সকাল ১০:২২ ; শনিবার ;  ১৯ অক্টোবর, ২০১৯  

প্যারিসের ভালো-মন্দ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

চিররঞ্জন সরকার॥

প্যারিসের বিশেষ ভৌগোলিক-রাজনৈতিক অবস্থান, ইউরোপীয় ইউনিয়নে তার অগ্রগণ্য ভূমিকা, টুরিজমের মুকুট হিসেবে প্যারিসের স্বীকৃতি, এ সব তো আছেই। কিন্তু এই সবই গৌণ হয়ে যায় প্যারিস ও ফ্রান্সের ইতিহাসের পাশে। ফরাসি বিপ্লব প্রশ্নাতীত ভাবেই ফরাসি সমাজ ও জীবনধারার দিকনির্দেশ করেছে, সংবিধানকে দিয়েছে তার মূল চরিত্র, শিক্ষাচিন্তার উন্মুক্ততা আর উদারতাকে।

প্যারিস যদি আজ সন্ত্রাসবাদের শিকারিদের অন্যতম রাজধানী হয়, প্যারিস তো আধুনিক সভ্যতার অন্যতম তীর্থ। প্যারিস নামেই শিহরণ! অন্নদাশঙ্কর 'পথে প্রবাসে' (১৯২৯)-তে লিখেছিলেন প্যারিস হলো অর্ধেক নগরী আর অর্ধেক কল্পনা। স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়, প্যারিস ইউরোপীয় 'সভ্যতা-গঙ্গার গোমুখ'। 'প্রাচীন গ্রিক মরে ফরাসি হয়ে জন্মেছে যেন'। এক দিকে চিত্ত-বিনোদনের স্বপ্নভূমি, অন্য দিকে চিন্তার রাজধানী। মুক্তচিন্তার এমন পীঠস্থান প্রাচীন আথেন্স ও রেনেসাঁস ইতালির সঙ্গে তুলনীয়। পিয়ের দানিনোস তাঁর একটি বিখ্যাত বইতে লিখেছেন, ফ্রান্সে যদি ৫২ মিলিয়ন মানুষ থেকে থাকেন (এখন বেড়ে ৬৪-র বেশি), সেখানে সমসংখ্যক স্বাধীন মত! 'না' বলার স্বাধীনতা, 'না' বলার অধিকার আর কোথাও এতো স্বীকৃত নয়। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে চিরপ্রতিবাদী রম্যাঁ রলাঁর প্রথম বার দেখা এই প্যারিসের মঁপারনাসে। পাশ্চাত্যে আধুনিক শিল্পসাহিত্যের ইতিহাসের অনেকটাই তো আসলে প্যারিসের ইতিহাস!

লুভ্র, রদ্যাঁ, পিকাসো ও দালি মিউজিয়ামের শহর। স্যেন নদীর শহর, ওপেরার শহর। প্যারিসের রাস্তায় কয়েক শতাব্দী ধরে আলো হাতে হাঁটছেন স্বয়ং দান্তে, রঁসার, রাবলে, রাসিন, কর্নেই, মলিয়ের, পাসকাল, ভিক্টর হুগো, লামার্তিন, স্তাঁদাল, বালজাক, ফ্লবের, মপাসাঁ, জোলা, ভল্টেয়ার, মালার্মে, র‌্যাবো, গগ্যাঁ, সেজান, আপোলিনের, আদ্রেঁ জিদ, মার্সেল প্রুস্ত, ভালেরি, স্যুররেয়ালিস্তরা, আরাগঁ, এল্যুয়ার, কাম্যু, সার্ত্র, গদার, ত্রুফো, লেভি-স্ত্রোস, রলাঁ বার্ত, ফুকো, দেরিদা ছাড়াও সেই প্রতিভাবান বিদেশিরা যাঁরা শিল্পচিন্তার অন্তর্মান চিত্রটাই বদলে দিয়েছেন। যেমন, শোপ্যাঁ, ভ্যান গখ বা মদিলিয়ানি, পিকাসো বা দালি, বেকেট বা ইওনেস্কো। এতো আলো, এতো নক্ষত্র, এতো আকাশ!

এইখানে সবার জন্য দরজা খোলা। ইতালীয় চলচ্চিত্রকার মাইকেল এঞ্জেলো আন্তোনিওনি হোন, স্বাধীন মতের জন্য স্বদেশে নিন্দিত কুণ্ডেরাই হোন বা তসলিমা নাসরিন, সকলেই জন্যই এই জাদুশহরের দরজা খোলা। সহনশীলতা এই শহরের মুকুটের পালক। এই শহরেই প্রতিবাদী সমাবেশে বক্তৃতা দিয়েছেন সার্ত্র। এই শহরেই সমস্ত প্রথাভাঙ্গা বিদ্যা নিয়ে মিছিলে হেঁটেছেন মিশেল ফুকো। ১৯৮৯-এর জুন মাসে চিনে তিয়েন আনমেন স্কোয়ারের ঘটনার প্রতিবাদে প্যারিসের রাস্তায় যে মহামিছিল হয়েছে তা ছিল অভাবনীয়।

এ সব কারণেই প্যারিসের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব অসীম। যেহেতু তার সদর্থক কারণ অনেক, সেই কারণগুলিই তার কাল হয়েছে। মনে রাখতে হবে যে সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণে অনেক দিন ধরেই প্যারিস হয়ে আছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের প্রধান টার্গেট (rotating plate), যেখানে এই রকম ভয়ঙ্কর কিছু ঘটলে সারা পৃথিবীতে তার দ্রুত ও বাড়তি অভিঘাত হয়। হে কালপুরুষ, মুক্তমনের জন্য এই দাম দিতে হবে?

