সকাল ১০:১১ ; শুক্রবার ;  ১৯ জুলাই, ২০১৯  

প্রসঙ্গ আইএস নির্মূল নয়, পৃষ্ঠপোষকতা!

প্রকাশিত:

গোলাম মোর্তোজা॥

আইএস কারা তৈরি করেছে, তা অজানা নয়। এতদিন অভিযোগ ছিল, এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা বলছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশের নীতির কারণে আইএস তৈরি হয়েছে।

আইএসের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলব। বাংলাদেশের কিছু মানুষ আছেন যারা দেশে, দেশের বাইরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। তেমন একজন মানুষ (শেষ মুহূর্তে তিনি নাম দিয়ে কথা বলতে রাজি হলেন না, নিরাপত্তার কারণে)। কাজ করছেন দেশের বাইরে।

তার অনেকগুলো পরিচিতির মধ্যে আংশিক বলি, পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল অ্যাকসেস -এ এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দায়িত্বে আছেন। এর আগে পৃথিবীর দু’তিনটি বড় প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হিসেবে নীতি -নির্ধারক পর্যায়ে কাজ করেছেন।

এই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিয়ে, আইএসের প্রযুক্তি সুবিধা নিয়ে কিছু প্রসঙ্গ তুলে ধরছি।

১. ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়ার জন্যে গেটওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া অপরিহার্য। আমি-আপনি কোন গেটওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করছি, সেটা গোপন রাখার কোনও উপায় নেই। আইএস যে গেটওয়ের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, খুব সহজে সেই গেটওয়ের সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া যায়। তাহলে আইএস ইন্টারনেট ব্যবহার করে কোনও ধরনের (কথা বলাসহ) প্রপাগান্ডা চালাতে পারবে না। গেটওয়ে বন্ধ করার ক্ষেত্রে টেকনিক্যালি কোনও সমস্যা নেই। খুব সহজে তা সম্ভব। তাহলে সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে না কেন?

২. আইএস তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্যে ফেসবুক/টুইটার ব্যবহার করছে। আইএস বা আইএস সংশ্লিষ্ট যে কোনও অ্যাকাউন্ট ফেসবুক/টুইটার কর্তৃপক্ষ খুব সহজে শনাক্ত করতে পারে, বন্ধ করে দিতে পারে। অ্যানালগ পদ্ধতিতে নয়, একটা কোডিং সিস্টেমের মাধ্যমে তা খুব সহজে করা যায়। এটা এখন সাধারণ প্রযুক্তি। ফেসবুক টুইটার কর্তৃপক্ষ কেন তা করছে না, কেন তাদের প্রোপাগান্ডা চালানোর সুযোগ করে দিচ্ছে?

৩. সিরিয়া-ইরাকের কোন অঞ্চলগুলো আইএসের নিয়ন্ত্রণে তা মোটামুটি জানা। এই অঞ্চলের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দিলে আইএস তখন প্রোপাগান্ডার জন্যে অন্য অঞ্চলের ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করতে পারে। হতে পারে সেটা আমেরিকা বা ইউরোপের কোনও অঞ্চল বা আশেপাশের কোনও দেশ। সেটাও খুব সহজে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। সেদিকে কোনও দৃষ্টি নেই কেন?

৪. আইএসের টিকে থাকার জন্যে, এলাকা নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। কোথা থেকে তারা এই অর্থ পায়? কোন দেশের মুদ্রা তারা ব্যবহার করে? ডলার বা অন্য কোনও মুদ্রা লোকাল মুদ্রায় কিভাবে পরিবর্তন করে? বর্তমান পৃথিবীতে অর্থ স্থানান্তর, পরিবর্তন অত্যন্ত কঠিন ও জটিল প্রক্রিয়া। আইএস কি করে নির্বিঘ্নে তা করে যাচ্ছে? তেল তো সিগারেট না যে, পকেটে করে বহন করা যায়। আইএস তেল বিক্রি করে কিভাবে, কারা এই তেলের ক্রেতা? যে সব জাহাজে তেল পরিবহন করা হয়, তা তো না দেখা যাওয়া সম্ভব নয়। কালো বাজারের এই তেল কেনা বন্ধ করার ক্ষেত্রে উদ্যোগ দেখা যায় না। এই তেলও তো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনও মুদ্রায় কেনা-বেচা হয়। এই মুদ্রা আবার লোকাল মুদ্রায় পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি লোকচক্ষুর অন্তরালে গোপনে সম্ভব নয়।

৫. এই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের প্রযুক্তি বিষয়ক জ্ঞান নিয়ে নিশ্চয়ই কোনও সন্দেহ নেই। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এই প্রসঙ্গগুলো নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব কোনও কথা বলে না।

