বিকাল ০৪:০২ ; মঙ্গলবার ;  ২১ নভেম্বর, ২০১৭  

‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ এর দ্বিতীয় দিনের বাংলা সেশন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

 

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক

‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-১৫ এর দ্বিতীয় দিনের বাংলা সেশন শুরু হয় ‘জাতীয়তাবাদের বৃত্ত ভেঙে’ এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। বেলা দুইটা পনের মিনিটে বাংলা একাডেমির ‘লন’ এ অনুষ্ঠিত হয় এ সেশনটি। মাহবুুব আজিজের সঞ্চালনায় পাপড়ী রহমান, চঞ্চল আশরাফ, আহমদ মোস্তফা কামাল এবং ফারুক ওয়াসিফ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। নিজস্ব সংস্কৃতিকে জানতে শিকড় আঁকড়ে থাকা নয়, শিকড়কে, নিজ সংস্কৃতিকে অন্যদের জানাতে জাতীয়তাবাদের বৃত্ত ভেঙে আন্তর্জাতিক পাঠকের সামনে কীভাবে উপস্থাপন করবেন, আপনার সাহিত্য আপনার সংস্কৃতি— এই বিষয়ে আলোচনা করেন।
সঞ্চালক মাহবুুব আজিজের এক প্রশ্নের জবাবে আলোচক চঞ্চল আশরাফ সবাইকে অপরাহ্নের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন— বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতা, উপনিবেশবাদ এমনকি তিরিশের দশকেও সাহিত্যিকরা তাঁদের চিন্তা-চেতনায় বৈশ্বিক দিকটাকে সাহিত্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি আরো বলেন— একটি জাতির কথার বললেই সেখানে অবধারিতভাবে জাতীয়তাবাদ বিষয়টি চলে আসে।

ফারুক ওয়াসিফ বলেন— আমি এবং আপনারা সবাই মিলেই জাতি। জাতিতে যেমন ভাষা থাকে তেমনি ভাষাতেও জাতি থাকে। অর্থাৎ জাতি এবং ভাষা একে অপরের সাথে ঘনিষ্টভাবে জড়িত। সে অর্থে ভাষাকে সেক্যুলার করা যায়। তিনি রুমীর কথা উল্লেখ করে বলেন— তিনি একজন গ্রেট কবি, যদিও এক সময় তাঁকে স্বীকার করা হতো না। আবার ম্যাক্সিম গোর্কী, তলস্তয়, রবীন্দ্রনাথকে আমরা কিন্তু জাতীয় মতবাদ হিসেবে পাই। তিনি এক প্রকার জাতীয়তাবাদের বৃত্ত ভেঙে সাহিত্য বা সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছাতে নারাজ।

সাহিত্যে জাতীয়তাবাদের উল্লেখ করে পাপড়ী রহমান বলেন— রবীন্দ্রনাথের গোরা, যোগাযোগ প্রভৃতিতে জাতীয়তাবাদের কথা উঠে এসেছে। তিনি এও বলেন— জাতীয়তাবাদ আমরা তখনই দেখি যখন আমরা কোনো ক্লান্তির মধ্য দিয়ে যাই।

সঞ্চালক মাহবুব আজিজ বলেন— আমি কোথা থেকে এসেছি, লেখক কোথা থেকে লিখবে তা লেখকেরই উপর নির্ভর করবে। শাহবাগ, কুড়িগ্রাম না ম্যাক্সিকো থেকে তা মূলত লেখকের উপর নির্ভর করে। আমাদের মাটির ঘর, খনার বচন, ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ইত্যাদি থেকেই তো আমরা আমাদের সাহিত্য রচনা করবো এটাই তো স্বাভাবিক। তা আন্তর্জাতিক হোক বা না হোক।  

