সন্ধ্যা ০৭:৩৭ ; মঙ্গলবার ;  ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭  

অথঃ নাইপল সমাচার || অমল চক্রবর্তী

‘আমি আমার সকল গ্রন্থের যোগফল’

প্রকাশিত:


 উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ ও আত্মপরিচয়ের সংকট বেশ গুরুত্বের দাবিদার। নাইপল সৃষ্ট জগতে অন্ধকার আছে, আলো নেই; দহন আছে, স্বস্তি নেই। বিক্ষুদ্ধ এই পৃৃথিবীতে মানুষের নিজস্ব জমি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে নব্য সাম্রাজ্যবাদের করাল থাবায়। উপনিবেশ শুধু ভূগোলের সীমান্তে নয়, মানব করোটির তিমিরেও সতেজ ছাপ রেখে গেছে। বেশ লাগসইভাবে এক সমালেচক নাইপলকে তার উত্তর-ঔপনিবেশিক অস্তিত্বের জটিলতা এইভাবে চিহ্নিত করেছেন : ‘তিনি ( নাইপল ) ভারতীয়, যতদিন ওয়েস্ট ইন্ডিজে ছিলেন; ক্যারিবীয় যখন ইংল্যান্ডে থাকেন এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক জগতে এক যাযাবর বুদ্ধিজীবী।’ নাইপলের বিপুল রচনাসম্ভার, মননের জটিলতা ও পরিচয়ের বহুমাত্রিকতাকে মাথায় রেখে নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব তিনি কোন পরিচয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ২০০১ সালের নোবেল গ্রহণ ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে বললেন : ‘পৃথিবী সদা চলমান।সর্বত্র লোকেরা কোন না কোনভাবে শেকড়চ্যুত।’ নিজের দর্শন, বিশ্বাস ও উৎস নিয়ে বলতে গিয়ে ত্রিনিদাদের ইতিহাস আবিষ্কার নিয়ে লম্বা জ্ঞানগর্ভ কথা বললেও সবশেষে বললেন, ‘আমি আমার সকল গ্রন্থের যোগফল মাত্র।’ অন্যভাষায় বলতে গেলে নাইপল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনেক কিছু লিখলেও— সারাজীবন একটি বড় আত্মকথাই লিখে গেছেন যার প্রতিটি অধ্যায়ে উপনিবেশ ও ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার সুর রয়ে গেছে। ব্যক্তি নাইপল ও প্রতিথযশা সাহিত্যিক স্যার ভি. এস. নাইপল, স্রষ্টা ও সৃষ্টি; দুটোরই জ্যামিতিক ভরকেন্দ্র এই ঔপনিবেশিক সংকটে।
 
১৯৭২ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর সাহিত্য-রীতির এই ‘meta-narrative’ প্রসঙ্গের কথা উল্লেখ করেছেন : ‘যখন আমি নির্বাসিত বিষয়ে কিছু বলি, আমি নিছক উপমা হিসেবে নয়, আক্ষরিক অর্থেও তা বুঝাই।’ নিজের অস্তিত্বের শেকড়হীনতাজনিত যাবতীয় যাতনা তাকে পৃথিবীর আর সকল অভিবাসী ও উৎপাটিত জনগোষ্ঠীর মনোভঙ্গি বুঝার বিরল ক্ষমতা দিয়েছে। উৎকেন্দ্রিকতার মানসিক সমতলে থেকে ব্যক্তি নাইপল কখনোই যে একটি ‘Sense of belonging’ বা ‘পক্ষভুক্তিরা স্বস্তি পাননি তা তার বর্ণনার ছত্রে ছত্রে ব্যক্ত। নাইপলের লেখনি শৈলি ও এমনি করে আবেগ নিস্পৃহ, ছাড়া ছাড়া, ক্যামেরার লেন্সের প্রতিফলন মাত্র থেকে গেছে, যদিও পেছনের আলোকচিত্রীর মানসিকতা স্পষ্টতর হয় কোথায় ও কতক্ষণ তিনি তার লেন্স স্থির করেছেন এই দেখে। তিনি আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন সেই জগতে যেখানে বিপুল বিশ্বে মানুষ নিয়ত একাকি। একটি ফোবিয়া বা মিথ্যা-ভীতি নাইপলের মগজে নিউরনে অবিরত অনুরণন করে যার স্বীকৃতি ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ‘এনিগ্মা অব অ্যারাইভাল’ উপন্যাসে দেখি যখন ন্যারেটর বলছেন : ‘এখানে কোন নতুন স্থানে গেলে সেই একই ধরনের শঙ্কা জাগে, সেই অপক্ক প্রতিক্রিয়া, এখনো বোধ করি আমি অন্য কোন ভূমে আছি; এখনো নিজ একাকিত্বের মাঝে আমি বিষ্ময়াহত থাকি।’

