বিকাল ০৫:৫৭ ; শনিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৮  

আকাশে উড়ার আগে..

প্রকাশিত:

নাঈম রায়হান ভুঁইয়া।।

কোনও বিমান দুর্ঘটনায় পড়লেই শুরু হয় দীর্ঘ তদন্ত। বিমান নির্মাতা ও এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠানগুলো জানতে চায়, বিমান কেন দুর্ঘটনায় পড়ল, কী করলে এড়ানো যেত দুর্ঘটনা। তবে কিছু দুর্ঘটনা আছে, যেখানে সব তদন্তই ফেল। বহু চেষ্টার পরও অধরাই থেকে যায় রহস্য উন্মোচন। এবারের আয়োজনে থাকছে এমন কিছু বিমান দুর্ঘটনার কাহিনী।

এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৪৭

২০০৯ সালের ১ জুন। মধ্য আটলান্টিকের আকাশে উড্ডয়নরত অবস্থায় হাওয়ায় মিলিয়ে যায় এয়ার ফ্রান্সের ফ্লাইট এএফ ৪৪৭। ফ্লাইটটিতে করে ব্রাজিল থেকে ফ্রান্সে যাচ্ছিল ২১৬ জন যাত্রী এবং ১২ জন ক্রু। যৌথ অনুসন্ধানে নামে ব্রাজিল, ফ্রান্স, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র। ২২৮ যাত্রীর মধ্যে উদ্ধার করা হয় ১০৪ জনের মৃতদেহ। ২০১১ সালের মার্চে চতুর্থ পর্বের অনুসন্ধান অভিযান শুরু করে উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান উডস ওশেনোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশন। এ বছরের ৩ এপ্রিল সমুদ্রের ১৩০০০ ফুট নিচে ফ্লাইট ৪৪৭-এর ধংসাবশেষ উদ্ধার করে প্রতিষ্ঠানটি। ছবিতে দেখা যায় বিমানটি ভেঙে গুড়িয়ে যায়নি। অর্থাৎ বোমা বিস্ফোরণ বা ঝড়ের কবলে পড়েনি ওটা।

কী কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে সেটা এখনও রহস্যই রয়ে গেছে। দুর্ঘটনার আগ মুহূর্তে বিমান থেকে বিপদের কোনো বার্তাও দেয়নি পাইলট। অনেকের ধারণা, অটোপাইলট জনিত ত্র“টির কারণেই আচমক দুর্ঘটনায় পড়ে বিমানটি। তবে এ ধরনের ক্ষেত্রে পাইলটরা চাইলে দুর্ঘটনা এড়াতে পারতেন।

নিরুদ্দেশ ছয়

৫ ডিসেম্বর ১৯৪৫। দুপুর সোয়া ২টা। ফ্লোরিডার পোর্ট লাউডেরডালের ইউএস নেভাল এয়ার স্টেশন থেকে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে উড়াল দিল পাঁচটি টর্পেডো বম্বার। ফ্লাইটের কোডনেম ফ্লাইট ১৯। চার সহযোগীর নেতৃত্বের ককপিটে বসা লেফটেন্যান্ট চারলস টেইলর। বাতাসের গতি স্বাভাবিক। থেমে থেমে বৃষ্টি। দৃষ্টিসীমা ৬ থেকে ৮ মাইল। বিকাল ৩টা ৪৫ মিনিটে পথ হারানোর কথা জানিয়ে কন্ট্রোল রুমে বার্তা পাঠান টেইলর। ফ্লোরিডার উপকূল পাওয়া যাচ্ছে না। এক পর্যায়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ওয়্যারলেস সংযোগও। এটাই ছিল ওই পাঁচটি বিমানের অগস্ত্যযাত্রা। ধারণা করা হয় ফ্লোরিডার পূর্বদিক থেকে গায়েব হয়েছে ফ্লাইট ১৯-এর বিমানগুলো।

