রাত ০৮:৩৯ ; মঙ্গলবার ;  ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৮  

বাংলার সঙ্গে বিশ্বের মেলবন্ধন ঘটিয়ে পর্দা নামলো লিট ফেস্টের

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

ফাতেমা আবেদীন ।।

সন্ধ্যা নামতেই প্রধান মঞ্চে শুরু হয়ে গেল সমাপনী অনুষ্ঠান। বেজে উঠল বিদায়ের সুর। তবে সে সময়ও ভেসে আসছে বেহুলার লাচারির জারি। বর্ধমান মঞ্চে  চলছে বেহুলার লাচারি। মানুষের গল্প-গুজবের শব্দ ভেসে আসছে। কেউ কেউ  লেখকদের পেছনে ছুটছেন ছবি তোলার জন্য।

তৃতীয় দিনের সকালেই বোঝা যাচ্ছিল আজ পঞ্চম আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন ঢাকা লিট ফেস্টের শেষ দিন। শুরুতেই লন মঞ্চে গুরুদুয়ারার সাধুদের কীর্তন। শিউলি ঝড়া সকালে ধূপ-ধুনার গন্ধে মনমুগ্ধকর এক পরিবেশ। একই সময় প্রধান মঞ্চ উপচে পড়েছে দর্শকে। সেখানে প্রদর্শিত হচ্ছে লেসলি উডউইনের আলোচিত চলচ্চিত্র ‘ইন্ডিয়া’স ডটার’। কুখ্যাত ধর্ষক মহেষের বিবরণ আর করুণ সুর অনেকের চোখে পানি এনেছে। কান্নার সুর গুমরে উঠছে সবার মনে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষের ক্ষমতা কাঠামোর নিয়মিত চর্চার মধ্যেও একজন ধর্ষক পুরুষও যে ভিক্টিম হয়ে উঠেছে এই ছবিতে সেটি লক্ষণীয়।

লিট ফেস্টের সমাপনী দিনে সাহিত্যভিত্তিক আলোচনা করেন কয়েকজন লেখক। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন।

একই সময়ে পাশের কেকে টি মঞ্চে চলছিল ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা নুপু প্রেসের চলচ্চিত্রায়নের অভিজ্ঞতা বর্ণনা। নুপু বলে চলেছেন কীভাবে তার অভিজ্ঞতা  আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। নুপু প্রেসের এই সেশনটির নাম ছিল ‘ক্যারেক্টার’।

একই সময়  ভাষা মঞ্চে চলছিল পপ ফিকশন। ঢাকা লিট ফেস্টের তৃতীয় দিনে সকাল ১০টায় ভাষা মঞ্চে তিনটি বইয়ের উদ্বোধন করা হয়। বই তিনটি হলো খন্দকার আসিফ উজ জামানের লেখা থ্রিলার উপন্যাস  ‘ফেডেড’। বইটির প্রকাশক বেঙ্গল প্রকাশনী, নেসার নাদিমের হরর উপন্যাস ‘ডিমন’ যার প্রকাশক ডেইলি স্টার বুকস এবং শ্রাবন্তী নারমিন আলীর আরেকটি উপন্যাস। প্রকাশনা উৎসবে আলোচনা সঞ্চালক হিসেবে ছিলেন নিরুপমা সুবরামানিয়াম।

আসিফের উপন্যাসটি একটি কমপ্লেক্সড সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। নিরুপমার প্রশ্নের জবাবে আসিফ বলেন, তিনি এই উপন্যাসে মূলত মানুষের প্রকৃতি ( হিউম্যান নেচার) নিয়ে কাজ করতে চেয়েছেন। এই ইচ্ছার পেছনে কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে বাবা মা থ্রিলার পড়তে দিতেন, তাই যখন লিখতে শুরু করি, থ্রিলার লেখার কথাই মাথায় আসে। আমি কমিক সাহিত্যেরও খুব ভক্ত’।

লিট ফেস্টের সমাপনী দিনে সঙ্গীত পরিবেশন করেন ভারত থেকে আগত শিল্পীরা। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

লেখার পেছনে প্রেরণা বা কারণ হিসেবে একে অভ্যাস হিসেবেই চিহ্নিত করেন আসিফ। নিজেকে প্রকাশ করার এই মাধ্যম তার আশৈশব প্রিয়।

নাদিম হরর উপন্যাস লেখার পেছনে কারণ হিসেবে প্রায় একই রকমভাবে ছোটবেলাকার পড়ার কথা জানান।

এদিকে জনপ্রিয় ভারতীয় লেখক নয়নতারা শেহগাল বসেছিলেন তার জীবনী রচনাকারী ঋতু মেননের সঙ্গে। ঐতিহাসিকভাবে পরমতসহিষ্ণু এবং নানা ধর্ম বর্ণের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল ভারতবর্ষে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে যে ধর্মান্ধ রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে তার বিপরীতে নিজের অবস্থান জানাতেই আরও চল্লিশজন লেখকের সঙ্গে সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দেন নয়নতারা। ঋতু তার জীবনী লেখার কারণ হিসেবে বলেন, নয়নতারার লেখালেখিতে বলিষ্ঠ তার রাজনৈতিক দর্শন। তার পারিবারিক সংগ্রহশালা এত সমৃদ্ধ ছিল যে ঋতুর লিখতে বেগ পেতে হয়নি।

