সন্ধ্যা ০৭:২৩ ; রবিবার ;  ২৪ মার্চ, ২০১৯  

সত্যের সন্ধানে

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মাহমুদুর রহমান॥ 

অবিশ্বাস যখন চরমে পৌঁছে, তখন খোদ ইতিহাসের বিশ্বস্ততা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। হাজার বছরের ঘটনা লিপিবদ্ধ বইয়ের পাতা উল্টে অথবা ইন্টারনেটের ডিজিটাল পাতার মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায়—কোনও রকম সন্দেহ থাকলে, অন্যের লেখা দিয়ে সত্য নিশ্চিত করা  হয়। এর বাইরে জানার উপায় নেই। কারণ ঘটনার নায়করা কেউ ইহধামে উপস্থিত থাকেন না।  কিন্তু সময়ের চেয়েও  বড় ধূসরতা নিকট ইতিহাসকে জানার, বোঝার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সত্যকে অসম্পূর্ণ রেখে, কেবল ব্যক্তির অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা করে এবং পারিপার্শিকতা উপেক্ষা করে রচিত ইতিহাস এক ধরনের ধূসর প্রলেপে ঢেকে গেছে। এতে সত্য আছে বৈকি, মূল সার নেই।

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলের ইতিহাসের প্রসঙ্গে উঠলে সেই সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী যে কয়জন এখনও জীবিত, তাদের রোষানলে পড়তে হয়। তখন তারা বলেন, 'তোমরা ইতিহাস পড়ে শিখেছ, আমরা দেখেছি'। কথাটির যুক্তি অকাট্য। ভারত থেকে পাকিস্তানের সৃষ্টি নিয়ে বহুজনের বহু মত। আটষট্টি বছর পর, অনেকে বলবেন এর অনেক আগেই, ধর্মের ভিত্তিতে দ্বিজাতি তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ভুল যদি হয়ে থাকে, তা তাত্ত্বিক না বাস্তবায়নে, তা নিয়ে হয়তো আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

একই আমলের সম্পূর্ণ চিত্র হয়তো ফুটে ওঠেনি। না বলা অনেক কথা লেখা হয়নি। যা লেখা হয়েছিল, তা ছাপা হয়নি। তাই কিছুটা গ্রিক ইতিহাস জানবার চেষ্টায় মৌখিক পরম্পরা লব্ধ। সে কারণেই মিসরের গ্র্যান্ড মুফতিকে হিটলারের ইহুদি নিশ্চিহ্ন করার চুড়ান্ত সমাধান (Final solution)-এর মূল হোতা আখ্যায়িত করার চেষ্টা বেনজামিন নেতেনইয়াহুর। লিপিবদ্ধ ইতিহাসের বাইরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোক, এমনকি হলোকাস্টের বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের উদ্ভট তত্ত্ব উপস্থাপন করেনি। এর মাধ্যমে খোদ জার্মানির আত্মস্বীকৃত দায়বদ্ধতার গ্লানি হাল্কা করার প্রয়াস জার্মানির চ্যান্সেলর এন্জেলা মার্কেল নিজেই উড়িয়ে দিয়েছেন। রাজনীতির মাঠে কোণঠাসা হলে ইতিহাসকেও বিকৃত করা যায়। পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন হলেও ব্রিটিশ রাজ মুকুটের মধ্য মনি কোহিনুর ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিও কিছুটা ইতিহাসকে নিয়ে তামাশা। কোহিনুর চুরি করে নেওয়া না কি দান করা হয়েছে, পরিষ্কারভাবে উল্লিখিত আছে কি না, সন্দেহ। নরেন্দ্র মোদি-ডেভিড ক্যামেরনের আলোচনায় বিষয়টি যে স্থান পাবে না, তা নিশ্চিত।

বছরখানেক আগে দ্বিজাতি তত্ত্ববিরোধী সাংবাদিক এম জে আকবর কট্টর হিন্দুপন্থী বিজেপি-তে যোগদান করেন। সেইসঙ্গে ভারতের মুসলিম যুবকদের জানিয়েছিলেন যে, তারা পাকিস্তানের মুসলিমদের চাইতে অনেক ভালো আছেন। ধর্মনিরপেক্ষ ভারত আজ কতটুকু নিরপেক্ষ তা আজ সহজেই অনুমেয়। বিজেপি তথা রাষ্ট্রীয় সেবক সংহের মূল চরিত্র আজ উদঘাটিত। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের কোনও ধর্মবিরোধী যুদ্ধ ছিল না। যে স্বাধীকার অর্জনের জন্য সংগ্রাম, সে স্বাধীকার পশ্চিম বঙ্গে আজও অনুপস্থিত।

পাকিস্তানের জন্মের পর পরই বোঝা গেল জাতিগত নয়, অঞ্চলভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব চাপিয়ে দেওয়ার সকল আয়োজন করা হয়েছে। ধর্মের আদলে আবৃত প্রথমে ভাষা তারপর জাতিসত্ত্বার ওপর এলো আক্রমণ। আর সেকারণে যে পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য জনগণের ঢল রাস্তায় নেমেছিল, তাদের আবার নামতে হলো স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য।

লেখক: কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।