রাত ১১:৩৮ ; মঙ্গলবার ;  ২১ নভেম্বর, ২০১৭  

একান্ত অনুভবে কবি ওমর আলী || মজিদ মাহমুদ

প্রকাশিত:

‘‘আমাদের কবিতার ইতিহাসও যে রাজনীতি ও রাজধানী-কেন্দ্রিক, ওমর আলী তার যথার্থ শিকার। নানা রাজনৈতিক প্রয়োজনে, রাজা পরিবর্তনে তারও যেমন প্রয়োজন ছিল না, তাকেও তেমন প্রয়োজন ছিল না; তাই প্রচারের পাদপ্রদীপের বাইরেই থেকে গেছেন তিনি চিরকাল’’

 

কবি ওমর আলীর মৃত্যুর খবরটি আমি পাই— গত বৃহস্পতিবার পড়ন্ত বিকালে; পাবনা থেকে সালেক শিবলু ফোন করে জানালেন, কবি ওমর আলী আজ দুপুরে মারা গেছেন। আমি তখন পরীবাগ রাইটার্স ক্লাব কার্যালয়ে কয়েকজন সভ্যের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম; কবির মৃত্যুর খবরটি জানালেও কারো মধ্যে খুব একটা ভাবান্তর লক্ষ্য করা গেল না। তারা পুনরায় আড্ডায় মেতে উঠলেন, গতকাল রাতে তারা দরিয়ানগর থেকে ফিরেছন— একটি আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব করে; সমুদ্রস্নান থেকে ফিরে আসায় তাদের মধ্যে সামুদ্রিক ঢেউয়ের উচ্ছ্বাস তখনো বিদ্যমান ছিল। কবিতার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে ছবি ভাগাভাগি করার আনন্দ জীবনে কম নয়। তাছাড়া এবারের রাইটার্স ক্লাবের অনুষ্ঠানটি ছিল সত্যিই আনন্দের— বেশ কয়েক দেশের কবি প্রতিনিধি এসেছিলেন; বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও নেপালি কবিরা তাদের প্রতিভার যথেষ্ট স্বাক্ষর রেখেছেন। অবশ্য জাতিসত্ত্বার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা কবি ওমর আলীর মৃত্যুর খবরে বেশ ব্যথিত হলেন; তার চোখে-মুখে ব্যথার চাপ ছিল স্পষ্ট। কিন্তু আমি আশা করছিলাম, কেউ কবিকে নিয়ে দু’একটি কথা বলুক, স্মৃতি রোমন্থন করুক; তার কবিতা নিয়ে কথা বলুক। আমাদের জীবনের কাঁচা-ব্যথার কষ্ট যখন অপ্রকাশিত থেকে যায়, তখন ধরে নিতে হয়, এই ব্যথার অস্তিত্ব কোথাও ছিল না। তাহলে কি ধরেই নেব, ওমর আলী বলে একজন কবি— যার থাকা না থাকা বাংলা-সাহিত্যে কোনো অর্থ বহন করে না। যদিও এ ধরনের সিদ্ধান্তের যুক্তিসংগত কোনো কারণ নেই, কারণ মৃত্যুর অনুষ্ঠানে যে সব কবি উজ্জ্বল ছিলেন তাদের উপস্থিতিও আজ ম্লান হতে চলেছে; তবু প্রকৃত কবি তার কালের ইতিহাস ও মানব-চরিত্র নির্মাণে যে ভূমিকা পালন করেন তার একটি কিতাবি দায়িত্ব কখনো ফুরায় না। আমার বিবেচনায় ওমর আলী এমন একজন কবি— যার কেবল একটি নিজস্ব কবি জীবনই ছিল না; তার রচনার অভিনবত্ব ও গুরুত্ব বাংলা ভাষা-সাহিত্যে অম্লান কীর্তি হয়ে থাকবে কিছুকাল। তার প্রয়াণ উপলক্ষ্যে অনেক ব্যক্তিগত স্মৃতি ভিড় করে আসছে। ওমর আলীর যদি একটি কবি জীবন না থাকতো, তাহলে হয়তো এ রচনার আলাদা কোনো মূল্য থাকতো না আমার কাছে । এখনো যারা কবি জীবনের জন্য রাজধানীর ইঁদুর দৌড় পছন্দ করেন; মস্তিস্কের রক্তক্ষরণে স্থবির না-হওয়া পর্যন্ত অসন্তোষের লড়াইটি চালিয়ে যেতে চান, ওমর আলীর জীবনযাপন তাদের জন্য কোনো অর্থ বহন করবে না।

