রাত ০৮:০৯ ; রবিবার ;  ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯  

‘নাটি দিয়া ডাঙাইলেও দ্যাশ ছাড়ব্যার নই’

প্রকাশিত:

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ।।

‘নাটি (লাঠি) দিয়া ডাঙাইলেও দ্যাশ ছাড়ব্যার নই। মারি ফ্যালাইলেও ভিটা ছাড়ি যাবার নই। যা হওয়ার হইবে।’ কথাগুলো বলেন দাশিয়ার ছড়ার দেবীরপাট গ্রামের গজেন্দ্র বর্মণ।

গজেন্দ্র বর্মণ ছাড়াও দেবীরপাট থেকে ভারতে যেতে চেয়ে পরে মত পাল্টেছেন নারায়ণ বর্মণ, রামপ্রসাদ বর্মণ, বাবুল বর্মণ, শশীভূষণ বর্মণ, কৃষ্ণকান্ত বর্মণ, মণীন্দ্র বর্মণ, মোহন বর্মণ, কামনি বর্মণ, দধিরাম বর্মণ ও বদিয়ার রহমানের পরিবারসহ মোট ১৭টি পরিবার। সর্বশেষ মোট ৬৪ জন বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার জন্য কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক এবং ভারতীয় হাইকমিশনে পৃথকভাবে আবেদন করেছেন।

এদিকে ভারতে যাওয়ার জন্য পাওয়া ট্রাভেল পাসের উল্লিখিত সময়টি পেরিয়ে যেতে আর বাকি আছে মোটে ৯ দিন। তাই থেকে যাওয়ার আবেদনকারীদের মনে দেখা দিয়েছে সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন সংশয়। দেবীরপাট গ্রামের বাসিন্দা সুন্দর বর্মনের প্রশ্ন, ‘ভিটা ছাড়ি আর যাবার নই, কিন্তু সরকার মানবে তো!’

গৃহকর্তারা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভীষণ আনন্দিত দাশিয়ারছড়ার এই গৃহকর্মীরা। ছবি: আরিফুল ইসলাম, বাংলা ট্রিবিউন।

প্রথম দফায় ভারতে যাওয়ার জন্য নাম তালিকাভুক্ত করার পরও এখন কেন তারা মত বদলেছেন, সে প্রশ্নের উত্তরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। জানা যায়, বর্মণদের কারও কারও বসতবাড়ি ছাড়াও ২০-২৫ বিঘা জমি আছে এ দেশে। নতুন ভূখণ্ডে যেতে হলে ওই ভূসম্পত্তি ছেড়ে যেতে হবে। অনেকের পারিবারিক আদি নিবাস বাংলাদেশে হওয়ায় এ দেশ ছেড়ে যাওয়ায় আপত্তি তো রয়েছেই। জানা যায়, ট্রাভেল পাস নিয়ে অনেকেই ইতোমধ্যে ভারতে ঘুরে এসে হতাশ হয়েছেন। যেসব সুবিধা সেখানে পাওয়ার কথা তারা শুনেছিলেন তার সঙ্গে বাস্তব মিল আছে সামান্যই। এদেরই একজন বাবুল বর্মণ।    

তিনিসহ নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, সেপ্টেম্বর মাসে তারা কোচবিহারের দিনহাটায় গিয়ে দেখে এসেছেন, ছিটের লোকদের জন্য দিনহাটার কৃষি মেলার পাশে ঘিঞ্জি পরিবেশে পরিবার প্রতি ১৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থের দুটি করে ঘর বানানো হচ্ছে। সেইসঙ্গে সেখানে গিয়ে কাজ পাওয়ারও কোনও নিশ্চয়তা পাননি তারা। আর জমি বরাদ্দের বিষয়ে সে দেশের সরকারি সিদ্ধান্ত কী, সে ব্যাপারেও তারা কিছু জানেন না। অন্যদিকে বিলুপ্ত ছিটমহলে জমি বিক্রি আপাতত বন্ধ আছে। তাই জমিগুলো বিক্রিও করা যাচ্ছে না।

বিপরীতে বাংলাদেশে বিপুল সুবিধা পেতে যাচ্ছেন সাবেক ছিটবাসীরা। বিদ্যুৎ সংযোগ ও যাতায়াতের সুব্যবস্থাসহ সকল নাগরিক সুবিধা হাতের নাগালে চলে আসছে। প্রধানমন্ত্রীও পরিদর্শনে এসে তাদের ‘একগুচ্ছ ফুল’ বলে ডেকেছেন।

দাশিয়ার ছড়ার এমন অবস্থার পর বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষে পরিদর্শন করা হয় কুড়িগ্রামের আরেক উপজেলা ভূরুঙ্গামারীতে। এর সাবেক ছিটমহল গোড়লঝাড়া থেকে ৩০ জন ভারতে যাওয়ার ট্রাভেল পাস নিলেও ইতোমধ্যে তা বাতিলের আবেদন করেছেন ছয়জন। তারাও বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার ক্ষেত্রে এবং নাগরিকত্ব নিয়ে ভবিষ্যতে কোনও জটিলতায় পড়তে পারেন কিনা সংশয়ে রয়েছেন।

তাদের সংশয়গুলোর বিষয়ে কথা হয় ছিটমহল বি‌নিময় সমন্বয় ক‌মি‌টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফার সঙ্গে। তিনি মনে করেন, দেশে থেকে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এখনও পর্যন্ত ৭০ জন ভারত না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্যে ফোনে যোগাযোগ করা হয় রাজশাহীস্থ ভারতের সহকারী হাই কমিশনার সন্দ্বীপ মিত্রের সঙ্গে। মিত্র জানান, ৩০ নভেম্বরের পর উভয় দেশ আলোচনা করে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে আশা করছি তাদের কোনও সমস্যা হবে না।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক খাঁন মো. নুরুল আমিনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা হয়। অপর পক্ষ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, ভারতীয় সংসদে স্থলসীমান্ত চুক্তির বিলটি পাস হলে চলতি বছরের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ভারত-বাংলাদেশের ভেতরে অবস্থিত ১৬২ ছিটমহল বিনিময় হয়। গত ৭ ও ৮ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ির দাশিয়ার ছড়ায় এবং ভুরুঙ্গামারীতে ভারতীয় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে কুড়িগ্রাম জেলার বিলুপ্ত বিভিন্ন ছিটমহল থেকে ভারতে গমনেচ্ছু ২৬৪ জনকে ট্রাভেল পাস দেওয়া হয়। ৩০ নভেম্বর তার মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে।  

/জেবি/এফএস/এইচকে/টিএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।