সন্ধ্যা ০৭:১৩ ; রবিবার ;  ২৪ মার্চ, ২০১৯  

ধীরে চলুক বিএনপি

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

আনিস আলমগীর॥

খালেদা জিয়ার অবস্থা এখন ‘পঞ্চভূতের ফাঁদে, ব্রহ্ম পড়ে কাঁদে’-এর মতো। তার চিন্তাধারা ও কাজকর্মে বাস্তবতার কোনও চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে না। বিরাট সংসারের একক কর্তা। অন্য কারও কথা চলে না এ সংসারে। এমন একটি সংসার ফেলে তিনি বসে আছেন নির্বিঘ্নে লন্ডনে। পায়ের ব্যাথা, চোখের অমুখ-তমুখ অনেক সমস্যা তার। অনেকে বলছেন, আসলে তিনি নাকি ফান্ড কালেকশনে ব্যস্ত। স্থানীয় ব্যবসায়ী, যারা চাঁদা দিতেন, তারা দৌড়ের ওপর আছেন। আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাসীকে চাঁদা দেওয়া আর বিএনপিকে চাঁদা দেওয়াকে তারা এক ও অভিন্ন মনে করছেন।

খালেদা জিয়া সবসময় সবকিছুই জৌলসের সঙ্গে করেছেন। তার প্রচুর টাকার প্রয়োজন। ক্ষমতায় নেই প্রায় ৯ বছর হতে চলেছে। সুতরাং টাকার অভাব তো হবেই। তার গৌরি সেনেরা তো কিছুটা ক্লান্ত আবার কিছুটা সরকারের কু-দৃষ্টিতে আছেন। সুতরাং লন্ডনে বসে বসে ফান্ড কালেকশনের বিষয়টা একেবারে মিথ্যা মনে হচ্ছে না। রাজপুতেরা সবাই মোঘল আধিপত্য মানেননি। প্রতাপ সিং মোঘল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। তিনি পাহাড়ে পর্বতে থাকতেন। অর্থাভাবে তিনি সময় সময় তার সৈন্য-সামন্তের খাবার ব্যবস্থাও করতে পারতেন না। এক সময় এক নাগাড়ে তিনদিন অভুক্ত থাকার পর তিনি মোঘল সেনাপতি মান সিংহকে লিখেছিলেন তারপক্ষে অর্থাভাবে বিদ্রোহ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সুতরাং তিনি মোঘল রাজদরবারে গিয়ে আত্মসর্মপণ করবেন।

মান সিংহও ছিলেন রাজপুত। তিনি প্রতাপ সিংহের জ্ঞাতী ভ্রাতা। মান সিংহ তাকে উত্তরে বলেছিলেন, রাজপূতদের মানসম্ভ্রম রক্ষা করার জন্য তিনি যেন আত্মসমর্পণ না করেন। প্রতাপ সিংহ কখনও আর সমতলের মুখ দেখেননি। বহু বিদ্রোহী বহু স্বাধীনতাকামী অর্থাভাবে বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। অর্থ খালেদা জিয়ারও প্রয়োজন। না হয় তার অবস্থাও প্রতাপ সিংহের মতো হবে। লন্ডনে নাকি তিনি বহিঃবিশ্বের কোনও কোনও বন্ধুরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করছেন। অবশ্য বহিঃবিশ্বের খালেদা জিয়ার বন্ধুরাষ্ট্র তেমন নেই, পাকিস্তানই তার একমাত্র বন্ধুরাষ্ট্র। খুব শক্তিশালী লবিস্ট ফার্মও নাকি নিয়োগ দিয়েছেন।

ফার্মটা নাকি খুবই অভিজ্ঞ এবং উচ্চ মানের। খালেদা জিয়া যেভাবে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছেন, তা কাটিয়ে উঠতে শক্তিশালী সাহায্যের প্রয়োজন। ২০১৪ সালের, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বন্ধ করতে আমেরিকা পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে প্রকাশ্য সাহায্য করেছিল, তার রাষ্ট্রদূত দিল্লি পর্যন্ত গিয়ে দরবার করেছেন। তখন কিন্তু কোনও কিছুই ফলপ্রসূ হয়নি। যুগপৎ তিনি আন্দোলনও তখন অব্যাহত রেখেছিলেন। বহিঃবিশ্বে একটা পতিত রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের জন্য কতটুকু সাহায্য করবে? আর এ সাহায্য কতটুকুই বা কার্যকরি হবে? অন্যদিকে বহিঃবিশ্বে খালেদা জিয়ার চেয়ে শেখ হাসিনার পরিচিতি ও সুখ্যাতি বেশি। ড. ইউনুস পদ্মা সেতুর সাহায্য বন্ধ করতে পেরেছিলেন সত্য কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালকের পদে পুনরায় বসতে পারেননি।

