বিকাল ০৪:১০ ; মঙ্গলবার ;  ২১ নভেম্বর, ২০১৭  

সামসুল হকের কবিতা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

কেমন করে যেন পশ্চিম বাংলার এই ষাট দশকের অন্যতম কবি হারিয়ে গেলেন—তা বাংলা কবিতার পাঠকরা জানতেও পারলেন না। একমাত্র যিনি বলতে পারতেন, বক্রোক্তি করতে পারতেন—তিনি এখন কাকদ্বীপে অচেনার দেশে নিশ্চুপ হয়ে আছেন, এখন আর কোনো কথা বলেন না, তাঁর অনুরাগীদের মেজাজ ও অভদ্র আচরণ দিয়ে বিস্মিত করেন না। দরজার সামনে ‘প্রবেশ নিষেধ’ ঝুলিয়ে রাখেন না। কিন্তু ‘একুশ’টা কাব্যগ্রন্থ আমাদের সামনে, ধুলোয়, অজানায়, পড়ে আছে।

তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়ন গদ্য ছাপা হচ্ছে শিগগিরই। আজ শুধু কবিতা।

 


খুনি

খুনিও কবিতা লেখে হঠাৎ-ই সে লেখে
‘সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!’
জীবনানন্দের এই লাইনটি তুমি কেন লিখলে আবার
শুনে খুনি ঝড়ের ভিতর থেকে আন্তরিক বিস্মিত হয়েছে
ঝড়েরও বিস্ময় ছিলো
    সে কেন খুনিকে দিলো চৌকোনীল উন্মত্ত স্তব্ধতা
    সে কেন খুনিকে দিলো
            নীল ভোর
            কাঁচা আর
            কিশোরীর প্রথম আঁচল

খুনিতো কবিতা লেখে
    বলেছিলো অন্য-এক খুনি
    শুনেছিলো অন্য-এক খুনি
যে প্রতিরাত্রেই তার কবরের শূন্য থেকে উঠে এসে
    খুন করে কিশোর কবিকে


পিঁপড়ে আর মাছির আপনজন

‘ক’-হাতে ‘খ’-এর একজন খুন
    তার নাম : খ-০০৫/১৪(৭০)
‘ক’-এর তৃপ্তি, ‘খ’-এর শোক-রাগ,
‘ক’-এর শত্রু খতম, ‘খ’-এর কথায়—শহিদ
ফলে, মিছিল, শোক-মিছিল, ক্রোধ-মিছিল, মালা ইত্যাদি

‘খ’-এর হাতে ‘ক’-এর একজন খুন,
    তার নাম : ক-২০.০১৩(৪৭)
‘খ’-এর টেবিলে, পেপার-ওয়েটে উল্লাস,
    ‘ক’-এর ক্যালেন্ডারে কালো অক্ষরের দিন
ফলে, মিছিল, শোক-মিছিল, ক্রোধ-মিছিল, মালা ইত্যাদি

‘ক’-এর হাতে ‘ক’-এর একজন খুন,
    ঠিকঠিক শব্দটি : শেষ-নিশ্বাস ত্যাগ,
‘খ’ অনবহিত, ইনডিফরেন্ট
‘ক’ প্রাত্যহিক কাজে ব্যস্ত
    সবাই তৃপ্তিহীন, ক্রোধহীন,
লাশটার উপর পিঁপড়ের আর মাছির কোনো অবহেলা নেই।


ট্রেন যায়

কোথায় কিসের শব্দ— হয়তো ট্রেনের শব্দ যায়,—
বুঝি সারা কামরা জুড়ে চৈতন্য ভীষণ একা-একা,
পাহাড়তলির পথে ট্রেন যায়; শব্দ চলে যায়:
শব্দ কতোদূর যায়?— বাবা-মার শৈবাল-সত্তার?
ট্রেন যায়, অন্ধকার, তোমাকে স্বীকার করে নিয়ে;
ব্রিজের উপর দিয়ে চলার সময় ছায়া নেই—
শব্দ যায়, ভালোবাসা, তোমাকে স্বীকার করে নিয়ে...

ট্রেন ক্রমাগত যায়, স্টেশন কোথাও ছিলো না।

মিতকথন

১.
দ্বিচারিণী বোধ কখন বেঁধেছে সুষম স্বরের ঘর?
জীবন জেনেছি বিস্রস্তপ্রভা তিথিহীন চন্দ্রিকা...