আমরা সেই একই নরকে যাচ্ছি। সবাই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। ওরা আমাদের প্রাণে মেরে ফেলছে। কোন কিছুর অর্থ নেই।


বিচ্ছিন্নতার ডালপালা তাই নাইপলের প্রতিটি লেখায়, ভাষণে ও চিন্তায় ঘুণ পোকার মতো বিস্তার পেয়েছে। সেই ১৯৫০ সালে ১৮ বছর বয়সে অক্সফোর্ডে বৃত্তি পেয়ে নাইপল গৃহত্যাগি। বাবার কাছে লেখা বাসনা : ‘I feel nostalgic for home. Do you know what I long for? I long for the nights that fall blackly, suddenly without warning.’ কিন্তু আবার দ্বন্দ্বের দ্বৈরথে ভাবেন ত্রিনিদাদে একবার ফেরত গেলে লন্ডনে আর ফিরতে পারবেন তো। ২১৫ নং চিঠিতে মাকে তাই লিখেছেন ‘বাড়ি তো ফিরতেই চাই, কিন্তু কবে? মোদ্দা কথা আমি ত্রিনিদাদের ঐ জীবনে নিজেকে কিভাবে মানাবো? মনে হয় মরে যাব যখন ভাবি পুরো জীবন ওখানে কাটাতে হবে। জায়গাটা এত ছোট, মূল্যবোধ এত মিথ্যা এবং লোকজন এত সাধারণ মাপের।’ বাড়ি আর ফেরা হলো না নাইপলের; একযুগ পরে যখন ফিরলেন তখন বাবা আর নেই, আর তিনি নিজেও পাল্টে গেছেন। ‘স্থান’ ও ‘স্থানচ্যুতির’ ডায়ালেকটিকস, উত্তর-ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের যা অনুষঙ্গ ব্যক্তি নাইপলের অনুভবের গোড়াতেই তার প্রকাশ। বুকার বিজয়ী ‘ইন আ ফ্রি স্টেট’ নামের উপন্যাসের মুখবন্ধে তিনি অকপটে বলেন :
‘স্থানচ্যুতির ধারণা হাওয়া থেকে আসেনি। আমার ব্যক্তিগত পরিস্থিতিকেই তা প্রতিফলন করে।’ ব্যক্তিক এই শূণ্যতা ও নেতিবোধকে নৈর্বক্তিক করার, সাহিত্যিক চেষ্টাই যে তার উপন্যাসের ‘Ouvre’ এর মূল সুর নোবেল ভাষণে তা তিনি দোহাই দিচ্ছেন— ‘অন্ধকারের এই জগত আমাকে দিয়ে অবিরাম লেখিয়ে নিচ্ছে যাতে আমি নিজের সাথে আরও সহজে খাপ খাওয়াতে পারি।’ মোদ্দা কথা বিদিয়াধার সুরুজ প্রসাদ নাইপলের সাহিত্যিক সঞ্চয় ও অভিযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য উত্তর-ঔপনিবেশিক স্থানচ্যুতি ও মননের সংকট নিরসনে সাহিত্যিক কর্মের পুনর্বাসন সম্ভাবনা যাচাই যাকে Gillion Aitken বলেছেন ‘Post-colonial displacement and the redemptive possibities of Writing.’ বিচ্ছিন্নতাবোধ ও ডায়াস্পোরিক চেতনার সূতা এই একই লাটাইয়ের ঘূর্ণগতিতে পাক খাচ্ছে।
উত্তর-ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতাবোধ নাইপলের অদ্বিতীয় অনুসন্ধানে শুরু থেকেও ধরা পরেছে যখন সেই ১৯৫৫ সালেই মানসিক অবসাদ ও বেঁচে থাকার অবলম্বন খোঁজার যুগপৎ চাপে সদ্য অক্সফোর্ড স্নাতক নাইপল BBC এর রেডিও ধারাভাষ্যের কাজের ফাঁকে পোর্ট-অফ-স্পেনের কানাগলির ভারতীয়দের ও নিগ্রো অভিবাসীদের শেকড়হীন জীবনের অসংলগ্নতা ও বিবমিষাকে পরিহাসের ধরনে লিখলেন ‘মিগুয়েল স্ট্রীট’ গল্পগুচ্ছে। এই চরিত্রগুলো উদ্দেশ্যরহিত এক জীবনে ঔপনিবেশিক আত্মরতিতে প্রতিনিয়ত ক্ষয় হচ্ছে। পরবর্তীতে ‘Reading and Writing’ প্রবন্ধে নাইপল হয়ত এদের প্রসঙ্গেই বলেছেন যে, ‘তিনি লেখার কাঁচামাল খুঁজেন যেখানে লোকেরা শহরের রাস্তাগুলো থেকে, এরও আগে দেশ থেকে, একটি মানস-সৃষ্ট ভারতের রীতি-নীতি থেকে অনেক দূরে, সরে আছে।’ কার্ল মার্ক্স ‘এ্যালিয়েশন’ খুঁজে পেয়েছেন শ্রমিকের সাথে উৎপাদনের ফারাক থেকে। নাইপল সেই ‘বিচ্ছিন্নতা’ দেখেছেন ‘Cultural Refugee’ বা সাংস্কৃতিক উদ্বাস্তু সত্তার মধ্যে। পরবর্তীকালে উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য বেত্তারা এর নাম দিয়েছেন ‘Unhomeliness’ বা ‘গৃহহীনতাবোধ’ এর মানে ‘To feel not at home even in one’s own home, because you are not at home in yourself.’ একবার নিজের মাটি থেকে ঔপনিবেশিক ভূত এইসব ‘Sub-altern’ দের ভূমিহীন করে দাস্খত লেখাল সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে; আর কখনোই না আশেপাশে না নিজের মধ্যে কোন গৃহ খুঁজে পেল তারা। এই উৎসচ্যুত মানুষের কথাই নাইপল মহাকাব্যিক পরিসরে লিখলেন ‘এ হাউস ফর মি: বিশ্বাস’ উপন্যাসে যেখানে মোহন বিশ্বাস নাইপলের নিজের পিতা সিপ্রসাদের ছায়া মাত্র। সিপ্রসাদ নিজেও পায়ের তলার জমিন খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন সৃজনশীল লেখালেখির মাধ্যমে। ব্যর্থ সাহিত্যিক পিতার সফলতম পুত্র নাইপল পিতার মত নিজেও আজীবন গৃহহারা রয়ে গেলেন। বিচ্ছিন্নতাবোধের কর্কট রোগ নাইপলকে বালক বয়সেই গ্রাস করেছিল।

