সন্ধ্যা ০৭:০৬ ; রবিবার ;  ২৪ মার্চ, ২০১৯  

ভেসে যাওয়া সমাজের বুদবুদ ঐশী

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

তুষার আবদুল্লাহ॥

আমরা হাঁটতে, দাঁড়াতে ভুলে গেছি। শিখেছি কেবল ভেসে যেতে। এই ভেসে যাওয়া স্রোতের অনুকূলে। বিপরীতে চলার সাহস রাখছি না। স্রোতের বিপরীতে চলা অত্যাবশ্যক তা-ও বলছি না।কিন্তু কখনও কখনও বিপরীতে চলতে হয়। বিচার-বিশ্লেষণ করতে হয় ভেসে যাওয়া কতটা যৌক্তিক হচ্ছে। কখনও কোনও দিকে না যেয়ে মাঝে দাঁড়িয়ে থাকারও প্রয়োজন দেখা দেয়। আসলে যৌক্তিকতা ও বিচার-বিশ্লেষণ করে চলতেই বুঝি ভুলে গেছি আমরা। তাই দেশে, সমাজে কোনও ঘটনা ঘটলে স্রোত চলতে শুরুর অপেক্ষায় থাকি, দেখি কোন দিকে যাচ্ছে, তারপরই নিজেকে ভাসিয়ে দেই। দিস্তা দিস্তা উদাহরণ তুলে ধরতে পারি। কিন্তু পাতা উল্টিয়ে পেছনে না যেয়ে যদি সস্ত্রীক নিহত পুলিশ কর্মকর্তার মেয়ে ঐশীর মৃত্যুদণ্ড নিয়ে সাধারণের প্রতিক্রিয়া দেখি, তাহলেই ভেসে যাওয়া কচুরিপানার মতোই নিজেদের অবস্থান চিহ্নিত করা যাবে। ঐশী তার বাবা-মাকে হত্যা করেছে। মাদকাসক্ত ছিল মেয়েটি। চলাফেরায় ছিল না শৃঙ্খলা। বন্ধুদের সহযোগিতায় বাবা-মাকে হত্যা করেছে সে। একথা সবার জানা। আদালত ফাঁসির আদেশ দেওয়ার পর সাধারণ মানুষের মাঝে দুটি পক্ষ তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ বলছে- ফাঁসির আদেশ যথাযথ হয়েছে। এই রায় দেখে, যে ছেলেমেয়েরা উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপন করছে তারা সাবধান হবে। সংযত হবে ব্যক্তি জীবনে। অপরপক্ষ ফাঁসির এই আদেশ মেনে নিতে পারেনি। তাদের মতে যারা ঐশীকে বিশৃঙ্খলার পথে যেতে সায় দিয়েছে, পরিস্থিতি তৈরি করেছে এই দায় তাদের। কেবল ঐশীকে ফাঁসি দেওয়ার মধ্যে তারা কোনও সমাধান খুঁজে পাচ্ছেন না।

যুক্তি, বিশ্লেষণ দিয়ে হেঁটে চললেই আমাদের এগিয়ে যাওয়া টেকসই হবে। যেখানে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র হবে চিন্তাশীল ও সংযমী, সেখানে ঐশীরা সুযোগ পাবে না মুঠোর বাইরে চলে যাওয়ার। সম্তানের ফাঁসির রায়ের ভারও বইতে হবে না আমাদের।