সাগরের বুকে ক্র্যাশ ল্যান্ডিংও করতে পারে। তাই বলে পাঁচটি একসঙ্গে? সন্ধ্যায় বিমানের সন্ধানে উড়ে যায় একটি মারটিন মেরিনার সি প্লেন। ১৩ ক্রু নিয়ে ওটাও হারিয়ে যায়। ফ্লাইট ১৯-এর ১৪ জন আর মারটিন মেরিনারের ১৩ জনসহ মোট ২৭ যাত্রীর আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬টি বিমানের খোঁজে অভিযান চালায় নৌ আর বিমানবাহিনী। মারটিন মেরিনার যখন অদৃশ্য হয় ওই সময় ওই অঞ্চল দিয়ে যাচ্ছিল গাইনেস মিলস নামের আরেকটি বিমান। ওই বিমানের পাইলট আকাশে একটি অগ্নিগোলক দেখেন যা উল্কার মতো পানিতে পড়ছিল। একই সময়ে ইউএসএস সলোমন নামের অন্য একটি মার্কিন এয়ারক্রাফটের নাবিকরা আকাশে অগ্নিগোলক দেখতে পান। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ওই আগুনের গোলকই মারটিন মেরিনার।

ওপরওয়ালাই ভরসা

২১৭ জন আরোহী নিয়ে আটলান্টিকে নিমজ্জিত হয় ইজিপ্ট এয়ারের ফ্লাইট ৯৯০। ১৯৯৯ সালে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনার যৌথ তদন্তে নামে মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংস্থা উপসংহারে আসে, পাইলট আত্মহত্যা করেছেন। আর মিসর বলে কারিগরি ত্রুটির কারণেই দুর্ঘটনায় পড়ে বিমান। দীর্ঘসময় রহস্যে মোড়া ছিল এ দুর্ঘটনাটি। নানা নাটকীয়তার পর অবশেষে নিজেরাই ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব নেয় মিসর।

কর্তৃপক্ষ কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে ব্যর্থ হলেও বিমানটির পাইলটের শেষ সময়ের কথোপকথনের রেকর্ডটি ঠিকই উদ্ধার হয়। পাইলট বলেছিলেন ‘হোয়াট ইজ দিস? এসব কি! তুমি কি ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়েছিলে?’ কো-পাইলটের উত্তর, ‘ওপরওয়ালাই ভরসা’।

অপয়া ১৯১

১৩ নম্বরটির মতো বিমানের দুনিয়ায় অলক্ষুণে নম্বরটি হলো ১৯১। ১৯৬০ সালে ১৯১ নম্বরের পাঁচটি ফ্লাইট দুর্ঘটনার শিকার হয়। এর বাইরেও ১৯১ নম্বরের আরও অনেক ফ্লাইট দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এমন এক ঘটনা ঘটেছে, যার ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি। জেট ব্লু এয়ারওয়েজ ফ্লাইট-১৯১ বিমানটির পাইলট হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। বিমান চালাতে চালাতে তিনি ঘন ঘন যিশু, সন্ত্রাসবাদ ও নাইন ইলেভেনের কথা বলছিলেন।

ঘটনা দেখতে পেয়ে কো-পাইলট ও ক্রুরা তাকে ধরে ককপিট থেকে সরিয়ে ফেলেন। পরে ওই পাইলটের স্থান হলো মানসিক হাসপাতালে। ১৯১ সংখ্যাটির সঙ্গে বিমানের কী সম্পর্ক, তা নিয়ে সংখ্যাতাত্ত্বিকরা পর্যন্ত বেশ মাথা ঘামিয়েছেন।

সবচেয়ে মারাত্মক

১৯৯৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। ১৩২ জন যাত্রী ও ক্রু নিয়ে পিটসবার্গ এয়ারপোর্টে অবতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইউএস এয়ার ৪২৭। ১০ মিনিটের পথ বাকি। এমন সময় দেখা দেয় কারিগরি ত্রুটি। প্রথম দিকে গতি কম থাকলেও পরে তা ঘণ্টায় ৫০০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ গতিতে সংঘর্ষ ঘটে। মারা যায় ১৩২ আরোহীর সবাই।

এ দুর্ঘটনা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে এটি প্রত্যক্ষদর্শীদের মানসিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলেছিল। অন্যান্য ক্ষেত্রে বিমান দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কয়েক মাস লাগলেও এ দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে পেতে চার বছর লেগেছে। দেখা গেল বিমানের রাডারের ত্রুটি থেকেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। একই কারণে ১৯৯০ সালেও মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ে ইউএসএয়ার-এর একটি ফ্লাইট।

/আরএফ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।