তুমি অন্য একজন, যাকে আমি চিনি না এবং উদ্বিগ্ন হই এই ভেবে যে, তুমি এমন এক ভ্রমণে আছ যার সম্বন্ধে আমি অজ্ঞাত।


হেগেল ‘Alienation’ or ‘Estrangement’ কে নেতিবাচকভাবে দেখেননি। কিন্তু নাইপলের ভূবনে ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’ একটি গভীর অস্বস্তি যার উৎস ব্যক্তির ‘Unhomeliness’ এ প্রোথিত। মোহন বিশ্বাস তাই হনুমান হাউজের কর্তৃত্ববাদ (Hegemony) থেকে পালিয়ে বাঁচতে যান যেখানে তিনি এক অস্তিত্বহীন পদার্থমাত্র। মিসেস তুলসীর ভাষায় মোহন বিশ্বাস যখন এ বাড়িতে এসেছিল তখন দেয়ালে পেরেক দিয়ে ঝুলানোর মতো কিছুই ছিল না। নিজের গৃহ নির্মাণ চেষ্টা। উত্তর-ঔপনিবেশিক আলোচনায় বিচ্ছিন্নতাবাদের চারটি পর্যায়—  ‘আকারহীনতা’, ‘শক্তিহীনতা’, ‘অর্থ শূণ্যতাবোধ’ এবং ‘সামাজিক খর্বতা’— এই সব পর্যায়ের ভেতর দিয়ে মোহন বিশ্বাসকে যেতে হয়েছিল। মোহন বিশ্বাসের জন্য গঠনাত্মক হলেও বেশিরভাগ ভারতীয় অভিবাসীর জন্য স্বতন্ত্র্য আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা অভিপ্রায় কোন সফলতা আনেনি। ‘Formless’ বা ‘অবয়বহীন’ চরিত্রগুলো পোর্ট-অব-স্পেনের রাস্তাগুলো থেকে তাই হঠাৎ করে উধাও হয়ে যায়, ‘মিগুয়েল স্ট্রীটের’ সেই হ্যাট, বোগার্ট, ম্যানম্যান, পোপো, বি ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাই ঔপনিবেশিক নামের ছায়াতেই থেকে যায়। ‘হাফ আ লাইফ’ উপন্যাসের উইলি সমার সেট চন্দন তার বাবাকে নিজ সংকর নামের কারণ সম্বন্ধে এই জন্যই প্রশ্ন করে। আর তার বাবা উত্তরে বলেন— ‘তুমি অন্য একজন, যাকে আমি চিনি না এবং উদ্বিগ্ন হই এই ভেবে যে, তুমি এমন এক ভ্রমণে আছ যার সম্বন্ধে আমি অজ্ঞাত।’ নাইপলের চরিত্রগুলো গন্তব্যবিহীন ভ্রমনে বের হয়ে গেছে, ঠিকানা না জানা থাকলেও।
বিচ্ছিন্নতাবোধের কারণ ঔপনিবেশিক ফাঁদের মধ্যেই রয়েছে। ফ্যানোন (Fannon) এই বোধের মনোঃসমীক্ষণ শেষে এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশে নব্য দেশীয় শাসক তার প্রাক্তন প্রভূর মুখোশে নিজেকে আবৃত্ত রাখতে চান ক্ষমতার বলয় গড়ে তোলার বাসনায়। এই মুখোশ মিথ্যা বা আত্মপ্রবঞ্চনার জন্ম দেয় ‘হাফ আ লাইফ’ উপন্যাসে চন্দনের মধ্যে : ‘... সে যা পড়তো, তার কিছু নিজেও গ্রহণ করতো। আর সে বলতো যে তার মা এমন এক সুপ্রাচীন খ্রীষ্ট সম্প্রদায়ভূক্ত যা খ্রীষ্টধর্মের সমান বয়সী, বাবাকে রাখতো ব্রাহ্মন হিসেবে, আর পিতামহকে বলতো ‘রাজার অমার্ত্য’। শব্দের খেলা করে নিজেকেই পুনঃনির্মাণ করতো, এটি তাকে একটি ক্ষমতায়ণ অনুভূতি দিতো।’ ফুকোডিয়ান ক্ষমতাবলয় ও শব্দের প্রবঞ্চনাময় আন্ত:সম্পর্ক উত্তর-ঔপনিবেশিক আলোচনায় প্রাসঙ্গিকতার দাবিদার। অনেক আগেই এই প্রসঙ্গে আলোকপাত করে নাইপল ‘অভিবাসী চেতনা’ ও ‘ক্ষমতা বুনন’ এর সংযোগ করেছেন। একই কারণে ‘মিগুয়েল স্ট্রীটের’ বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ বা ব্ল্যাক ওয়ার্ডসওয়ার্থ নামের কাল্পনিক জগতে থাকতে চেয়েছেন সারাজীবন যদিও শেষে স্বীকার করেন— ‘এইসব কবিতা ও সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্যের গপ্পো, গালগল্প ছাড়া আর কিছুই নয়।’
উপনিবেশ মানুষকে মিথ্যা ও খণ্ডীকৃত বীক্ষায় নিয়ে যায় চূড়ান্তে যা নৈরাজ্য ও হিংসার জগতের সূচনা করে। এই প্রক্রিয়ায় মহোত্তম কাহিনিকার যে ভি. এস. নাইপল সে ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। একেবারে শুরুতে ‘মিগুয়েল স্ট্রীট’ এর একটি গল্প— ‘যতক্ষণ সৈন্যরা আসেনি’ ছোট পরিধির মধ্যে উত্তর-ঔপনিবেশিক ভাঙন দেখিয়েছে। হাতের তালুর মতো ছোট এক ভূবন, ত্রিনিদাদ দ্বীপের অতিপরিচিত জগত বালক বর্ণনাকারী চোখের সামনে ক্রমশ অচেনা হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন সৈন্যদের আবির্ভাবের মাধ্যমে দ্বিতীয়বার উপনিবেশ হওয়ার ফলে। তার বন্ধু হ্যাট আবিষ্কার করলো ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশি এডওয়ার্ড ধীরে ধীরে নিজস্ব পরিচয় সঁপে দিচ্ছে মার্কিন ভোগবাদী প্রভূদের পায়ে। উত্তর-ঔপনিবেশিক জগতে কর্তৃত্বশালী ‘ইডিওলজী’ ক্রমশ দূর্বল ‘ইডিওলজী’র উপর যে আগ্রাসন চালায়, এডওয়ার্ডের মানসিক আত্মসমর্পণ সেই আন্তোনিও গ্রামসি বর্ণিত ‘ইডিওলজিক্যাল হেজিমনির’ দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মিগুয়েল স্ট্রীটের আড্ডার সাথীদের গর্বের সাথে সে বলল : ‘শুনো আমেরিকানরা মোটেই ব্রিটিশদের মতো না। জান, তারা তোমাকে বেশি খাটাবে সত্য, কিন্তু  টাকা দেবে ষোল আনা!’
পরিহাসের বিষয়, গল্পের শেষে আমরা অবহিত হই— এই এডওয়ার্ড পলাতক, আর ওর বউকে গর্ভবতী করলো এক ইয়াংকি সৈন্য। উপনিবেশের এই প্রবল প্রতাপ ভিন্ন মাত্রায় বিচ্ছিন্নতা ও সংঘর্ষের সূচক হয়ে উঠে আফ্রিকা নিয়ে লেখা— দুটো গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসে।
 