দুই.
ওমর আলী আমাদের ইংরেজি পড়াতেন। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন। এমনকি পাবনা শহীদ বুলবুল কলেজে আমার উচ্চ-মাধ্যমিক পড়তে আসার পেছনে ওমর আলী প্রধান প্রণোদনা ছিলেন; যদিও তখনো আমি তাকে সশরীরে দেখিনি; কিন্তু পাবনায় একজন কবি আছেন, যিনি ‘এ দেশের শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি’ নামের একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন; যেটি দীর্ঘ নামের ও বিষয়-ব্যতিক্রমে এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে, সেই কবির সান্নিধ্য যে পেতে চাননি সে কি করে কবি হতে পারেন! সেই বোধ থেকেই আমি বুলবুল কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম, যদিও আমার বন্ধুরা প্রায় সকলেই ঐতিহ্যবাহী এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন; আর সেদিক থেকে বুলবুল কলেজে ভর্তি হওয়া আমার জন্য খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না, মান হারানোর আশঙ্কা ছিল; কবিতার জন্য এই ঝুকি আমাকে নিতে হয়েছিল; কারণ কবি হওয়া ছাড়া আমার জীবনে আর কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ ছিল না; ফলে জগতের সকল কবির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নির্ণয় তখন আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল; আর আমার দেখা সেইসব কবির তখন শীর্ষে ছিলেন ওমর আলী।
কলেজে প্রবেশ করার কয়েকদিনে মধ্যে শুরু হলো বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা; তার একটি ইভেন্ট ছিল কবিতা রচনা; অনেকের সঙ্গে আমিও একটি স্বরচিত কবিতা জমা দিয়েছিলাম; এই বিভাগে ওমর আলী একমাত্র বিচারক। আমার কবিতাটির তৃতীয় স্থান প্রাপ্ত হয়েছিল; পুরাতন ছাত্রদের কবিতা প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছিল; কিন্তু কবিতাটি যখন আমি পাঠ করলাম; তখন ছাত্র-শিক্ষক সকলেই বললেন, আমার কবিতাটিই প্রথম হওয়া উচিত ছিল। অবশ্য আমার কবিতার প্রতি সুবিচার হয়নি, এই বোধ তখনো আমার ছিল না, এখনো নাই; বরং আমি সে-সময়ে এতই খুশি হয়েছিলাম যে, কবি ওমর আলীর বিবেচনায় আমার কবিতা নির্বাচিত হয়েছে; এটিকে আমি আমার কবিতার স্বীকৃতি হিসাবেই দেখেছিলাম; যদিও প্রথম ও দ্বিতীয়রা কেউ কবি হননি।
একদিন ক্লাসে এসেই তিন ব্ল্যাকবোর্ডে অনেকগুলো ইডিয়ম-ফ্রেইজ লিখলেন, তারপর একে-একে ছাত্রদের কাছে অর্থ ও সঠিক বাক্য গঠন জানতে চাইলেন, অধিকাংশ ছাত্রের পক্ষে সঠিক উত্তর দেয়া সম্ভব হয়নি। আমার কাছে আসতেই আমি ‘এ টু জেড’ পর্যন্ত বলে দিলাম; উনি জিজ্ঞাসা করলে, এই ছেলে তুমি কোন স্কুল থেকে এসেছ। বললাম, রাধানগর মজুমদার একাডেমি থেকে। তিনি বললেন, হ্যাঁ, ওই স্কুলে কিছুটা লেখাপড়া হয়।
ছাত্র হিসাবে এ ধরনের কথাবার্তা হলেও আমাদের ঘনিষ্ট হতে কিছুটা সময় লেগেছিল। আমার অন্তর্মুখিনতা তার সঙ্গে ঘনিষ্ট হতে বাঁধা দিয়েছিল; এটি তার স্বভাবেরও অংশ; চট করে কারো সঙ্গে কথা বলা হয়ে উঠতো না। জীবনানন্দ দাশের মতো এখনো পরিচিত মানুষ দেখলে কিছুটা পথ ঘুরে যেতেও বাধে না। আর ওমর আলী এতটা মাটির দিকে ঝুকে হাঁটতেন যে, কাউকে দেখার দায় তাকে নিতে হতো না। একটা চটের তৈরি বাজারের ব্যাগ আর ছাতা বগলে নিয়ে তিনি কলেজে আসতেন। কোমরপুর থেকে বুলবুল কলেজ— প্রায় পাঁচ মাইলের দূরত্ব; পুরোটা পথ তিনি পায়ে হেঁটে আসতেন। তাই তার সঙ্গে ঘনিষ্ট হবার জন্য একটি উপায় বের করলাম, ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকে তাকে উৎসর্গ করে একটি কবিতা লিখে ফেললাম। আর সেই থেকেই তিনি জানলেন আমি কবি; ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক ছাপিয়ে আমাদের সম্পর্ক কবিতার বয়সহীনতায় উত্তীর্ণ হলো। আমার ও তার মধ্যকার সম্পর্ককে তিনি বর্ণনা করতেন— জনসন ও বসওয়েলের মধ্যকার সম্পর্ক দিয়ে। আমি অবশ্য তখন জনসন ও বসওয়েল সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না। তিনিই বলেছিলেন, ইংরেজ কবি ও পণ্ডিত স্যামুয়েল জনসনের গুণমুগ্ধ তরুণভক্ত ছিলেন জেমস বসওয়েল; যাদের বয়সের দূরত্ব ছিল একত্রিশ বছর; যিনি জনসনের অজান্তেই তার সকল চিন্তা ও বক্তব্য পরম মমতায় লিপিবদ্ধ করেছিলেন; রচনা করেছিলেন খুব উন্নত মানের একটি জীবনীগ্রন্থ; জনসনকে জানার জন্য তার গুরুত্ব অপরিসীম; তাদের কর্ম অবলম্বন করে ভিক্টোরীয় যুগের ইংরেজ সাহিত্য অনেক দূর এগিয়ে যায়। যদিও ওমর আলী সম্বন্ধে আমি তেমন কিছু লিখিনি, এবং খুব অল্পদিন পরেই ভেবেছিলাম, আমার ও তার পথ সম্পূর্ণ আলাদা; তবে এই সত্য থেকে কখনো আমি বিচ্যুত হয়নি যে, তার কবিশক্তি অপরাপর শক্তিশালী বাঙালি কবিদের চেয়ে কম নয়।

