ভোর ০৬:৫৮ ; শনিবার ;  ১৮ নভেম্বর, ২০১৭  

বিতর্কিত এবং কিংবদন্তী ‘জ্যাক লন্ডন’ || ফারহানা রহমান

প্রকাশিত:

পেশি শক্তি বাড়াবার চেয়ে মেধাশক্তি বাড়ানোই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ। ফলে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে গিয়ে স্কুলে ভর্তি হলেন। পরে কলেজে পড়ার সময় দৈনিক পত্রিকার একটি গল্প প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। আর তখন থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে।

জ্যাক লন্ডনের লেখা “হোয়াইট ফ্যাং” বইটি প্রথম পড়ি ক্লাস সেভেনে পড়া অবস্থায়। সদ্য চোখ ফোঁটা নেকড়ে শাবকের গুহার মুখ থেকে প্রথম আলোকময় পৃথিবী দর্শনের বিস্ময়কর অভিভূতর বর্ণনা পড়ে লেখকের মত একইভাবে আমিও বিস্ময়ের ঘোরে ছিলাম বেশ কিছুদিন। সেই থেকে শুরু। একে একে পড়েছি “কল অফ দা ওয়াইল্ড”, “দি সি উলফ”, “আগুন জ্বালতে হলে”( To Build a Fire), “জীবন তৃষ্ণা” (Love of Life"), “বিধর্মী”, “গল্পের শেষে”। জ্যাক লন্ডন “এক টুকরো মাংস” নামের যে গল্পটি লিখেছিলেন, আমাকে আজও তা ভাবায়। সর্বোপরি, তার কর্মের মাস্টারপিস হিসেবে যেটা পাঠক মহলে সর্বাধিক আলোচিত, “কল অফ দা ওয়াইল্ড” সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত না করলেই নয়! কারণ এই উপন্যাসিকাটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে একসময় ইতালি এবং যুগোস্লাভিয়াতে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।  

জ্যাক লন্ডন ছিলেন একাধারে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, ছোট গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। তিনি ১৮৭৬ সালের ১২ জানুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রানসিসকোতে জন্মগ্রহণ করেন। তার মূল নাম ‘জন গ্রিফিথ চেনে’। মাত্র ৪০ বছরের তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনটি ছিল যেমন একাধারে প্রবল ঘটনাবহুল, তেমনই যেন রূপকথার মত বর্ণময়। তিনি বিশ্বের দ্রুত বিস্তার লাভকারী বাণিজ্যিক সাহিত্য পত্রিকাগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন সেসময় এবং বিশ্বব্যাপী একজন সমাদৃত ‘সেলিব্রিটি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তার ফিকশন গল্পগুলো এতটাই আকর্ষণীয় ছিল, যা বর্তমান বিশ্বসাহিত্যের জগতেও সমান ধারায় জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে। লন্ডন ছিলেন সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার একজন অনুরাগী লেখক। সেজন্য তাকে চড়া মূল্যও দিতে হয়েছে। তার সবচেয়ে বিখ্যাত লেখার একটি হচ্ছে "কল অফ দা ওয়াইল্ড" যা বিশ্বসাহিত্যে মাস্টারপিস হিসেবে সন্মানিত এবং আজও সমাদৃত। 

শৈশব থেকেই জ্যাক লন্ডন বেড়ে ওঠেন শ্রমিক শ্রেণির একজন হিসেবে। দারিদ্র-পীড়িত শৈশবে জীবনধারনের তাগিদে প্রত্যেকদিন অন্তত ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা তাকে পরিশ্রম করতে হতো। তার ছেলেবেলা কেটেছে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের এক বস্তিতে। একসময় ঝুপড়ি বস্তি ছেড়ে জ্যাক বেরিয়ে পড়েন পৃথিবীর পথে। আর এভাবেই ধার করা টাকা দিয়ে এক সময় কিনে ফেলেন র‍্যাজেল ড্যাজেল নামক এক পুরানো জাহাজ। হয়ে ওঠেন রীতিমত একজন ঝিনুকদস্যু। জাহাজটি একদিন সাগর গভীরে ডুবে যাওয়ার পর তিনি বাধ্য হয়ে মৎস্যজীবীদের দলে যোগদান করেন এবং পরে জাপান উপকুলে স্কুনার নিয়ে যান। এর পরের কয়েক বছর, খাবার কারখানার শ্রমিকের কাজ থেকে শুরু করে কয়লা উত্তোলন, পাট কলের কেরানী, শিল মাছ শিকার, শুঁড়িখানার বিক্রেতা ইত্যাদি-সহ হেন কাজ নাই তিনি করেননি জীবিকা নির্বাহের জন্য। ভবঘুরে হিসেবে সারা আমেরিকা ঘুরে বেরিয়েছেন এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত। এই ঘোরাঘুরির জন্যও তাকে জেল খাটতে হয়েছে। এরই মাঝে তার হাতে আসে কার্ল মার্কসের কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো যা পাঠ করে চিরভবঘুরে জ্যাক অন্যরকম এক ‘জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার’ আলোর সন্ধান পান। হয়ে ওঠেন দীক্ষার আলোয় আলোকিত। 