আমার মনে হয় স্রোতে কোনও দিকে ভেসে না গিয়ে, ক্ষণকাল দাঁড়িয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন আছে। এখানে মধ্যম অবস্থান নিয়ে উভয়ের সঙ্গে চলি এমন মনোভাবকেও স্বাগত জানানো যাচ্ছে না। আমাদের প্রথমে পরিবারের দিকে নজর দিতে হবে। এখানে একটি শিশু এক পা দুই পা করে, কিভাবে কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পৌঁছে? এই পথ-পরিক্রমায় সমাজের প্রভাবে তার মাঝে অনেক চাহিদা বা উপযোগ তৈরি হয়। সেই উপযোগ গুলো কি পরিবার ভেবেচিন্তে মেটাচ্ছে? কোনও কোনও পরিবার প্রতিযোগিতায় ভেসে সিন্দুক মেলে দেওয়ার মতো করে সন্তানের বায়না মেটাচ্ছে। কেউ সামর্থ্য থাকার পরও কানাকড়ি দিতে রাজি নয়। এই দুই অবস্থানই সন্তানের জন্য অনিরাপদ। তাকে বায়নার কতটা কখন উপভোগ করা উচিত সেই বিষয়ে অবগত করা দরকার। সন্তানের কাছে বাবা-মা অর্থাৎ পরিবারের অর্থের উৎস স্পষ্ট হওয়া উচিত। আসলে লুকিয়ে রাখতে চাইলেও সন্তানের কাছে সেটা রাখা সম্ভব হয় না। সন্তান যখন জানতে পারে পরিবারে অনৈতিক আয়ের উৎসের কথা, তখন সেও অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত জীবন বেছে নেয়। তখন সে মনে করে পরিবারের নৈতিক অবস্থান নেই তাকে নিয়ন্ত্রণ করার। বেশিরভাগ সময় দেখা যায়- সামাজিক দৃশ্যমান প্রতিযোগিতায় বাবা-মা সন্তানকে আধুনিক, স্মার্টরূপে তৈরি করতে চান। সেজন্য দুহাত খুলে প্রশ্রয় দিতে থাকেন। যেহেতু প্রশ্রয় দেন হাত খুলে, সেহেতু এক সময় সন্তান আর নাগালের মধ্যে থাকে না। তাকে নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে চাইলেই, শুরু হয় বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বিরোধ। সন্তান তখন তার বখে যাওয়ার চরম অবস্থানটি নিয়ে নেয়। এবং তা চরিতার্থ করতেও দ্বিধা করে না। পুলিশ অফিসার, তার স্ত্রী এবং সন্তান ঐশীর বেলাতে আমরা এই পরিস্থিতি লক্ষ্য করেছি।

আমাদের বেসামাল পুঁজি, ফেঁপে ওঠা মধ্যবিত্ত সমাজে বেড়ে ওঠা সন্তানদের একটি বড় অংশ কোন অবস্থানে আছে? ঐশী তার প্রতিনিধিত্ব করেছে মাত্র। পুলিশ অফিসার ও তার স্ত্রী নিহত হওয়ার পর থেকে ঐশী কারাগারে ছিল। গণমাধ্যমে তার বখে যাওয়ার কারণ ও গল্প এসেছে অসংখ্যবার। কিন্তু এর কোনও প্রভাব কি সমাজে পড়েছে? আমিতো ফেঁপে ওঠা মধ্যবিত্ত সমাজ ও পুঁজির সরোবরে হাবুডুবু খাওয়া শ্রেণিতে ঐশীর মতো সন্তানদের ভিড় বাড়তেই দেখছি। ঠিক ঐশীর বাবা-মা তার সন্তানকে যেভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন, সেই প্রশ্রয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নাতো ওই সমাজের সন্তানরা। বলছি না যে, নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন সমাজে ঐশীরা অনুপস্থিত। সেখানে দারিদ্র্য ও শিক্ষার অভাবে অন্যরূপে ঐশীরা আছে। কিন্তু মধ্য ও উপরতলায় যে শিক্ষা পাচ্ছে ঐশীর বয়সীরা সেখানে পুঁজির দৃশ্যমান উপস্থাপন শিক্ষাই মুখ্য হয়ে উঠছে। ফলে একটি বিচারের রায়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার অবস্থানে নেই আর আমরা। কখনও কখনও মনে হয় সমাজকে যদি ভেঙে মাটির দলা করা যায়, তাহলে আবার নতুন করে গড়ার সুযোগ নেওয়া যেত। কিন্তু সেই সুযোগ নেই। তাই বলে সমাধান নেই একথাও বলছি না।

বাংলাদেশ আর্থ-রাজনৈতিকভাবে এখন যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখান থেকে বলতে পারি আবার শুরু হোক নতুন করে চলা। সেই চলা ভেসে চলা নয়। ভেবেচিন্তে হেঁটে চলতে হবে। দৌড়ে চলারও প্রয়োজন নেই। যুক্তি, বিশ্লেষণ দিয়ে হেঁটে চললেই আমাদের এগিয়ে যাওয়া টেকসই হবে। যেখানে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র হবে চিন্তাশীল ও সংযমী, সেখানে ঐশীরা সুযোগ পাবে না মুঠোর বাইরে চলে যাওয়ার। সম্তানের ফাঁসির রায়ের ভারও বইতে হবে না আমাদের।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।