আহমদ মোস্তফা সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে কথা বলা শুরু করেন। শুরুতেই তিনি প্রশ্ন রাখেন— আমাদের সংস্কৃতি কীভাবে ভেঙে আন্তর্জাতিক হবে তার উপর। তিনি মনে করেন, জাতীয়তাবাদ হলো একটি রাজনৈতিক বিষয়। যেমন বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।
তিনি আরো বলেন, নিজস্ব সংস্কৃতি আঁকড়ে থেকেও তো তা আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। আমি মনে করি, অন্যদেশের  সাহিত্য পড়েই আমরা বেড়ে উঠেছি। এখানে তিনি সবাইকে রুশ সাহিত্যের কথা, আফ্রিকান সাহিত্য, লাতিন সাহিত্যের কথা বলেন। তাঁর মতে, সাহিত্যের মূলে রয়েছে মূলত দুটি বিষয়। এক. সমকালীন বাস্তবতা; দুই. স্থানিক বাস্তবতা। কিন্তু তিনি আবার সংকটের কথাও বলেন। যেমন ২৫ বছর পরে সমকালীন বাস্তবতা ও স্থানিক বাস্তবতা এক নাও থাকতে পারে। তিনি মনে করেন, স্থানিক বাস্তবতাই আন্তর্জাতিক করে তোলে এবং এটা কিন্তু লেখকের কাজ। তিনি এও বলেন, মার্কেজ ও হাসান আজিজুল হক যার যার দেশের, যার যার ভাষায় তাদের সমকালীন এবং স্থানিক বাস্তবতাকে পাঠকের সামনে তোলে ধরেছেন। তিনিও জাতীয়তাবাদের বৃত্ত ভেঙে নিজস্ব সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছাতে চান না। বরং কীভাবে জাতীয়তাবাদের বৃত্তের মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক হয়ে উঠা যায় তার দিকে সাহিত্যিকদের দৃষ্টি আর্কষণ কামনা করেন।

‘ব্যক্তি তার নিজের সঙ্গে নিজে প্রতিনিয়ত তো যুদ্ধ করেই কিন্তু জন্মের পর মানুষ সংগঠিত যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি দেখতে হয়। গত শতকে ঘটে যাওয়া দুটি বিশ্বযুদ্ধের নৃশংসতা তারপর বাঙালি জাতিকে ১৯৭১ সালে করতে হয়েছে মুক্তির জন্য যুদ্ধ, আজ গণতন্ত্রের জন্য লড়ছে’— এই শিরোনামে বাংলা একাডেমির ‘কসমিক’ টেন্টে শুরু হয় ‘যুদ্ধের পর যুদ্ধ’। পারভেজ হোসেনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন মৃত্তিকা সহিতা, রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী। এখানে মূলত যুদ্ধ পরবর্তীকালের মানুষের নানান বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি আলোচকরা গণতন্ত্রের বিষয়েও তাদের মতামত তুলে ধরেন পাঠকের সামনে।
মৃত্তিকা সহিতা সঞ্চালক পারভেজ হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন— যুদ্ধের একটা ঐতিহাসিক কারণ আছে। শুধু ’৭১ সালের যুদ্ধ নয়, তার একটা বিশ্ব ইতিহাস আছে। তিনি আরো বলেন, ভাষা-আন্দোলনের মধ্যেই জাতীয়তাবাদের বীজ নিহিত ছিল। ইতিহাস ও সাহিত্য যার যার পথে চলে। তবে, সাহিত্যের মধ্যে যেমন ইতিহাসের উপাদান থাকে তেমনি ইতিহাসের মধ্যেও সাহিত্যের উপাদান থাকে। এখানে তিনি ইতিহাসের পটভূমিতে রচিত ঐতিহাসিক সাহিত্যের কথা উল্লেখ করেন।