২.
দীর্ঘখেত একলা থাকে, একলা থাকা স্বাভাবিক,
সময় হলে একক খেত ফসল ঘরে দিয়ে যায়।

৩.
ঈসকাইলাস শুয়ে আছে ভাঙা ফ্লাওয়ারভাসে।...

৪.
হরিণশিশু খেলা করে ফ্লাওয়ারভাসে।...
...........
হুলোবেড়াল উলটে দিলো ফ্লাওয়ারভাস। রানু,
আমি বনে ফিরে গিয়ে হরিণশিশু হবো।

৫.
ফ্যারাও, দ্বিতীয় স্বর্গের নির্মাণ
শেষ ক'রে তবু পেলে না তো অধিকার;
শেষাবধি তুমি কার হাতে সন্ধান
স্থাপন করলে? স্বরচিত সামগান
শুনবার মতো অবসর কোথা পেলে?
এমনি ক'রেই থেমে যায় সংস্তব।
আত্মপ্রণয় ছিলো না অসম্ভব
যদি রেখে দিতে প্রসারিত ভালোবাসা।

৬.
ভালোবাসা, তুমি পশ্চিমে কেন গেলে—
ললিত বৃক্ষ অপমানে মরে যায়;
শেষ সম্মান অনসূয়া ধরে রাখে:
তার দায়িত্ব নিশ্চিত চর্যায়
এবং ধৃত হোক। কার অপেক্ষা করো?

৭.
প্রেমের অপর নাম প্রথাহীন দায়িত্বগ্রহণ।
প্রেমের অপর নাম ধূ-ধূ মাঠ নিঃসঙ্গ নির্জন।

৮.
আমার নাম ধরে আমি বেদনা ডাকলাম,
বোধিদ্রুমের পাতা এখন ভীষণ ঝরে যায়।

৯.
প্রকৃত সমুদ্র কোন নিয়তির মধ্যে প্রবাহিত?
বোধের জাহাজে দীর্ঘ নিশ্চিত মাস্তুল
গলায় ঝুলিয়ে, চাঁদ সব সর্বনাশ পার হয়—
কোথায় সমুদ্র, বোধিজাহাজ, মাস্তুল?

সর্বনাশ পার হলে সফলতা পার হতে হয়...

১০.
বিছানায় আজ হচ্ছে নিলাম
কার খোঁপাচ্যুত ক্রিসান্থিমাম...

১১.
শূন্যতা, যখন তুমি চুমু খাবে নায়িকার মতোন কোমল,
এক হাত স্তনে রেখে ট্রিগার খুঁজবো, দেখো, অন্য করাঙ্গুলে।

১২.
সমাজ বা রাষ্ট্র-বিপ্লবের জন্যে প্রকৃতি কতোটা সহায়ক?
রমণের পূর্বে শৃঙ্গারের মতো? সুখ বা শান্তির জানে কে আছে চালক?

১৩.
স্বীকরণে শোকযাত্রার খুশি আসে।
কেন তরঙ্গ দোলাবো সেরিব্রামে
বেশিমাত্রায়? জীবন মাত্রাধিক
জমকালো হলে কেউ আর ভালোবাসে?

১৪.
তুমি আমার বন্ধু হবে?
প্রতিশ্রুতির অপরাহ্নে
সবাই কেমন বাতাসে তির্যক
পরস্পর ভাবছে দ্রুত:
আমিও কেবল পরিশ্রুত
...অন্য সবাই ভীষণ আহাম্মক।

১৫.
.............................ঘোড়াটা
জলের উপরে তার ছায়া দেখলো, বুঝতে পারলো—
                কবিতা লোহিত;
লোহিতকে বড়ো ভয়। গদ্যের মতোন মাঠে ছোটালো চার-পা।
মাঠের পশ্চিমে সূর্য; ছায়া পূর্বে: স্বভাবত ঘোড়াটা আবার
ভয় পেলো, গদ্যের অসংখ্য পায়ে আসছে তার দিকে।

