দুপুর ১২:২১ ; শনিবার ;  ১৯ অক্টোবর, ২০১৯  

পুলিশকে অসহায় দেখে বড় কষ্ট হয়

প্রকাশিত:

সালেক উদ্দিন॥

সম্প্রতি জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার দক্ষিণপাড়া গ্রামে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ধরতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা বেকায়দায় পড়ে। পুলিশ সদস্যের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে আসামি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। বেচারা এসআই পিস্তল হারিয়ে চিৎকার শুরু করলে গ্রামবাসীরা এগিয়ে আসে। এতে আসামি ভয়ে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় নদীর ধারে কোনও এক কাশবনে পুলিশের অস্ত্রটি ফেলে যায়। এসআই সাহেবের প্রতি গ্রামবাসীর সহানুভূতি জাগে। তারা নদীর ধারে কাশবনে পাঁচ ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করে এসআই সাহেবের অস্ত্রটি খুঁজে পায় এবং তাকে ফেরত দেয়।

এই ঘটনাটির ১৮ দিন আগে ২২ অক্টোবর গাবতলীর পুলিশ চেকপোস্টে সন্ত্রাসীর ছুরিকাঘাতে এক পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হয়। সেই মৃত্যুর ১৩ দিনের মাথায় ৪ নভেম্বর সকালে আশুলিয়ার বাড়ইপাড়ায় খুন হয় আরেক পুলিশ সদস্য। এই ঘটনায় আরেক পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছে। এটাও ছিল পুলিশের চেকপোস্ট, সেখানে পাঁচ পুলিশ সদস্য ছিল। এই পাঁচজনের প্রত্যেকের কাছেই ছিল পাঁচটি চায়নিজ রাইফেল। আর হামলাকারীরা ছিল দুইজন। তাদের হাতে ছিল ছুরি আর চাপাতি। মাত্র দুইজন চাপাতিওয়ালার কাছে চায়নিজ রাইফেলধারী পাঁচজন পুলিশ ছিল অসহায়। তারা চাপাতির বিপরীতে রাইফেল দিয়ে কোনও প্রতিরোধই গড়তে পারেনি। চাপাতিকে রাইফেলের চেয়েও ভয়ঙ্কর ভেবে সম্ভবত প্রতিরোধের চেষ্টাই করেননি। বরং ‘জান বাঁচানো ফরজ’ এই সূত্র ধরে তিন পুলিশ সদস্য শালবনের দিকে দৌড়ে পালাল। গুলি ছোড়ার চেষ্টা তো দূরের কথা পেছন ফিরেও তাকায়নি তারা। ওদিকে হামলাকারীরা চাপাতি দিয়ে ইচ্ছে মতো কুপিয়ে একজনকে পরপারে পার করে দিল এবং আরেকজনকে পরপারে যাবার উপক্রম করে ফেলে বীর-বিক্রমে মোটরসাইকেলে স্থান ত্যাগ করল।

জামালপুরের সরিষাবাড়ীর ঘটনায় আসামি পুলিশের উপ-পরিদর্শকের হাত থেকে শুধু পালাতেই সমর্থ হয়নি বরং তাকে পরাস্ত করে তার পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। একজন অবলা নারীর হাত থেকে ভ্যানেটি ব্যাগ ছিনতাই করে ছিনতাইকারী পালিয়ে গেলে অসহায় অবলা নারীটি সাহায্যের জন্য যেভাবে চিৎকার করে; তার চিৎকারে যেভাবে জনসাধারণ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে দৌড়ে আসে, পুলিশের উপ-পরিদর্শকের হাত থেকে তার পিস্তলটি নিয়ে আসামি পালালে উপ-পরিদর্শক সাহেবও সেই অবলা নারীর মতো চিৎকার করেছিলেন কিনা জানি না। তবে তিনি যে জনগণের সাহায্যের জন্য চিৎকার করেছিলেন এবং সেই চিৎকার শুনে পাড়া-প্রতিবেশীরা তাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। শুধু এগিয়েই আসেনি, আসামিকে ধাওয়াও করেছিল। সেই ধাওয়ায় আসামি কাশবনে পিস্তল ফেলে দিয়ে নদী সাঁতরে পালিয়ে গেছে এবং পুলিশের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসা মানুষরাই কাশবন থেকে পিস্তলটি খোঁজে বের করে দিয়ে উপ-পরিদর্শক সাহেবকে রক্ষা করেছে তা পরের দিন ৯ নভেম্বর দৈনিক পত্রিকা দেখে নিশ্চিত হলাম।