সঞ্চালক পারভেজ হোসেন বলেন, সাহিত্যে যে যুদ্ধ তা মূলত জীবনেরই কথা বলে। এমন প্রশ্নের জবাবে রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী বলেন— যুদ্ধের সময়ই আামার জন্ম। আর আমি স্প্যানিস সাহিত্যে যুদ্ধ কীভাবে আসে তা বলবো। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমার মার্কেজের উপর বেশি কাজ। ‘কর্ণেলকে কেউ লেখে না’ এ নামে মার্কেজের একটি নভেলা আছে; যেটি আমি অনুবাদ করেছি। মূলত কলোম্বিয়ার গৃহযুদ্ধের উপর রচিত। যারাই বাংলা সাহিত্য লেখেন তাদের লেখাতেও কিন্তু ’৭১ সালের যুদ্ধ চলে আসে। মূলত একজন কর্ণেল তার যুদ্ধের কাহিনি এতে শুনান। সেখানে দেখা যাচ্ছে যে, কর্ণেল, তার স্ত্রী ও মৃত ছেলের বর্ণনা পাওয়া যায় নভেলায়। মৃত ছেলের একটা মোরগ ছিল; তার স্ত্রী সেই মোরগকে বিক্রি করতে বলে কারণ তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। কিন্তু কর্ণেল মোরগ বিক্রি করতে চান না। কারণ এটা তার একমাত্র ছেলের স্মৃতি। কর্ণেল সেই মোরগকে সামনের এক মোরগ যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্থ আয়ের কথা ভাবেন। মূলত মার্কেজের এ নভেলায় কলোম্বিয়ার সেই গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে কর্ণেল এবং যুদ্ধ শেষে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় তাকে পুরস্কৃত করা হবে। এজন্য কর্ণেল একটা চিঠির জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু সেই পুরস্কার বা পেনশনের চিঠি আসে না। মূলত জীবনের প্রতিটি ধাপে ধাপে মানুষকে যুদ্ধ করেই বেঁচে থাকতে হয় সে কথাই এ নভেলায় কর্ণেলের জবানিতে প্রকাশ পেয়েছে।
আবার তিনি বলেন, ইতিহাস ও ভাষা বা সাহিত্য উভয়ই বাস্তবতা নিয়ে কাজ করে। এ প্রসঙ্গে তিনি মার্কেজের ‘নিঃসঙ্গতার একশো বছর’ উপন্যাসের মাকন্দ গ্রামের কথা উল্লেখ করেন। এই গ্রামের লোকজন কলোম্বিয়ার হয়ে কলা চাষ করতো। সেখানে এক পর্যায়ে সরকারের নির্দেশে প্রায় বেশ কিছু লোককে মেরে ফেলা হয়; যা সরকারি হিসেব মতো ১৭ জন। কিন্তু সেখানের স্থানীয় লোকজনের হিসেব মতো প্রায় ২৪৯ জন। এখানে দেখা যাচ্ছে যে, বাস্তবতার মাধ্যমে আসল ইতিহাস জানা যায় সাহিত্যকে আশ্রয় করে।  
পরিশেষে, সঞ্চালক পারভেজ হোসেন মহাভারতের কৃষ্ণের কথা উল্লেখ করে বলেন, মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে যুদ্ধ থাকবেই আর যুদ্ধকে জয় করেই আমাদের সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।  

‘জীবন জুড়ে লেখা’ হাসান আাজিজুল হকের একক অনুষ্ঠান। বাংলা একাডেমির ‘ভাষা’ স্টেজে সন্ধ্যা পাঁচটায় শুরু হয় এ অনুষ্ঠান। এখানে মুখ্যত দেশবিভাগের সময় শিশু আজিজুল হকের জন্মভূমি ছেড়ে আসা, বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন— লেখালেখির জীবনে কী ধরনের বা রকম প্রভাব ফেলেছে তা গল্পে গল্পে বলেন হাসান আজিজুল হক।

কবি শামীম রেজার সঞ্চালনায় শৈশব, শৈশবের স্মৃতি, কৈশোর, কৈশোরের স্মৃতি, দেশবিভাগের সময় কীভাবে বাংলাদেশে আসলেন তা নিয়ে এক আনন্দময় স্মৃতি চারণায় মেতে উঠেন বাংলা সাহিত্যের গল্পের ‘রাজ পুত্তর’।

কবি শামীম রেজার দেশবিভাগের এক প্রশ্নের জবাবে হাসান আজিজুল হক বলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রে এক গাভী ছিল। যে গাভীর সামনের অংশ ছিল আমাদের তথা বাংলাদেশে আর গাভীর পেছনের অংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। এখানে তিনি গাভীর পেছনের অংশ বলতে মূলত গাভীর ওলানের কথা বলেন। কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, আমরা সেই গাভীকে যত্ন করে খাওয়াতাম আর পশ্চিম পাকিস্তানিরা সেই ওলান চুষে দুধ পান করতো। অর্থাৎ দেশবিভাগের ফলে আমরা বাঙালিরা তথা বাংলাদেশিরা বৈষম্যের স্বীকার হতাম।

 এছাড়াও ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-১৫ এর দ্বিতীয় দিনের বাংলা সেশন শেষ হয় ‘শহর পেরিয়ে’ এর মধ্য দিয়ে। এখানে আলোচক সাধনা শহরের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।  

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।