রাত ১২:১৬ ; শনিবার ;  ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮  

কপ-২১: শুরুর আগেই বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা

স্বল্পোন্নত ৭০টি রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

উদিসা ইসলাম।।

নানা শঙ্কার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত দিনে ফ্রান্সে শুরু হলো ‘কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস (কপ-২১)’-এর জলবায়ু সম্মেলন- কপ ২১। পরিবেশ বাঁচাতে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমণের পরিমাণ ৮৭ ভাগ কমানোর অঙ্গীকার নিয়ে ১৮৩টি দেশ এবার একটি চুক্তি স্বাক্ষরের কথা থাকায় এবারের সম্মেলনকে ঐতিহাসিক বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সম্মেলনে অংশ নেবেন ১৪৭টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। যদিও চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলো ভুক্তভোগী ছোট দেশগুলোর প্রতি কী ধরনের আচরণ করে সেটা নিয়ে পরিবেশবাদীরা কিছুটা শঙ্কায় আছেন।

এবারের সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত স্বল্পোন্নত ৭০টি রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থরক্ষায় আপস থেকে শুরু করে করণীয় নির্ধারণও করবে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেষমুহূর্তে সম্মেলনে যোগদানের বিষয়টি বাতিল করলেও পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে ৩৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবেন।

‘ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার' ও ‘নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ছয় বছরে বাংলাদেশের ৫৭ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছে। যার বড় উদাহরণ ২০০৭ সালে ঘূর্নিঝড় সিডরে আক্রান্ত বেবীর পরিবার। দুর্যোগপরবর্তী সময়ে পেশায় জেলে স্বামীকে তিনি খুঁজে পাননি। চার সন্তান নিয়ে খাস জমির ওপর বানানো ঘরে থাকতে শুরু করেন।কিন্তু সেখানেও থাকতে না পেরে বেবীকে বাধ্য হতে হয় তার সন্তানগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে।একেক সন্তানকে একেক আত্মীয়ের বাড়ি, মাদ্রাসায় পাঠিয়ে বেবী তাদের নিরাপত্তা দিতে চান। একটি ঝড় বেবীর জীবন লণ্ডভণ্ড করে দেয়।

আইলা ২০০৯

অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্যেও। সরেজমিনে দেখা গেছে, খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা, বাগেরহাটের মংলা ও শরণখোলা, সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলাসহ সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার প্রায় ২ লাখ নারী ও কিশোরী প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ অঞ্চলের নারী ও শিশুসহ সাধারণ মানুষ পুকুর-ডোবার পানিই ফুটিয়ে পান করছে। অস্বাস্থ্যকর পানি দিয়েই চলে তাদের নিত্যদিনের কাজ। পানির লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সে পানি পানসহ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকার নারী ও কিশোরীরা জরায়ুর প্রদাহ, গর্ভকালীন খিঁচুনি ও অপরিণত শিশু জন্ম দেওয়াসহ প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন।

জলবায়ুর পরিবর্তনে ভরা মৌসুমে পদ্মা

শুধু বাংলাদেশ নয়, যে যুক্তরাষ্ট্র নানা চুক্তি ভাঙা এবং কার্বন নিঃসরণের কথা দেওয়ার বিষয়ে গড়িমসি করার অভিযোগে অভিযুক্ত সেদেশেরই একটি শহর জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে আছে। ইউনিয়ন অফ কনসার্নড সায়েন্টিস্ট সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে দেশটির সাউথ ক্যারোলাইনার পুরনো শহর চার্লসটন থেকে শুরু করে গৃহযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ফোর্ট মনরো আছে এ ঝুঁকিতে।

১৯৯৭ সালে জাপানের কিয়োটোয় অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনের পর এবারের প্যারিস কপ-২১’কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। কিয়োটো প্রটোকল বাস্তবায়নে এবারের সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্যারিসে প্রটোকল স্বাক্ষর করবেন যার ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস নির্গমণের পরিমাণ ৮৭ ভাগ কমানোর জন্য অঙ্গীকারও করবেন তারা। পরিকল্পনা মতে এর বাস্তবায়ন শুরু হবে ২০২০ সাল থেকে।

এই চুক্তি জরুরি কেননা, বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে কার্বন নিঃসরণ লাগামহীনভাবে চলতে থাকলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে ১৫ বছরের মধ্যে ১০ কোটিরও বেশি মানুষ চরম দরিদ্র এবং ৫০ কোটির বেশি মানুষ গৃহহীন হতে পারে। এ ছাড়া ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অতিরিক্ত ১৫ কোটি মানুষ ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ১০টি শহরের সবকটা এশিয়াতে। এগুলোর মধ্যে ঢাকা ছাড়াও রয়েছে কলকাতা, মুম্বাই, হংকং, সাংহাই, জাকার্তা ও হ্যানয়।

জাতিসংঘ চেষ্টা করছে এ সম্মেলনের মাধ্যমে সব দেশকে নিয়ে একটি কার্যকর চুক্তি করতে। যাতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব মাত্রা থেকে দুই ডিগ্রির মধ্যে থাকে।

তিস্তা, সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা

সেই ধারাবাহিকতায় এই জলবায়ু সম্মেলনে কোনও ধরনের শর্ত ছাড়াই ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর ঘোষণা দেবে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কপ-২১এ বাংলাদেশ এ-সংক্রান্ত দুটি প্রস্তাব দেবে বলে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। তবে এ চুক্তিতে খুব একটা সাড়া দিচ্ছে না সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পোন্নত দেশগুলো। আবার বেশি সাড়া দিয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে জার্মানি আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাবে বলে জানিয়েছে।

সম্মেলন প্রসঙ্গে গত সপ্তাহে পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু শঙ্কার পাশাপাশি আশান্বিত হতে চান বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পৃথিবীতে যেভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে সেভাবে চলতে থাকলে একদিন শুধু বাংলাদেশই নয়, ওয়াশিংটন ডিসিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে উন্নত দেশগুলো দুই ভাগে বিভক্ত স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘দেখি কতদূর করা যায়।’ আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে যে প্রভাব পড়বে এর ক্ষতিপূরণের কোনও অর্থ ঋণ হিসেবে নয়, অনুদান হিসেবে দেওয়ার দাবি জানানো হবে। প্রয়োজনে সম্মেলন বর্জন করা হবে।

পোপ ফান্সিস ইতোমধ্যে এক চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছেন, ধনী দেশগুলোকে এ সমস্যা সৃষ্টির দায় মেনে নিতে হবে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং উন্নয়নশীল বিশ্বকে জ্বালানি উৎপাদনের টেকসই পদ্ধতি গ্রহণে সহায়তার মাধ্যমে এই ঋণ পরিশোধে সহায়তা করতে হবে। পোপ অবিলম্বে ধাপে ধাপে কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০ নভেম্বর সকালে এ সম্মেলন মূলভাগ শুরু হওয়ার কথা। প্যারিসের লি বার্গেটে অনুষ্ঠিতব্য এ সম্মেলন চলবে ১১ ডিসেম্বর (শুক্রবার) পর্যন্ত। গত ১৩ নভেম্বর প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার পর এ সম্মেলন ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। হামলার পরবর্তী সময়ে সম্মেলন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিলেও তা কাটিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে সম্মেলন। মূল সম্মেলন কেন্দ্র লি বার্গেট ঘিরে ২ হাজার ৮০০ পুলিশ-সেনা মোতায়েন থাকবে। সম্মেলন চলাকালে প্যারিসে কোনও সভা-সমাবেশের অনুমতি দেবে না ফরাসি সরকার।

 

/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।