১৬.
এখন ভাসান দেবো জলে হিত ও অহিত,
স্থিতি আমার এবার হবে স্বয়ংবরা।


ট্রাপিজ

নিচে আস্তরণ ছিলো, কমপক্ষে, সুব্যবস্থা ছিলো,
বাঁশ, দড়ি, ইত্যাদি অনেক-কিছু ছিলো,
            কয়েক হাজার চোখ ছিলো,
            এখন সে-সব কিছু নেই,
            তাঁবুটা, লোহার রড— কোনো কিছু নেই,
কেবল দুজন একপ্রান্তে থেকে অন্য শূন্যপ্রান্তে ক্রমাগত
            দোল খাচ্ছে
                  দোল খাচ্ছে
                দোল খাচ্ছে,
            অবশেষে তারা বুঝলো, তারা
ভিন্ন অবয়ব নিয়ে ট্রাপিজের
            খেলা খেলছে আজ,
            শেষে ছেলে-মেয়ে-দুটো একে অপরের
নখ দিয়ে মাংস তুলে চতুর্দিকে ছুড়ে-ছুড়ে দিলো,
            তারা ভাবলো,
মাংসখণ্ডগুলো ক্রমে দর্শকের
            চোখের আকৃতি নিয়ে নেবে,
ক্ষতস্থান-থেকে-ঝরা রক্তগুলো
            নিচে জাল হয়ে সেভ্ করবে,
অনুরূপ আশা করে পাৎলুন জাঙ্গিয়া ফেলে দিলো,
            তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে তারা ফের ভাবলো—
            রডদুটো ধরে থেকে এখন কী লাভ,
এই ভেবে ছেলেটি মেয়েটি রড ছেড়ে দিয়ে
            শূন্য জড়াজড়ি করে
            দোল খাচ্ছে দোল খাচ্ছে দোল—

আর, ঘোর জ্যোৎস্না থেকে কারা যেন হাততালি লাগালো খুব জোরে।

অনুবাদ

আ:
শব্দ, তুমি কতোবার পুণরাবৃত্তির বলি হবে—
কতোদিন বিভিন্ন সঙ্গতে? কিংবা বিভিন্ন বাতাসে?
‘নত’ দন্ত্যবর্ণের সমষ্টি,
‘ধন’-ও সমান জায়গায় অন্তর্গত,
উভয়েই হ্রসস্বর, অর্ধেক বিপল আয়ুঙ্কাল,
অথচ দুজনে যদি পাশাপাশি এসে যায় আমাদের কী-বা আর থাকে?
হয়ে যাই কাঠের পুতুল কিংবা ছিলাহীন ধনু।
পৃথিবী জম্মের পরে যতো স্বাস্থ্য নিয়ে এসেছিলো
যতোটা ওজন তার ছিলো
এখন নিশ্চয় তার থেকে কিছু বাড়েনি, কমেনি, কিন্তু দ্যাখো,
অ্যামিবা মানুষ হলো, দেশে দেশে গণতন্ত্র হলো,
জামার পকেট হলো, ভিতরে রয়েছে তীক্ষ্ন ছুরি।
তোমার ঐ অডরোবে, শব্দ কতো-কোটি-প্রস্ত স্যুট জমা আছে?

ফ্রেঞ্চ থেকে, জর্মন ইংরেজি থেকে, বৃক্ষ থেকে শুধু
ঘুমের ওষুধ থেকে শুধু
জটিল নয়ন থেকে শুধু
সব অনুবাদ করে যাচ্ছি,
কবিও নিজেই অনুবাদ।


নিজের বিপক্ষে

নিজের বিপক্ষে হলে প্রতিবাদ কিছুই আসে না।
নিজের বিপক্ষে বলা সবচেয়ে নিরাপদ। দ্যাখো,
বাতাস পশ্চিম থেকে পূর্বে এলে আকাশের বক্তব্য থাকে না;
বাগানের তর্জনী ওঠে না
যখন হলুদ ফুল লাল হয়। আসল রহস্য,
নিজের বিপক্ষে সব প্রতিবাদ। নিজের পাতাল-
প্রবেশের জন্য সব প্রতিবাদ। স্ত্রী আত্মীয় বন্ধু
স্বরের ব্যাপারে শুধু সহায়তা করে, কিন্তু আমার প্রতীকী অনিদ্রার
প্রতিবাদ করে না। যে রাজ্যপাট উল্টে দিয়ে আমি বেপরোয়া,
তার সিংহাসন নিজে মাথায় বহন করে যাই,
অথচ কোথায় প্রতিবাদ?
প্রতি প্রতি প্রতি প্রতি প্রতি প্রতি প্রতি
কার প্রতি? সম্ভবত কেউই জানে না। হায়, আসল রহস্য,
নিজের বিপক্ষে সব প্রতিবাদ। নিজের পাতাল-
প্রবেশের জন্য প্রতিবাদ।

 

 

অলঙ্করণ : সঞ্জয় দে রিপন

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।