জেল থেকে বেরনোর পর জ্যাক বুঝতে পারলেন, পেশি শক্তি বাড়াবার চেয়ে মেধাশক্তি বাড়ানোই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ। ফলে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে গিয়ে স্কুলে ভর্তি হলেন। পরে কলেজে পড়ার সময় দৈনিক পত্রিকার একটি গল্প প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। আর তখন থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে। এরই মাঝে ১৮৯৭ সালে তিনি স্বর্ণ সন্ধানীদের সাথে হুজুগে মেতে কলেজ ত্যাগ করে আলাস্কা ও ক্লোনডাইকে যাত্রা করেন। একসময় জ্যাক কপর্দকহীন অবস্থায় ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে আসেন তবে সঙ্গে নিয়ে আসেন সোনার চেয়েও অনেক মূল্যবান; এতদিনের সংগৃহিত অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। 

মূলত একটি একনায়কতন্ত্রের শাসন ব্যবস্থা ততদিনই টিকিয়ে রাখা সম্ভব যতদিন রাষ্ট্রের জনগনকে অবরুদ্ধ করে রাখা যায়। 

উত্তরের প্রচণ্ড শীতে কুকুর ও নেকড়েদের মাঝ থেকে তিনি যে অভিজ্ঞতা লাভ করছিলেন পরবর্তীতে তাকে পুঁজি করেই তিনি লিখে যান একের পর এক জগত বিখ্যাত সব গল্প-উপন্যাস। জ্যাক লন্ডন একটানা ষোল বছর অবিচ্ছেদ্যভাবে লেখালেখির কাজে নিজেকে নিয়জিত রেখেছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিগুলোর মধ্যে ছিল উনিশটি উপন্যাস, আঠারোটি ছোটগল্প ও বেশকিছু প্রবন্ধের বই ছাড়াও আরও বেশ কিছু বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখা বই।

১৯০২ সালের শেষের দিকে জ্যাকের মাথায় কুকুর নিয়ে এক গল্প লেখার ভাবনা এলো। গল্পটিকে তিনি শুরুতেই চার হাজার শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু লেখা শেষ করে তাঁর উপলব্ধিতে আসে যে, গল্পটি তো আসলে মাত্র বলা শুরু হয়েছে! সেই প্রথম বারের মত তিনি বুঝতে পারেন যে লেখার সময় গল্পের চরিত্রগুলো নিজ থেকেই জীবন্ত হয়ে ওঠে, আর সে চরিত্রগুলো চলে তার নিজের খেয়ালখুশি মত আপন গতিতে, যেখানে লেখক বড্ড অসহায়, যার তেমন কিছুই করার মত ক্ষমতা থাকে না। এই গল্পের নাম দেন তিনি ‘কল অফ দা ওয়াইল্ড’। 

‘কল অফ দা ওয়াইল্ড’ গল্পের প্রধান চরিত্র ‘বাক’ একটি চার বছর বয়সী বিশাল দেহী আধা সেন্ট বার্নারড এবং আধা স্কটিশ মেষ পালক কুকুর, যে তার ধনী মালিক জজ মিলারের অত্যন্ত প্রিয় ও আদুরে কুকুর হিসেরে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্টা ক্লারা ভ্যালির রেঞ্চে দিন যাপন করে আসছিলো। ঠিক সে সময়টাতেই মূলত উত্তরে স্বর্ণখনি আবিষ্কৃত হয়েছিল। যার কারণে বড় সাইজের কুকুরগুলোও তখন হঠাৎ খুবই মূল্যবান প্রাণিতে পরিণত হয়েছে, যেহেতু এরা গভীর বরফের উপর দিয়ে স্লেজগুলকে টেনে আনতে পারতো । আর ঠিক এ সময়টিতেই হঠাৎই একদিন বাকের জীবনে একটি নাটকীয় মোড় নেয়, যা ছিল এক অর্থে নারকীয়।

জুয়ায় আসক্ত জজের এক অসাধু দাস বাককে চুরি করে উত্তরের কুকুর কেনা বেচার ব্যবসার সাথে জড়িত একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। সে এই প্রথমবারের মত খাচায় বন্দি হয়ে ভ্রমণ শুরু করে এবং আলাস্কাতে বিক্রি হয়ে যায় যেখানে কুকুরস্লেজই পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিলো। 

