সকাল ১০:০৩ ; শুক্রবার ;  ১৯ জুলাই, ২০১৯  

হঠাৎ অ্যানালগ!

প্রকাশিত:

প্রভাষ আমিন॥

লিখতে আমার ভালো লাগে। আমি নিয়মিত লেখালেখি করি। প্রতিদিনই কিছু না কিছু লিখি। সেসব লেখালেখি কখনও অনলাইনে, কখনও অফলাইনে (পত্রিকায়) প্রকাশিত হয়। আর কিছু না পেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক তো আছেই। ফেসবুকেও আমি খুবই সক্রিয়। সব বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেই ফেসবুকে। তারপর বিস্তারিত লিখি।

আজ দুপুরে যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসির দণ্ড বহাল থাকার খবর শুনে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে গিয়ে দেখি ফেসবুকে আপডেট হচ্ছে না, চাক্কি ঘুরছে তো ঘুরছেই। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় মনে মনে গ্রামীণফোনকে গালি দিলাম। আমি মোবাইলে গ্রামীণফোনের থ্রিজি ইন্টারনেট প্যাকেজ ব্যবহার করি। ইদানীং প্রায়শই গ্রামীণফোন ঝামেলা করে। তবে প্রায় সাথে সাথেই জেনে গেলাম, এবারের দোষটা গ্রামীণের নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুরোধে বিটিআরসি ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। সাথে সাথেই নিউজরুমে একটা হাহাকার শুনলাম। মেসেঞ্জার, ভাইবার বা হোয়াটসঅ্যাপ নিয়ে অতটা নয়, যতটা ফেসবুকের জন্য।

আমাদের দেশের মানুষদের অনেকেই এখন এতটাই ফেসবুকনির্ভর হয়ে গেছেন যে ফেসবুক ছাড়া জীবন তারা ভাবতেই পারেন না। অফিসের অনেকেই আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে, দাদা আপনার কী হবে? আসলেই ফেসবুক ছাড়া জীবন ভাবাই কঠিন। তবে আমি আসলে ফেসবুক ভালোবাসি না, ভালোবাসি লিখতে। ফেসবুক আবিষ্কারের অনেক আগে থেকেই আমি লেখালেখি করি। ফেসবুকের মজাটা হলো, তাৎক্ষণিকভাবে লেখা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা যায়, তাদের প্রতিক্রিয়া জানা যায়। ফেসবুক যে বন্ধ, এটা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে দেখলাম অনেকের হাত নিশপিশ করছে। কিন্তু সেটা জানাতেও তো ফেসবুকই ভরসা। ফোন করে আর কজনকে জানাবেন। ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিলেই তো সবাই জেনে যায়। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে, আমার এক বন্ধু তার বিয়ের দাওয়াত দিয়েছে ফেসবুকে গ্রুপ খুলে। ফেসবুক বন্ধু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে দেখলাম, আমার দুই সহকর্মী বই পড়ছে। অবাক হলাম। তারা বললো, কী করবো দাদা ফেসবুক তো নেই।

ফেসবুক আমাদের দিয়েছে অনেক, নিয়েছে তারচেয়েও বেশি। ফেসবুক না থাকলে আমরা আরও বেশি পড়তে পারতাম, আরও বেশি লিখতে পারতাম। ফেসবুক আমাদের প্রতিদিনের অনেকটা সময় গিলে নেয়। আহা, ফেসবুক ছাড়া আমাদের সময় কতই না আনন্দময় ছিল! ঘণ্টা দেড়েক পর ফেসবুক ফিরে এসেছে। কিন্তু আমার মোবাইলে এখনও ফেসবুক আসেনি। আমি আপ করার চেষ্টাও করিনি। ফেসবুক ছাড়া আমার খারাপও লাগছে না। জানি আর পাব না, তবে ফেসবুক ছাড়া জীবনটা ফিরে পেলে মন্দ হতো না।