তিন.
সঠিক কারণটি আমার মনে নেই। ক্লাসে ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে তিনি রাগান্বিত হয়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলেন; যাওয়ার সময় এমন একটি কসম খেলেন যে, তিনি যদি এই ক্লাসে দ্বিতীয়বার আসেন তাহলে ওমুকের বাচ্চাই নয়। আমাদের নাগরিক সংস্কৃতির সাথে তার চরিত্রের অনেক কিছু মিলবে না; কারণ তিনি ছিলেন গ্রামীণ অকৃত্রিম জীবনে অংশ; যদিও তিনি কলেজে ইংরেজি পড়াচ্ছেন; ইংরেজি কবি সাহিত্যিকদের কথাও বলছেন; তবু তিনি গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। ওমর আলীর গোস্সা করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে, অধ্যক্ষ নূরুন্নবী স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। তিনি বললেন, দেখ যে মানুষটি তোমাদের ক্লাস নিচ্ছেন, তিনি বাংলা-সাহিত্যের অনেক বড় একজন কবি; তিনি বাংলা একাডেমির পুরস্কারও পেয়েছেন; এটি তোমাদের জীবনে একটি ইতিহাস হয়ে থাকবে যে, তোমরা কবি ওমর আলীকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলে। এটি হয়তো অস্বাভাবিক নয় যে, তার পাঠদান তোমাদের ভালো লাগছে না। জেনে রেখ, জীবনানন্দ দাশও শিক্ষক হিসাবে আকর্ষণীয় ছিলেন না। কিন্তু কেউ যদি আজ বলেন, তিনি জীবনানন্দ দাশের ছাত্র ছিলেন, তখন তার গুরুত্বটা কেমন হবে, বোঝ! ছাত্ররা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছিল; এবং ওমর আলী একটি চরম কসমের পরেও আবার ক্লাশে আসতে শুরু করেছিলেন। আমি যখন দৈনিক বাংলায় অবর সম্পাদক হিসাবে যোগদান করলাম, তখন নির্মল সেনের মতো একজন সমাজতান্ত্রিক ও সাংবাদিক নেতাকে সহকর্মী হিসাবে পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। নির্মল সেন জীবনানন্দ দাশের সরাসরি ছাত্র ছিলেন, তার কাছে জীবনান্দ দাশ সম্বন্ধে অনেক কথা শুনেছি; এমনকি শিক্ষক হিসাবে খুব উজ্বল ছিলেন না, সেটিও।
একবার ‘স্বদেশে ফিরছি’ নামে একটি সদ্যপ্রকাশিত কবিতার বইয়ের প্রায় শ’খানেক কপি পাটের দড়ি দিয়ে বেঁধে তিনি আমাদের ক্লাসে হাজির হলেন; বললেন, দু’টাকার বিনিময়ে কবিতার বইটি ক্রয় করা যেতে পারে। দেখলাম কয়েক মিনিটের মধ্যে বইটির সকল কপি নিঃশেষ হয়ে গেল। যারা পেলেন না, কবি তাদের আশ্বাস দিলেন পরবর্তী দিনে তিনি বাকিদের জন্য এই বইয়ের আরো কপি নিয়ে আসবেন। যদিও দু’টাকার বিনিময়ে তখনকার দিনেও বইটির বাঁধাই খরচও ওঠা সম্ভব ছিল না।

