সকাল ১১:২২ ; শনিবার ;  ১৯ অক্টোবর, ২০১৯  

হতবাক, নির্বাক

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা॥

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান হতবাক হয়েছেন। বলেছেন, তিনি ভাবতেই পারছেন না কেন নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার পর রিমান্ডে নেওয়া হলো না। তিনি একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “নূর হোসেন এ মামলার প্রধান আসামি। তার যোগসাজশে ও অর্থায়নে এ খুন সংঘটিত হয়েছে। তাহলে তাকে কেন জামাই আদরে জেলখানায় রাখা হলো?”

এমন প্রশ্নের উত্তর যাদের দেওয়ার কথা তারা বলছেন, নূর হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র হয়ে গেছে। তাই তাকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। এর বাইরে তারা আর কিছু না বলে নির্বাক রয়েছেন।  রিমান্ড হবে না হয়তো নুর হোসেন তা আগে থেকেই জানতেন। আর তাই আদালতের কাঠগড়ায় তার মধ্যে কোনও উদ্বেগ বা ভয়ের ছাপ দেখা যায়নি। তার হাসিমাখা মুখ সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তুলেছে আর আতংকিত করেছে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের। তারা আশঙ্কা করছেন নূর হোসেন কারাগারে থাকলেও তার সহযোগীরা আবার বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।

নূর হোসেনের মতো একজন দুর্ধর্ষ আসামিকে পুলিশি রিমান্ডে না নেওয়ায় মানুষের মনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। নুর হোসেনকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু খুনের ঘটনায় অভিযোগপত্রভুক্ত এক ডজন আসামি এখনও পলাতক রয়েছে। প্রধান আসামি নূর হোসেনের সহযোগী বন্দর উপজেলার কুড়িপাড়া এলাকার সেলিম বর্তমানে ভারতের কারাগারে আটক। আরেক সহযোগী সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার সানা উল্লাহ, ম্যানেজার শাহজাহান ও জামাল উদ্দিনকে পুলিশ ধরতে পারেনি।

নারায়নগঞ্জে নূর হোসেন প্রভাবশালী ব্যক্তি। সাত খুনের ঘটনার পর সামিয়ক বিরতির পর তার লোকজন এখনও আগের মতোই মাদক ব্যবসা,  চাঁদাবাজিসহ আরও কিছু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে গণমাধ্যমে অভিযোগ আসছে। এমন যার প্রভাব তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যারা করেন বা মামলা পরিচালনা করেন তাদের থাকতে হয় চরম শঙ্কার মধ্যে। তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু একটি বড় অভিযোগ করেছেন নিহত কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী। জানিয়েছেন, সাত খুনের ঘটনার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে তার নিরাপত্তার জন্য যে পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা ছিল তা আর নেই। নূর হোসেন ফিরে আসায় তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন এটাই স্বাভাবিক।

যতক্ষণ জলে রয়েছে, কুমির ততক্ষণ শক্তিশালী। তার দাঁত ভাঙতে হলে ডাঙায় তুলে আনতে হয়। প্রধান আসামিকে নির্বিঘ্নে জেলে পাঠিয়ে দেওয়ার অর্থ, ডাঙায় তোলা কুমির জলে ফিরে গেল। সেখানে সে শক্তিশালী হয়ে উঠবে, তার সাম্রাজ্য চালানোর রসদ পাবে।

প্রধান আসামি নুর হোসেন, তার গডফাদার আর অন্য আসামি, যারা একটি বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন প্রত্যেকের সমাজে প্রভাব রয়েছে। এই প্রভাব অর্থের, এই প্রভাব রাজনীতির। তাই সুষ্ঠু বিচার হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দূর হচ্ছে না কোনভাবেই।
 

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের এই নৃশংস ঘটনায় দেশজুড়ে যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তাতে এই মামলাগুলো সুষ্ঠু ও দক্ষভাবে পরিচালনা করার মধ্য দিয়ে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটা বিশেষ চ্যালেঞ্জ।

আইনের শাসন দাবি করে, খুনি যাদের হত্যা করে, তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে গেলে হত্যাকারীকে কঠোর দণ্ড দিতে হয়। সেই বিবেচনায় নুর হোসেনের প্রতি এমন সদয় আচরণ নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। আইনের শাসন গণতন্ত্রের নিহিত শক্তি। ঘৃণ্যতম অপরাধীকেও গণতন্ত্র আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়। নুর হোসেনকে সেই সুযোগ অবশ্যই দিতে হবে। কিন্তু অতিরিক্ত কিছু দিতে গেলে জনরোষের আশঙ্কাকে থাকে, মানুষের মাঝে বিচার না পাওয়ার হতাশা কাজ করে। বিচারহীনতার ধারণা একবার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে পাকাপোক্তভাবে বসে গেলে আইনের শাসন তার স্থান হারাতে বাধ্য।

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি স্বস্তিদায়ক। গত বছরের ২৭ এপ্রিল সাত খুনের ঘটনার পর ভারতে পালিয়ে যান নূর হোসেন। ওই বছরেরই ১৫ জুন কলকাতার লাগোয়া বাগুইআটির একটি ফ্ল্যাট থেকে দুই সহযোগীসহ তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে মামলা করা হয়। এ মামলার কারণে নূর হোসেনকে দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানো যাচ্ছিল না। ভারত সরকার সম্প্রতি মামলাটি প্রত্যাহার করে নিলে তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর পথ সুগম হয়।

নারায়ণগঞ্জের সাত খুন দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি ঘটনা। নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাত ব্যক্তি অপহৃত হওয়ার তিনদিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে ছয়জনের এবং পরদিন আরেকজনের লাশ পাওয়া গেলে দেশব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। অপহৃত ও নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতার জোরালো অভিযোগ ওঠার পর র‌্যাব-১১-এর অধিনায়কসহ তিন কর্মকর্তাকে আগাম অবসরে পাঠানো হয়।

সাত খুনের ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ। এ কারণে এই ঘটনার নিষ্পত্তি শেষ পর্যন্ত কী হয়, অপরাধীদের কী সাজা হয় তা দেখার অপেক্ষায় আছে মানুষ। প্রতিটি অভিযোগেরই যথাযথ নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। কারণ এর সঙ্গে একটি বাহিনীর ভাবমূর্তির প্রশ্ন জড়িত, জড়িত রাজনীতিও। রাজনীতি নিয়ে এমনিতেই দেশব্যাপী কুখ্যাতি আছে নারায়ণগঞ্জের। কোনও একটি পরিবার আর তার কোনও কোনও সদস্যের গডফাদারসুলভ আচরণে সেখানে এমনিতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সাধারণভাবে মানুষের কোনও আস্থা নেই। সাত খুনের ঘটনা প্রশাসনের ওপর আস্থা ফেরানোর একটি সুযোগ।

এমন একটি নৃশংস ঘটনায় জড়িত একজনও যেন বিচার ও শাস্তি থেকে অব্যাহতি না পায় তা নিশ্চিত করা জরুরি। নারায়ণগঞ্জের সাত অপহরণ ও খুনের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সাত খুনের মামলার প্রধান আসামির বিষয়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিন্দুমাত্র উদাসীনতা, নির্লিপ্ততা কিংবা শিথিলতা প্রদর্শনের সুযোগ নেই। নূর হোসেনের একটি অডিও কথোপকথন তার ভয়ংকর চরিত্রের হদিস দেয়।  আর তাই আদালতের কাঠগড়ায় নূর হোসেনের হাসি যেন তার সেই দম্ভকে আবারো জানান দেয় সবাইকে।

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।