সন্ধ্যা ০৬:১৪ ; রবিবার ;  ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬  

সব্যসাচী হাজরা মানেই বই আর প্রচ্ছদ!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

এহতেশাম ইমাম।।

একটি বইয়ের প্রচ্ছদ হলো পুরো বইয়ের সারমর্ম। এ ক্ষেত্রে এককভাবে যেকোনও বইয়ের প্রচ্ছদের শক্তি হচ্ছে এক পৃষ্ঠায় পুরো বইয়ের প্রকাশ। এই সময়ে প্রচ্ছদশিল্পীদের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়দের একজন প্রচ্ছদ শিল্পী সব্যসাচী হাজরা। বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তুলে ধেরেছেন তার কর্মজীবন থেকে ভাবধারার আদ্যোপান্তো। 

প্রচ্ছদ অলংকরন নয়, বই পড়াটাই পেশা...

পড়তে ভালোবাসি সব সময়। সেই চিন্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে পেইন্টিং এ মার্স্টার্স করার পর তথাকথিত পেশাগত জীবন থেকে সরিয়ে রেখেছে অনেকটা। দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ি পেশা জীবন বেছে নেওয়ার বিষয়ে।

এ ক্ষেত্রে যোগ করব নিজের ভাললাগার ছবি বিক্রি করাটা আমার কাছে পছন্দ হতো না। আর্টওয়ার্ক বিক্রি করা উচিৎ না। এর পাশাপাশি একটি পেশা খুঁজছিলাম যেটা আমার জন্য উর্পাজনের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলি। আমার ব্যক্তি জীবনে অনুসরণীয় হিসেবে, চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীন ও কামরুল হাসান বিশেষ গুরুত্ববহন করেন।

রাজনীতিতে না থেকেও রাজনীতিক...

কিছু চিত্রশিল্পী আছেন যাদের মধ্যে কখনও রাজনৈতিক কোনও কার্যক্রমের অস্তিত্ব খুঁজে পাবেন না। তবে দেখবেন তাদের কাজের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে সমাজের হালচাল। যেমন জয়নুল আবেদীন ও কামরুল হাসান রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত না থেকেও, যথেষ্ট সচেতন ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন।

এরা প্রতিটি মুহূর্তে যে কাজটি করেছেন সেটি হচ্ছে রাজনীতির ইস্যুগুলোকে কাজের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা। যেমন ধরুন, দুর্ভিক্ষের সময় নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু, দুর্ভিক্ষ বোঝাতে এখনও জয়নুল আবেদীনের ছবির বিকল্প নেই।

মূলত এই বিষয়গুলো আমাকে আমার পেশাজীবন নির্ধারণে সহায়তা করেছে। যে কারণে আমার চিত্রশিল্পকে আমি আমার শখের স্থানেই রেখেছি। কিন্তু, পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি চিত্রশিল্পকে গ্রাফিকাল আর্টস ওয়ার্ক। তারেই একটি মাধ্যম বইয়ের প্রচ্ছদ করা।

পাণ্ডুলিপি ছাড়া প্রচ্ছদ অসম্ভব...

পাণ্ডুলিপি পড়া ছাড়া আমি কখনও বুক কাভার ডিজাইন করি না। এবং সেখানে আমার পছন্দ-অপছন্দকে আমি সবসময়ই গুরুত্ব দেই। এ ক্ষেত্রে কার লেখা পাণ্ডুলিপি বা ভাল-মন্দের বিচারের চেয়ে আমি গুরুত্ব দেই আমি বইটিকে ঘিরে আমার কাজটিকে কতটা বাস্তবসম্মত করে করতে পারব।

কাজ নির্ধারণে শুধুই পড়া...

পাণ্ডুলিপি পড়ার পর আমি মূলত নির্ধারণ করি কাজের ধরন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় একটি কবিতার বই পড়ার পর ঠিক করি বইটির প্রচ্ছদ কি ওয়াটার কালারে হবে, নাকি টাইপোগ্রাফিতে করব। অথবা কোন ফটোগ্রাফি ব্যবহার করে সেটার ওপর আলাদাভাবে কাজ করব। এভাবে প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক কাজের মাধ্যম নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে, একই বিষয়ে ভিন্ন প্রচ্ছদ তৈরি কিছুটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে বিভিন্ন সময়। একই ধরনের প্রেমের কবিতা লেখক বিশেষে ভিন্ন ভিন্ন আবেহ তৈরি করে। সে ক্ষেত্রে প্রচ্ছদ তৈরির সময় বিষয়গুলো মাথায় রাখা অনেকটা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

ছিন্ন হয়ে যাচ্ছেন সৃজনশীলরা...

