সকাল ০৮:০৪ ; শুক্রবার ;  ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯  

প্যারিস হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের দায়

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

হারুন উর রশীদ।।

প্যারিসে শুক্রবারের সন্ত্রাসী হামলার পরদিন শনিবার এক বিতর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগামী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের একজন বার্নি স্যান্ডার্স বলেন, ‘আইএসের উত্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত রয়েছে। ইরাকে আগ্রাসী যুদ্ধের ফলেই আল-কায়েদা ও আইএসের উত্থান হয়েছে। এর দায়দায়িত্ব আমরা চাইলেও এড়াতে পারব না।’

আমেরিকার একজন রাজনীতিবিদের এই উপলব্ধি দেরিতে হলেও এতে সত্য প্রকাশ পেয়েছে। আমি মনে করি, শুধু আমেরিকা নয় ইউরোপেরও এই উপব্ধি জরুরি। তবে এই কথা যা মার্কিন রাজনীতিবিদ এখন বললেন তা অনেক আগেই বলেছেন আন্তর্জাতিক জঙ্গি বিষয়ক বিশ্লেষকরা।

কানাডাভিত্তিক রিসার্চ গ্রুপ গ্লোবাল রিসার্চ ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের ওয়েবসাইটে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যার শিরোনাম ছিল,‘America Created Al-Qaeda and the ISIS Terror Group’ । এই লেখাটি এখন ব্যাপকভাবে শেয়ার হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আমস্টারডামে আমার সাংবাদিক বন্ধু মাজা ট্রিভানভিক আমাকেও লেখাটি শেয়ার করেছেন ফেসবুকে। আর সেখান থেকেই মূল ওয়েবপেজে ঢুকে আমি লেখাটি পাই। এর লেখক গারিকা চেঙ্গু এখন জিম্বাবুয়েতে বসবাস করেন। পড়াশোনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন রিসার্চ স্কলার।

তার লেখার কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি আর আমার ধারণা, তা থেকেই বোঝা যাবে কীভাবে আমেরিকা আল কায়েদা এবং আইএস-এর উত্থানের নেপথ্যে আছে। তিনি লিখেছেন, ‘আমেরিকা আইএসকে তিনভাবে ব্যবহার করছে।

এক. মধ্যপ্রাচ্যে শত্রুদের ওপর হামলা।

দুই. বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপট তৈরি এবং অজুহাত খোঁজা এবং

৩. দেশের অভ্যন্তরে আইএস বা জঙ্গি হামলার হুমকি তৈরি করা যাতে অব্যাহতভাবে নজরদারি বাড়ান যায়। ওবামা প্রশাসন রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার কথা বলে নাগরিকদের ওপর নজরদারি বাড়াচ্ছে। বিপরীতে সরকারের ওপর মার্কিন নাগরিকদের নজরদারি কমছে।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধ পরবর্তী তিন বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৭০টি কোম্পানি ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাজ পেয়েছে।’

আর ১৯৯৭ সালে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্স রিপোর্টে বলা হয়েছে,’বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সন্ত্রাসী হামলার হুমকির একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।’

গত মার্চে মার্কিন ভাইস নিউজকে(টিভি) দেওয়া এক সাক্ষাতকারে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা স্পষ্ট করেই বলেন, ‘২০০৩ সালে জর্জ ডাব্লিউ বুশের নির্দেশে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা অভিযানের সময়ই সশস্ত্রগোষ্ঠী আইএস’র উদ্ভব হয়েছে।’

সাক্ষাতকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আল কায়েদা থেকে সরাসরি আইএস’এর সৃষ্টি হয়েছে এবং ইরাকে আমেরিকার সেনা অভিযানের ফলেই এর উদ্ভব ঘটেছে।’ তবে ওই সময়ে আইএস’র উত্থানকে একেবারেই যুদ্ধের অনাকাঙ্খিত ফলাফল বলে উল্লেখ করেন তিনি। ওবামা আরও দাবি করেন, ‘তবে এটা পরিকল্পিত ছিল না।’

বারাক ওবামা যা বলেছেন তা একটু খতিয়ে দেখা যাক। তিনি বলছেন, আইএস সৃষ্টির দায় তার পূর্বসূরীদের। তবে তিনি দাবি করছেন, এটা অনিচ্ছাকৃত, পরিকল্পিত নয়। আর গারিকা চেঙ্গু’র বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে- এটা পরিকল্পিত। আর কেন পরিকল্পিত তার তিনটি কারণ তিনি বলেছেন। যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি।