বিচ্ছিন্নতার প্রতিক্রিয়া শুধু ব্যক্তিক ও নীরব পদস্খলনেই সীমাবদ্ধ নয়; আফ্রিকার পটভূমিতে পূর্বসূরি জোসেফ কনরাডের মতো অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশিয় অরাজকতার চিত্র পাই ‘ইন আ ফ্রি স্টেট’ ও ‘দ্যা বেন্ড অব দ্যা রিভার’ উপন্যাসে। ১৯৭১ সালে বুকার পুরস্কার জয়ী ‘ইন আ ফ্রি স্টেট’ উপন্যাসে নাইপল তার নিরাসক্ত ও সর্বভেদী পর্যবেক্ষণে তুলে এনেছেন উত্তর-ঔপনিবেশিক উগাণ্ডার নব্য প্রভূর নৈরাজ্যময় শাসনকাল যা ঔপনিবেশিক শাসনের পুনরাবৃত্তি মাত্র। প্রাক্তন ঔপনিবেশিক ইংরেজ ববি ও লিণ্ডার চোখে এই দেশে সেই অর্থহীন নৈরাজ্য ও হিংস্রতার করাল গ্রাস বর্ণিত হয়েছে বহু বছর আগে মার্লো তা দেখেছিল কঙ্গো নদীর তীরে কনরাডের ‘হার্ট অব ডার্কনেস’ উপন্যাসে। ঈশ্বর শূণ্য, নৈতিক শাসন বিযুক্ত, ঔপনিবেশিক পরিমণ্ডলের বিশৃঙ্খলায় বিধ্বস্ত শহরে ববি নিজেকে গৃহযুদ্ধে রক্তাক্ত এক জনপদে আবিষ্কার করেন। এই ফাঁকে নাইপল আমাদের জানান সমকামী ববির সাথে ওর স্ত্রী লিণ্ডার সম্পর্ক ফাঁপা। ব্যক্তিগত সম্পর্কের অর্থহীনতা ও উপনিবেশের রাজনৈতিক শূণ্যতা পরস্পরকে প্রতিফলিত করছে মাত্র। ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত ‘দ্যা বে- অব দ্যা রিভার ’ উপন্যাসের সলিমের অভিজ্ঞতায় কোন এক রড় নদীর তীরে আফ্রিকার সদ্য স্বাধীন দেশে হয়তো কঙ্গোর মবুতুর মতো দক্ষ শাসক ‘Big Man’ নামে আরেক নারকীয় দক্ষযজ্ঞ করছেন নব্য কলোনীয় স্টাইলে ‘Maxime’ নামে পুস্তিকায় স্লোগানের মাধ্যমে কলোনাইজড আফ্রিকানদের বিভ্রান্ত করে। জেলা শাসক ফাদিনান্দের ভাষায়— ‘আমরা সেই একই নরকে যাচ্ছি। সবাই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। ওরা আমাদের প্রাণে মেরে ফেলছে। কোন কিছুর অর্থ নেই।’ শেষ পরিচ্ছেদে সলিম প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছে জাহাজে করে; আফ্রিকানেরা বার্জ ডুবি হয়ে করুণ মৃত্যুবরণ করছে। সলিমের পুনরায় ‘Refugee’ হয়ে যাবার মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক ‘Displacement’ পরবর্তী সার্বিক নৈরাজ্যেকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
 