অশিক্ষিত কুকুর বাককে তখন অন্যান্য কুকুরদলের সাথে একসাথে থেকে কী করে স্লেজগাড়ী টানতে হয়, কী করে ঘুমের জন্য বরফের ভেতর গর্ত তৈরি করতে হয়, কী করে চিরস্থায়ী ক্ষুধা যন্ত্রণার মধ্যে বেঁচে থাকতে হয় এবং কখন কী করে পশুদের সহজাত বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভর করে চলতে হয় সেগুলো বাধ্য হয়ে শিখতে হয়েছিল। একটা ব্যাপার সে বুঝতে পারে যে, তার মধ্যে সহজাত পশুপ্রবৃত্তি অত্যন্ত প্রখর। সে জানতো, আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথেই যে পাল্টা আক্রমণে প্রতিপক্ষকে মুহূর্তের মধ্যে ঘায়েল করে ফেলতে হবে এবং তা না হলে যে নিজেরই জীবন বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে। একই সাথে সে বুঝতে পারে এই বরফাচ্ছন্ন উত্তরের জীবনে তাকে প্রতি মুহূর্তে সতর্কতার সাথে নানা প্রকার অসস্তি ও ক্রমাগত ব্যথা-বেদনার সাথে জীবন ধারণ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দিনের পর দিন ক্ষুধার্ত থেকে থেকে বাকের কাঁচা মাংস ও রক্ত খাওয়ার আদিম প্রবৃত্তি আবারও জেগে ওঠে তখন। একই সময়ে স্লেজগাড়ি টানার প্রধান কুকুর স্প্লিটজের দ্বারা নানাভাবে উত্যক্ত হয়ে হয়ে একসময় বাক সুযোগ বুঝে ওর উপরে ঝাপিয়ে পড়ে, আর লড়াই করে নিজের সুযোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নেয়। যার কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে তার দুই মাস্টার ফ্রাসোয়া ও পেরল্ট-এর কাছে খুব প্রিয় হয়ে ওঠে।     

পরবর্তী সময়ে বাক-এর নতুন স্কটিশ মাস্টার একটি অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে প্রায় অসহনীয় অবস্থায় বাককে কাজ করতে বাধ্য করে। বাক ছাড়া আর প্রায় সব কুকুরগুলোই এ অবস্থায় পথিমধ্যেই মরে যায়। যদিও এ পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় বাককে ভয়ংকরভাবে তার ওজন হারাতে হয়। পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে যখন, বাক আবারো বিক্রি হয়ে যায় চার্লস, হল ও মারসেডিস নামের তিনজন অপেশাদার দুঃসাহসী ভ্রমণকারীর কাছে। এরা এমন একটি দল যাদের কোন ধারণাই নেই যে কীভাবে বরফাচ্ছন্ন উত্তরের তীব্র প্রতিকূল পরিবেশে কুকুরের দলকে সুসংগঠিতভাবে পরিচালিত করতে হয়, কীভাবে তাদের সাবধানতার সাথে সুপরিকল্পিতভাবে পথ দেখিয়ে সামনে এগিয়ে নিতে হয়। এরই ফলে অর্ধেক রাস্তায় যেতে না যেতেই খাবার ফুরিয়ে যায় এবং বাক সামনে এগোতে অস্বীকৃতি জানায়। যদিও এজন্য তাকে অমানুসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। পরবর্তীতে দেখা যায় যে, সেই দুঃসাহসী অপেশাদার ভ্রমণকারিরা ও তাদের বাকি জীবিত কুকুরগুলোর বরফাচ্ছাদিত নদীতে সলিল সমাধি হয়।   

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই বাক-এর সাথে পরিচয় হয় জন থরন্টন নামের একজন সজ্জন ব্যক্তির সাথে, যার নিরলস সেবায় বাক একসময় নিজের হারানো স্বাস্থ্য ও শক্তি ফিরে পায়। এতে করে বাক তার নতুন মাস্টারের প্রতি গভীর আনুগত্য, নিষ্ঠা ও কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করতে থাকে। মাস্টারের সাথে ছায়ার মত থেকে তাকে সব ধরনের বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।

কিন্তু এসব কিছুর পরেও বাক একদিন গভীর জঙ্গল থেকে এক রহস্যময় ডাক শুনতে পায় যা তার ভেতরের বহু পুরনো ঘুমন্ত এক সত্তাকে তীব্রভাবে জাগিয়ে তুলতে চায়।

