবরস্থানটা একটা গোটা গ্রামের সমান। কবরস্থানের মাঝখানে কোথায় যেন এক আফগান নারী চিৎকার করছিল। এরকম এক মায়ের কান্না শুনেছিলাম মিনসকের কাছের এক গ্রামে। বাড়ির ভেতর তখন একটা দস্তার কফিন আনা হচ্ছিল। এই চিৎকার কোনো মানুষ কিংবা জন্তুর নয়; এর সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছি কাবুলের এক কবরস্থানে শোনা কান্নার।  
আমাকে স্বীকার করতেই হবে, হঠাৎ করেই আমি মুক্ত হয়ে গেছি— এমন নয়। আমার বিষয়ে আমি নিষ্ঠ ছিলাম। তারা সবাই আমার ওপরে বিশ্বাস রাখতে পেরেছিলেন। আমাদের প্রত্যেকেরই স্বাধীনতার দিকে নিজ নিজ পথ আছে। আফগানিস্তান যাওয়ার আগে আমি বিশ্বাস করতাম, সমাজতন্ত্রের মানবের মতো মুখ আছে। আফগানিস্তান থেকে যখন ফিরে আসি, তখন আমার মনে আর কোনো ধরণের অন্ধবিশ্বাস নেই। ফিরে এসে বাবার সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্তেই বললাম, আমায় মাফ করো, বাবা। আমাকে তুমি সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী করে বড় করে তুলেছ। তুমি আর মা যে সব ছেলেদের পড়াও (আমার বাবা মা দুজনই গ্রামের স্কুলশিক্ষক ছিলেন) তাদের মতো বয়সী ছেলেরা বিদেশ বিভূঁইয়ে মানুষ মারছে। যাদেরকে হত্যা করছে তাদেরকে ওরা চেনেও না। আমার এসব দেখার পর তোমার সব কথা এখন আমার মনের ভেতর ছাইভষ্মে পরিণত হয়েছে। আমরা হত্যাকারী। বাবা, তুমি বুঝতে পারছ? আমার বাবা কেঁদে ফেললেন। 
মুক্ত হয়ে অনেকেই আফগানিস্তান থেকে ফিরে এসেছে। কিন্তু অন্য ধরণের দৃষ্টান্তও আছে। আফগানিস্তানের একটা অল্পবয়সী ছেলে একদিন চিৎকার করে বলেছিল, আপনি একজন নারী। আপনি যুদ্ধের কী বুঝবেন? আপনি মনে করেছেন বইয়ে কিংবা সিনেমায় মানুষের যেভাবে মহিমান্বিত মৃত্যু হয় সেরকম হয়ে থাকে যুদ্ধে, তাই না? গতকাল আমার বন্ধু নিহত হয়েছে। মাথায় গুলি নিয়ে সে আরো দশ মিটার এগিয়ে গিয়েছে। মাথায় হাত দিয়ে নিজের মগজ আটকে রাখার চেষ্টা পর্যন্ত করেছে। সাত বছর পরে সেই ছেলেটাই একজন সফল ব্যবসায়ী হয়েছে। এখন তার আফগানিস্তানের গল্প বলতে ভালো লাগে। সে এখন আলাদা ব্যক্তি হয়েছে। মৃত্যুর মধ্যে দেখা সেই ছেলেটি আর নেই সে। মাত্র বিশ বছর বয়সে সে ছেলেটি মৃত্যুবরণ করতে চায়নি। এখন সে ছেলেটিই বড় হয়েছে। আমাকে টেলিফোনে জিজ্ঞেস করেছে, আপনার বই কিসের জন্য? আপনার বই অতিমাত্রায় আতঙ্ক জাগায়। 
আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি, যুদ্ধ সম্পর্কে আমি কোন ধরণের বই লিখতে চাই। যুদ্ধের ওপর এমন একজনকে নিয়ে লিখতে চাই যে মানুষটি গুলি ছোড়ে না। অন্য কোনো মানুষকে গুলি করে না। সে যুদ্ধের কথায় কাতর হয়ে পড়ে। কোথায় আছে এমন মানুষ? তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি এখনও।  

১৯৯০—১৯৯৭
বিশাল এক দেশের ওপর পর্যবেক্ষণ চালানোর গল্প বলে বলেই রাশিয়ার সাহিত্য সবার কাছে ভালো লাগে। আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি সব সময় ট্র্যাজেডি নিয়ে লেখেন কেন? উত্তরে বলব, কারণ ট্র্যাজেডির ভেতরেই আমাদের বসবাস। আমরা এখন বিভিন্ন দেশে বাস করি। কিন্তু ‘লাল’ মানুষেরা সবখানে আছে। তারাও ওই একই জীবন থেকে এসেছে এবং তাদেরও স্মৃতি একই রকম।  
চেরনোবিল সম্পর্কে লেখা অনেকদিন লিখিনি। জানতাম না কিভাবে লিখব। বুঝে উঠতে পারিনি কোন কৌশল ব্যবহার করে আমার বিষয়বস্তুর ভেতরে প্রবেশ করব। ইউরোপের এক কোণার ভেতরে ঢুকে থাকা আমার ছোট দেশটি সম্পর্কে পৃথিবীর লোকজন কখনও তেমন কিছু শোনেনি। কিন্তু এখন মনে হয় তাদের সবার মুখে মুখে আমার দেশের নাম। আমরা বেলারুশের মানুষেরা চেরনোবিলের মানুষ। অজানা এক সাংঘাতিক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি আমরাই প্রথম। তখন পরিষ্কার হয়ে গেছে, আমাদের ভাগ্যে সমাজতান্ত্রিক, জাতিগত, নতুন ধর্র্মীয় চ্যালেঞ্জ ছাড়াও বৈশ্বিক আরো কোনো আদিম চ্যালেঞ্জ আছে। তখনও সবার দৃষ্টিগোচর হয়নি, তবু বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে ততদিনে। চেরনোবিলের পরেই কিছু কিছু বিষয় খোলাসা হয়েছে।