ফেসবুক তো অভ্যাস। কিন্তু ইন্টারনেট আমাদের প্রয়োজন। বাংলাদেশ এখন এতটাই ডিজিটাল যে, ইন্টারনেট ছাড়া আমাদের চলে না। তাই যখন খবর এলো ইন্টারনেটও বন্ধ, তখন হাহাকার রূপ নিলো চিৎকারে। কারণ ইন্টারনেট না থাকলে নিউজরুম অচল। ইন্টারনেট এখন আমাদের অক্সিজেনের মতো। ইন্টারনেট বন্ধ শুনে সাথে সাথে সবাই হাত পা ছেড়ে দিল। ইন্টারনেট না থাকায় ঢাকার বাইরে থেকে নিউজ আসা বন্ধ হয়ে গেল। ফ্রান্সের কোনও আপডেটও পাওয়া যাচ্ছিল না। ব্যাকপ্যাক অচল থাকায় বন্ধ হয়ে গেল সরাসরি সম্প্রচারও। বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে আমাদের ক্যান্টিনের মাইক্রোওয়েভ ওভেনটি চলছিল না। একজন হাসতে হাসতে বললো, ইন্টারনেট নেই তো, তাই মাইক্রোওয়েভও চলছে না। অল্প কিছুক্ষণ ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বুঝলাম, আমরা এখন কতটা ইন্টারনেট নির্ভর হয়ে গেছি। অথচ খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। ইন্টারনেট তো ছিলই না, ছিল না মোবাইল ফোনও। একসময় ঢাকার পত্রিকায় বাইরে থেকে ফ্যাক্সে পাঠানো ঢেউ খেলানো ছবি ছাপা হতো, এটা শুনলে এখনকার সাংবাদিকরা হাসে। ইন্টারনেট ছাড়া কিভাবে পত্রিকা বেরুতো, টিভি চলতো, এখন ভাবাই যায় না।

এ তো গেল নিউজরুমের কথা। আমাদের তবু জোড়াতালি দিয়ে চলছে। কিন্তু ইন্টারনেট না থাকলে তো ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-শেয়ারবাজার, কেনাকাটা সব স্থবির হয়ে যাবে। শেয়ারবাজার তো পুরোটাই ইন্টারনেট নির্ভর। ইন্টারনেট ছাড়া চলবে না অনলাইন ব্যাংকিং। এখন অনেকেই নগদ টাকা বহন করেন না, ক্রেডিট কার্ড বা ডেবিট কার্ড পকেটে রাখেন। দরকার হলে এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নেন বা কার্ডে কেনাকাটা করেন। কিন্তু ইন্টারনেট ছাড়া সব অচল। বিমান পরিবহন পুরোটই ইন্টারনেট নির্ভর। ইন্টারনেট না থাকলে ফ্লাইট এলামেলো হয়ে যাবে। গার্মেন্টস, আমদানি-রফতানি, আউটসোর্সিং সবই ইন্টারনেট নির্ভর। ইন্টারনেট না থাকলে অচল হয়ে যায় বর্তমান সময়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা অনলাইন মিডিয়াও। তাই অল্প সময়ের ইন্টারনেটের অনুপস্থিতি আমাদের নড়বড়ে করে দেয়। আমরা বুঝে যাই, প্রযুক্তি ছাড়া আমরা অচল।

এমন সর্বগ্রাসী প্রভাবই আমাদের প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলেছে। তবে প্রযুক্তির ভালো দিক যেমন আছে, তেমনি খারাপ দিকও আছে। ইন্টারনেটে গুজব ছড়ানো হয়, মানুষকে হুমকি দেওয়া হয়, মানুষকে হেয় করা হয়। তাই তো অল্প সময়ের জন্য হলেও ইন্টারনেট বন্ধ রাখার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয় প্রযুক্তিবান্ধব সরকারকেও। তবে সত্যি বলছি, হঠাৎ করে কিছুক্ষণের জন্য অ্যানালগ জীবন আমার খারাপ লাগেনি। নিজেকে অনেক নির্ভার লেগেছে।

লেখক:  অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

probhash2000@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।