উত্তর-ঔপনিবেশিক জগতে ভাঙ্গন আছে, মোক্ষ নেই। ‘চোরাবালিতে মুখ গুঁজে আর কী লাভ বলো?/মনস্তাপেও লাগবে না তা জোড়া।’ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘উটপাখি’ কবিতার নৈরাশ্যের আঁধার যেন নাইপলীয় জগতে প্রতিটি স্তরে বিরাজিত । ঔপনিবেশিক ক্ষমতাবল যে সার্বিক নৈরাজ্যের সূচনা করেছে মানুষের ভূগোলে ও মগজে তা থেকে মুক্তি কোথায়? এই ধারণাই দৃঢ়তর হয় রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে উপনিবেশ-বিরোধী জয়ে নাইপল প্রত্যয় রাখেন না। মানুষ— উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশগুলোর— আত্ম পরিচয়ের সংকট, আর্থ-সামাজিক নৈরাজ্য ও অস্তিত্ববাদী সংকটে ক্ষত হয়ে কোন স্বর্গরাজ্যে পৌঁছাচ্ছে না। নোবেল কমিটির স্তুতি ভাষণ অনুযায়ী সাম্রাজ্যের দুই কথক— কনরাড ও নাইপল বিশাল ক্যানভাসে নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। নোবেল বিজয়ের মূল কারণ পূর্বসুরী কনরাডের মতো নাইপল ‘Annalist of the destinies of empires in the moral Sense’ পূর্বসুরী কনরাডের ‘Heart of Darkness’ এর কঙ্গোর সাথে নাইপলের ভূবনের মিল আমাদের চমৎকৃদত করে। নাইপল বৈচিত্র্যময় লেখনির সূতোর বুনটে যে ‘Moral Vision’ বা ‘নৈতিক জগত’ দেখাতে চেয়েছেন তা কতটুকু ‘কলোনিয়াল প্রভূর’ আর কতটুকু ‘কলোনাইজড সাব-অল্টার্ণ’ নিম্নবর্গের সেই প্রশ্নের উত্তরটাই এখন মূখ্য।
 
তাহলে কোন নাইপল আমরা পড়ব? যে নাইপল তার উপন্যাসে কলোনিয়াল মানসিকতার স্ততি কপচান, তিনি আমাদের নমস্য নন। কিন্তু উত্তর কাঠামোবাদী সমালোচনায় টেক্সট নিজেই স্বার্বভৌম সত্ত্বার দাবীদার। আর নাইপলের কাহিনি সমগ্র তার সকল বৈপরীত্য ও আপাত অসংগ্নলাতা সত্ত্বেও সাহিত্য বোধের প্রসাদ গুণে উত্তর ঔপনিবেশিক জগতের আন্তরিক দলিল হয়ে ওঠে । ব্যক্তি নাইপলের দর্শন আমাদের অভিষ্ট নয়, নাইপলের টেক্সট গুলোই সাম্রাজ্যের অন্তভেদী পর্যবেক্ষণ হিসেবে আমাদের মনোযোগের জোরালো দাবীদার।

 

প্রথম অংশ পড়তে ক্লিক করুন :

http://www.banglatribune.com/news/show/118024/

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।