বৃদ্ধ এক ট্যাক্সি চালকের কথা মনে আছে। তাঁর ট্যাক্সির ইউন্ডশিল্ডের ওপরে একটা কবুতর এসে আছড়ে পড়ার পর তিনি শপথের ভঙ্গিতে বললেন, প্রতিদিন দু’তিনটে পাখি গাড়ির সাথে আছড়ে পড়ে। কিন্তু খবরের কাগজ বলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে।  
শহরের পার্কগুলোর গাছের পাতা আঁচড়া দিয়ে জড়ো করে শহরের বাইরে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। তেজস্ক্রিয়ার ছোঁয়া লেগেছে এমন সব জায়গার মাটি খুঁড়ে খাল করে অন্যখানের মাটি দিয়ে চাপা দেয়া হয়েছে। মানে মাটির নিচে মাটিকে চাপা দেয়া। জ্বালানি কাঠ, ঘাস— এগুলোও পুঁতে রাখা হয়েছে। সবাইকে কিছুটা অস্থির দেখাত তখন। এক বৃদ্ধ মৌমাছির রক্ষক আমাকে বললেন, সেদিন সকালবেলা বাগানে গেলাম। মনে হলো পরিচিত কোনো শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছি না। দেখলাম একটা মৌমাছিও নেই বাগানে। একটারও শব্দ শুনতে পেলাম না। কী, হচ্ছে কী এসব? দ্বিতীয় দিন গেলাম। দেখলাম সেদিনও একটা মৌমাছি পর্যন্ত উড়ছে না। তৃতীয় দিনও না। তারপর শুনলাম, নিউক্লিয়ার স্টেশনে দুর্ঘটনা ঘটেছে। স্টেশনটা আমার ওখান থেকে তো খুব দূরে নয়। কিন্তু আমরা অনেকদিন পর্যন্ত জানতেই পারিনি কী ঘটেছে। মৌমাছিরা টের পেয়েছে। কিন্তু আমরা পাইনি। 
চেরনোবিল সম্পর্কে খবরাখবর যেগুলো প্রত্রিকায় এসেছে, সব সামরিক ভাষায় লেখা— বিস্ফোরণ, বীর সকল, সৈনিকেরা, জনঅপসারণ ইত্যাদি। কেজিবির লোকেরা স্টেশনে কাজ করেছে। তারা অনুসন্ধান চালিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে কেউ শত্রুতামূলক দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে কি না। গুজব ছড়িয়েছিল, পশ্চিমা ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেস সমাজতান্ত্রিক ক্যাম্পের দিকে সুড়ঙ্গ খুঁড়তে গিয়ে এ দুর্ঘটনার পরিকল্পনা করেছিল। এক সময় চেরনোবিলে সামরিক সরঞ্জামাদি আসতে শুরু করল। সৈনিকেরা আসতে লাগল। সব ব্যবস্থা দেখে মনে হলো, আবার যুদ্ধের সময় শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এই নতুন জগতে চকচকে পোশাক পরা সৈনিককে ট্র্যাজেডির চরিত্র ছাড়া আর বেশি কিছু মনে হলো না। তার করার কাজ একটাই ছিল— বেশি মাত্রায় তেজস্ক্রিয়া নিজের ভেতরে ধারণ করা এবং বাড়িতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করার।    
আমার চোখের সামনে দেখলাম, চেরনোবিল-পূর্ব মানুষেরা চেরনোবিলের মানুষ হলে গেলেন। 
তেজস্ক্রিয়া চোখে দেখা যেত না, ছুঁয়ে দেখার মতো ছিল না, এর গন্ধও ছিল না। চারপাশের জগত চেনা ছিল; আবার অচেনাও। দুর্ঘটনা এলাকায় আমি গিয়েছিলাম। আমাকে সাবধান করে দিয়ে বলা হলো, ফুল তুলবেন না, ঘাসের ওপর বসবেন না, কোনো কুয়া থেকে পানি খাবেন না। মৃত্যু সবখানেই লুকিয়ে থাকে। কিন্তু এখানকার মৃত্যু একেবারেই আলাদা। নতুন মুখোস পরা, নতুন ছদ্মবেশে মৃত্যু ওৎ পেতে থাকত। যুদ্ধের সময় যারা বেঁচে গিয়েছিলেন এমন বয়স্ক মানুষদেরকে আবারো সরিয়ে নেয়া হলো। যাওয়ার সময় তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, পরিষ্কার আকাশে সূর্যের আলো ছড়াচ্ছে; আকাশে ধোঁয়া নেই; গ্যাস নেই। কেউ তো গুলি ছুড়ছে না। এটা আবার কেমন যুদ্ধ? আমাদের আবারো শরণার্থী হতে হবে? 