ফাররুক ধোন্ডি আর অমিত চৌধুরী বেলা একটায় বসছিলেন প্রধান মঞ্চে। তাদের বলার বিষয় ছিল শহরের গল্প। কি করে লন্ডন শহর তাদেরকে সুযোগ দিয়েছে একইসঙ্গে বঞ্চিত করেছে।

সে সময় লনের মঞ্চে চলছে কবিতা পাঠ। মুগ্ধ হয়ে সবাই শুনছিলেন নির্মলেন্দু গুণ, চিন্ময় গুহ, মুহাম্মদ নূরুল হুদা আর কামাল চৌধুরীর কবিতা পাঠ। সেসময় কসমিক টেন্টে চলছিল অনুবাদের অধিকার নিয়ে আলোচনা। অনুরাভ সিনহার উপস্থিতিতে ফরিদা হোসেন, মাসুদ আহমেদ, পেন বাংলাদেশের সৈয়দা আইরিন জামান অংশ নেন এই অনুষ্ঠানে।

অনুবাদের অধিকারের পরপরই ভাষা মঞ্চে শুরু হয় সাহিত্য যখন সবার। সাহিত্যের সার্বজনীনতা নিয়ে রীতিমতো বিতর্কে বসেন কথা সাহিত্যিক আনিসুল হক, আন্দালিব রাশদী, পৌলমি সেনগুপ্ত এবং আতা সরকার।

একই সময় ইন্ডিয়াস ডটার নিয়ে তুমুল বিতর্কে মাতেন ছবিটির নির্মাতা লেসলি উডইউন, সারা যাকের ও শিরিন হক। নিজস্ব গণ্ডিতে প্রতিষ্ঠিত এই নারীরা তুলে ধরেন তাদের চোখে দেখা সমাযে নারীর অবস্থান। এদের একজন দাবি করেন, নারীরা জেনে শুনেও পণ্য হন। তবে আদতে নারীর অবস্থান সমাজে কী  হওয়া উচিত বা কী হচ্ছে তার ওপর আলোচনাটি শেষ হয় না। কারণ এসব বিতর্ক চলমান থাকে সবসময়।

এর আগে উৎসবের পরিচালক সাদাফ সায্‌ ও নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হ্যারল্ড ভার্মাস বসেন সাহিত্য ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে। সাদাফ হ্যারল্ডের কাছে জানতে চান তার সাহিত্য পড়ার অভিজ্ঞতা ও ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা ও নোবেল পাওয়ার অভিজ্ঞতার সম্মিলন।

বেলা পড়ে আসার সময় ভারতীয় কলাম লেখক গর্গ চ্যাটার্জি বসেন ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহর সঙ্গে। রামচন্দ্রের বিখ্যাত বই গান্ধী বিফোর ইন্ডিয়া নিয়ে আলোচনা করেন এই দুই অতিথি।

সেসময় ফ্যামিনিজম লনের নিয়ে মঞ্চে উঠেন, জুড ক্যালি, উর্বশী বুটালিয়া, শোভা দে ও তাসাফি রহমান। শোভা দে বলেন, নারী-পুরুষ আলাদা করে বিভাজিত করতে আগ্রহী নন তিনি। নারী বনাম পুরুষ আলাদা না করে একসঙ্গে মানুষ হয়ে কাজ করে সমাজের উন্নতির দিকটিকেই প্রাধান্য দিতে চান বলে জানান।

এদিকে উর্বশী বুটালিয়া বলেন, তিনি যখন নারীবাদী প্রকাশনা শুরু করেন তখন পুরুষরা এখানে লেখাটাকে অসম্মানজনক বলেই মনে করতেন। তবে এখন সময় বদলেছে, পরিবর্তিত বাস্তবতায় এটি অনেক সম্মানজনক একটি বিষয়।

বর্ধমানে চলছিল বেহুলার লাচারি। টাঙ্গাইল থেকে আসা বিশেষ দল নেচে গেয়ে মাতিয়ে তুলেছেন লিট ফেস্টের মঞ্চ।

সমাপনী শেসনে বসেন সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ, নয়নতারা সায়গল, কিরণ নাগারকর, ফসিহ আহমেদ ও বিকাশ সানগ্রলা। সঞ্চালনায় ছিলেন সাংবাদিক ভিক্টর মালেট। ‘ইজ দেয়ার এনি ফিউচার ফর লিবারেলিজম ইন সাউথ এশিয়া’ছিল আলোচনার বিষয়। আলোচনায় অংশ নেওয়া সব বক্তার কথায় উঠে এসেছে উদারপন্থা। বক্তারা বলেন, সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে প্রয়োজন ব্যক্তি পর্যায়ে মানসিকভাবে গ্রহণের প্রবণতা এবং আগ্রহ। নয়নতারা সায়গল ও কিরণ নাগরকর উদারপন্থা নিয়ে হতাশ হলেও উদারপন্থার প্রবণতা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন কাজী নাবিল আহমেদ।  এ প্রত্যাশা নিয়েই শেষ হলো পঞ্চম আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন ‘ঢাকা  লিট ফেস্ট’।

বিদায়ের সুর বাজলেও সবার কণ্ঠে ছিল প্রত্যয়—আসছে বছর আবার সবাই একত্র হবেন, সবাই মিলে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে আরেকটু এগিয়ে দেবেন।

/টিএন/ 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।