তবে রাজনীতিকদের হাত ধরে ফরাসি সমাজের অধঃপতনও কিছু কম হয়নি। সেই অধঃপতনের পঙ্কিলতায় জন্ম নিচ্ছে হিংসায় উন্মত্ত সন্ত্রাসবাদ। যার নগ্ন বহির্প্রকাশ ঘটেছে ১৩ নভেম্বর। সন্ত্রাসী হামলায় প্যারিস রক্তাক্ত হওয়ার পর এখন বিশ্বজুড়ে চলছে এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক। কেন এমনটা ঘটল-এ নিয়ে রয়েছে নানা জনের নানা মত। খোদ ফ্রান্সেই সরকারি পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠছে।

ফরাসি সরকার এবং ন্যাটোর মধ্যপ্রাচ্য নীতির পর্যালোচনার জোরালো দাবিও উঠেছে। ফরাসি সরকারের হস্তক্ষেপ ও আগ্রাসনের নীতি থেকে সন্ত্রাসবাদ জন্ম নিচ্ছে, মার্কিন জোটের মদতেই বেড়ে ওঠা আইসিস আজ দানব হয়ে ফিরে এসেছে বলে অনেকেই জোরালোভাবে বলেছেন। এমনকি ইউরোপের ধনতন্ত্র তীব্র বৈষম্য ও বঞ্চনার মধ্যে দিয়ে মৌলবাদী বিচ্ছিন্নতার জমি তৈরি করে দিচ্ছে বলেই অভিমত প্রকাশ করেছেন অনেক বুদ্ধিজীবী।

যে কনসার্ট হলে শুক্রবার রাতে ভয়াবহতম আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে তার সামনেই মৃতদের শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি পোস্টারও রেখে এসেছিলেন কেউ। লেখা ছিলো: ‘তোমার যুদ্ধ, আমাদের মৃত্যু’!

তবে আমরা ফরাসি সমাজ সম্পর্কে যতোটা ভালো জানি তলে তলে তার অনেকটাই যেন ক্ষয়ে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে। খুব বেশি দূরের অতীত নয়, মাত্র ১০ বছর আগে ২০০৫ সালে আধুনিক প্যারিসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দাঙ্গার কথা কী ভোলা যাবে? রমজান মাসে ফুটবল ম্যাচ খেলে হুটোপুটি করতে করতে বাড়ি ফিরছিল কিশোরের দল। শুধুমাত্র তাঁদের গায়ের রঙ দেখে জিপ নিয়ে তাড়া করে পুলিশ। ভয়ে, শুধুমাত্র ভয় পেয়ে পালাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে দুই কিশোর ঢুকে পড়েছিল বিদ্যুৎ স্টেশনে। ১০ হাজার ভোল্টে ঝলসে যায় তারা। প্রতিবাদে দাঙ্গা লেগে গিয়েছিল প্যারিসে। সাদা চামড়ার লোকেরা যেখানে যাতায়াত করে, শহরের সেসব দ্রষ্টব্য জায়গায় শুধুমাত্র গায়ের রঙের কারণে যখন তখন থামিয়ে তল্লাশি করে পুলিশ। সবসময়ের এই অপমানও কী ভুলে যাওয়া যায়? শহরতলিতে মানুষ যে অবস্থায় থাকে সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাত্র ১৬ কি.মি. দূরে অনেক জায়গায় নেই প্যারিসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। নেই কোনও কর্মবিনিয়োগ কেন্দ্র। ছ’সাত তলা উঁচু বস্তিগুলিতে বছরের পর বছর চলে না লিফট। বয়স্করা বাজার করে ওপরে উঠতে গিয়ে অল্পবয়সী ‘কুলি’দের সাহায্য নেন। অনেকে জানলায় লাগিয়ে নিয়েছেন পুলি। তাই দিয়ে বাজার তোলা হয় ঘরে। তবে সে জানলার কাচ লাগানো হয় না দীর্ঘকাল। বাসিন্দারা বলেন, এটা প্যারিস? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির অবস্থাও এর থেকে ভাল। ২০০৭ সালে ফের হয়েছিল দাঙ্গা। তবে ছোট আকারে। কিন্তু সেবারই প্রথম পুলিশের বিরুদ্ধে যথেচ্ছ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়। আহত হন বহু অফিসার। পাল্টা অনেককে বিনা বিচারে দীর্ঘদিন আটকে রেখেছিল পুলিশ। এক বিখ্যাত ফুটবল তারকাকে জেলে আটকে রাখা হয়েছিল ২৯ মাস। অবস্থা আরও খারাপ হয় দক্ষিণপন্থী প্রেসিডেন্ট সারকোজির আমলে। ব্যয় সঙ্কোচ আর উদারনীতির বিরুদ্ধে ফ্রান্সে ক’টা ধর্মঘট হয়েছে সেটাও কী ভোলা যাবে? এমন সরকারি নীতি, এমন শত্রু মনোভাবের পুলিশ আর এমন শহরতলির অবস্থা থাকলে সেখানে সন্ত্রাসবাদের চাষ হবে না তো কোথায় হবে? আইসিস পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে পুরোপুরি। আশা জাগিয়েছিলেন সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ। কিন্তু ভয়ঙ্কর এই আঘাতের পর তাঁর মুখেও তো বারুদের ঝলসানি।