ধরুন কোনও লেখক তার সামনের চলমান কোনও ঘটনা তার লেখার মধ্য দিয়ে তুলে আনলেন, কিন্তু এখন আর্টিস্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মাধ্যম নির্বাচন। সম্ভব হলে প্রচ্ছদশিল্পীর উচিৎ লেখকের সঙ্গে বসে কথা বলে লেখকের চিন্তার গভীরতা বোঝা। একট সময় ছিল যখন লেখক, কবি, সাহিত্যিক, ফটোগ্রাফারেরা মিলে আড্ডা দিতেন। সময়ের ধারাবাহিকতায় সেই অভ্যাসগুলো পরিবর্তন হয়ে গেছে। মানুষ এখন অনেক ছিন্ন হয়ে গেছে একে অপরের থেকে। 

বইয়ের ক্ষেত্রে দুই চ্যালেঞ্জ...

বইয়ের ক্ষেত্রে সব সময় দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। যার একটি হচ্ছে টাইপোগ্রাফী বা অক্ষরবিন্যাস। লক্ষ্য করলে দেখবেন ইউরোপসহ অন্যান্য দেশগুলোর বইগুলোর প্রচ্ছদ হয় মূলত ফটোগ্রাফি কেন্দ্রিক। আমাদের এই সাব-কন্টিনেন্টে হাতে এঁকে করা কাভার এ প্রবণতা চোখে পড়বার মতো। উদাহরণ হিসেবে বলি জাহানার ইমামের লিখা ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইয়ের প্রচ্ছদ কাইয়ুম চৌধুরী যেভাবে হাতে এঁকে করেছেন, এটি কোনওভাবেই ফটোগ্রাফি দিয়ে সম্ভব হতো না। এছাড়া হাতে তৈরি কোনও শিল্পের প্রতি মায়া তুলনামূলক একটু বেশি থাকে।

আমি বইয়ের কাভারের ক্ষেত্রে হাতের কাজের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। এর বাইরে কম্পিউটার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ।  সবার কাজ আলাদা। তবে প্রত্যেকের কাজের মধ্যে লক্ষ্য করলে তাদের সিগনেচার বোঝা যায়।

সব কাজ সবার জন্য না...

যে শিল্পী পোস্টার থেকে শুরু করে কর্পোরেট লোগো তৈরির জন্য বিখ্যাত, সেই যে বইয়ের প্রচ্ছদ ভালো করবেন সে ধরনের আশা করা অনুচিত। কারণ ব্যক্তি বিশেষ তার কাজের আগ্রহের সঙ্গে সঙ্গতি মিলিয়ে কাজ করবেন সেটাই স্বাভাবিক। উদাহরণ হিসেবে বলি,চির তরুণ আফজাল হোসেনের কথা। আফজাল হোসেন জনপ্রিয় অভিনেতা কিংবা উপস্থাপক হিসেবেই পরিচিত সবার কাছে। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন তার করা পোস্টার করার কথা। একটা সময় ছিল যখন থিয়েটারের পোস্টার আফজাল হোসেন ছাড়া সম্ভব ছিল না। তিনি এটা নিজের ভালবাসার জায়গা থেকে ধরে রেখেছেন।

চিত্রলিপি এর গল্প...

সহজে কী করে জগতের সঙ্গে পরিচয় করে নিতে পারবে শিশুরা? সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হতে পারে ছবি। ছবি দিয়ে শিশুদের অক্ষর চেনানোর লক্ষ্যে আমার সৃষ্টি ‘চিত্রলিপি’। যেখানে শিশুরা বাংলা বর্ণমালার সঙ্গে মিলিয়ে আঁকা ছবি গুলো দেখে শিখবে মাতৃভাষা।

আমি চেষ্টা করেছি ভালবাসার কাজ আর পেশাগত কাজকে ভিন্ন রেখে কাজ করতে। এভাবেই শিল্পীর শিল্পমান আর শিল্পের প্রতি ভালবাসা টিকে থাকে বলে আমার বিশ্বাস।

/এফএএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।