চার.
আমরা তখন বন্দে আলী মিয়ার নামে একটি স্মরণ পরিষদ করেছিলাম; সম্ভবত পঁচাশি/ছিয়াশি সালের দিকে। আমরা বন্দে আলী মিয়ার আশিতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একটি বড়সড় আয়োজন করেছিলাম। এমনকি বন্দে আলীর নামে একটি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল; প্রথম যৌথ পুরস্কারে ভূষিত হলেন— ওমর আলী, আর পাবনার আরেকজন কৃতিসন্তান আবু হেনা মোস্তফা কামাল; তিনি তখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। আবু হেনা মোস্তফা কামাল দাপ্তরিক কারণে আমাদের অনুষ্ঠানে যেতে পারেননি, তাই ওমর আলীর প্রতি আমাদের দৃষ্টি ছিল বেশি, যাতে তিনি কোনোভাবে এড়িয়ে না যেতে পারেন; আমরা তাকে আনার জন্য আমাদের পরিষদের এক সভ্যকে সারাক্ষণ তার পেছনে লাগিয়ে রাখলাম। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে তিনি আমাদের ওই সভ্যকে বলেছেন, তুমি এখন যাও, আমি নিজেই চলে আসছি; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আর আমাদের অনুষ্ঠানে আসেননি। পরেরদিন জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললেন, আমার প্যালপিটিশন বেড়ে গিয়েছিল; তুমি তো জান, আমি মানুষের সামনে বক্তৃতা করতে পারি না। এই হলো ওমর আলী— তিনি পুরোটাই ছিলেন ভেতরের মানুষ; মানুষের সান্নিধ্যে তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলতেন।