একবিংশ শতাব্দীতে সন্ত্রাসবাদ সারা বিশ্বে তার ছায়া ফেলেছে। যদিও অঞ্চলভেদে সন্ত্রাসবাদের প্রকৃতি ও কারণ ভিন্ন। ‘ইসলামি উগ্রবাদ'-এর প্রশ্নটি ফরাসি জনজীবনে কয়েক দশক ধরেই বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে। ফ্রান্সের জনসংখ্যার বড়ো জোর ৮ শতাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী-এঁদের অধিকাংশ অভিবাসী। কিছু সংখ্যক ফরাসি অবশ্য মনে করেন যে ক্রমাগত অভিবাসনের ফলে ফরাসি দেশে মুসলমানদের সংখ্যা ভীতিপ্রদ ভাবে বেড়ে চলেছে। ফ্রান্সে মুসলমানদের উপস্থিতি নিয়ে উত্তেজনা ও বিতর্কের পারদ গত তিন-চার দশক ধরেই ঊর্ধ্বমুখী। এর কারণ বুঝতে হলে ফরাসি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে একটু দৃষ্টি দিতে হবে। বিপ্লবোত্তর ফ্রান্সের রাজনৈতিক সংস্কৃতি 'মুক্তি, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব'-এর আদর্শগুলিকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। তবে সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করতে গেলে কয়েকটি নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হয়। প্রজাতান্ত্রিক ফ্রান্সে রাষ্ট্রকে ধর্মের সকল রকম প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। জনজীবনেও ধর্মের স্থান নেই। তবে ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মের অনুশীলনের ওপর কোনও বাধানিষেধ নেই। সকল ধর্মের সহাবস্থানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ‘প্রজাতান্ত্রিক সংস্কৃতির’ এই ধারণাটিই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংঘাতের একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোষ্ঠী হিসেবে ফ্রান্সে মুসলমানদের সামাজিক আর রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। একবিংশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে অর্থনৈতিক সংকট যত তীব্র হয়েছে, মুসলমানদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা আরও নিম্নগামী হয়েছে।

দারিদ্র ও বেকারত্ব ভয়াবহ। অনেক পরিবারেই রাষ্ট্রীয় দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল। বড়ো শহরগুলির সীমান্তে ঘিঞ্জি, অস্বাস্থ্যকর এলাকায় তাদের বসবাস। সামাজিক মূলস্রোত থেকেও এরা বিচ্ছিন্ন। অভিবাসীদের সন্তান-সন্ততির অবস্থা আরও মর্মান্তিক।

অশিক্ষা, দারিদ্র্য ও racial prejudice-এর মাসুল গুণতে হয়েছে এই প্রজন্মকেই। এই প্রজন্মই ফরাসি দেশের আর্থিক সংকটের প্রধান ভুক্তভোগী। আশাভঙ্গের শিকার এই প্রজন্মের একাংশের কাছে তাদের ধর্মবিশ্বাসই হয়ে উঠেছে আত্মসম্মান ও আত্মপরিচিতি রক্ষার প্রধান উপায়। রাষ্ট্রের ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষতা উপেক্ষা করে ধর্মকে তারা সচেতন ভাবেই জনপরিসরে নিয়ে এসেছে. এর ফলে রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতও বেঁধেছে। একাংশের মধ্যে জন্ম নিয়েছে 'ইসলামী উগ্রবাদ’। ফ্রান্সের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করতে না পেরে স্বল্পসংখ্যক তরুণ-তরুণী আবার ঝুঁকেছে আলকায়েদা ও ইসলামি স্টেটের মতো সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর দিকে। যার ফলাফল শুক্রবারের ঘটনা।  

যে রাষ্ট্র তাদের দেখে এসেছে অনাহূত অভিবাসী হিসেবে ফরাসি নাগরিক হিসেবে নয়-সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাই ছিল তাদের প্রতিবাদ। ফরাসি রাষ্ট্রের কাছে তাই প্রধান চ্যালেঞ্জ আশাহত এই অংশকে ফরাসি দেশে পূর্ণ নাগরিকের সম্মান দেওয়া-তা না হলে সন্ত্রাসবাদী হামলা ঠেকানো যাবে বলে মনে হয় না।

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।