সিরিয়ায় এখন যে পরিস্থিতি চলছে তা বিশ্লেষণ করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে সরাসরি আইএস-এর কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছে তা পরিষ্কার হয়ে যায়। তারা বাশার আল আসাদকে উৎখাত করতে চায়। আর আইএস এবং বিদ্রোহী গ্রুপ দুটোই আসাদবিরোধী। আইস নিধনের কথা বলে সিরিয়ায় হামলা চালাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবে আসাদ সমর্থকরাই নিধন হচ্ছে। শক্তিশালী হচ্ছে আইএস এবং বিদ্রোহী গ্রুপ।

অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আসাদকে রক্ষায় কাজ করছেন। তাদের অভিযানও আইএস নিধনের নামে। কিন্তু বাস্তবে বিদ্রোহীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আইএস তেমন কোনও ক্ষতির মুখে পড়ছে না। কী অদ্ভূত বিশ্ব রাজনীতির মোড়লদের আচরণ ও যুক্তি!

মার্কিন প্রশাসনের সৃষ্ট আল কায়েদা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালালেও এখন পর্যন্ত আইএস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি হামলা চালায়নি। ফ্রান্সে হামলার পর হামলার হুমকি দিয়েছে মাত্র। কিন্তু যদি মার্কিন প্রশাসন আইএস-এর জন্য বড় হুমকি হতো তাহলে হামলা তো ফ্রান্সে হওয়ার কথা ছিল না।

ফ্রান্সে হামলার পর ফ্রান্সের পুঁজিবাদবিরোধী নতুন রাজনৈতিক দল এনপিএ তাদের ব্লগ সাইটে লিখেছে ‘Your wars, our dead.’ এই যুদ্ধ এবং মৃত্যুর ব্যবসা এতদিন ইরাক, আফগানিস্তান, প্যালেস্টাইন, সিরিয়াই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন তা ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ল।

টুইন টাওয়ার হামলার পর প্যারিস হামলা পশ্চিমা বিশ্বে সবচেয়ে বড় হামলার ঘটনা। কিন্তু এর মাঝখানে মারা পড়েছে ইরাক, আফগানিস্তান, প্যালেস্টাইন, সিরিয়ার মানুষ। তাদের ওপর হামলা আর আঘাত অবশ্য ওবামার কাছে ‘বিশ্ব মানবতার বিরুদ্ধে হামলা’ বলে প্রতীয়মান হয়নি।এবার ফ্রান্সে হামলার পর যেমন হয়েছে।

আর ফ্রান্সে হামলার পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবার এক বোমা ফাটিয়েছেন। তিনি ৪০টি দেশকে জঙ্গি অর্থায়নকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পৃথিবীর ৪০টি দেশ জঙ্গিদের অর্থ দিয়ে আসছে। এরমধ্যে জি-টুয়েন্টিভুক্ত কিছু দেশও রয়েছে।’

জি-টুয়েন্টিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়া ছাড়াও রয়েছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সৌদি আরব, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চীন, জার্মানি, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, জাপান, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্ক।

ভালো কথা বলেছেন পুতিন। কিন্তু সময়ে বলেননি। এমন সময়ে বললেন যখন শুধু জঙ্গি অর্থায়ন নয়, এসব দেশের নাগরিকরাও প্রধান জঙ্গিতে পরিণত হয়েছে। বহুল আলোচিত ব্রিটিশ জিহাদি জন অবশ্য বোমা হামলায় নিহত হয়েছে বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে। আর প্যারিস হামলার সন্দেহভাজনদের তিনজনই ফ্রান্সের। আছে বেলজিয়ামের নাগরিকও।

তাহলে যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো- বাইরে যারা আইএস সৃষ্টি করে, জঙ্গি সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থের জন্য এখন তাদের ঘরেই আইএস সৃষ্টি হচ্ছে। জঙ্গি জন্ম নিচ্ছে। আর তারাই নিজেদের দেশে হামলা চালাচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বের ও ইউরোপের নাগরিকরাও তা বোঝেন। বোঝেন বলেই নেদারল্যান্ডস সাংবাদিক মাজা ট্রিভানভিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেন ‘America Created Al-Qaeda and the ISIS Terror Group’ শিরোনামের লেখা। বার্নি স্যান্ডার্স বলেন, আইএস সৃষ্টিতে নিজ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের হাত থাকার কথা।

 

লেখক: সাংবাদিক

ইমইেল: swapansg@yahoo.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।