পাঁচ.
তখনো তিনি সুস্থ ছিলেন, তার বাড়িতে যাওয়ার পরে তিনি দেখালেন, কিভাবে তিনি কবিতা লেখেন; জানালেন তার কবিতা কিভাবে বাস্তবতাকে ভর করে রচিত হয়, কোনো কল্পনার প্রশ্রয়ে তিনি কবিতা লেখেন না। লেবুগাছে বসা টুনটুনিকে তিনি কিভাবে আদর করেন; ধরতে গেলে একটি ফিঙেপাখি কিভাবে পালিয়ে যায়, আক্ষরিক অর্থে তিনি তা অভিনয় করে দেখালেন। তার বাড়িতে তখন পর্যন্ত দুটি মাত্র টিনের ঘর, খুবই গরীব দশা, সাধারণ টিন ও খড়ের বেড়া; খাট বলে তেমন কিছু নেই; এমনকি কোনো গ্রন্থাগারও নয়; বাঁশের মাচা ও চৌকির ওপর তিনি শয়ন করেন; বইপত্র যা আছে পাটের বস্তায় বন্দি করে চাতালের ওপর রেখে দেয়া আছে। দুটি ঘরের দক্ষিণ দুয়ারে একটি চাপকল, তারপাশে দুধেল গাইয়ের জন্য ঘর, আর সম্ভবত বাতাবি লেবু গাছ রয়েছে; বাইরে একটি খড়ের গাদা, আর উঠানে ধান শুকাতে দেয়া আছে। বললেন, মজিদ, থেকে যাও একটি মোরগ কাটি, তোমরা তো আর শহরে দেশি মুরগি খেতে পার না।
ওমর আলী জীবনের শুরুতে ঢাকায় ছিলেন, দৈনিক সংবাদের সাব-এডিটর হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন, ভালো অনুবাদ করতে পারতেন না বলে বকাঝকা শুনেছেন; কেরানিগঞ্জে একটি বাসায় ছেলেমেয়ে পড়ানোর বিনিময়ে থাকার বন্দোবস্ত করেছিলেন, সাপ-খোপের ভয়ে বেশিদিন থাকতে পারেননি। কবি আহসান হাবীবও তাকে থাকার জায়গা দিয়েছিলেন; সেখানেও বেশি দিন থাকা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তিনি পাবনা চলে আসেন। উজির আলীর ছেলে ওমর আলী, শৈশবে মাতৃহারা বালক, সহজাত কাব্যশক্তির অধিকারী; জীবনের জটিল মারপ্যাচের মধ্যে না গেলেও কবিতার নন্দনতত্ব তিনি ভালোই রপ্ত করেছিলেন। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের জীবনকেই তিনি কীর্তিময় কবি জীবনে পরিণত করেছিলেন; তাই যমুনা পার হয়ে রাজধানী আসার তাড়া তিনি কখনো অনুভব করেননি। বললে বলতেন, গাড়িতে উঠতে আমার ভয় করে। কি জানি আসলেই সত্য কিনা।