এরপর জন থরন্টন বাককে নিয়ে সভ্যজগতে ফিরে আসলে একজন মাতাল খনিশ্রমিক তাকে হঠাৎ আক্রমণ করে বসে। হতবিহ্বল বাক তৎক্ষণাৎ লোকটাকে প্রতিআক্রমণ করে মেরে ফেলে। নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া জনকে বাক প্রতিকুলে স্রোতে সাঁতার কেটে নিজের জীবন বিপন্ন করে মাস্টারকে উদ্ধার করে নিয়ে কূলে আসে। 

এক সময় মাস্টার জন থরন্টনেরও মৃত্যু হয়। আর সেই শেষ হয়ে যায় সভ্যজগতের সাথে বাক-এর শেষ লেনদেনটুকু। সে আবার ফিরে যায় তার বন্য জীবনের নেকড়েদের ভিড়ে। কথিত আছে যে, বাক নেকড়ে ও কুকুরের সংমিশ্রণে একটি নতুন বংশবৃদ্ধি করেছিল সেসময়, যারা এখনো গ্রেট উত্তরের বন্য এলাকাগুলোতে ঘুরে বেড়ায়। প্রচণ্ড শীতের মধ্যরাতে মানুষ তাদের গান এখনো শুনতে পায়।    

১৯০৩ সালে প্রকাশিত ‘কল অফ দা ওয়াইল্ড’ জ্যাক লন্ডন এর সবচেয়ে পঠিত ও সবচেয়ে পাঠক সমাদৃত বই বলে আজও মনে করা হয়, যা মাস্টারপিস হিসাবে পাঠক মহলে প্রশংসিত হয়। কোনো এক কারণে জ্যাক লন্ডনের এ লেখাটি ১৯২০ এবং ১৯৩০ সালের সময়কার বেশ কয়েকটি ইউরোপিয় একনায়কতন্ত্রের শাসন ব্যবস্থার জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। যার ফলশ্রুতিতে বইটিকে সে সময়ের শাসককূল দ্বারা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।   

১৯২৯ সালে ইতালি ও যুগোস্লাভিয়াতেও “কল অফ দা ওয়াইল্ড” উপন্যাসটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। লন্ডনের এ লেখাগুলোর মাধ্যমেই স্পষ্টভাবে সমাজতেন্ত্রর সমর্থক হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। এছাড়াও ১৯৩৩ সালে নাৎসি পার্টি লন্ডনের লেখা সব বই আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছিল।  

‘কল অফ দা ওয়াইল্ড’-এ আমরা দেখতে পাই যে, বাক প্রথমে তার আরামদায়ক অস্তিত্ব থেকে দূরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং নিজেকে একটি সফল স্লেজগাড়ি কুকুর গড়ে তোলে এবং একসময় নিজেকে নেকড়ে দলের নেতা হিসেবে প্রমাণিত করে। ফলে সে নিজেই নিজের দেবতা হয়ে ওঠে। উপন্যাসটি রূপক অর্থে হলেও তা ছিল মূলত জ্যাক লন্ডনের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস।

সম্ভবত এই বিষয়টিই ইউরোপীয় শাসকশ্রেণির কাছে সবচেয়ে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন। উপন্যাসটিতে দেখানো হয়েছে শ্রমিকশ্রেণি নিজেদের ক্ষমতার বলয়কে আরো শক্তিশালী করার জন্য শাসকশ্রেণির সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং নিজেদের ক্ষমতাধর হিসেবে সমাজে তুলে ধরে। উপন্যাসে আরো স্পষ্ট হয় এইভাবে যে, মূলত একটি একনায়কতন্ত্রের শাসন ব্যবস্থা ততদিনই টিকিয়ে রাখা সম্ভব যতদিন রাষ্ট্রের জনগনকে অবরুদ্ধ করে রাখা যায়। স্বভাবত কারণেই তারা এমন একটি বইকে চিরকালের জন্য ঢালাওভাবে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়েছিল, যা ছিল তখনকার বাস্তবিক প্রেক্ষাপটের জন্য স্বাভাবিক, যেখানে একজন মানুষ নিজের সত্য সত্তাকে খুঁজে নিতে এবং সমস্ত বশ্যতাকে অস্বীকার করে নিজেকে নিজের সৃষ্টিকর্তা ভাবতে পারে বলে মনে করা হয়। মূল উপন্যাসের এটাই ছিল উপলক্ষ্য, যা অন্যকে ভাবতে এবং প্রভাবিত করতে যথেষ্ঠ সহায়ক উপাদান হিসেবে শাসকগোষ্ঠির দৃষ্টিগোচর হয়েছিল।

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।