সকালবেলা পত্রিকা পড়ার জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। খবরের লোভে সবাই তৎপর থাকত। তেমন কোনো খবর না দেখে আবার হতাশায় কাগজ সরিয়ে রাখত। কোনো গুপ্তচর ধরা পড়েনি। জনগণের শত্রুদের কথা কেউ লেখেননি। গুপ্তচর ছাড়া, জনগণের শত্রু ছাড়া যে জগত সেটা তো অপরিচিতি জগত। নতুন কিছুর শুরু এখানেই। আফগানিস্তানের পথ ধরে চেরনোবিল আমাদেরকে স্বাধীন করে দেয়। 
দুর্ঘটনার এলাকায় আমার জগত দুভাগ হয়ে যায়। নিজেকে বেলারুশিয়ান, রুশ কিংবা ইউক্রেনীয় ভাবতে পারিনি। বরং মনে হতো আমি এমন এক প্রজাতির প্রতিনিধি যে প্রজাতি নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। কাকতালীয়ভাবে সামাজিক স্তরে দুটো বিপর্যয় ঘটে যায়। একটা সমাজতান্ত্রিক আটলান্টিস ডুবে যাচ্ছিল; আর মহাজাগতিক স্তরে ছিল চেরনোবিল। সাম্রাজ্যের পতন সবাইকে বিচলিত করে দেয়। প্রাত্যহিক জীবন নিয়ে মানুষেরা চিন্তিত হয়ে পড়ে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কী দিয়ে কিভাবে কিনবে? বেঁচে থাকা যাবে কিভাবে? বিশ্বাস স্থাপন করা যাবে কিসে? এই সম্রয়ে কোন ব্যানার অনুসরণ করা যাবে? কিংবা আমাদের কি কোনো মহান ধারণা ছাড়াই বাঁচতে শিখতে হবে? এরকম জগতও তো অপরিচিত জগতই। কারণ আগে এভাবে তো কেউ বেঁচে থাকেনি। ‘লাল’ মানুষকে এরকম শত শত প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। কিন্তু সে নিজের মতোই থাকে। স্বাধীনতার প্রথম দিনগুলোর মতো এতটা একাকী সে কখনও ছিল না। দেখতাম আমার চারপাশের লোকেরা সব আশাহত। আমি তাদের কথা শুনলাম। 
আমার ডায়েরি এখন বন্ধ করছি।  

সাম্রাজ্য পতনের সময় আমাদের কী হলো? আগে জগতটা ভাগ হয়েছিল এরকম— এক দিকে ঘাতক, আরেক দিকে তার শিকার; এরকমই ছিল গুলাগ; ভাইয়েরা, বোনেরা; আরেক ভাগে ছিল যুদ্ধ, আরেক দিকে ছিল নির্বাচকমণ্ডলী, আরেক অংশ ছিল প্রযুক্তি আর সমসাময়িক জগত। আমাদের জগত যারা বন্দি করেছে এবং যাদেরকে বন্দি করা হয়েছে— তাদের মাঝে ভাগ হয়েছিল। আজকের দিনে আমাদের জগত ভাগ হয়েছে স্লাভিকদের সমর্থক এবং পশ্চিমাদের সমর্থকের মাঝে; ফ্যাসিবাদী বিশ্বাসঘাতক আর দেশপ্রেমিকের মাঝে; যারা জিনিসপত্র কেনার ক্ষমতা রাখে আর যাদের ক্ষমতা নেই তাদের মাঝেও। সর্বশেষ বিভাজনটাই সমাজতন্ত্রের পরবর্তী কঠিন পরীক্ষাগুলোর মধ্যে নিষ্ঠুরতম। কারণ সবাই সমান ছিল— সেটা তো খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ‘লাল’ মানুষ তার রান্নাঘরে টেবিলের চারপাশে যে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছে সে স্বাধীনতার রাজ্যে সে প্রবেশ করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত সে হয়েছে অপমানিত, হৃত, আগ্রাসী এবং বিপজ্জনক। 
রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানোর সময় বিভিন্ন জনের মন্তব্য শুনেছি। এখানে সেরকম কয়েকটি মন্তব্য তুলে দিচ্ছি : 