ছয়.
আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক সব সময় একই মাত্রায় চলেনি। একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম অবনতির মধ্যে চলে আসে। ১৯৮৭ সালে ঢাকা থেকে তার একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের জন্য তিনি আমাকে ছয় হাজার টাকা দেন; বইটি সময় মতো প্রকাশ হলেও প্রেসে বাকি থাকায় সবগুলো কপি তাকে সময় মতো সরবরাহ করা যায়নি। এ ঘটনায় তিনি আমার ওপর এতই চটে গেলেন যে, আমার শিক্ষক থেকে শুরু করে পরিচিত সকল সাহিত্য-সম্পাদকের কাছে যাচ্ছেতাই বলে চিঠি লিখলেন; যার ভাষা সর্বত্র শ্লিল ছিল না, আমি এই ঘটনায় কিছুটা বিব্রত হয়েছিলাম। কিন্তু তৎক্ষণাৎ কিছু সমাধান করার উপায় আমার হাতে ছিল না। তবে এই সৌভাগ্য হয়েছিল এ ঘটনায় আমাদের মধ্যে সম্পর্কটি চিরদিনের জন্য আমি ছিন্ন করতে দিইনি। আমি তার টাকাটি পরিশোধ করেছিলাম; এবং সময় পেলেই তার বাড়িতে ছুটে গেছি। চর কোমরপুরের যে বাড়িতে তিনি থাকতেন, তার ঠিক কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে পদ্মা পেরুলে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি— যেখান থেকে বিশ্বকবি অনেক গল্প-কবিতা লিখেছিলেন; তার সেই স্মৃতিকে দেখার জন্য দেশ-বিদেশের কবি-সাহিত্যিক ও গবেষকদের নিত্যভিড় লেগে থাকে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পদ্মাপারের অতিথি, তারও আফসোস ছিল, তিনি এই জনপদের মানুষের জীবনযাপন ভেতর থেকে জানেন না বলে ঠিকঠাক মতো তার সাহিত্যে সে-সব ধরতে পারেননি; তিনি মনে করতেন, কোনোদিন যদি এই জনপদের নিজস্ব কবির আবির্ভাব ঘটে সেদিন ঠিক মতো এ জনপদের জীবনচিত্র ফুটে উঠবে; ওমর আলী সেই জাতের কবি ছিলেন; কিন্তু মানুষের আকাঙ্ক্ষা— কবিতার প্রতি না কবির— সে বিষয় অবশ্য এখনো সঠিকভাবে নির্ণিত নয়। ওমর আলী কবিতা লিখেছিলেন কিংবা লেখেননি, তাতে কার কি এসে যায়, যে অংশটুকু ওমর আলী বলে প্রচারিত হয়েছে, কিংবা যে অংশটুকু কবিদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে সেটুকুই এখন পর্যন্ত ওমর আলীর কাব্যশক্তি বলে পরিচিত।

সাত.
ওমর আলী চল্লিশটা কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন; হয়তো অপ্রকাশিতও কিছু রয়ে গেছে। দু’একটি গদ্যগ্রন্থও লিখেছেন তিনি; কিন্তু ১৯৬০ সালে লেখা ‘এ দেশের শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি’ গ্রন্থটির বাইরে পাঠকের কাছে আর কোনো তথ্য আছে বলে মনে হয় না; কিংবা এই গ্রন্থটিতে কী আছে সেটিও পাঠকের কাছে বড় অনুষঙ্গ নয়; সবচেয়ে বড়— ষাট-দশকের পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক যে সাহিত্য সমাজ গড়ে উঠেছিল ওমর আলী ছিলেন তার সক্রিয় সদস্য; এবং এই গ্রন্থটির ভাগ্যে আদমজির মতো একটি পুরস্কার জুটে যাওয়ায় নামটি অক্ষয় হয়ে যায় বাঙলা কাব্যভুবনে; আর এই নামের প্রচারণা উত্তর প্রজন্মের কাছে পর্যন্ত চলে এসেছে, এরচেয়ে বেশি কিছু নয় বলেই মনে হয়। আমাদের কবিতার ইতিহাসও যে রাজনীতি ও রাজধানী-কেন্দ্রিক, ওমর আলী তার যথার্থ শিকার। নানা রাজনৈতিক প্রয়োজনে, রাজা পরিবর্তনে তারও যেমন প্রয়োজন ছিল না, তাকেও তেমন প্রয়োজন ছিল না; তাই প্রচারের পাদপ্রদীপের বাইরেই থেকে গেছেন তিনি চিরকাল। ওমর আলীর কবিতা তোষামোদের মধ্যে একজন পাঠকের কোনো লাভালাভের ব্যাপার ছিল না; ক্ষতি কিংবা উপকার করার ক্ষমতা ছাড়া জীবদ্দশায় শক্তিশালী কবিরাও তাদের অনুজদের আকৃষ্ট করতে পারেন না। কবিতার সঙ্গেও ক্ষমতার গ্যারাকল সক্রিয় থাকে। কমুদরঞ্জন মল্লিক, জসীমউদ্দীন, বন্দে আলী মিয়া ও আল মাহমুদীয় কবিতা ধারায় আমার বিবেচনায় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী কবির নাম ওমর আলী; যার মাধ্যমে গ্রামটি গ্রামে থেকেই বিশ্বগ্রামে প্রবেশ করেছে; আর এ ক্ষেত্রে তার ইংরেজি বাংলায় ডবল এম.এ হয়তো সহায়তা করেছে। প্রেম-প্রকৃতি তার কবিতার বিষয় হলেও বিশ্বায়নের রাজনীতির অবক্ষয়ী দিকসমূহ ধরা পড়েছে। তার কবিতাগুলো আমি তার কালের কবিদের পাশাপাশি পাঠ করে দেখেছি, এমন সহজাত ও মৌলিকত্ব বাংলা কবিতায় সুপ্রতুল নয়। তবে শেষের দিকে অতিলিখন, তার কবিতাকে অতিকথনে পরিণত করেছিল; দৈনিক পত্রিকায় সাপ্তাহিকীতে কবিতা না দেখলে তার কাছে অস্তিত্বহীনতার সংকট তৈরি হতো; তিনি অস্থিরতায় ভূগতেন, রুচি নির্বিশেষে সর্বত্র কবিতা পাঠাতেন, সাহিত্য-সম্পাদকদের কাছে চিঠি লিখতেন; কবিতা তার অস্তিত্বে পরিণত হয়েছিল, তাই কিছুটা ভালোমন্দের বোধ হয়তো লোপ হয়েছিল; কিন্তু এ পর্বের কবিতগুলোও যেভাবে বাংলাদেশের ভূগোল ও জনপদ উঠে এসেছে, ততটা প্রগাঢ়ভাবে আর কারো কবিতায় আসেনি। আজ মনে হয়, এগুলো খুব প্রয়োজন ছিল, যে দ্রুততার সঙ্গে গ্রামীণ অনুষঙ্গের বিলুপ্তি ঘটছে, ওমর আলীর কবিতার ডিটেইলস ছাড়া এই জনপদের কোনো ভাষিক ফটোগ্রাফি থাকবে না। ওমর আলী কি বুঝতে পারছিলেন যে, হারিয়ে যাওয়ার আগে যতটুকু সম্ভব মুঠোমুঠো এসব ধরে রাখতে হবে। সামাজিক ইতিহাসের প্রয়োজনে আজ আমরা যেভাবে মুকুন্দরাম চক্রবর্তীকে জানতে চাই, সাম্প্রতিক দ্রুত পরিবর্তমান গ্রামীণ জীবন ও একদিনের বাংলাদেশকে জানার জন্য হয়তো ওমর আলীই সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে উঠবেন।