আশুলিয়া চেকপোস্টের ঘটনা মানুষ কীভাবে মেনে নেবে তা সময়ই বলে দেবে। একজন অস্ত্রধারীর সামনে দশজন মানুষ তুচ্ছ ব্যাপার ছাড়া কিছু নয়। এজন্যই গোটা কয়েকজন পুলিশ অস্ত্রের বলে সশস্ত্র মানুষের মিছিলকে তছনছ করে দিতে পারে। জানের ভয়ে মানুষ কোথায় পালাবে দিকবিদিক খুঁজে পায় না। সেখানে পাঁচজন অস্ত্রধারী পুলিশ দুইজন চাপাতিওয়ালাকে মোকাবেলা করতে পারল না। সঙ্গী দুইজনকে চাপাতির নিচে ফেলে বাকি তিনজন শালবনে পালাল। পুলিশের কাপুরুষতা এখানেই শেষ নয়। এই ঘটনার পরে সাংবাদিকরা ওই এলাকার দু’একটা চেকপোস্টের পুলিশ সদস্যের সাক্ষাৎকার নেন। যা ৬ নভেম্বর জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চেকপোস্টে দায়িত্বরত একজন এসআই বলেন, ‘আমরাও আতঙ্কের মধ্যে আছি’। আরও একজন পুলিশ সদস্য ভয়ার্ত কণ্ঠে বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছি ভাই’। একজন এলাকাবাসী বলেন, ‘যেখানে পুলিশই নিরাপদ নয় সেখানে আমাদের নিরাপত্তা দেবে কে?’

জনসাধারণের জীবনের নিরাপত্তা বিধান পুলিশের প্রধানতম কাজ। তাইতো কেউ কারও মাথায় বাড়ি দিলে মানুষ পুলিশের কাছে যায়। কেউ কাউকে জীবননাশের হুমকি দিলে মানুষ পুলিশের শরণাপন্ন হয়। মানুষ সন্ত্রাস চায় না। পুলিশের ওপর তাদের অগাধ ভরসা। মানুষ ভাবে- পুলিশ সন্ত্রাস দমন করে সাধারণ মানুষকে শান্তিপূর্ণ জীবন ধারণের পথ করে দেবে। সেই পুলিশেরই পাঁচ সদস্য যদি দুইজন অস্ত্রধারীর কাছে এমন নাস্তানাবুদ হয়; আর ঘটনা দেখে আরেক পুলিশ সদস্য যদি বলে, ‘আমরাও আতঙ্কের মধ্যে আছি’। যদি বলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছি ভাই তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? তারা যেখানে নিজেরাই সন্ত্রাসের শিকার এবং নিজেরা নিজেদের রক্ষা করতে পারছে না তখন সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দেবে কে? পুলিশের কাছে যদি মানুষ সেই নিরাপত্তাটুকুই আশা করতে না পারে তবে কি তাদের মনে প্রশ্ন আসবে না, এই পুলিশ দিয়ে কী হবে?

প্রতিদিনের খবরের কাগজে দেশের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের যে নমুনা দেখি, একের পর এক হত্যাকাণ্ডের যে বিবরণ পড়ি এবং সবশেষে পুলিশের চেকপোস্টে পুলিশ হত্যার যে কাহিনী অবলোকন করলাম তাতে জনমনে নিরাপত্তাবোধ প্রশ্নের সম্মুখিন হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে সর্বসাধারণের মধ্যে নিরাপত্তা বোধহীনতার সৃষ্টি হবে তা একটি জাতীর জন্য অকল্যাণকর তো বটেই। এমনকি সেখান থেকে ফিরে আসাও একটি কঠিনতম কাজ। একদিন আসবে যেদিন এই নিরাপত্তা বোধহীনতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারকে অনেক ঘাম ঝরাতে হবে।

বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭১ সালে রাজারবাগ পুলিশলাইনে এই পুলিশ বাহিনীই পাক-হানাদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। স্বাধীনতাযুদ্ধে বড় অবদান রেখেছিল। শান্তি মিশনে বাংলাদেশের যে গৌরব উজ্জ্বল অবস্থান তাতে পুলিশ বাহিনীর অবদান কম নয়। সেই পুলিশকে বাংলাদেশের মানুষ এমন নাজুক অবস্থায় দেখতে চায় না। তারা পুলিশকে জনসাধারণের নিরাপত্তার আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখতে চায়। পুলিশ সদস্যরা সাহসী হবে, তারা হবে উদ্যমী, তাদের মনোবলে ঘাটতি থাকবে না। গোয়েন্দা তৎপরতায়ও তারা থাকবে অবিচল। এদেশের মানুষ এমন একটি পেশাদারি মনোভাবই পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে আশা করে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।