রাত ০৫:৫০ ; শুক্রবার ;  ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮  

কৃষকদের আতংকের নাম বিষধর চন্দ্রবোড়া!

প্রকাশিত:

রাজশাহী প্রতিনিধি।।

রাসেল’স ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। তবে কৃষকদের ভয়ের আরেক নাম প্রায় ৩০ বছর পর ফিরে এসেছে। বেড়েছে আতংকও। এর ভয়ে ধান কাটাও বন্ধ রাখতে হচ্ছে। চলাফেরায় আরো করতে হচ্ছে বাড়তি সতর্কতা। গত দুই বছরে এর কারণে ভয়াবহ মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে অন্তত পাঁচ কৃষককে। এর কামড়ে অসুস্থ তিনজনের হাত-পা কেটে ফেলেও বাঁচানো যায়নি।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরের প্রথম দিকে চাঁপাইনবাগঞ্জের নাচোল উপজেলার বরেন্দা গ্রামের আব্বাস উদ্দীনের ছেলে আনোয়ার হোসেনকে (১৮)ছোবল দেয় চন্দ্রবোড়া (রাসেল’স ভাইপার) সাপ। চিকিৎসার জন্য স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আনোয়ার হোসেনের মৃত্যু হয়।

২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাঁধাইড় ইউনিয়নের শিবরাম গ্রামের নওশাদ আলীর ছেলে তাইজুদ্দীনকে (২৫)কামড় দেয় এই বিষধর সাপ। তার স্ত্রী নাদিরা বলেন, আক্রান্ত তাইজুদ্দীনকে স্থানীয় দুজন ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা ফু দিয়ে শরীরে বিষ নেই বলে তাইজুদ্দীনকে বাড়িতে নিয়ে যেতে বলেন। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে অবস্থার অবনতি ঘটলে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তির পর তাইজুদ্দীনের মৃত্যু হয়।

চলতি বছরের (২০১৫ সাল) বিভিন্ন সময়ে এই সাপের ছোবলের শিকার হয়ে রামেক হাসপাতালে ভর্তি হন আরও তিন ব্যক্তি। এদের একজন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলেও দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

এ বছরের অক্টোবরে এর কামড়ে মৃত্যু হয় তানোর উপজেলার সাইধরা গ্রামের কৃষক ইয়াসিন আলী কালুর (৫১)। কালুর মৃত্যুর বরেন্দ্র অঞ্চলে চন্দ্রবোড়া (রাসেল‘স ভাইপার) সাপের আতংক আরও ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে এই সাপের ভয়ে কৃষি কাজেও বিরত থাকেন বলে জানান। 

রাজশাহী তানোর উপজেলার শিবরামপুর , জুমারপাড়া, তেলোপাড়া, সাইধাড়া, মাড়িয়া, চাপড়া, জোকারপাড়া গোদাগাড়ী উপজেলার চান্দলাই, ছয়ঘাটি, ভুষণা  নাচোল উপজেলার খড়িবোনা, পাইকুড়া, নুরপুর, জোরপুকুর, রায়পাড়া, নন্দিঘর, সাঁওতালপাড়ায় চন্দ্রবোড়া সাপ বেশি দেখা যায় বলে জানা গেছে। এর আতংকে জমির ধান কাটাও বন্ধ করে দেয় কৃষক।

তানোরের বাধাইড় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান হেনা বলেন, চন্দ্রবোড়ার দংশনে আক্রান্তদের সবাই কৃষক।

তানোর উপজেলার শিররামপুর গ্রামের বাবলু সরকার (৬২) বলেন, ১৯৮৫ সালের দিকে এ অঞ্চলে চন্দ্রবোড়ার বিলুপ্তি ঘটে। কিন্তু ২০১৩ সালের আবারও এ সাপ দেখা যায়। গত দুই বছরে চন্দ্রবোড়ার দেখা মিলছে বেশি।

এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অশোক ফাউন্ডেশন ফেলো এবং  বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আবু সাইদ জানান, বাংলাদেশে ১০০ প্রজাতির সাপ রয়েছে। এর মধ্যে বিষধর সাপ ৩২ প্রজাতির সবচেয়ে বিষধর ৩টি সাপের মধ্যে একটি চন্দ্রবোড়া সাপ। চন্দ্রবোড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বেশি দেখা যায়। বন্যার পানির সঙ্গে ভারত থেকে এ সাপটি বরেন্দ্র অঞ্চলে এসে বংশ বিস্তার করে যাচ্ছে। এ সাপটি গর্তে বেশি থাকে।

তিনি জানান, চন্দ্রবোড়া তিন-চার ফুট লম্বা হয়। সাপটি গর্তে থাকতে বেশি পছন্দ করলেও রাতেই বেশি দেখা যায়। এ সাপ ইঁদুর, ঘাসফড়িংসহ বিভিন্ন পোকামাকড় খায় বলে ধান ও গমের জমিতে থাকে। সাপটির মাথা সরু ও ছোট হওয়ায় দ্রুত মানুষকে দংশন করতে পারে। সাপটির চলাচল ধীরগতির। অন্য সাপের চেয়ে চন্দ্রবোড়ার দাঁত বড় ও শব্দ করে জোরে। একে উত্ত্যক্ত না করলে তা মানুষকে দংশন করে না। সাপটি ২৬০ মিলিগ্রাম বিষ প্রয়োগ করতে পারে। তবে ৪০ মিলিগ্রাম বিষ প্রয়োগ করলে ঐ ব্যক্তির মৃত্যু হয়।

এ প্রসঙ্গে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (রামেক) মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আবু সাহিন বলেন, চন্দ্রবোড়ার দংশনের কিছুক্ষণ পর হাত-পা ফুলে যায় এবং দেহের বিভিন্ন স্থান দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়। হাত ও পা রশি দিয়ে বাঁধলে ফুলে যাওয়া রক্তক্ষরণের স্থানে পচন ধরে। দংশনের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিলে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি।রামেক-এ এর চিকিৎসার ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। 

বরেন্দ্র অঞ্চলের চন্দ্রবোড়া সাপ নিয়ে গবেষণা করেছে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান বারসিক। সংস্থাটির প্রোগ্রাম অফিসার শহিদুল ইসলাম বলেন, চন্দ্রবোড়া  সাপ নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও সাপটি সম্পর্কে জনসচেনতা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছি।

/এসএস/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।