এখানে আধুনিকায়ন ঘটবে বিজ্ঞানীদের হাজত ক্যাম্প এবং ফায়ারিং স্কোয়াড সেরাসকারগুলোর মাধ্যমে।
রুশ লোকেরা আসলে ধনী হতে চায় না। ধনী হওয়ার ব্যাপারে তারা বেশ ভীতও। তাহলে কোনো রুশ ব্যক্তি কী চায়? সে চায় অন্য কেউ যেন ধনসম্পদ না পায়। তার চেয়ে ধনী যেন আর কেউ না থাকে। 
এখানে কোনো সৎ লোক নেই; তবে এখানে বেশ অনেক ঋষিসুলভ মানুষ আছেন। 
এমন কোনো প্রজন্ম আমরা দেখব না যারা চাবকানির শিকার হয়নি। রুশরা স্বাধীনতার অর্থই বোঝে না। তাদের দরকার সামরিক কায়দা জানা লোক আর চাবুক। 
রাশিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দটো শব্দ হলো ‘যুদ্ধ’ এবং ‘কয়েদখানা’। কোনো কিছু চুরি করলে, কিংবা কিছু নিয়ে মজা করতে গেলেই কয়েদখানায় আটকাবে। একটু মতামত প্রকাশ করতে গেলেই জেলে ঢোকাবে। 
রাশিয়ার জীবনকে কলুসিত এবং ঘৃণ্য হতেই হবে। তখন আত্মা উন্নীত হয় এবং বুঝতে পারে, সে এ জগতের অধীন নয়। সবকিছু যত বেশি ময়লা আবর্জনাপূণ আর রক্তাক্ত হবে, সেখানে আত্মার জন্য জায়গাও তত বেশি পরিসরের থাকবে। 
নতুন বিপ্লবের শক্তি কিংবা বাতিক কারো নেই। মানসিক শক্তিও নেই। রুশদের এমন কোনো ধারণা দরকার যেটা শুনে কারো প্রথমে মেরুদণ্ড বেয়ে ভয়ের হিম নামবে। 
সুতরাং আমাদের জীবন পাগলাগারদ আর ব্যারাকের মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় আছে। সমাজতন্ত্র আসলে মরেনি; সমাজতন্ত্রের শব এখনও জীবিত। 

আরেকটি কথা না বলে পারছি না, ১৯৯০-এর দশকে আমরা যে সুযোগ পেয়েছিলাম সেটা হারিয়েছি। আমরা কোন ধরণের দেশ চাই— সে প্রশ্ন তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমরা শক্তিশালী দেশ চাই, নাকি এমন কোনো দেশ চাই যেখানে জনগণ ভ্রদ্রভাবে জীবন যাপন করতে পারে। আমরা প্রথমটা বেছে নিয়েছি। শক্তিশালী দেশ। আবারো আমরা ক্ষমতার যুগে বসবাস করছি। রুশরা তাদের ভাই ইউক্রেনীয়দের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আমার বাবা বেলারুশের; আমার মা ইউতেক্রনীয়। আমাদের অনেক মানুষেরই এরকম পারিবারিক সম্পর্ক। রাশিয়ার বিমান সিরিয়ার বোমা ফেলছে।  
আশায় ভরা একটা সময়ের জায়গায় চলে এসেছে হতাশার সময়। সময়ের যুগ পরিপূর্ণ হয়ে আবার পেছনের দিকে যাচ্ছে। আমরা এখন সেকেন্ড হ্যান্ড সময়ে বাস করছি। 
মাঝে মাঝে মনে হয়, ‘লাল’ মানুষের ইতিহাস লেখার কাজটা আমার শেষ হয়নি। 
আমার আবাস তিনটা: আমার বেলারুশীয় ভূমি, মানে আমার বাবার মাতৃভূমি যেখানে আমি সারাজীবন বাস করেছি; আমার মায়ের মাতৃভূমি ইউক্রেন যেখানে আমার জন্ম হয়েছিল এবং আরেকটা হলো রুশ সংস্কৃতি যেটা ছাড়া আমি নিজের সত্তার কথাই কল্পনা করতে পারি না। কিন্তু এই সময়ে, এখনকার দিনে ভালোবাসা সম্পর্কে কথা বলা কঠিন।   

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।