এর সঙ্গে আরও কিছু প্রসঙ্গ যোগ করছি-

ক. ইরানের উপর যখন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, ইরানের তেল রফতানি তখন বন্ধ হয়ে যায়। কালো বাজারেও তেল রফতানি করতে পারে না ইরান। অবরোধে বিপদে পড়ে রাশিয়ার মতো সুপার পাওয়ারও। আইএস কী করে কালো বাজারে তেল বিক্রি করে? এই তেল তো ওই অঞ্চলের কোনও মুসলিম দেশ কেনে না। পশ্চিমা দেশগুলোই কেনে। আমেরিকা-ইউরোপের যেসব যুদ্ধ জাহাজ ওই অঞ্চলে অবস্থান করছে, তারা দেখে না কেন? নাকি তারাই তেল বিক্রি করতে আইএসকে সহায়তা করে? তারা সহায়তা না করলে কোনওভাবেই আইএসের পক্ষে তেল বিক্রি করা সম্ভব নয়। সবাই আইএস নির্মূলে বদ্ধ পরিকর বলেই মুখে দাবি করে। আকাশ থেকে বোমা বর্ষণ করে। কিন্তু আইএস নিয়ন্ত্রিত তেল ক্ষেত্রগুলোর কাছে কেউ যায় না। কেন যায় না?

খ. ইরাক যখন কুয়েত আক্রমণ করে তখন আমেরিকা এই অঞ্চলে কয়েক’শ গাড়ি নিয়ে গিয়েছিল, নিজেদের ব্যবহারের জন্যে। অভিযোগ আছে সেই সব গাড়ি আইএস ব্যবহার করে। সম্প্রতি আইএসকে টয়োটার নতুন জিপ ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। তারা কয়েক’শ নতুন জিপ পেয়েছে ব্যবহারের জন্যে। প্রশ্ন হলো, এই জিপগুলো তারা কিভাবে পেল? কোনও দেশ যদি টয়োটার কাছ থেকে এক’শ জিপ কিনতে চায়, তবে আগে অর্ডার দিতে হবে। মূল্য পরিশোধ করতে হবে। তারপর টয়োটা জিপ পৌঁছে দেবে। আইএস কিভাবে টয়োটাকে অর্ডার দিল, মূল্য পরিশোধ করল কিভাবে, কোন মুদ্রায়?

টয়োটা জিপ পৌঁছে দিল কোথায়? ওই অঞ্চলে থাকা কোনও আমেরিকা-ইউরোপের যুদ্ধ জাহাজ তা দেখল না? নাকি অন্য কোনও দেশ গাড়ি কিনে আইএসকে সরবরাহ করল? চাইলে খুব সহজে তা জানা সম্ভব। কিন্তু জানতে চাওয়ার দিকে কারও নজর নেই কেন?

৬. প্যারিস রক্তাক্ত। ইউরোপ আক্রান্ত। হামলার পরিকল্পনা সিরিয়ায়। হামলাকারীদের একজনের সিরিয়ান পাসপোর্ট। এসবই নানা সূত্রের সংবাদ। সিরিয়ায়

আইএসের উপর ফ্রান্স বোমা হামলা বৃদ্ধি করেছে। ইউরোপ থেকে কমপক্ষে ৩ হাজার তরুণ-তরুণী এর মধ্যে আইএসে যোগ দিয়েছে। ফ্রান্স থেকেই যোগ দিয়েছে প্রায় দেড় হাজার। ফ্রান্সসহ ইউরোপেই ছড়িয়ে রয়েছে আইএস। সিরিয়ায় বোমা মারলে ইউরোপের আইএসের কী হবে?

এখন জানা যাচ্ছে পৃথিবীর প্রায় ৪০টি দেশ আইএসকে অর্থ সহায়তা দেয়। নাম এসেছে ইসরায়েলের। মুখে আইএস দমনের বড় বড় কথা, আকাশ থেকে বোমা বর্ষণ যে সত্যিকারের আইএস নির্মূল চাওয়া নয়, তা পরিষ্কার।

মুসলমানরা সন্ত্রাসী প্রমাণ করা যাবে, ইউরোপে আশ্রয় পাওয়া মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা তৈরি করা যাবে, সমস্যার সমাধান হবে না। এই পদ্ধতিতে, ভুল নীতিতে আইএসের মতো জঙ্গি-সন্ত্রাসী তৈরি করে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও টিকিয়ে রেখে মুসলমানদের ভালো থাকতে দেওয়া হবে না। পৃথিবী কি ভালো থাকবে, শান্তিতে থাকবে? পশ্চিমারা ভালো থাকবে? ভালো থাকবে না, থাকতে পারবে না, তা এখন প্রমাণিত।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।