আট.
ওমর আলীর সঙ্গে সর্বশেষ আমার দেখা হয়েছিল গত বছর তার ছিয়াত্তরতম জন্মদিনে তার কোমরপুরের বাড়িতে; কবি ততদিনে বাকরুদ্ধ; প্রায় বছর খানেক আগে মস্তিস্কের রক্তক্ষরণে তার স্বরযন্ত্রে ও শরীরে স্থবিরতা নেমেছে। একটি হুইল চেয়ারে বসে থাকতেন। মানুষজন চেনেন, কথা বলতে পারেন না; ঘনিষ্ঠ কেউ হলে গলা জড়িয়ে ধরেন, কান্নাকাটি করেন। আমাকে দেখে কেঁদে ফেললেন। জন্মদিনের কেক কেটে খাইয়ে দেয়া হলো। স্থানীয় কবিরা তাকে উদ্দেশ্য করে স্বরচিত কবিতা পাঠ করলেন; তার কলেজে পড়ুয়া নাতি নাতনিরাও তার কবিতা আবৃত্তি করলো। কিন্তু এসব এমন একটি গ্রামে ঘটছিল, আধুনিক কবিতার আত্মা এবং অস্তিত্ব এখনো সেখানে অনুদ্ঘাটিত রয়ে গেছে; তবু ওমর আলী নামের একটি দ্রষ্টব্য যার রচিত বাণী কোমরপুর গ্রামকে অতিক্রম করে সমগ্র বাংলাভাষা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছিল; আর এতকাল তিনি যে সব কবিতা রচনা করেছিলেন বাকহীন অনুভবের মধ্যে কবি হয়তো সেগুলো আরও আপন করে অনুভব করছিলেন।      

      

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।