কোনও জটিল পথে অগ্রসর না হয়ে সহজ-সরল পথে রাজনীতি নিয়ে সংগঠন নিয়ে অগ্রসর হওয়াই খালেদা জিয়ার জন্য মনে হয় উত্তম ছিল। বিহারের নির্বাচনে লালু প্রসাদ যাদব ফৌজদারি মামলায় শাস্তি হওয়ার কারণে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করতে পারেননি সত্য কিন্তু নির্বাচনে তার জোটই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে সরকার গঠন করছে। বিএনপির ভুল সংশোধন করতে গিয়ে পথ আরও জটিল হচ্ছে কি না, তাও চিন্তা-ভাবনা করা উচিত।

হটকারী রাজনীতি করতে গিয়ে জাসদ বিধ্বস্ত হয়েছে। জাসদ বিএনপির চেয়ে এত বেশি ছোট আকারের দল ছিল না। তার জনসমর্থনও অবহেলা করার মতো নয়। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের অনেক আগ থেকে আন্দোলন চলমান ছিল বিএনপির। তাতে দলের শত শত কর্মী জেলে গেছে। শত শত কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তার কোনও  ব্যবস্থা না করে ২০১৫ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে পুনরায় আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্তটাই ভুল হয়েছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এটাকে হটকারী সিদ্ধান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এত বিপুল  মামলা, এত ব্যাপক গ্রেফতার মনিটারিং করে সুষ্ঠু কোনও সাহায্য-সহানুভূতি নিয়ে কর্মীদের পাশে দাঁড়ানো কোনও দলের পক্ষেই সম্ভব নয়।

আমরা যতই বলি না কেন, আন্দোলনের কারণে এরশাদের পতন হয়েছে। এটা কিন্তু সত্য নয়। প্রশাসন তার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেছিল বলেই তার পতন তরান্বিত হয়েছে। খালেদা জিয়া লন্ডনে এই আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে তীব্র বলে উল্লেখ করেছেন, অথচ সরকারের পতন তো দূরের কথা নির্বাচনটা পর্যন্ত বানচাল করে দিতে পারেননি। প্রশাসন যদি অনুগত থাকে, তবে নির্বাচন ছাড়া সরকার বদলানোর আর কোনও বিকল্প পথ আছে বলে মনে হয় না।

খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৩২ বছরব্যাপী রাজনৈতি করছেন। দশ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দশ বছর সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী ছিলেন। আমরা লক্ষ করেছি, তিনি দেশ চালানোর সময় কোনও প্রসারিত প্রগ্রেসিভ কর্মসূচি নিয়ে সরকার চালানোর চেষ্টা করেননি। আবার দল পরিচালনার সময়ও কোনও দর্শন উপস্থিত করে কর্মীদের একটা সুষ্ঠু সুন্দর পথে পরিচালনার পন্থা স্থির করেননি। অথচ উভয় কর্মসূচি ছিল একটা দলীয় সরকার ও দলীয় কর্মীদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। আর বিএনপির চিন্তা চেতনায়ও কখনও সুস্থতা ছিল না। তারাই বললেন যে, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার তারাও চান, তবে তা স্বচ্ছ হতে হবে। আবার মানবতাবিরোধী অপরাধীদের রাজনৈতিক নেতা আখ্যায়িত করে তাদের মুক্তিও চান খালেদা জিয়া। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের নিয়ে মিছিল-মিটিংও করেন। এমত দ্বিচারিতার কারণে তারা মানুষের কাছে হালকা হয়েছেন।রাজনীতির এই ধারা অব্যাহত রাখলে তারা মানুষের কাছেও পরিত্যক্তও হবেন।

আওয়ামী লীগবিরোধী অন্য কোনও প্ল্যাটফর্ম নেই, সে কারণে আওয়ামী লীগবিরোধী ভোট কোনও আশ্রয় পাচ্ছে না বলে এখনও বিএনপিকে ভোট দিচ্ছে মানুষ। না হয় তাদের বিশৃঙ্খল রাজনীতির জন্য বহুদিন আগেই তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারত। মানুষ রাজনীতি করে, সংগঠন করে কিন্তু ক্ষমতার জন্য এত পাগলামি করা মানুষ ভালো চোখে দেখে না।

বিএনপিতে প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদের খুবই অভাব। পিওন কাইয়ুম, মুরগী বশর, হকার চৌধুরী আলম, মুরগী মিলন এরাই দলটির মধ্যমসারির নেতা। সংগঠনকে রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে রাখলে যে কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি আছেন, তারাও চলে যাবেন। শমসের মুবিন চৌধুরী এরই মাঝে চলে গেছেন এখন মেধা শূন্যতায় অস্থিত্বই চূড়ান্তভাবে বিপন্ন হবে। বিএনপির উচিত ধীরে চলা। নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করা।

লেথক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।