রাত ১০:১৮ ; সোমবার ;  ১৮ নভেম্বর, ২০১৯  

এখনও শোকে মূহ্যমান অসাম্প্রদায়িকতার সড়ক ‘অজহর রোড’

প্রকাশিত:

হানিফ উল্লাহ আকাশ, নেত্রকোনা।।

১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও শোকে মূহ্যমান নেত্রকোনা শহরের অসাম্প্রদায়িকতার সড়ক ‘অজহর রোড’। ২০০৫ সালে এই সড়কেই জেএমবি’র দুষ্কৃতকারীদের বোমা হামলায় আতততায়ীসহ ৮জন নিহত ও ৫০ জন আহত হন। সেই ঘটনা স্মরণ করে এখনও দিবসটি স্মরণে কাঁদে নেত্রকোনাবাসী।

২০০৫ সালের ৮ ডিসেম্বর বিজয়ের মাসেই অসাম্প্রদায়িকতার চেতনাকে হত্যা করতে একদল সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী  অজহর রোডের উদীচী ও শতদল গোষ্ঠীর কার্যালয়ের সামনে একটি বোমা ফেলে রেখে। এ খবর শহরে ছড়িয়ে পড়লে উৎসুক জনতা ঘটনাস্থলে ভিড় করে। এ সময় উৎসুক জনতার ভিড়ে জামা’তুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)’র একজন সক্রিয় আত্মঘাতী সদস্য সাইকেলযোগে ঘটনাস্থলে এসে আকস্মিক ভাবে বোমা হামলা চালায়। এ সময় হামলাকারীসহ নেত্রকোনা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক খাজা হায়দার, সাংগঠনিক সম্পাদক সুদীপ্তা পাল শেলী ও মোটর মেকানিক্স যাদব দাসসহ ৮ জন নিহত ও কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়।

এ ঘটনা নিয়ে সেসময়ে সারা বাংলাদেশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বোমা হামলার ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য তখনও একটি স্থানীয় কুচক্রীমহল সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের কাছে প্রিয় পাত্র থাকার জন্য মোটর মেকানিকস যাদবকে হিন্দু জঙ্গি ‘নিউ ডাইমেনশন’ হিসেবে প্রমাণিত করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু নেত্রকোনার সচেতন নাগরিকরা সম্মিলিত ভাবে এর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং জেএমবি সংগঠনই এর সঙ্গে জড়িত বলে প্রমাণ করেন।

তৎকালীন সময়ের এই আলোচিত ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরাসহ সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং আহত-নিহতের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস প্রদান করেন। কিন্তু পরবর্তীতে ঘটনার ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও নিহতদের পরিবারের সদস্যরা সরকার বা কোনও বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে কোনও রকম আর্থিক অনুদান পায়নি। এমনকি সরকারি কোনও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসব পরিবারের কাছে সান্ত্বনার বাণী শোনাতেও আর আসেননি।

২০০৮ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি ঢাকায় দ্রুত বিচার আদালত-২ এ, এই বোমা হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে সালাউদ্দিন, আসাদুজ্জামান এবং ইউনূস নামে ৩ জন জেএমবি’র সক্রিয় সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও আজ পর্যন্ত তাদের গ্রেফতার করে ফাঁসির রায় কার্যকর করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে জেএমবির স্থানীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের খুঁজে বের করতে দীর্ঘদিনের দাবি নেত্রকোনাবাসীর। কিন্তু স্থানীয় ভাবে কারা মদদ দিয়েছিল তাদের এখনও চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ।

পরিবারের এমমাত্র উপার্জশীল ব্যক্তিটিকে হারিয়ে অনেক পরিবারের সদস্যরা আর্থিক অনটনে দিনাতিপাত করছে। অসুস্থদের চিকিৎসা করারও সংগতি নেই। খাজা হায়দারের পরিবারের এখন বড়ই করুণ অবস্থা।

নিহত খাজা হায়দারের স্ত্রী শাহানাজ বেগম বলেন, আপনারা শুধু এই দিনটি এলেই আমাদের কাছে আসেন দুঃখের বোঝা আরও ভারি করতে। কই মৃত্যুর পর কিভাবে সন্তানদের নিয়ে বেঁচে আছি তার খবর তো কেউ নিতে আসেননি। সন্তানদের লেখাপড়া কিভাবে হচ্ছে না হচ্ছে তাও তো কেউ কোনও দিন জানতে চাননি। শাহানাজ অভিমান ভরে বলেন,‘আমি আর এই দিনটির কথা স্মরণ কতে চাই না। যা হারিয়েছি তার কষ্ঠ শুধু আমিই জানি কত যন্ত্রণার।’

এ ব্যাপারে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি মোজ্জাম্মেল হক বাচ্চু বলেন, নিহতদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সাহায্য ও জেএমবির সদস্যদের নেত্রকোনায় আশ্রয় প্রশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য সরকারের কাছে বারবার দাবি জানিয়ে আসছি কিন্তু কোনও কাজ হচ্ছে না। আমি চাই বর্তমান সরকার একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অসাম্প্রদায়িতকার সরকার এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সাহায্য করবেন এবং স্থানীয় মদদাতাদের খুঁজে বের করতে আইনশৃংখলা বাহিনীকে নির্দেশ দেবেন।

এ ঘটনার স্থানীয় আশ্রয় প্রশ্রয়দাতাদের খুঁজে বের করতে গোয়েন্দাবাহিনীর সদস্যরা কাজ করছে জানিয়ে নেত্রকোনা পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী বলেন, আদালত যদি ঘটনার অধিকতর তদন্ত দাবি করেন তাহলে আমরা সে মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

/টিএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।